কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

শ্রাবণী দাশগুপ্ত

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ছেঁড়া শেকড়ের অন্তরাখ্যান


 

(১৬)   

খানিকটা নাম কাঁটাতারে তারে বেঁধা

শিবনাথ প্রথমদিকে ধীরেন্দ্রনাথকে অনেক সাহায্য করেছে স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজে। তখন অবশ্য আরেকটা কারণও ছিল। অমলা বিবাহিত বছর ঘুরে আরও প্রায় ছ-মাস পেরিয়ে গেছে, আসেও খুব কম। তার দু-চারটে পোস্টকার্ডের চিঠি প্রথম প্রথম বাসন্তী পেয়েছে। শিবনাথ চাপা ছেলে, নিঃশব্দে ধীরেন্দ্রনাথের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।

শিবনাথ ক-দিন ধরে কাজে যাচ্ছিল না। বাড়িতে থাকে, খায়, শুয়ে থাকে, বই পড়ে, কারো সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা বলেনা। শেফালী লক্ষ করে বলল, “ঠাকুরপো কী হইছে তমার শুইয়া আছ?”

“কিছু না, এমনেই। তুমি কাজ কর গিয়া যাও।”

“বিনিরে তোমার কাছে রাখবা? ছবির বই একখান দিয়া বসাইয়া দেই?’

শিবনাথ আপত্তি করল না। শেফালী পাতাছেঁড়া ছড়ার বইসমেত মেয়েকে কোলে নিয়ে এল। বাচ্চাটি টুকটাক কথা শিখছে, কুট্টি-কুট্টি দাঁতে খিলখিল করে হাসে। শিবনাথ কোলে তুলে নিয়ে বলল, “অর ভালো নাম কী দিছ বড়বউদি?”

“আমি কী দেব? একটা দেও না তুমি, কত বই-টই পড় যে—।”

“শ দিয়া শর্মিলা নাম রাখবা? নাম শুনছ—শর্মিলা ঠাকুর? নতুন সিনেমা আর্টিস।”

“আমি আর কোনখানে শুনব? ছোড়দিরে জিগাসা কইর। ঠিকুজিতে কী আসে দেখি।”

“ধুর্ ঠিকুজির নাম ইস্কুলে চলবে না। ভালো নাম দিতে হয়—দিদিমনিরা ডাকবে, বন্ধুরা ডাকবে।”

শেফালী হাসিমুখে বলে, “তমার ভাইজি, তুমি দিয়ো। আমার ত একখানই নাম—।”

“বউদি, একটা কথা কই?”

“কী কথা?”

“আমারে ক-টা টাকা ধার দিতে পারবা?”

শেফালী প্রথমে চমকে ওঠে, তারপর দুঃখীমুখে মাথা নেড়ে বলে, “কই পাব ঠাকুরপো? এইটুক কাপড় দিয়া মাথা ঢাকতে পাছা বাইরাইয়া যায়—।”

শিবনাথ আর কিছু বলতে পারে না। শ্বশুরবাড়ির এতজনের মনরক্ষার দায় শেফালীর, কারো কাছে সে অপ্রিয় হতে চায় না। দ্বিতীয় সন্তান আনার জন্য শাশুড়ি বারবার বলছেন, এখনই ইচ্ছে নেই তার। অবশ্য কতদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবে জানে না।

