ঋষি অরবিন্দ: বিপ্লবী থেকে বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের রূপকার
(তৃতীয় পর্ব)
বঙ্গভঙ্গ, 'বন্দে মাতরম' ও জাতীয়তাবাদের নতুন ভাষা (১৯০৫–১৯০৮)
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। ব্রিটিশ সরকার এই সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস বলে ব্যাখ্যা করলেও সমসাময়িক বহু ভারতীয় নেতা একে "Divide and Rule" নীতির অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। এই সময়েই বরোদার নীরব অধ্যাপক অরবিন্দ ঘোষ কলকাতায় এসে সরাসরি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। ইতিহাসের দৃষ্টিতে এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়। কারণ মাত্র তিন বছরের মধ্যেই তিনি কেবল একজন লেখক বা চিন্তাবিদ নন, বরং ভারতীয় চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।
কলকাতায় এসে অরবিন্দ প্রথমে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ-এর অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প গড়ে তোলা। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি উপলব্ধি করেন যে কেবল শিক্ষা নয়, রাজনৈতিক চেতনাকেও জাগিয়ে তুলতে হবে। এই সময় তিনি ইংরেজি দৈনিক Bande Mataram-এর প্রধান সম্পাদকীয় লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। যদিও পত্রিকার আনুষ্ঠানিক সম্পাদক ছিলেন বিপিনচন্দ্র পাল, অধিকাংশ প্রভাবশালী সম্পাদকীয় অরবিন্দের লেখা বলে সমসাময়িক সূত্র ও গবেষকরা একমত। তাঁর ভাষা ছিল যুক্তিনিষ্ঠ, তীক্ষ্ণ এবং নির্ভীক। ব্রিটিশ শাসনের নৈতিক বৈধতাকেই তিনি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন।
অরবিন্দের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যায় এই সময়ে। তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃত্ব ব্রিটিশ সরকারের কাছে সাংবিধানিক সংস্কার ও অধিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানাচ্ছিল। কিন্তু অরবিন্দ যুক্তি দেন, পরাধীন জাতির লক্ষ্য হতে পারে না সীমিত সংস্কার; লক্ষ্য হতে হবে পূর্ণ জাতীয় স্বাধীনতা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। অনেক জনপ্রিয় লেখায় দাবি করা হয় যে "পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি প্রথম অরবিন্দই তুলেছিলেন।" ইতিহাসবিদদের অধিকাংশই বরং বলেন, তিনি ছিলেন প্রথম সারির সেই নেতাদের অন্যতম, যিনি ১৯০৬–০৭ সালেই প্রকাশ্যে পূর্ণ স্বাধীনতার ধারণাকে রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। কারণ কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে "পূর্ণ স্বরাজ"-কে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে ১৯২৯ সালের লাহোর অধিবেশনে। সুতরাং অরবিন্দের অবদান ছিল এই ধারণাকে অনেক আগে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা।
এই সময় তাঁর লেখায় চারটি বিষয় বারবার ফিরে আসে— স্বদেশি, বয়কট, জাতীয় শিক্ষা এবং স্বশক্তির সংগঠন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল বিদেশি পণ্য বর্জন করলেই স্বাধীনতা আসবে না; প্রয়োজন আত্মনির্ভর অর্থনীতি, জাতীয় চরিত্র গঠন এবং জনগণের মানসিক মুক্তি। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে স্বামী বিবেকানন্দের আত্মশক্তির ধারণা এবং বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয় চেতনার প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। একই সঙ্গে তিনি ভগবদ্গীতা থেকে কর্ম, ত্যাগ ও নির্ভীকতার আদর্শকে রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেন। এই কারণেই তাঁর জাতীয়তাবাদ কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল এক সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণের আহ্বান।
১৯০৭ সালের সুরাট কংগ্রেস অধিবেশনে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের বিভাজন ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করে। অরবিন্দ প্রকাশ্যে বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল এবং লালা লাজপত রায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান। তবে এটিও উল্লেখযোগ্য যে তিনি কখনও অকারণ সহিংসতার সমর্থন করেননি। তাঁর মতে, একটি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হতে পারে, কিন্তু জাতীয় আন্দোলনের মূল ভিত্তি হতে হবে সংগঠন, আত্মত্যাগ এবং জনগণের জাগরণ। ব্রিটিশ সরকারের গোপন নথি থেকে জানা যায়, এই সময় থেকেই গোয়েন্দারা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিবিড় নজরদারি শুরু করে। তাঁর লেখনীকে তারা বিশেষভাবে বিপজ্জনক বলে মনে করত, কারণ তা শিক্ষিত যুবসমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছিল।
১৯০৮ সালের শুরুতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবী কার্যকলাপ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। একই বছরের মে মাসে মুজাফ্ফরপুর বোমা বিস্ফোরণের তদন্তের সূত্র ধরে অরবিন্দ ঘোষকে গ্রেফতার করা হয় এবং শুরু হয় ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ঐতিহাসিক বিচার— আলিপুর বোমা মামলা। এই মামলায় তাঁর বিচার শুধু একজন ব্যক্তির বিচার ছিল না; কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিল একটি নতুন জাতীয়তাবাদী দর্শন, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নৈতিক ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করেছিল। সেখান থেকেই শুরু হবে অরবিন্দের জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
(চলবে)
এই পর্বে ব্যবহৃত প্রধান সূত্র
১. Sri Aurobindo – Bande Mataram (Selected Writings, Complete Works)
২. Sri Aurobindo – The Doctrine of Passive Resistance
৩. Peter Heehs – The Lives of Sri Aurobindo
৪. K. R. Srinivasa Iyengar – Sri Aurobindo: A Biography and a History
৫. Bipan Chandra et al. – India's Struggle for Independence
৬. Sumit Sarkar – The Swadeshi Movement in Bengal (1903–1908)
On Thu, 16 Jul 2026, 14:37 Suvroneel Chakroborty, <svrnlchkrbrt1@gmail.com> wrote:

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন