কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

<<<< সম্পাদকীয় >>>>

 

 

কালিমাটি অনলাইন / ১৪৪ / চতুর্দশ বর্ষ : পঞ্চম সংখ্যা

 


প্রাণীজগতে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, কেননা একমাত্র মানুষই সমাজ সভ্যতা সংস্কৃতি শিক্ষা প্রযুক্তির সূচনা করেছে এবং নিরবধি তা বহন করে চলেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রাণীজগতের অন্যান্য প্রাণীকে হীন দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতাও মানুষ বহন করবে। কিন্তু  ঘটনা হচ্ছে তাই, এবং তারই জন্য মানুষের মনুষ্যগত ভুল ত্রুটি এবং মনুষ্যত্বহীনতার জন্য তাকে অন্যান্য প্রাণীদের সঙ্গে তুলনা করে হয়ে থাকে। আমরা ভুলে যাই, অন্যান্য প্রাণীরা যেসব আচরণ করে থাকে, তা  তাদের একান্ত নিজস্ব  প্রাণীগত বৈশিষ্ট্য। তারা কখনই তাদের প্রাণীগত বৈশিষ্ট্যকে অতিক্রম করে না।  মানুষ কিন্তু তা করে, অনেকক্ষেত্রেই মনুষ্যত্বের সীমা লঙ্ঘন করে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, অন্যান্য মানুষেরা তখন তাকে বিভিন্ন প্রাণীদের সঙ্গে তুলনা করে। এটা নিতান্তই মিথাচার, নিন্দার অযোগ্য ব্যাপার।

আমি যেহেতু ‘কালিমাটি অনলাইন’ ব্লগজিনের সম্পাদকীয় লিখতে বসেছি, কোনো প্রবন্ধ বা নিবন্ধ নয়, তাই এই বিষয়ে বিশদভাবে বিশ্লেষণ এবং আলোচনা করার পরিসর নেই। তাই সরাসরি প্রবেশ  করি বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে। আমরা জানি যে, আমাদের মধ্যে অনেক অনেক মানুষ আছে, যারা অত্যন্ত জ্ঞানী, গুণী, বুদ্ধিমান, মেধাবী। তাদের আমরা সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু সব মানুষ তো আর সমান মেধাবী বা গুণী হতে পারে না। বিভিন্ন কারণে এবং পরিস্থিতির দরুণ তারা মধ্যমেধা সম্পন্ন হয়। আবার কিছু মানুষের মেধার স্তর আরও নিম্ন হয়, যাদের অনেকক্ষেত্রে বোকা বলে সম্বোধন করা হয়। বিশেষত তাদের উপমিত করা হয় দুটি প্রাণীর সঙ্গে – গরু এবং গাধা। যেমন ‘তুই/তুমি/আপনি একটা গাধা’,  ‘তোর/তোমার/আপনার মাথায় কোনো বুদ্ধি নেই, গাধা পিটিয়ে তো আর ঘোড়া করা যায় না’, ‘গাধার মতো কথা বলিস না’ ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একথা কীভাবে বলা যায় যে, গাধার কোনো বুদ্ধি নেই? এটা একেবারেই মানুষের ভুল ধারণা। বরং গাধা কোনো বিপদে অন্যান্য প্রাণীদের মতো ভয় পেয়ে পালিয়ে যায় না, সে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে। এটা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সেইসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় তার শক্তি এবং সহনশীলতার কথাও। গাধা একদিকে যেমন প্রচন্ড গরমে থাকতে পারে, অন্যদিকে যেখানে জলের নিতান্তই অভাব যেমন মরুভূমিতেও বেঁচে থাকতে পারে। কেননা এদের বড় কান শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। আর বহন করতে পারে বিশাল ওজনের সামগ্রী। সমতলে বা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে  অথবা বালুচরে – সর্বত্র। গাধার এই শক্তি ও সহনশীলতার সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে মানুষের অমানুষিক পরিশ্রম বা খাটুনির সঙ্গে, বলা হয় ‘গাধার খাটুনি’। গাধার স্মৃতিশক্তিও প্রখর। একবার যে রাস্তায় যাত্রা করে, দীর্ঘদিন পরেও তা তার স্মৃতিতে থেকে যায়। ডাক্তারবাবুদের অভিমত, গাধার দুধ নন-এলার্জিক এবং শিশুদের পেটের সমস্যার জন্য অত্যন্ত উপকারী।

মরুভূমির প্রাণী গবেষক ড. আর্ক রাজিক মানব সভ্যতায় গাধার এই অসামান্য অবদান সম্পর্কে ও তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ২০১৮ সালে ৮ মে সূচনা করেন বিশ্ব গাধা দিবস। অবশ্য তারও আগে ব্রিটিশ প্রাণীকল্যাণ কর্মী আগে ডঃ এলিজাবেথ সভেনসেন ১৯৬৯ সালে ‘দ্য ডঙ্কি স্যাংচুয়ারি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একদিন একটি বাজারে সাতটি অবহেলিত গাধার প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষিত হয় এবং সেদিন থেকেই গাধাদের প্রতি তাঁর আজীবনের নিষ্ঠার সূচনা হয়। তিনি গাধাদের উদ্ধার করেন এবং তাঁরই নিরলস চেষ্টা ও পরিশ্রমে ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ‘দ্য ডঙ্কি স্যাংচুয়ারি’ একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যা সারা বিশ্বে গাধাদের কল্যাণ এবং জনমানসে গাধাদের সম্পর্কে ধারণার পরিবর্তন এনেছে।

সবাইকে জানাই আমাদের আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা এবং শ্রদ্ধা।

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

kajalsen1952@gmail.com

দূরভাষ যোগাযোগ : 9835544675

 

 

<<<< কথনবিশ্ব >>>>

 

কথনবিশ্ব

 

শুভ্রনীল চক্রবর্তী

 

ঋষি অরবিন্দ: বিপ্লবী থেকে বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের রূপকার

 


(প্রথম পর্ব: শৈশব, ইংল্যান্ড ও আই.সি.এস. কীভাবে গড়ে উঠলেন অরবিন্দ ঘোষ)

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অরবিন্দ ঘোষকে কেবল একজন যোগী বা আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবে দেখলে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি আড়াল হয়ে যায়। আবার তাঁকে শুধুমাত্র একজন বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী বললেও তাঁর চিন্তার পূর্ণতা ধরা পড়ে না। প্রকৃতপক্ষে অরবিন্দের জীবন ছিল এক ধারাবাহিক বিবর্তনের ইতিহাস। সেই বিবর্তনকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনে, কারণ এখানেই তৈরি হয়েছিল সেই ব্যক্তিত্ব, যিনি পরবর্তীকালে একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম কঠোর সমালোচক এবং অন্যদিকে আধুনিক ভারতের অন্যতম মৌলিক দার্শনিক হয়ে উঠবেন।

অরবিন্দ ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন ১৫ আগস্ট ১৮৭২ সালে কলকাতার থিয়েটার রোডে (বর্তমান শেক্সপিয়র সরণি)। তাঁর পিতা ডা. কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত চিকিৎসক এবং যুক্তিবাদী মননের মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সন্তানরা সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। অন্যদিকে তাঁর মা স্বর্ণলতা দেবী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। ফলে অরবিন্দের পারিবারিক পরিবেশে একদিকে ছিল পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ, অন্যদিকে ভারতীয় নবজাগরণের সাংস্কৃতিক চেতনা। ইতিহাসবিদ পিটার হীস মন্তব্য করেছেন যে, এই দুই ধারার মিলনই অরবিন্দের পরবর্তী চিন্তাজগতের ভিত্তি নির্মাণ করে।

মাত্র সাত বছর বয়সে, ১৮৭৯ সালে, অরবিন্দকে তাঁর দুই দাদার সঙ্গে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। তাঁর পিতার স্পষ্ট নির্দেশ ছিল— ছেলেরা যেন ভারতীয় ভাষা, ধর্মীয় আচার বা সামাজিক পরিবেশের প্রভাব থেকে দূরে থাকে। প্রথমে ম্যানচেস্টারে রেভারেন্ড উইলিয়াম ড্রুয়েটের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা এবং পরে লন্ডনের সেন্ট পল'স স্কুল-এ তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। গ্রিক ও লাতিন ভাষায় তাঁর দক্ষতা এতটাই ছিল যে অল্প বয়সেই তিনি ইউরোপীয় ধ্রুপদি সাহিত্য মূল ভাষায় পড়তে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে তিনি ফরাসি, ইতালীয়, জার্মান ও কিছু স্প্যানিশ ভাষাও শেখেন। এই বহুভাষিক শিক্ষা তাঁর রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তাকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেয়।

১৮৯০ সালে অরবিন্দ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংস কলেজ-এ ভর্তি হন এবং একই সময়ে Indian Civil Service (ICS)-এর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এখানে একটি প্রচলিত ভুল ধারণার সংশোধন জরুরি। অনেক বই ও সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয় যে অরবিন্দ "আই.সি.এস.-এ চাকরি করতে অস্বীকার করেছিলেন"। বাস্তবে ঘটনাটি কিছুটা ভিন্ন। তিনি লিখিত পরীক্ষায় সফল হলেও শেষ ধাপের ঘোড়ায় চড়ার (Horse Riding Test) পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে উপস্থিত হননি। ফলে তিনি আই.সি.এস.-এ নিয়োগ পাননি। ইতিহাসবিদ Peter Heehs এবং A. B. Purani উভয়েই উল্লেখ করেছেন যে এটি ছিল ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরিতে যোগ না দেওয়ার একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ, তিনি আই.সি.এস. থেকে পদত্যাগ করেননি; বরং চূড়ান্ত যোগ্যতা অর্জনের শেষ ধাপটি সম্পূর্ণ করেননি।

ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে অরবিন্দের রাজনৈতিক চেতনারও বিকাশ ঘটে। তিনি ভারতীয় ছাত্রদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। তাঁর ব্যক্তিগত চিঠি ও পরবর্তী স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় যে এই সময়েই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন— ভারতের স্বাধীনতা কেবল প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়; প্রয়োজন জাতীয় আত্মশক্তির জাগরণ। এই উপলব্ধিই পরবর্তীকালে তাঁকে কংগ্রেসের নরমপন্থী রাজনীতির পরিবর্তে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবির দিকে নিয়ে যায়।