এমনিতেই সংসারের খরচ অসম্ভব বেড়েছে, হঠাৎ বেড়ে চালের দাম আকাশ-ছোঁয়া। পূর্ববঙ্গের মানুষ খেতে ভালোবাসে। আর কিছু না থাক, দু-বেলা ভরপেট ভাত না পেলে বড় কষ্ট হয়। এরাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অনাহার, মৃত্যু, আত্মহত্যার খবর—জীবনের মান ও মূল্য ক্রমশঃ কমে যাচ্ছিল। তার ওপর দূরতর গ্রাম থেকে অভুক্ত, কঙ্কালসার জনস্রোত শহরে এসে পড়ছে কাজের সন্ধানে, খাবারের খোঁজে। খোলা বাজারে যা বিক্রি হয় তা অগ্নিমূল্য, ছুঁলে হাতে ছ্যাঁকা লাগে। গরীবের ভাগ্যে রেশনের মাপা, অতি খারাপ মানের ভেজাল-মেশানো চাল-গম। যোগমায়া ছেলেমেয়ের জন্য সেই চালের কাঁকড় বেছে দেন, তা সত্বেও দু-একটা দাঁতে পড়ে। তাঁর জন্য আতপ চাল আসে। সেই চালও তথৈবচ—কাঁকড়, পোকা, ভাঙা চাল বা খুদ বেশী। তিনি একবেলা ভাত খান, অন্যবেলা মুড়ি-জল। অল্প দুধ আসে নাতনির জন্য, শেফালী তাঁকেও দিতে চায়। তিনি বারন করেন, কদাচিৎ জল মিশিয়ে পাতলা করে দিতে বলেন। নাতনির দুধে ভাগ বসাতে ইচ্ছে করে না। বাচ্চা ভাত খেতে চায় না, বমি করে দেয়। রেশনের চালের মোটা মুড়ির মতো শক্ত ভাত চারবার ফোটালেও নরম হয় না। শেফালী ভাতের ফ্যান না ঝরিয়ে হাঁড়িতে শুকিয়ে মেরে নেয়। বাসার পুরুষরা বাইরে খাটে, থালা ভরে না দিতে পারলে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। তার নিজেরও বেলাশেষে ডাঁটাচচ্চড়ি, মাছের দু-একটা কাঁটা আর ঝোল দিয়ে বড়-বড় গরাসে পেটভরা ভাত না খেলে শান্তি হয় না। মেয়ে এখনো বুকের দুধ টানে। তার মা ক-বার বলেছেন বুকের দুধ ছাড়িয়ে দিয়ে ভাত খাওয়াতে। শেফালী পারেনা। বাপের বাড়িতে গিয়ে থাকলে হয়ত মা-বোন মিলে সামলে দিত। থাকা হয় কোথায়? এক-একদিন বিনিকে যোগমায়ার কাছে রেখে সন্ধের দিকে ঘুরে আসতে যায়। এসে হয়ত দেখে মধ্যমগ্রাম, ব্যারাকপুর বা টিটাগড় থেকে শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কের আত্মীয়রা এসেছেন। বাসন্তী প্রাথমিক আপ্যায়ন করেছে, তারপর সব মিলে ‘বড়বউমা কই গ্যাছে?’ করে হইচই শুরু করছেন। বিনি এত অচেনা মানুষ দেখে তারস্বরে কাঁদছে আর মা-কে খুঁজছে।

স্বামী বিশ্বনাথ ও তার ভাইয়েরা এক-এক সময় কাজ থেকে ফেরে। সকলের নৈশাহার ও সংসারের যাবতীয় কাজ সেরে, মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে বালিশে মাথা পাততে রাত বারোটা পার হয়। নিঝুম অঞ্চলে অদূরে কুকুরের হাঁকডাক শোনা যায়। বিশ্বনাথ রিরংসার তাড়নায় জেগে উঠে শেফালীর শরীর টানে নিজের দিকে। শেফালী বিনাবাক্যে সহযোগিতা করে। ক্লান্ত শরীর নিরুপদ্রব বিশ্রাম চায় তবু শেফালী বারণ করে না, বিনাবাক্যে সহযোগিতা করে। কাজ শেষে বিশ্বনাথ ঝিমিয়ে গেলে শেফালী বলে, “খরচার চিন্তায় আন্ধার দেখি – আবার মায়ে ক-ন--,”

“মায়ে কী কয়?”

“নাতি আনা লাগব! কইলেই হয়? ”

বিশ্বানাথ হেসে স্ত্রীকে একটু আদর করে বলে, “হের চিন্তা করা তমার কাম নাকি? আমি কী করতে আছি?”

“দুলালী দুধের ডিপুতে কাজ ধরছে।”

“ছুটশালী দুধের ডিপুতে কাজ ধরছে? ক্যান? তার বিয়া দিব না তোমার বাবায়? বিয়ার বয়স ত গেছে গা।”

“পাত্তর পাইলেই দিব। আছে তমার হাতে? দেইখ্যা গেছে কতজন, পছন্দ করে নাই। কাল, শুইটকা, গালভাংগা মাইয়ার জন্য অনেক টাকা লাগে। মা-র যা কয়খান অলঙ্কার আছে, দিব। পণের টাকা কই? বাজারের অবস্থা বুঝ না? তার চাইতে এইটাই ভালা হইছে।”

শেফালী মুখ বেজার করে রাখে। বিশ্বনাথ অন্ধকারে হাসে, ঈষৎ ঠাট্টা করার চেষ্টায় বলে, “বোনেগ মইধ্যে সুন্দরীরে ত আমি তুলে আনছি।”

শেফালী স্বামীর গা ঘেঁষে ফিশফিশ করে বলে, “তুমি আমারে একখান দরখাস্ত লিখে দিবা?”

“কিসের দরখাস্ত—বাসন্তীর ইশকুলের? তুমি পড়বা না পড়াইবা? দশ-ক্লাস পাশ দাও নাই শ্বশুরমশয় কইছিলেন।”

“দুধের ডিপুতে নাকি লোক নিব, দুলালী বলছে। কও না, লিখে দিবা? হাতে দু-টা পয়সা আসলে সংসারে লাগব। দুলালী কলেজেও এডমিশন নিবে কইল। বাসার কাছে, ভোরের সময় মোটে দুইঘন্টা ডিপুর কাম থাকে।”

বিশ্বনাথ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অন্যপাশে ফিরে তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, “রাইত অনেক হইছে, আমারে না জালাইয়া ঘুমাতে দাও।”

একটু পরে সে ভয়ানক নাক ডাকে। শেফালীর চোখে জল এসে পড়ে। তার কচি মেয়ে ঘুমের মধ্যে নড়াচড়া উশখুশ করে, মা-র বুকের কাছে হাতড়ায়। আলতো হাতে মেয়েকে চাপড়ায়, চোখে ঘুম জড়িয়ে এলে স্বপ্ন দেখতে থাকে। মশারির বাইরে অজস্র মশার গুনগুনানি সঙ্গতের মতো শোনায়। তার মা-র এক খুড়তুত বোন বিয়ে হয়ে গেছে আসানসোলের ওদিকে। মেসো কারখানায় লেবারের কাজে ঢুকেছিল—বর্তমানে ওভারসিয়ার। বিয়ের দু-মাস আগে শরীর সারাতে শেফালীকে তার মা পাঠিয়েছিল সেই মাসির সঙ্গে, ছিল দিন পনেরো। মাসি যেন হাতে চাঁদ পেয়েছিল, ফলে সারাদিন সেখানেও কাজের কমতি ছিল না শেফালীর। তাতে শরীর কতটা সেরেছিল বলা কঠিন তবে মাঝে একটা দিন বাসে চড়ে বেড়াতে যাওয়া স্বপ্নসদৃশ হয়ে আছে – কল্যাণেশ্বরী মন্দির, মাইথন ড্যাম। শেফালীর ঘুমের মধ্যে প্রচণ্ড শব্দে আছড়ে পড়ে ফ্যানার মতো বরাকর নদীর জল।

সকালে বেরিয়েছিল শিবনাথ, অবেলায় ফিরে নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছিল। এই ঘরে আগে তারা অবিবাহিত তিনভাই থাকত, এখন সে আর সবার ছোটো দেবনাথ থাকে। বছরখানেক আগে মেজভাই শম্ভুনাথ আরেকটা ছোটো ঘর তুলেছে, পাকা ঘর – চূন-সুড়কি, লাল সিমেন্টের মেঝে, মাথার ছাদ অবশ্য টালির। ঘরের সামনের অংশের উঠোন সিমেন্টে ঢালাই করিয়েছে। মা ও বোনকে থাকতে বলেছিল, যোগমায়া রাজি হননি। অতএব সে একা ঘুমোয় ওঘরে।