১৮৯৩ সালে প্রায় চৌদ্দ বছর বিদেশে থাকার পর অরবিন্দ ভারতে ফিরে আসেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ভারতীয় ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিলেন। কিন্তু দেশে ফিরে বরোদায় কর্মজীবন শুরু করার পর তিনি নিজেই সংস্কৃত, বাংলা এবং ভারতীয় দর্শন অধ্যয়ন শুরু করেন। উপনিষদ, গীতা, কালিদাস, বঙ্কিমচন্দ্র ও স্বামী বিবেকানন্দের রচনা তাঁর চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় জীবন— যেখানে একজন পাশ্চাত্য-শিক্ষিত যুবক ধীরে ধীরে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

(ক্রমশ)

এই পর্বে ব্যবহৃত প্রধান সূত্র

 ১. Sri Aurobindo, On Himself (Complete Works of Sri Aurobindo)

২. Peter Heehs, The Lives of Sri Aurobindo (Columbia University Press, 2008)

৩. A. B. Purani, The Life of Sri Aurobindo

৪. K. R. Srinivasa Iyengar, Sri Aurobindo: A Biography and a History

৫. Dinendra Kumar Roy, Aurobindo Prasanga (বরোদা পর্বের সমসাময়িক স্মৃতিচারণ)

 

শ্রেষ্ঠা সিনহা

 

পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার বৈশিষ্ট্য, চল্লিশের দশকের সমকাল-প্রভাব ও সমকালীন কবিদের সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য: একটি তুল্যমূল্য আলোচনা

 


বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী যুগে যে কবিগোষ্ঠী আধুনিকতার নতুন ভাষাশৈলী নির্মাণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) এক অনন্য, অপ্রতিরোধ্য স্বরের অধিকারী। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ "পদাতিক" শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, বাংলা কবিতার ইতিহাসে একটি বিভাজনরেখা— যার এক পাশে রবীন্দ্রনাথের গীতলতাপ্রধান রোম্যান্টিক ঐতিহ্য এবং জীবনানন্দের নিভৃত আত্মমগ্ন চিত্ররূপময়তা, অন্য পাশে নবীন এক কাব্যভাষা যা রাজনৈতিক প্রত্যয়, শ্রেণিচেতনা ও সাধারণ মানুষের নিত্যজীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে কবিতার কেন্দ্রে স্থাপন করল। ১৯৪০ সালে "পদাতিক" যখন প্রথম "কবিতা ভবন" থেকে প্রকাশিত হয়, তখনও রবীন্দ্রনাথ জীবিত, জীবনানন্দ দাশ তাঁর কাব্যজীবনের মধ্যগগনের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। সুভাষের আবির্ভাব যে কতটা কঠিন পরীক্ষা ছিল, তা বুঝতে হলে এই দুই পূর্বসূরী মহাকবির কাব্যসৃষ্টিকে স্মরণ করা আবশ্যক। রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি হিসেবে নয়, গীতিকার হিসেবেও বাঙালির প্রেমমনস্কতাকে প্রকাশ করেছিলেন বহু দশক ধরে, এবং ১৯৩০-এর দশকের মধ্যেই তাঁর কাব্য ও সঙ্গীতের রোম্যান্টিক রূপ সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিল; বাঙালি মননের ওপর তার প্রভাব ছিল সর্বব্যাপী। জীবনানন্দ দাশ আবার ১৯২০-র দশকের শেষাংশ থেকে কবিতা প্রকাশ করতে শুরু করে প্রেমভাবাপন্ন কবিতায় এক নতুন ক্লাসিকাল শৈলী নির্মাণ করেছিলেন। ঠিক এই দুই দিকপাল কবির ছায়ায় দাঁড়িয়ে, তরুণ একুশ বছর বয়সী এক কবি যখন ঘোষণা করলেন যে "ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য", তখন তা নিঃসন্দেহে এক স্পর্ধিত কাব্যিক বিদ্রোহ। এই নতুন ইডিয়মে বাঙালির মনে একটি স্থায়ী আসন অধিকার করার জন্য যে গভীর আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন ছিল, তা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ছিল— এবং সুদীর্ঘ ছয় দশকের অধিক কাব্যজীবনে তিনি তা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন।

এই প্রবন্ধে আমরা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার বৈশিষ্ট্য, চল্লিশের দশকের ঐতিহাসিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট কীভাবে তাঁর কাব্যচেতনাকে নির্মাণ করেছিল এবং বিষ্ণু দে, সমর সেন প্রমুখ সমকালীন কবিদের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য— এই তিনটি অভিমুখে বিস্তৃত আলোচনা করব। সঙ্গে দেখব তাঁর গদ্যসাহিত্য, অনুবাদকর্ম ও জীবনাচরণের সঙ্গে কাব্যপ্রকল্পের আন্তঃসম্পর্ক, এবং পরিণত বয়সে তাঁর কাব্যভাবনার যে রূপান্তর ঘটেছিল, তার তাৎপর্য।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯১৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে মামাবাড়িতে। পিতা ক্ষিতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, মাতা যামিনী দেবী; পৈতৃক নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায়। শৈশব কেটেছে রাজশাহীর নওগাঁয় ও কলকাতায়। নিজের বাল্যকাল সম্পর্কে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, "আমার শৈশব কেটেছে রাজশাহীর নওগাঁয়।" ছেলেবেলা থেকেই পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গ্রন্থাগারের বইয়ের প্রতি তাঁর অধিক আগ্রহ ছিল, এবং স্কুলে পড়াকালীনই বিভিন্ন ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করে। কবি হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন কবি কালিদাস রায় এবং "কালি ও কলম" পত্রিকার সম্পাদক মুরলীকৃষ্ণ বসুর কাছ থেকে। ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিক পাশ করার পরেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত। ১৯৩২-৩৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিশোর ছাত্রদলে যোগদান এবং সহপাঠী কবি সমর সেনের কাছ থেকে "হ্যান্ডবুক অব মার্কসিজম" গ্রন্থ পেয়ে মার্কসীয় রাজনীতিতে দীক্ষা— এই দুটি ঘটনা তাঁর সমগ্র সাহিত্যজীবনের অভিমুখ নির্ধারণ করে দেয়। ১৯৪০ সালে তিনি প্রথমে লেবার পার্টিতে যোগদান করেন, কিন্তু ছাত্রনেতা বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের একটি প্ররোচনামূলক মন্তব্যে ব্যথিত হয়ে লেবার পার্টি ত্যাগ করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৪১ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে অনার্স সহ বি.এ পাশ করার পরও তিনি প্রথাগত কর্মজীবনের পথে হাঁটেননি— রাজনীতিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের কেন্দ্রীয় অভিজ্ঞতা, এবং সেই অভিজ্ঞতাই হয়ে ওঠে তাঁর কবিতার ভাষা ও বিষয়ের আকর। পরবর্তীকালে তিনি আশুতোষ কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার ফলে তাঁর পঠনপাঠন বেশিদূর অগ্রসর হয়নি।

১৯৪২ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ এবং একই সময়ে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের সাংগঠনিক কমিটিতে বিষ্ণু দে-র সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া তাঁকে সরাসরি যুক্ত করে দেয় তিরিশ-চল্লিশের দশকের প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে। মাসিক মাত্র পনেরো টাকা ভাতায় পার্টির মুখপত্র "জনযুদ্ধ" পত্রিকায় সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে যুক্ত হওয়া থেকে শুরু করে ১৯৪৬ সালে দৈনিক "স্বাধীনতা" পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যোগদান, এবং ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে কারাবরণ— প্রতিটি জীবনপর্ব তাঁর কবিতাকে আরও গভীরভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংলগ্ন করে তোলে। দমদম জেলে হাঙ্গার স্ট্রাইকেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৫০ সালে মুক্তি পাওয়ার পর অর্থকষ্টে পড়ে তিনি বাধ্য হয়ে একটি প্রকাশনা সংস্থায় সাব-এডিটরের চাকরি নেন— জীবনে এই একবারই তিনি প্রথাগত চাকরি করেছিলেন। ১৯৫১ সালে সেই চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি "পরিচয়" পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, এবং পাশাপাশি "সপ্তাহ", "লোটাস" পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। কিছুকাল তিনি সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে "সন্দেশ" পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদকের কাজও করেছেন। একই বছর তিনি সুলেখিকা গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হলে তিনি পুরনো পার্টিতেই থেকে যান। ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়া হলে আন্দোলনে যোগ দিয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার ফলে তাঁর দ্বিতীয়বার কারাবরণ হয়। বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে দীর্ঘকাল সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা এই কবির রাজনৈতিক চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে শেষজীবনে— সত্তরের দশক থেকেই এই পরিবর্তনের সূচনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন জানালেও পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনকে তিনি সমর্থন করেননি, এবং ১৯৮১ সালে রণকৌশল ও অন্যান্য রাজনৈতিক কারণে দলের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বামপন্থী রাজনীতি ছেড়ে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সান্নিধ্য লাভ করেন, এবং এই পরিবর্তনের জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট নেতৃত্বের কাছে বহুবার সমালোচিত হয়েছেন— মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এই বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। এই রাজনৈতিক রূপান্তর তাঁর কবিজীবনের এক জটিল অধ্যায়, যা প্রমাণ করে দেয় যে তাঁর কাব্যিক প্রত্যয় কোনও স্থির মতাদর্শগত ছকে আবদ্ধ ছিল না, বরং জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তা বিবর্তিত হয়েছিল।

কবিতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য: ভাষা, আঙ্গিক ও বিষয়চেতনা

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যভাষার সবচেয়ে আলোচিত ও বিপ্লবাত্মক বৈশিষ্ট্য তার আড়ম্বরহীনতা। তিনি প্রথম বাঙালি কবিদের একজন, যিনি প্রেমের কবিতা বা প্রকৃতিবিষয়ক কবিতা দিয়ে কাব্যজীবন আরম্ভ করেননি। "পদাতিক" কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা "মে-দিনের কবিতা"-তেই তিনি সমকালীন জীবনের কঠোর রূপক উন্মোচন করেন— "প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,/ দুর্যোগে পথ হয় হোক দুর্বোধ্য/ চিনে নেবে যৌবন-আত্মা।" এই পংক্তিগুচ্ছই হয়ে ওঠে তাঁর কাব্যজীবনের ঘোষণাপত্র— এখানে রবীন্দ্রনাথের প্রেমমগ্ন গীতলতা বা জীবনানন্দের ক্ল্যাসিকাল রোম্যান্টিক শব্দবন্ধের কোনও অনুরণন নেই, বরং আছে এক তীক্ষ্ণ, তাৎক্ষণিক, আহ্বানধর্মী স্বর যা শ্রোতাকে সরাসরি সম্বোধন করে।

ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাঙালির শিল্পকে জীবন্ত করতে হলে বাঙালির জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আদর্শবাদ ও বাস্তবিকতা— এই সমস্তকেই ফুটিয়ে তোলার যে শর্ত দিয়েছিলেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা সেই শর্ত পূরণ করেছিল ভাষাপ্রয়োগ ও ভাবপ্রকাশের বিস্ময়কর সাবলীল দক্ষতায়। তাঁর কবিতায় কাব্যিক শৈলী ও নির্মোহ মননশীলতার মিশ্রণ ঘটেছে; বিষয়ের অভিনবত্বে, স্বতন্ত্র চিত্ররূপ নির্মাণে তিনি অভিনব ঔজ্জ্বল্য এনেছিলেন। তাঁর কাছে কাব্য-শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি মূল্যবান মনে হয়েছিল জীবনের দাবি। কবিতায় তিনি নিছক ভাবালুতাকে প্রশ্রয় দেননি; বাড়তি বাগ্‌বহুলতাকে ঝরিয়ে ফেলে কবিতাকে করতে চেয়েছিলেন মেদহীন, লঘু, নগ্ন এবং সুঠাম। যথাসম্ভব যতিচিহ্ন বর্জন করেছিলেন, গ্রহণ করেছিলেন তির্যক ব্যঙ্গ, প্রবাদ ও ইডিয়মের ব্যবহার।

গদ্যধর্মী আটপৌরে মুখের ভাষা, বৈচিত্র্যপূর্ণ হ্রস্ব বাক্যবিন্যাস, চরণের শেষে অন্ত্যমিল, অল্পকথায় গল্পের ভঙ্গি এবং জীবনমুখী চিত্রকল্প— বিষয়, আঙ্গিক ও ভাববস্তুতে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাংলা কাব্যের ধারায় ছিলেন যথার্থ আধুনিক। তাঁর কবিতার অন্ত্যমিল থাকা সত্ত্বেও তার শরীর বলিষ্ঠ গদ্যের মতো ঋজু ও সুঠাম থাকে— এই বৈপরীত্যই তাঁর কবিতার বিশেষ জয়। কবিতাকে ছুটি না দিয়েও তাকে গদ্যধর্মী করে তোলার এই কৌশল চল্লিশের দশক থেকেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন, এবং এই গদ্যস্পর্শী কাব্যশৈলী পরবর্তীকালের বহু কবির কাছে অনুসরণীয় হয়ে দাঁড়ায়।

বিষয়বৈচিত্র্যের দিক থেকে দেখলে, কবি সাধারণ মানুষের নিত্য নৈমিত্তিক ঘরোয়া সংসারে নেমে এসেছিলেন। ফলে তাঁর কবিতাগুলিতে এসেছে নিতান্ত তুচ্ছ বিষয়, সাদামাটা বাংলার প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিক ঘরোয়া গল্প। ভাষার অত্যাশ্চর্য সংহত রূপে ও শাণিত বাক্‌ভঙ্গিমায় কবিতার শরীরে এসেছে অভিনব ঔজ্জ্বল্য। জগৎ, প্রকৃতি, ব্যক্তিজীবন, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন, পারিবারিক জীবন, উৎসব, ধর্ম, সুখ-দুঃখ— সবকিছুই জীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে তাঁর রচনার গুণে। এখানে কবি অসাধারণ ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতায় সম্পূর্ণতার প্রতি নিজেকে অর্পণ করেছেন; জগৎ ও জীবনের সবকিছুকে নিজের করে গ্রহণ করে নিয়েছেন।

তাঁর কাব্যভাষার আরেকটি বিশিষ্ট দিক হল ফুল-প্রতীকের ব্যবহার। ফুলকে প্রতীক-দ্যোতনায় তিনি শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনে সার্বিক স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করেছেন। ফুল ফোটার মতোই তাঁর অনুভূতি ও উপলব্ধিগুলি বিকশিত হয়েছে তাঁর কাব্যে— "ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত" এই আশাবাদী উচ্চারণেই তা স্পষ্ট। দুঃখ, বেদনা, লাঞ্ছনা ও অপরিসীম নৈরাশ্যে ভারাক্রান্ত হয়েও তিনি রাতের গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনা ফুটন্ত সকালের প্রত্যাশা করেছেন— এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই তাঁর কবিসত্তার মৌলিক চরিত্র নিহিত।

ছন্দ ও আঙ্গিকের প্রশ্নে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পরীক্ষাপ্রবণতাও গভীর আলোচনার দাবি রাখে। তিনি মূলত অক্ষরবৃত্ত ছন্দের চালে আধুনিক কবিতার গদ্যঋদ্ধ একটি নতুন রূপ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই অক্ষরবৃত্তের ব্যবহার রবীন্দ্রনাথের গীতল অক্ষরবৃত্তের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক— সুভাষের হাতে অক্ষরবৃত্ত হয়ে ওঠে কথ্য ভাষার স্বাভাবিক স্পন্দনের বাহক, যেখানে পংক্তির দৈর্ঘ্য নিয়ন্ত্রিত হয় বক্তব্যের প্রয়োজনে, ছন্দের যান্ত্রিক দাবিতে নয়। "পদাতিক"-এর প্রথম কবিতা "মে-দিনের কবিতা"-কে তাঁর কাব্যজীবনের ইস্তেহার বলা যেতে পারে— এই কবিতায় তিনি কবিতাকে ছুটি না দিয়েও তাকে গদ্যধর্মী করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। যখন তাঁর কবিতার অন্ত্যমিল থাকে, যেমন "প্রস্তাব" কবিতায়, তখনও তার শরীর বলিষ্ঠ গদ্যের মতো ঋজু ও সুঠাম থেকে যায়। এই বৈপরীত্য সত্ত্বেও তা প্রকৃত অর্থেই কবিতা হয়ে ওঠে— এইখানেই কবি সুভাষের কাব্যিক জয়, যা তাঁকে নিছক স্লোগান-রচয়িতা থেকে পৃথক করে দেয়। মে দিনের কবিতাটি শ্রমিকশ্রেণির বিজয়কাব্য হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেছিল, যা প্রমাণ করে এই কবিতার রাজনৈতিক কার্যকারিতা ও কাব্যিক উৎকর্ষ একসঙ্গে বিদ্যমান ছিল।

চিত্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রেও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নিজস্বতা প্রণিধানযোগ্য। তিনি শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উপকরণ থেকেই তাঁর চিত্রকল্প আহরণ করেছেন— ক্ষেত, খাজনা, আগুন, ঘাম, মাঠ-ঘাট-সমুদ্র-বন্দর-কলকারখানা— এই শব্দভাণ্ডার তাঁর কবিতাকে এক বিশেষ বস্তুনিষ্ঠতা দিয়েছে, যা রোম্যান্টিক বা প্রতীকবাদী কবিতার অলংকারবহুল চিত্রকল্প থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। "পেট জ্বলছে, ক্ষেত জ্বলছে হুজুর" পংক্তিতে যে ক্রোধ ও তাৎক্ষণিকতা প্রকাশিত হয়, তা কোনও বিমূর্ত আদর্শের ঘোষণা নয়, বরং সরাসরি ক্ষুধার্ত মানুষের কণ্ঠস্বরের অনুকৃতি। এই কণ্ঠস্বর-নির্মাণের কৌশলেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা আলাদা হয়ে যায় বিষ্ণু দে-র মতো কবির কাছ থেকে, যাঁর কবিতায় কণ্ঠস্বর সাধারণত থাকে একজন পর্যবেক্ষক-বুদ্ধিজীবীর, প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগীর নয়।

চল্লিশের দশক: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কাব্যচেতনার নির্মাণ

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাকে বুঝতে হলে চল্লিশের দশকের ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে অগ্রাহ্য করার কোনও উপায় নেই। তিনি যে সময়ে সাহিত্য আকাশে আবির্ভূত হলেন, তখন চারিদিক ধ্বংসময়তায় আচ্ছন্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা জনমানসে আতঙ্কের শিহরন তুলেছে, মানুষের জীবন ও স্বপ্ন অনিশ্চয়তায় হাবুডুবু খাচ্ছে, সংগ্রাম শিথিল হয়ে পড়েছে, এবং ফ্যাসিবাদের উত্থান শোষণ-পীড়নের নখদন্তকে আরও নগ্ন ও তীক্ষ্ণ করে তুলছে। ঠিক এই মুহূর্তেই বাইরের ধ্বংস আর ভেতরের বিষণ্ণতাকে কাঁপিয়ে সুভাষের পদধ্বনি শোনা গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা— এই চারটি বিপর্যয় চল্লিশের দশকের বাংলাকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত করেছিল, এবং কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এই সংকটকালের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অংশগ্রহণকারী।

১৯৩৫ সালের ডিসেম্বরে "নিখিল ভারত প্রগতি লেখক"-এর ইস্তেহার প্রকাশের সূত্রে ১৯৩৬ সালে "নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ"-এর গোড়াপত্তন হয়, এবং একই বছরের ২৫শে জুন কলকাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে "নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘ" গঠিত হয়— যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে। এই প্রগতি লেখক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে সহ-লেখক ও মার্কসবাদী কর্মী সোমেন চন্দ-র হত্যার প্রতিক্রিয়ায় গঠিত হয় "ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সমিতি", যার অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়— বিষ্ণু দে-র সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে। এই সাংগঠনিক যুক্ততা শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল না, এটি তাঁর কাব্যভাষার গঠনতন্ত্রকেও নির্ধারণ করেছিল— কবিতা হয়ে উঠল সম্মিলিত সংগ্রামের হাতিয়ার, ব্যক্তিগত অনুভূতির নিভৃত প্রকাশ নয়।

১৯৪০ সালে "পদাতিক" যখন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, তখন কবির বয়স মাত্র একুশ। গ্রন্থের কবিতাগুলি লেখা হয়েছিল ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে— অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ও প্রথম পর্বে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ হিসেবে এই বইটি প্রকাশের পরপরই হৈচৈ ফেলে দেয়; কবিতাগুলি ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে, সাম্যবাদী আন্দোলনের কর্মীদের কাছে হয়ে ওঠে আন্দোলনের সংগীত। "পদাতিক"-এর "কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না?" এই প্রশ্নোক্তি কেবল কাব্যিক উচ্চারণ নয়, তা চল্লিশের দশকের রাজনৈতিক কর্মীদের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি।