শিবনাথের পাশের জায়গা খালি, কারখানা ছুটির পর দেবনাথ ফিরতে প্রায়ই বেশী রাত করে। শেফালী অনেকবার অনুযোগ করেছে, সম্পর্কে সে বড়বৌদি, শাসন করার অধিকার আছে। দেবনাথ বিরক্তভাবে বলে, “ঘরের বাইরে বার হইতে হয়না, গ্যালে বুঝতা রাস্তাঘাটের অবস্থা! এত এত মানুষ এসে ভীড় করতাছে। আইজ এইখানে মিছিল, কাইল ওইখানে বাস আটকাইয়া রাস্তা বন্ধ।”

অবশ্য একথায় সামান্য জল মেশানো থাকে। ছুটি থাকলেও দেবনাথ বাড়িতে থাকেনা, আড্ডা দিতে বেরোয়। সে বন্ধুপ্রিয় ছেলে।

শীতের সন্ধে হয় তাড়াতাড়ি। বাসন্তী ফিরে অভ্যেসমতো ভাইদের ঘরে উঁকি দিল একবার। শিবনাথকে শায়িত দেখে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, “কী রে শিবু অসময়ে ঘুমাস? চা খাইছস? র’; আমি কাপড় ছাইরা চা আনছি।”

শিবনাথের সাড়া না পেয়ে চিন্তিতমুখে রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়ে দেখল কলাইকরা কাঁধা-উঁচু থালাতে চায়ের কাপ সাজিয়ে আনছে শেফালী। বাসন্তী দু-টি কাপ দু-হাতে তুলে নিল,

“শিবু কখন আসছে বউদি? এই অবেলায় ঘুমায় যে?”

শেফালী মাথা নাড়ল, জানে না। বাসন্তী চা নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখে শিবনাথ বিছানায় উঠে বসেছে, জানালার বাইরে অন্ধকারে চেয়ে আছে। ঘরের মধ্যে বাইরের আলো প্রায় নেই। বাসন্তী ভাইকে ডেকে কাপদুটো ধরিয়ে বলল, “বস, উঠিস বুঝি! আমি কুপি নিয়া আসতাছি।”

কাপড় বদলে কুপির আলো নিয়ে আসতে একটু সময় লাগল বাসন্তীর, ততক্ষণে শিবনাথে চা খাওয়া শেষ। ঘরের মধ্যে বেশ অন্ধকার। কুপির আলোয় সামান্য কাটলেও চতুর্দিকে রহস্যময়তা বেড়েছে। যতটুকু আলো ছড়িয়েছে ততটুকু দেখা যাচ্ছে, বাকি অংশ কালো। শিবনাথ কাপটা এগিয়ে দিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল, “ল’, তর চা জল হয়ে গ্যাছে। ধর দেখি, আমি উঠি—।”

বাসন্তী দিদিসুলভ ধমক দিয়ে বলল, “এক্কেরে উঠবি না, চুপ করে বয়। কী হইছে কী তর? এইর’ম মনমরা হয়ে থাকস?”

“বললে একটা উপকার করবি?”

“আমি উপকার করব? ক’দেখি কী করতে হবে?”

“কয়টা টাকা ধার দিবি ছোড়দি?”

বাসন্তী হয়ত আন্দাজ করছিল এমনটাই। হেসে বলল, “তা আর দিমু না? ভালা লোকের কাছে কইলি—গাছ লাগাইছিলাম, ফলও ধরছে, অখন ঝারা দিলেই পরব! সত্যই টাকার দরকার তর?”

“হ রে ছোড়দি। ছুটো একখান বিজনেস – করতাম।”

“ক্যান তর দোকানের কাজটার কী হল?”

শিবনাথ ঘটনাটা জানাল বাসন্তীকে। কালীঘাট রিফ্যুজি হকার্স কর্নারের কাটরার যে দোকানে সে কাজ করত, মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিক্রি-বাটা ক্রমশঃ কমে আসছিল। দোকান বন্ধ করে মালিক চলে গেছে গ্রামের বাড়িতে। শিবনাথ আর তার সহকর্মী কালীপদ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। মালিক লোকটি খারাপ ছিল না, সামান্য টাকা তাদের হাতে দিয়ে জানিয়ে গেছে তারা যেন কাজ খুঁজে নেয়। বলতে বলতে শিবনাথের গলা ধরে এল। বাসন্তী তার পিঠে সজোরে কিল বসিয়ে বলল, “অ্যাদ্দিন কস নাই ক্যান? চাকরির অবস্তা খুবই অচল জানি ত! তাও এমন বেজার হইলে চলব? তুই ত আই-এস-সি পরজন্ত পড়ছস—, পরীক্ষা দিয়া ফালা!”