এরপর "চিরকুট" কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি রচিত হয় ১৯৪১ থেকে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে— এই সময়পর্বেই বাংলা প্রত্যক্ষ করে ভয়াবহ পঞ্চাশের মন্বন্তর (১৯৪৩)। "চিরকুট"-এ "পদাতিক"-এর কবিতাসমূহের আরও সংহত ও উজ্জ্বল রূপ পাওয়া যায়, যেমন— "পেট জ্বলছে, ক্ষেত জ্বলছে হুজুর,/ জেনে রাখুন/ খাজনা এবার মাপ না হলে/ জ্বলে উঠবে আগুন।" এই পংক্তিগুচ্ছে দুর্ভিক্ষের তাড়নায় বিধ্বস্ত কৃষকসমাজের ক্রোধ ও বিদ্রোহের ভাষা প্রত্যক্ষ। ১৯৪৮ সালে নিজের পার্টির দৈনিকের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রচিত মাত্র পাঁচটি কবিতার সংকলন "অগ্নিকোণ"-এ আবেগ ও সরলীকরণ আরও সংহত বাক্যে স্ফূর্তি লাভ করে— "লক্ষ লক্ষ হাতে অন্ধকারকে দু'টুকরো করে/ অগ্নিকোণের মানুষ সূর্যকে ছিঁড়ে আনে।/ কোটি কণ্ঠের হুঙ্কারে লাগে বজ্রের কানে তালা।" কবি স্বয়ং এই রচনা সম্পর্কে বলেছিলেন যে এটি "রাজনীতিকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতির জন্য" রচিত— এই স্বীকৃতিই প্রমাণ করে যে তাঁর কাছে কবিতা ও রাজনীতি কোনও বিচ্ছিন্ন সত্তা ছিল না, বরং একই জীবনপ্রবাহের দুটি প্রকাশ।

দ্বিতীয় বিশ্বমহাযুদ্ধ-সমকালের ভারতীয় পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের মরণপণ বিপ্লবের কাল— এই প্রেক্ষাপটে জাতির সংকটে যে কোনও সচেতন নাগরিকের রাজনৈতিক নিস্পৃহতা যেমন অস্বাভাবিক, তেমনই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসে ও কবিতায় কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রত্যয়দৃপ্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠের ধ্বনি উচ্চারিত হলে তাকে নিন্দিত করা যুক্তিসংগত নয়। বরং এই সময়খণ্ডের কালান্তরের আবেগে স্পন্দমান হওয়াই ছিল সেইসব সচেতন লেখকের ধর্ম— সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, যে কোনও ইতিহাস-জিজ্ঞাসু জানেন প্রতিটি কালখণ্ড কালান্তরের আবেগে স্পন্দমান, এবং পৃথিবীজোড়া দূষিত পরিবেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিশুদ্ধতার সাধনাও আমাদেরই।

কিশোর-জীবন থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ফলে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের স্থায়ী কর্মজীবন বলে কিছু ছিল না। প্রথমে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে কিছুদিন কারাবন্দি থাকতে হয়, পরবর্তীকালে সাব-এডিটরের চাকরি পান, কিন্তু ১৯৫১ সালে সেই চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে "পরিচয়" পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই জীবনপথ— রাজনৈতিক কর্মী থেকে সাংবাদিক, কারাবন্দি থেকে সম্পাদক— তাঁর কবিতার বিষয়বৈচিত্র্যের পশ্চাতে এক বাস্তব জীবনাভিজ্ঞতার আকর তৈরি করে দেয়। দেশের শ্রমিক সংগঠনের কাজে খেটে খাওয়া মানুষের নিত্যজীবনের সঙ্গে একাত্ম অনুভূতি এবং জেলজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর গদ্যসাহিত্যের মুখে ভাষা জুগিয়েছে। সমালোচক বিমল কুমার মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়, শিল্প হল মার্কস-এঙ্গেলস-এর মতে সমাজ-চেতনের অন্যতম রূপ; সমাজচেতনের অন্যান্য প্রকাশ অর্থাৎ ধর্ম, দর্শন, নীতি, অর্থনীতি সবই সাহিত্যের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কসূত্রে আবদ্ধ। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যসৃষ্টি এই তত্ত্বের জীবন্ত দৃষ্টান্ত— তাঁর ব্যক্তিজীবনের সমস্যা ও সামাজিক চলমান সমস্যাগুলিকে তিনি শিল্পের সমস্যার সঙ্গে একই প্রেক্ষিতে স্থাপন করেছিলেন।

বিশ শতকের তিরিশ ও চল্লিশের দশক ছিল বাংলা সাহিত্যে প্রগতিচেতনা ও প্রগতি আন্দোলন বিকাশের উদ্দীপনাময় কাল। এই কালধর্মকে সুভাষ মুখোপাধ্যায় অগ্রাহ্য করেননি; বরং বিশিষ্ট কালধর্মে বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও মহৎ জীবনদর্শন নিয়ে সাহিত্য সৃজনে তিনি বাংলা সাহিত্যের ধারায় এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হয়ে উঠেছিলেন। তবে এ কথাও সত্য যে রাজনীতি ও সাহিত্য— এই দুটির মধ্যে কোনও একটিকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে তাঁকে সংকীর্ণ পথে চলার বন্ধনে আটকে রাখা যায় না। রাজনীতির সংকীর্ণ গভীজাল তাঁকে চিরদিন আবদ্ধ করে রাখতে পারেনি; বরং তিনি রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতাকে আধার ও বাহন করে তাকেই সাহিত্য ও শিল্পরূপ দান করেছেন।

সমকালীন কবিদের সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য: বিষ্ণু দে, সমর সেন এবং অন্যান্য

সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁকে চল্লিশের দশকের সমকালীন কাব্যধারার মধ্যে স্থাপন করে দেখা আবশ্যক, কারণ তাঁর কাব্যিক স্বাতন্ত্র্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতীত হয় তুলনামূলক প্রেক্ষিতেই। সাম্যবাদী চেতনার এই ধারা শুধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় প্রথম উচ্চকিত হয়নি— কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়ও তা প্রবলভাবে উচ্চকিত ছিল, জীবনানন্দ দাশও এই ধারায় কবিতা লিখতে কিছুটা উৎসাহিত হয়েছিলেন, এবং প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমর সেন প্রমুখ কবির কবিতায়ও সাম্যবাদী চেতনার উজ্জ্বলতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এই সাধারণ আদর্শিক ভূমির মধ্যেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যস্বর তাঁর সমসাময়িকদের থেকে স্বতন্ত্র চরিত্র নির্মাণ করে।

বিষ্ণু দে-র সঙ্গে তুলনা করলে সবচেয়ে স্পষ্ট পার্থক্য ধরা পড়ে মননের স্তরে। বিষ্ণু দে ছিলেন এক কুলীন বুদ্ধিজীবী সাম্যবাদী— তাঁর কবিতায় মার্কসীয় দর্শন এসেছিল ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদী কাব্যপ্রকরণ, পুরাণ ও ইতিহাসচেতনার জটিল বিনির্মাণের ভেতর দিয়ে। তাঁর কবিতা পাঠকের কাছে দাবি করত পূর্বার্জিত মননশীল প্রস্তুতি— ইতিহাসের জ্ঞান, সাহিত্যিক উদ্ধৃতি ও প্রতীকের জটিল বুনন বোঝার ক্ষমতা। সুভাষ মুখোপাধ্যায় এই কুলীন বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতার পথ অনুসরণ করেননি। তাঁর কবিতা সহজ-সরল ভাষায় গূঢ় ব্যঞ্জনাধর্মী— তিনি জটিলতা পরিহার করে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাতেই গভীর তাত্ত্বিক অভিজ্ঞান প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই কারণেই তাঁর কবিতা ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষের মুখে মুখে, সাধারণ পাঠকের কাছে যা বিষ্ণু দে-র কবিতার পক্ষে দুর্লভ ছিল।

সমর সেনের সঙ্গে তুলনাটি আরও তীক্ষ্ণ। সমর সেন ছিলেন ব্যঙ্গতীক্ষ্ণ নৈরাশ্যবাদী সাম্যবাদী— তাঁর কবিতায় আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে যে দূরত্ব, যে বিচ্ছেদ, তা প্রকাশিত হয়েছে গভীর হতাশা ও আত্মবিদ্রূপের মধ্য দিয়ে। সমর সেনের কবিতার জগৎ ক্রমে নিজের সীমার মধ্যে সংকুচিত হয়ে এসেছিল, এবং পরবর্তীকালে তিনি কাব্যচর্চা থেকেই সরে গিয়েছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় সমর সেনের মতো সাম্যবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেও নৈরাশ্যবাদী নন, পলায়নবাদীও নন। তাঁর কবিতায় আবেগ, উদ্দীপনা, ব্যঙ্গ ও বিশ্বাস— এই সমস্তই মিশে গিয়েছিল একসঙ্গে। দুঃখ-বেদনার মধ্যেও তিনি আশাবাদ ত্যাগ করেননি; বরং দুর্যোগের মধ্য দিয়েই নতুন প্রভাতের প্রত্যাশা করে গেছেন। সমালোচক অমলেন্দু বসু সুভাষের কবিতায় তিনটি সুরের সন্ধান পেয়েছিলেন— ব্যঙ্গতীক্ষ্ণ সুর, চড়া গলার সুর এবং স্বগতোক্তির সুর। চড়া গলার এই সুর সম্ভবত সময়ের দাবিতেই সুভাষ, অরুণ মিত্র, বিষ্ণু দে এবং আরও অনেক সমকালীন কবির কবিতায় দেখা দিয়েছিল, কিন্তু সুভাষের কাছে এই চড়া সুরও কখনও নিরাশার আশ্রয় হয়ে ওঠেনি— বরং তা থেকে গেছে আহ্বানের, জাগরণের।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আঙ্গিকের প্রশ্নে। রবীন্দ্রনাথ, সমর সেন, সুকান্ত— এঁরা সকলেই "পথ"-এর মেটাফর ব্যবহার করেছেন তাঁদের কবিতায়, কিন্তু সুভাষের কবিতায় এই মেটাফরের ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন ভঙ্গিতে দেখা যায়— তাঁর "পদাতিক" নামকরণেই স্পষ্ট যে তিনি পথচলাকে দেখেছেন সম্মিলিত মিছিলের, সংগ্রামী বাহিনীর পদচারণার রূপকল্পে, যা ব্যক্তিগত যাত্রার চিরাচরিত কাব্যিক রূপকল্প থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। অপর দিকে দীপ্তি ত্রিপাঠীর মতো সমালোচক, যিনি "আধুনিক বাংলা কাব্যপরিচয়ে" "পঞ্চপাণ্ডব" (বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)-কে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সমর সেনকে গ্রহণ করেননি এই কারণে দেখিয়ে যে এই দুই কবিই বিষয়বস্তুর দিক থেকে একদেশদর্শী, এবং আধুনিক জীবনের জটিল রূপের বিচিত্র পরিচয় তাঁদের কাব্যে নেই বলে মনে করেছিলেন তিনি। এই মূল্যায়ন একসময়ের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য-ইতিহাস রচনার সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে— কারণ পরবর্তীকালে সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর কাব্যজীবনের ভাণ্ডারে যে বৈচিত্র্য সংযোজন করেছিলেন, পদাতিক, চিরকুট ও অগ্নিকোণ-এর উদ্দেশ্যমূলকতা পেরিয়ে ফুল ফুটুক-এর মতো কাব্যগ্রন্থে যে নান্দনিক মাধুর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা প্রমাণ করে দেয় যে তাঁকে কোনও একদেশদর্শী ছকে বেঁধে রাখা যায় না।

সাহিত্য সমালোচক অশোক মিত্র সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যধর্ম সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন যে অবলম্বনহীনতা থেকে কবিতা হয় না, বাংলা কবিতাকে বাঁচতে হলে কোনও আস্তিকতার জন্য মৃত্তিকায় করতেই হবে— আস্তিকতার জন্য মৃত্তিকার মূল থেকে, পরিপার্শ্বের নিঃশ্বাস থেকে। বাংলাদেশের সমাজ বিবর্তনের ধারাগুলি এড়িয়ে, সন্দেহ-সংশয়-অবরুদ্ধ বিপ্লব-আরক্ত সমাজব্যবস্থা ডিঙিয়ে কবিতা অসম্ভব— এই উপলব্ধি থেকেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়-সমর সেনের কবিতায় ফিরে আসার আহ্বান করেছিলেন তিনি। এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যিক প্রকল্প ছিল মৃত্তিকা-সংলগ্নতার প্রকল্প, যা তাঁকে অমিয় চক্রবর্তী বা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো অধিকতর নিভৃত, আত্মমুখী কাব্যধারা থেকে পৃথক করে রাখে।

তুলনামূলক প্রসঙ্গে আরও লক্ষণীয়, কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী এবং কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমর সেন প্রমুখ প্রখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সৃষ্ট সাহিত্যেও আমরা রাজনৈতিক সত্তাকে প্রত্যক্ষ করি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে কেবল রাজনীতি অথবা সাহিত্য— এই দুটির যে কোনও একটিকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে তাঁকে সংকীর্ণ পথে চলার বন্ধনে আমরা বাঁধতে পারি না, কারণ এই দুটোই তাঁর ব্যক্তিসত্তার উপর নির্ভর করে। তিনি রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতাকে আধার ও বাহন করে তাকেই সাহিত্য ও শিল্পরূপ দান করেছেন। অপরদিকে বিষ্ণু দে-র কবিতায় মার্কসীয় দর্শন প্রায়শই ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদ ও পুরাণচেতনার সঙ্গে মিলিত হয়ে এক জটিল ইন্টেলেকচুয়াল সিন্থেসিস তৈরি করেছে, যা সাধারণ পাঠকের নিকট কঠিন বলেই বিবেচিত হয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় এই বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতার পরিবর্তে আছে প্রত্যক্ষ অনুভবের ভাষা, যা তাঁকে অসাধারণ জনপ্রিয় কবি করে তুলেছিল।

কবি বিষ্ণু দে-র মন্তব্য নিজেই এই পার্থক্যকে আলোকিত করে— সাহিত্যিক বীরেন্দ্র দত্ত লিখেছিলেন, কথাশিল্পের যে চিত্রধর্ম, চিত্রঋদ্ধতা, গভীর তলাশ্রিত ব্যঞ্জনা— তা কথাকারের ব্যক্তিত্ব, বিষয়ের গুরুত্ব, রচনার স্বভাব-স্বাতন্ত্র্য ও গদ্যভঙ্গির বিশিষ্টতায় রূপ পায়। অধ্যাপিকা সুমিতা চক্রবর্তীর ভাষায়, গল্পের উপাদান-উপকরণ যাই হোক, লেখকের অভিপ্রায় বা দৃষ্টিকোণ শেষপর্যন্ত শিল্পীর মানবিকতাবোধের শক্তিতেই উপকরণগুলির বিন্যাস থেকে শিল্প জেগে ওঠে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে এই মানবিকতাবোধ ছিল রাজনৈতিক সংকল্পের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত— এবং এই যুক্ততাই তাঁকে তাঁর সমকালীন বুদ্ধিজীবী-কবিদের থেকে পৃথক করে দেয়।

কবি বিষ্ণু দে নিজেই সুভাষের সমসাময়িক হয়েও পথের ভিন্নতা বজায় রেখেছিলেন। যেখানে বিষ্ণু দে-র কবিতায় ক্লাসিকাল রেফারেন্সের আধিক্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক দূরত্বের কাব্যকৌশল, সুভাষের কবিতায় তার বিপরীতে আছে আটপৌরে দৈনন্দিনতার প্রত্যক্ষতা। বুদ্ধদেব বসুর প্রাসঙ্গিক বক্তব্যও এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়— পারিপার্শ্বিক জীবনে ও সমাজে যা কিছু অনুদার ও অশুভ, কুৎসিত ও নিষ্ঠুর, তার বিরুদ্ধে; ধর্মের, সমাজের ও সাহিত্যের অন্ধ সংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করে যেখানে বিশিষ্ট কবি-দৃষ্টি নিজস্ব রীতির সঙ্গে যুক্ত, সেখানেই প্রকৃত প্রেরণা সত্য। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় এই বিশিষ্ট কবি-দৃষ্টি প্রকাশ পেয়েছিল নিজস্ব এক রীতিতে— যা প্রচলিত কাব্যরীতি ভেঙেচুরে নতুন রূপ ও রীতি-রচনার পথ নির্মাণ করেছিল।

কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সঙ্গেও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। সুকান্ত মাত্র বিশ বছরের অতি হ্রস্ব জীবনযাপন করে কয়েকটি অবিস্মরণীয় পংক্তি বাঙালিকে দান করে চল্লিশের দশকেই অকালপ্রয়াত হয়েছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় সুকান্তের পরিচিত ও অগ্রজপ্রতিম কবি ছিলেন; তাঁর অকালপ্রয়াণে বাংলা কবিতার যে ধারাটি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারতো, সুভাষের কবিতায় তা জীবিত ও জীবন্ত থেকে যায়। এক অর্থে সুভাষের কবিতায় সুকান্ত মরণোত্তর জীবনলাভ করেছেন বলেই বলা যায়। সুকান্তের "ছাড়পত্র" কাব্যগ্রন্থের ছাড়পত্র কবিতায় লেখা— "চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/ এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—/ নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।" এই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্বরের সঙ্গে সুভাষের কবিতার সাযুজ্য স্পষ্ট, যদিও সুকান্তের কবিতায় কৈশোরিক তীব্রতা ও আবেগের যে নিষ্কলুষতা আছে, সুভাষের কবিতায় তার সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পরিণত জটিলতা।

কবি সমর সেনের কাব্যধারার সঙ্গে তুলনায় আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়— "নানা কথা", "খোলা চিঠি", "তিন পুরুষ", "গ্রহণ" প্রভৃতি কাব্যে সমর সেন সমাজ-সচেতন জীবনদর্শন থেকে সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, এবং তাঁর কাব্যগুলিতে কবির সমাজ-দায়বদ্ধতা ও জীবন-প্রত্যয়ের উৎকৃষ্ট শিল্প সৃষ্টি দেখা যায়— "তবু জানি, কালের গলিত গর্ভ থেকে বিপ্লবের ধাত্রী/ যুগে যুগে নতুন জন্ম আনে,/ তবু জানি,/ জটিল অন্ধকার একদিন জীর্ণ হবে চূর্ণ হবে ভস্ম হবে/ আকাশ গঙ্গা আবার পৃথিবীতে নামাবে।" কিন্তু সমর সেনের এই দীপ্তিময় প্রত্যয়ের সঙ্গে যে নৈরাশ্যের অন্তঃসুর জড়িত, তা তাঁর কাব্যজীবনকে ক্রমে সংকুচিত করে এনেছিল, এমনকি একসময় তিনি কাব্যচর্চা থেকেই সম্পূর্ণ বিরত হয়ে যান। সুভাষ মুখোপাধ্যায় এই পরিণতি এড়িয়ে গিয়েছিলেন তাঁর কাব্যজীবনের দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় জুড়ে কাব্যসাধনা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে— "পদাতিক" থেকে "ধর্মের কল" (১৯৯১) পর্যন্ত তাঁর কাব্যপথের যাত্রা প্রমাণ করে যে নৈরাশ্য তাঁর কবিসত্তাকে কখনও পরাভূত করতে পারেনি।

জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তুলনাটিও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক, যদিও দুজনের কাব্যভুবন প্রায় বিপরীত মেরুতে অবস্থিত। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় প্রকৃতি, ইতিহাস ও ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সংকট মিলিত হয়ে যে নিভৃত, আত্মমগ্ন, কখনও দুর্বোধ্য চিত্ররূপময়তা তৈরি করে, তার সঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ, আহ্বানধর্মী কাব্যভাষার কোনও সাদৃশ্য নেই। জীবনানন্দ ব্যক্তি-অস্তিত্বের নিঃসঙ্গতা ও সময়ের ক্ষয়িষ্ণুতাকে আশ্রয় করে কবিতা রচনা করেছেন, যেখানে ইতিহাসের বোধ আসে এক বিষাদময় দূরত্ব থেকে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় ইতিহাসচেতনা আসে সরাসরি বর্তমানের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে— তাঁর কাছে অতীত কোনও নস্টালজিয়ার বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার। এই পার্থক্যই দুজনকে আধুনিক বাংলা কবিতার দুটি ভিন্ন ধারার প্রতিনিধি করে তোলে— একদিকে জীবনানন্দের অস্তিত্ববাদী, প্রকৃতিলগ্ন কাব্যস্বর, অন্যদিকে সুভাষের সমাজবাদী, ইতিহাসসচেতন কাব্যস্বর। তবে এ কথাও সত্য যে সাম্যবাদী চেতনার ধারায় জীবনানন্দ দাশও কিছুটা উৎসাহিত হয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে চল্লিশের দশকের রাজনৈতিক আবহ থেকে কোনও সংবেদনশীল কবিই সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারেননি।

বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে তুলনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন এক ধরনের নন্দনতাত্ত্বিক বিশুদ্ধতার প্রবক্তা— কবিতাকে তিনি দেখতেন মূলত নিজস্ব এক স্বতন্ত্র শিল্পসত্তা হিসেবে, যা রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। অথচ স্বয়ং বুদ্ধদেব বসুই যখন বলেন যে পারিপার্শ্বিক জীবনে ও সমাজে যা কিছু অনুদার ও অশুভ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করাই হল প্রকৃত কাব্যপ্রেরণা, তখন তা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যপ্রকল্পের সঙ্গে এক অপ্রত্যাশিত সাযুজ্য তৈরি করে। পার্থক্য এই যে বুদ্ধদেব বসুর কাছে এই যুদ্ধঘোষণা ছিল মূলত নন্দনতাত্ত্বিক বিদ্রোহ— প্রচলিত কাব্যরীতির বিরুদ্ধে, যেখানে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে তা ছিল সরাসরি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিদ্রোহ, যা কাব্যরীতিকেও পরিবর্তন করে দিয়েছিল কিন্তু তার মূল লক্ষ্য ছিল সমাজবাস্তবতার রূপান্তর।

অরুণ মিত্রের সঙ্গে তুলনাও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক, যিনি প্রগতি লেখক আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিলেন। অরুণ মিত্রের কবিতায় পরাবাস্তববাদী (সুররিয়ালিস্ট) প্রভাব এবং ফরাসি কাব্যাদর্শের ছাপ স্পষ্ট, যা তাঁর কবিতাকে এক ধরনের ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদের সঙ্গে যুক্ত করে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় এই পরাবাস্তববাদী জটিলতা নেই; তাঁর চিত্রকল্প সরাসরি বাংলার মাটি, মানুষ ও সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত। তবে চড়া গলার সুর— যা সময়ের দাবিতেই বহু প্রগতি-লেখকের কবিতায় এসেছিল— সুভাষ, অরুণ মিত্র, বিষ্ণু দে তিনজনের কবিতাতেই কোনও না কোনও পর্বে প্রকট হয়ে উঠেছে, যা প্রমাণ করে যে চল্লিশের দশকের রাজনৈতিক তীব্রতা একটি প্রজন্মের কাব্যভাষাকেই নির্দিষ্ট দিকে চালিত করেছিল।

নতুন বাঁক: পদাতিক-চিরকুট-অগ্নিকোণ পরবর্তী কাব্যভুবন

এই উদ্দেশ্যমূলকতা কবি সুভাষের পদাতিক, চিরকুট, অগ্নিকোণ— এই তিনটি কাব্যগ্রন্থের নান্দনিক মাধুর্য ক্ষুণ্ণ করেনি, বরং সমকালের সাধারণের সামগ্রিক প্রত্যাশা, প্রত্যয় ও জীবনদৃষ্টি আলোচ্য এই তিনটি কাব্যগ্রন্থের শিল্প-সার্থকতাকে উৎকর্ষতার শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। কালক্রমে নদীর বাঁকের মতো লেখকের জীবনদৃষ্টি নতুন পথে বাঁক নিয়েছে। এই নতুন বাঁকে আলোচ্য তিনটি কাব্যের মিছিলের স্লোগান নয়, মুষ্টিবদ্ধ উদ্যত হাতের আহ্বান নয়, রাজনৈতিক চেতনাপুষ্ট উপকণ্ঠে কবির প্রত্যাশা ঘোষণা নয়— পরবর্তীকালের কাব্য নতুন রূপে সজ্জিত। নতুন ফসল হয়ে ওঠে বাংলা কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে। এটাই কবির কাব্য সৃষ্টির ভাণ্ডারের বৈচিত্র্য দান করেছে।

তাঁর কাব্যের কবিতাগুলিতে কবি সুভাষের রচনার বৈশিষ্ট্য বিচিত্র পথগামী হয়ে উঠেছে। কবির জীবনদর্শনে ইতিবাচক পট পরিবর্তনের ফলে এর ভাব-ভাষা, আঙ্গিক স্বতন্ত্র হয়ে বাংলা কাব্য সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি করেছে। কবির কাব্যে নানা রঙের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন চিত্র অঙ্কনের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। মানবতাবাদী চেতনা রয়েছে কবির জীবন দর্শনে। মরণকে জয় করে মানুষের জন্য লড়াই করার এই জীবন-প্রত্যয় দৃষ্টান্তমূলক এবং এই শুভকর্মের জন্য পৃথিবী তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে হয়তো— এই আত্মবিশ্বাস তাঁর বুকে প্রবল শক্তি সঞ্চার করেছিল। কবির আত্মপ্রত্যয় ও সুদৃঢ় মানসিক শক্তি তাঁর কবিতার মর্মবস্তু হিসেবে একক বৈশিষ্ট্যের মর্যাদা ও অধিকার অর্জন করে। শিল্পধর্মের সঙ্গে কবিতার উদ্দেশ্য সুষম অনুপাতে প্রয়োগ তাঁর অনন্যসাধারণ ও উৎকৃষ্ট শিল্প প্রতিভার নিদর্শন বহন করে।

কবির জীবনে ভোগ বিলাসের কোনও জায়গা ছিল না। গাড়ি-বাড়ি নিজের করে ভোগবিলাসী জীবন নিয়ে নির্বিকার চিত্তে তাঁর অনেক বন্ধুই সেই সময় উচ্চবিত্তের জীবন যাপন করেছিলেন, কিন্তু কবি সুভাষ তাঁর সেই সব বন্ধুর মতো উচ্চবিত্তের জীবন ভোগ করেননি। তাঁর জীবন কেটেছিল অন্যের বাড়ি ভাড়া নিয়েই। এই জীবনাচরণের সঙ্গে তাঁর কাব্যিক প্রকল্পের সংগতি স্পষ্ট— মাটি আর মানুষের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য, বাস্তব অভিজ্ঞতা কবিকে দিয়েছিল মানুষের সঠিক জীবনচিত্র অঙ্কনের বিশেষ দক্ষতা। যেজন্য তাঁর কলমে মানুষের নিখুঁত ছবি উঠে এসেছে তাঁর স্বকীয় বিশেষত্বের মুনশিয়ানায়।

সুভাষ মুখোপাধ্যায় যুব-জনচিত্তের হতাশা, অনন্যয়, অনিকেত অসহায়তা, নিস্ফলত্ব, বিষাদগ্রস্ত ও ভগ্নুর মনকে স্বপ্নময় জগৎ নির্মাণে উৎসাহিত করে, সাহস ও উদ্দীপনার সঞ্চার করতে, আলোর দিশা দিয়ে তাদের হৃদয়ের কাছের শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। মানুষের কান্না, অধঃপতন, মানবতার লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, শোষণ, পীড়ন ও বেদনার ভেতর দিয়ে শান্তি, সাম্য ও জাগরণী সুরের স্পর্শে ও বলিষ্ঠ জীবনবোধে মানুষের প্রত্যয় ও স্বপ্নময় জগতের ঠিকানা দিয়েছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়। সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত তাঁর মানবচেতনা, সমাজচেতনতা ও দায়বদ্ধ শিল্পীসত্তার জন্য তিনি কালজয়ী শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন।

কবির অন্তর্লোকে জাগরণের প্রত্যয় সর্বদা জাগরুক ছিল। মানুষকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন সমস্ত প্রতিবন্ধকতা, সার্বিক সংকীর্তা দূর করে— মানুষ মুখ ফুটে হাতে রাখি পরিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধের কথা মানুষ বলুক, এই ছিল তাঁর কাম্য। তিনি আমাদের সেই সব মানুষকেই রাজার আসনে বসাতে চেয়েছিলেন; যারা সারা দিনরাত মাঠ, ঘাট, সমুদ্র, বন্দর, কলকারখানায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মানুষের নিত্য প্রয়োজনে বাঁচার মহামন্ত্র ধ্বনি মুখরিত করে তুলেছে। তিনি মানুষকে জাগিয়ে সচেতন করে তুলতে চেয়েছিলেন; গুণীকে সমাদর করে, গলায় মালা পরিয়ে তার যোগ্যতাকে মর্যাদা দিতে এবং যারা খুনী তাদের সাজা দেবার জন্য মানুষকে সজাগ করতে বলেছিলেন তিনি। বলিষ্ঠ ও প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে কবির উৎকণ্ঠিত ঘোষণা— "কে কোন্‌খানে ঘুমোন সেটা/ একেবারেই গৌণ/ দেখব তিনি কোথায় জেগে/ কোথায় নন মৌন।"

জীবনদর্শন, কাব্যধর্ম ও সমালোচনার প্রতিক্রিয়া

সুভাষ মুখোপাধ্যায় পৃথিবীর তুচ্ছাতিতুচ্ছ সমস্ত ভেদাভেদ ঘুচিয়ে গ্রহণযোগ্যতার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছেন। তাঁর কবিতায় একজন কবির পূর্ণাঙ্গ দর্শন ও রচনা প্রকৃতি উপলব্ধি করা যায়। জগৎ, প্রকৃতি, ব্যক্তিজীবন, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন, পারিবারিক জীবন, উৎসব, ধর্ম, সুখ-দুঃখ সবকিছুই জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে কবির রচনার গুণে। এখানে কবি অসাধারণ ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতায় সম্পূর্ণতার প্রতি নিজেকে অর্পণ করেছেন। জগৎ ও জীবনের সবকিছুকে নিজের করে গ্রহণ করে নিয়েছেন। তাঁর এই আহ্বান মানুষের চিত্তকে উদার ও ধারণশীল করে তোলে।

সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জীবনকে দেখার মনোভঙ্গি স্বতন্ত্র— সেটা তাঁর নিজস্ব বৃত্তি, যার সাহায্যে তিনি তাঁর শিল্পকর্মে স্বাধীন ও স্বচ্ছন্দ গতি হতে পেরেছিলেন। তাঁর সেই স্বাধীন স্বাচ্ছন্দ্য সাহিত্যের কাঠামো নির্মাণ, চরিত্র সৃজন, ভাষাবয়ন ও জীবনব্যাখ্যা— সর্বত্র উপলব্ধি করা যায়। জীবন সম্বন্ধে তাঁর সামগ্রিক ধ্যানধারণা ও মনোভঙ্গি সাহিত্যের রস সৃষ্টিতে সহায়ক হয়ে উঠেছে। তাঁর সাহিত্যে নিছক কাহিনী চয়নের লক্ষ্যে চরিত্র নির্মাণ করতে দেখি না তাঁকে; সেই চরিত্রগুলি বেশিরভাগই তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতায় পুষ্টিলাভ করেছে। অভিজ্ঞতালব্ধ চরিত্রগুলি তাঁর সাহিত্যে বিশেষ দর্শনে ও অভিনব আঙ্গিক নির্মিত হয়েছে।

সাহিত্যের শিল্পধর্মকে সুভাষ মুখোপাধ্যায় সচেতন শিল্পসত্তা বজায় রেখেছেন। সাহিত্যের কোথাও কোথাও তিনি মার্কসকে অবলম্বন করেছিলেন; এজন্য বাংলা সমালোচনার ধারায় কোথাও কোথাও তিনি নিন্দিত হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে নিন্দিত বা নন্দিত না করে দেখার বিষয়— জীবনকে তাঁর দেখার ভঙ্গি, জীবন থেকে যা গ্রহণ করেছেন এবং জীবন সম্পর্কে যে বক্তব্যে তিনি পৌঁছাতে চেয়েছেন। কেননা সাহিত্য মানুষের জীবন ও ক্রিয়ার অনুকরণ; যেখানে তাঁর ব্যক্তি জীবনের সঙ্গে মার্কসীয় গণআন্দোলন অভিন্ন, সেখানে শিল্পধর্ম সৃজনে মার্কস বা কোনও মতবাদে গ্রহণে ত্রুটি থাকে না।

সমকালের সাধারণের প্রত্যাশা, প্রত্যয় ও জীবনদৃষ্টি যেমন তাঁর কাব্যের ভিত্তি, তেমনি তাঁর সাহিত্যিক যাত্রায় সমকালীন কালধর্ম ও সমাজবাস্তবতার সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ। কালধর্মে চলমান সাধারণ মানুষের জীবনের ছবিতে অসাধারণ শিল্প নির্মাণে সুভাষ মুখোপাধ্যায় কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠেছেন। কোথাও কোথাও তিনি সাহিত্যকে গণজীবনের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে প্রত্যয়ী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর লেখনীতে সাহিত্য শিল্পগুণে সাহিত্য হয়ে উঠেছে, আবার জীবনদর্শনে সেগুলি জনজীবনের জাগরণী সুরের বীণা হয়ে বেজে উঠেছে।

গদ্যসাহিত্য, রিপোর্টাজ, অনুবাদকর্ম এবং কাব্যের সম্প্রসারিত পরিসর

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যকীর্তি কেবল কবিতার পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি— তাঁর বহুমুখী সাহিত্যসৃষ্টি তাঁর কাব্যপ্রকল্পকেই আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কবিতা তাঁর প্রধান সাহিত্যক্ষেত্র হলেও ছড়া, রিপোর্টাজ, ভ্রমণসাহিত্য, অর্থনীতিমূলক রচনা, বিদেশি গ্রন্থের অনুবাদ, কবিতা-সম্পর্কিত আলোচনা, উপন্যাস, জীবনী, শিশু ও কিশোর সাহিত্য— সকল প্রকার রচনাতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। "আমার বাংলা" (১৯৫১), "যেখানে যখন", "ডাকবাংলার ডায়েরী" (১৯৬৫), "ভিয়েতনামে কিছুদিন" (১৯৭৪), "টো টো কোম্পানী" (১৯৮৪)-র মতো রিপোর্টাজ ও ভ্রমণসাহিত্যে তিনি যে দেশ-দেশান্তরের মানুষের জীবনচিত্র অঙ্কন করেছেন, তা তাঁর কাব্যিক বিশ্বদৃষ্টিকেই সম্প্রসারিত করে। কার্ল মার্ক্সের "ওয়েজ লেবার অ্যান্ড ক্যাপিটাল" অবলম্বনে রচিত "ভূতের বেগার" (১৯৫৪)-এর মতো অর্থনীতিমূলক রচনা প্রমাণ করে যে তাঁর মার্কসীয় প্রত্যয় কোনও ভাসা-ভাসা রাজনৈতিক অনুরাগ ছিল না, বরং তা ছিল তাত্ত্বিক অধ্যয়নের ভিত্তিতে দাঁড়ানো এক সুসংহত জীবনদর্শন।

অনুবাদ-সাহিত্যেও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অবদান অসামান্য। নাজিম হিকমতের কবিতা (১৯৫২ ও পরে ১৩৮৬), পাবলো নেরুদার কবিতাগুচ্ছ (১৩৮০ ও পরে ১৩৮৭), হাফিজের কবিতা (১৯৮৬), চর্যাপদ (১৯৮৬), অমরুশতক (১৯৮৮)— এই অনুবাদকর্মগুলির পরিধি লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় তাঁর সাহিত্যবোধ কতটা বৈশ্বিক ও বহুমাত্রিক ছিল। নাজিম হিকমত ও পাবলো নেরুদা— দুজনেই বিশ্বসাহিত্যের প্রতিবাদী, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কবি, এবং তাঁদের কবিতা অনুবাদের মধ্য দিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় নিজের কাব্যিক স্বজনদের সন্ধান করেছিলেন বিশ্বসাহিত্যের পরিসরে। অপরদিকে চর্যাপদ ও অমরুশতকের অনুবাদ দেখায় যে তিনি কেবল সমকালীন রাজনৈতিক কবিতার গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিলেন না, বরং বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্যের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গেও তাঁর গভীর সংযোগ ছিল। আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরী (১৯৮২) এবং চে গেভারার ডায়েরী (১৯৭৭)-র অনুবাদ আবার প্রমাণ করে যে তাঁর রাজনৈতিক সহমর্মিতা ছিল বৈশ্বিক প্রতিরোধ-সংগ্রামের প্রতি— ফ্যাসিবাদের শিকার এক কিশোরীর আত্মকথা থেকে লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী চিকিৎসকের রণাঙ্গন-দিনলিপি, দুটোই তাঁর অনুবাদকর্মের আওতায় এসেছে।

তাঁর উপন্যাসগুলি— "হাংরাস" (১৯৭৩), "কে কোথায় যায়" (১৯৭৬), "চিঠির দর্পণে"— এবং জীবনীগ্রন্থ "জগদীশচন্দ্র" (১৯৭৮)-ও তাঁর গদ্যশিল্পের পরিচায়ক। জগদীশচন্দ্র বসুর জীবনীগ্রন্থ রচনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কেননা এতে কবি বিজ্ঞান ও জাতীয়তাবাদী চেতনার সংযোগ-বিন্দু খুঁজে নিয়েছেন। শিশু ও কিশোর সাহিত্যে "মিউ-এর জন্য ছড়ানো ছিটানো" (১৯৮০), "দেশবিদেশের রূপকথা" (১৯৫৫)-র মতো রচনায় তিনি প্রমাণ করেছেন যে তাঁর ভাষাশৈলীর সাবলীলতা শুধু রাজনৈতিক কবিতার তীক্ষ্ণতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা শিশুমনের কোমলতাকেও স্পর্শ করতে সক্ষম। এই বহুমুখিতা তাঁকে বিষ্ণু দে বা সমর সেনের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত এক সাহিত্যিক পরিচয় দান করেছে।

লক্ষণীয় বিষয় এই যে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যে নারী-জীবনের প্রতিনিধিত্বও এক বিশিষ্ট দিক। তাঁর জীবনসঙ্গিনী গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত লেখিকা, এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। যে সময় পাশ্চাত্যের দুনিয়ায় মেরি ওলস্টোনক্রাফ্টের ধারার নারী আন্দোলনের নেত্রীরা মেয়েদের শিক্ষার অধিকার ও শ্রমের বিনিময়ে কাজের অধিকারের জন্য পথে নামছেন, তখন সুভাষ ও গীতা কলকাতার রাজপথে ঘুরে ঘুরে লড়ে চলেছেন সাম্যের লড়াই। রুশ বিপ্লবের আদর্শে বিশ্বাসী এই কবি আন্দোলনের এই স্রোতকে নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছিলেন, এবং তাঁর কবিতায় শ্রেণিসংগ্রামের পাশাপাশি লিঙ্গসমতার প্রশ্নও কোথাও কোথাও প্রতিফলিত হয়েছে— যদিও এটি তাঁর কাব্যের মুখ্য বিষয় নয়, একটি গৌণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্তর।

পরিণত বয়সের কাব্যভাবনা: রাজনৈতিক আবেগ থেকে দার্শনিক প্রশান্তি

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যজীবনকে যদি একরৈখিকভাবে দেখা হয়, তবে তা এক বড় ভুল হবে। পদাতিক-চিরকুট-অগ্নিকোণের তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক আহ্বান থেকে "ফুল ফুটুক" (১৯৫৭), "যত দূরেই যাই" (১৯৬২), "কাল মধুমাস" (১৯৬৬)-এর মতো কাব্যগ্রন্থে এসে তাঁর কাব্যস্বর ক্রমে আরও নান্দনিক, আরও মেধাবী জটিলতায় পরিণত হয়েছে। "একটু পা চালিয়ে ভাই" (১৯৭৯)-এর মতো কাব্যগ্রন্থে এসে কবি লেনিনের কণ্ঠস্বর ধার করে বলেছেন— "লেনিন যেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন,/ শতাব্দী শেষ হয়ে আসছে—/ একটু পা চালিয়ে, ভাই, একটু পা চালিয়ে।" এই পংক্তিতে তরুণ বয়সের সেই আক্রমণাত্মক, যৌবনোচিত তীব্রতার পরিবর্তে এসেছে এক পরিণত, প্রায় উপদেশাত্মক, কিন্তু তবুও আশাবাদী স্বর— এক প্রবীণ বিপ্লবীর কণ্ঠ, যিনি জানেন সময় কম, কিন্তু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনও অবকাশ নেই।

"জল সইতে" (১৯৮১), "চইচই চইচই" (১৯৮৩), "বাঘ ডেকেছিল" (১৯৮৫), "যা রে কাগজের নৌকা" (১৯৮৯) এবং সর্বশেষ "ধর্মের কল" (১৯৯১)-এ এসে কবির কাব্যভাষায় এক ধরনের প্রশান্ত পরিণতি লক্ষণীয়, যেখানে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক আহ্বানের পরিবর্তে এসেছে জীবনের সামগ্রিকতার প্রতি এক ধরনের দার্শনিক গ্রহণযোগ্যতা। তবে এই পরিণতিতেও তাঁর মৌলিক জীবনদর্শন— মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, শোষণের বিরুদ্ধে অনিঃশেষ ক্রোধ, এবং আগামীর প্রতি অপরাজেয় আশা— অপরিবর্তিত থেকে গেছে। এই দীর্ঘ কাব্যজীবনের পরিক্রমাতেই বোঝা যায় কেন সমালোচকেরা তাঁকে কোনও একটি দশকের বা কোনও একটি মতাদর্শের কবি বলে সীমাবদ্ধ করতে পারেননি— তিনি ছিলেন একটি নিরন্তর বিবর্তনশীল কাব্যপ্রকল্পের রূপকার, যার শিকড় চল্লিশের দশকের সংকটেই প্রোথিত, কিন্তু যার শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়েছে শতাব্দীর শেষ দশক পর্যন্ত।

প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির নিরিখেও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যকীর্তির ব্যাপ্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৬৪ সালে তিনি সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার পান, ১৯৭৭ সালে অ্যাফ্রো এশিয়ান লোটাস প্রাইজ, ১৯৮২ সালে কুমারন আসান পুরস্কার ও মির্জো তুরসুন জাদে পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে আনন্দ পুরস্কার এবং সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯২ সালে তিনি ভারতীয় জ্ঞানপীঠ পুরস্কারে সম্মানিত হন— বাংলা ভাষার অন্যতম সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান, এবং ১৯৯৬ সালে সাহিত্য অকাদেমী ফেলোশিপ পান। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান "দেশিকোত্তম"-এ ভূষিত করে। তিনি প্রগ্রেসিভ রাইটার্স ইউনিয়নের ডেপুটি সেক্রেটারি এবং ১৯৮৩ সালে অ্যাফ্রো-এশীয় লেখক সংঘের সাধারণ সংগঠক নির্বাচিত হন, এবং ১৯৮৭ সাল থেকে সাহিত্য অকাদেমীর একজিকিউটিভ বোর্ডের সদস্য ছিলেন। তাঁর স্মরণে ২০০৯ সালে শিয়ালদহ-নিউ জলপাইগুড়ি এক্সপ্রেসের নামকরণ হয় "পদাতিক এক্সপ্রেস", এবং ২০১০ সালের ৭ই অক্টোবর কলকাতা মেট্রোর নিউ গড়িয়া স্টেশনটি তাঁর নামে উৎসর্গ করে "কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন" নামকরণ করা হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিগুচ্ছ প্রমাণ করে যে তাঁর কাব্যিক রাজনৈতিকতা কখনও তাঁকে সাহিত্যজগতের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি, বরং তাঁকে এক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কবি-ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করেছিল। যকৃৎ ও হৃদপিণ্ডের সমস্যার কারণে দীর্ঘকাল অসুস্থতার পর ২০০৩ সালের ৮ই জুলাই কলকাতায় এই উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের জীবনাবসান ঘটে।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্য সৃষ্টিমূলে নিহিত তাঁর আদর্শিক চেতনা, ব্যক্তিজীবনের স্মৃতি, বাংলার মাঠ-ঘাট, শহর-নগর, কলকারখানার শ্রমজীবন মন্বন্তর, বৈষম্যহীন-শোষণহীন-পীড়নহীন নতুন জগতের স্বপ্ন প্রত্যয়। কেবল শিল্পের জন্য তাঁর শিল্প নয়— তাঁর সাহিত্য গড়ে উঠেছিল সমকালীনতার বৃহত্তর সত্য, প্রতীয়মান বাস্তবতার জীবনানুভূতি, সমকালের রূপ ও স্বরূপের সঙ্গে আত্মস্থ হয়েই। দেশ ও জাতির কালপ্রবাহজাত সমাজজীবনের সঙ্গে তাঁর চেতনাভূমি অঙ্গীভূত হয়ে গদ্যসাহিত্য গড়ে উঠেছিল। সমাজ-মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা, দেশ ও জাতির প্রতি কর্তব্যবোধের অনুভূতি তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির আদিকথা।

বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম বাংলা কাব্য-সাহিত্যে ভাববহুল সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুর চড়িয়েছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাম্যবাদের পূজা করেছিলেন। তদুপরি তিনি স্বতন্ত্র। বাংলা কাব্য-ইতিহাসে একমাত্র তিনিই প্রথম কবি যিনি একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসাবে সেই দলের মতাদর্শ পুরোপুরি মেনে নিয়ে সৃষ্টির জগতে আসন পাকা করে নিতে পেরেছিলেন। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য বিশেষ মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে; তথাপি তাঁর সাহিত্য নির্বিরোধ গ্রহণ যোগ্যতা লাভ করেছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শ কালের পরিবর্তনে, ক্ষমতার পরিবর্তনে ও যুগের বদলে জনমানসে পরিত্যক্ত হয়। এছাড়া ঘটনাশ্রয়ী রাজনীতি সাধারণ পাঠককে দলগত বৈষম্য ও বিরোধ সৃষ্টি করে। অথচ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একটি বিশেষ দলের হয়ে সেই দলের মার্কসীয় দর্শন কাব্যে প্রতিফলিত করেও বিরোধী পাঠক ও দর্শকের মনে অসাধারণ গ্রহণযোগ্যতা আদায় করে নেন। রীতিমতো রাজনৈতিক কবিতা ধারার সৃষ্টি করে তিনি বাংলা সাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তিনি অসাধারণ জনপ্রিয় কবি হয়ে ওঠেন।

ক্রমশ কবি সুভাষ, সমর সেন প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকরা হয়ে ওঠেন তরুণতর— অতি আধুনিক কবি সাহিত্যিকদের আশ্রয় স্থল। তাঁর সাহিত্যে আমরা একজন সামাজিক দায়বদ্ধ সচেতন শিল্পের শিল্পসত্তাকে উপলব্ধি করি। তাঁর সাহিত্যে প্রধানত গুরুত্ব পেয়েছে বিশিষ্ট জীবনদর্শন, সমকালীন পটভূমি ও সমাজবাস্তবতা। এর আগেও কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমর সেন প্রমুখ প্রখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সৃষ্ট সাহিত্যে আমরা রাজনৈতিক সত্তাকে প্রত্যক্ষ করি; সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে কেবল রাজনীতি অথবা সাহিত্য যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তে আমরা তাঁকে সংকীর্ণ পথে চলার বন্ধনে বাঁধতে পারি না— সেই দুটোই তাঁর ব্যক্তিসত্তার উপর নির্ভর করে। তদুপরি বিশ শতকের তিরিশ ও চল্লিশের দশক ছিল বাংলা সাহিত্যে প্রগতিচেতনা ও প্রগতি আন্দোলন বিকাশের উদ্দীপনাময় কাল। সেই কালধর্মকে তিনি অগ্রাহ্য করেননি; বরং বিশিষ্ট কালধর্মে বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও মহৎ জীবনদর্শন নিয়ে সাহিত্য সৃজনে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ধারায় এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হয়ে উঠেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যকীর্তি বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট প্রস্থানবিন্দু চিহ্নিত করে— যেখানে চল্লিশের দশকের যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ ও দাঙ্গার বিভীষিকাময় বাস্তবতা একজন তরুণ কবির কণ্ঠকে রাজনৈতিক প্রত্যয়ে পরিণত করেছিল, এবং সেই প্রত্যয়কেই তিনি গদ্যঋদ্ধ, আড়ম্বরহীন, অথচ গভীর ব্যঞ্জনাময় কাব্যভাষায় রূপান্তরিত করেছিলেন। বিষ্ণু দে-র বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতা বা সমর সেনের নৈরাশ্যবাদী আত্মসংকোচনের পথ তিনি গ্রহণ করেননি; জীবনানন্দের আত্মমগ্ন প্রকৃতিচেতনা বা বুদ্ধদেব বসুর নন্দনতাত্ত্বিক বিশুদ্ধতার পথও তাঁর পথ ছিল না। বরং তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক তৃতীয় পথ— যেখানে আবেগ, প্রত্যয়, ব্যঙ্গ ও আশাবাদ একই কাব্যকণ্ঠে মিলিত হয়, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কখনও কাব্যিক সৌন্দর্যের প্রতিযোগী হয়ে ওঠে না, বরং তার পরিপূরক হয়ে থাকে।

তাঁর কাব্যজীবনের দীর্ঘ পরিক্রমা— তরুণ বয়সের তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক আহ্বান থেকে প্রবীণ বয়সের প্রশান্ত দার্শনিকতা পর্যন্ত— প্রমাণ করে যে তাঁর কবিসত্তা কোনও স্থবির আদর্শিক কাঠামোয় বন্দি ছিল না। তিনি ছিলেন এমন একজন কবি, যিনি রাজনীতি ও সাহিত্যের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব অনুভব করেননি, বরং তাঁর জীবনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকেই কাব্যশিল্পের আকর করে তুলেছিলেন। এই সংশ্লেষেই তাঁর মৌলিকত্ব নিহিত— যেখানে অন্য সমকালীন কবিরা রাজনীতি ও কাব্যের মধ্যে কোনও একটিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্যটিকে খাটো করেছেন অথবা দুটির মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েনে ভুগেছেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় এই দুটিকে একই জীবনপ্রবাহের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে গ্রহণ করেছিলেন। এই কারণেই তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক কবি নয়, বরং বাংলা কাব্যসাহিত্যের ধারায় এক চিরকালীন, জনপ্রিয় ও কালজয়ী কবি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন— এমন একজন কবি, যাঁর কাব্যভাষা শতাব্দী পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে নবায়িত করতে পেরেছিল, অথচ যাঁর মূল প্রত্যয়— মানুষের প্রতি অপরাজেয় বিশ্বাস, শোষণের বিরুদ্ধে অনিঃশেষ প্রতিরোধ, এবং আগামীর প্রতি নিরবচ্ছিন্ন আশাবাদ— কখনও পরিবর্তিত হয়নি। বাংলা কবিতার ইতিহাসে "পদাতিক"-এর পদচারণা তাই কেবল একটি কাব্যগ্রন্থের সূচনা নয়, একটি নতুন কাব্যপ্রকল্পের সূচনা, যার তরঙ্গ আজও বাংলা কবিতার পাঠক ও রচয়িতাদের মধ্যে অনুভূত হয়।