বহুদিন পর ভাইবোন পরস্পরের সঙ্গে মন খুলে কথা বলল, কিন্তু টাকার সমস্যার সমাধান হল না। সবচেয়ে বেশী সংসার খরচ দেয় শম্ভুনাথ, ক-মাস পর নিজের সংসার হলে কতটা পারবে বলা যায় না। বিশ্বনাথও দেয়, দেবনাথ দেয় সামান্যই—নিজের খোরাকিটুকু, যোগমায়ার হাতে কখনো দু-চারটাকা। শিবনাথ নিজের জন্য সামান্য রেখে উপার্জনটুকু যোগমায়ার হাতে দিয়ে এসেছে, তা যত কমই হোক।

বাসন্তী ভাইকে কারখানায়, মিলে কাজের খোঁজ করতে বলল। শিবনাথ অন্তর্মুখী ছেলে। বেশ খানিকক্ষণ নীরব থেকে বলল, “অনেক ফিজিকাল খাটনি হয়রে ছোড়দি, দেবুরে দেখস না? আমি মনে হয় পারমু না। তয় আমি বসে নাইরে, চেষ্টা করতাছি। বড়বাজার গেছিলাম, মারুয়ারির গদীতে হিসাব-টিসাব রাখা, যদি—। দু-একটা ছাপাখানায় দেখা করছি। কয় যে, সারা রাইত জাইগা কাম। কয়জনারে বলে রেখেছি, রেলে বা ইনসুরেন্সে যদি জাগা খালি থাকে—। তুই অবশ্যি ঠিকই বলছস, দেখি পরীক্ষা দিয়া ডিগ্রি কমপ্লিট করি—।”

ধীরেন্দ্রনাথের কথামতো বাসন্তীকে ট্রেনিং নেওয়ার জন্য উৎসাহ দিল শিবনাথ, “তুই ঠিকই পারবি ছোড়দি, তোর মইধ্যে জোর আছে। টাকার জোগাড় হয়ে যাবে।”

বাসন্তী খুশী হল। ভাইকে বলল, “অঙ্গার বলে নাটক আসছে, যাবি নাকি দ্যাখতে? বউদিরেও কই। দিলীপবাবু টিকিট কেটে দিব বলছে।”

এই নাটকের নাম শুনেছে সে—খনিশ্রমিকদের মৃত্যু নিয়ে প্রতিবাদী নাটক। শিবনাথ কিছু অনুমান করে দিদির দিকে তাকিয়ে প্রশ্রয়ের হাসিতে সম্মত হল।

লিলিয়ান জোনাথন নামের অ্যাংলো মহিলা আরও দু-একবার স্কুলে এল, “হ্যাভ কাম টু ভিজিট দ্য স্কুল। আই ওয়াণ্ট টু জয়েন।”

দিলীপের একটু আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, “ইয়েস ম্যাডাম, আই সেইড দি প্রেসিডেণ্ট—।”

“তোমাদের স্কুলের অ্যাড্রেস কী? আমাকে দাও—।”

দিলীপ জবাব দেয়নি, হেসেছে। ছিন্নমূলের ‘অ্যাড্রেস’ হয় নাকি? উপড়ে-আনা মানুষের চোদ্দআনা  শেকড় যেখানে থেকে গেছে, ঠিকানা সেখানেই পড়ে আছে। পড়ে আছে নাম, পড়ে আছে অস্তিত্বের অংশ, পড়ে আছে মুহূর্তে-গাঁথা সময়। মিসেস জোনাথন সকলকে নেমন্তন্ন করে চিরকুট লিখলেন, “কর্ডিয়ালি ইনভাইট ইউ টু মাই হোম—।” চিরকুটটা ধীরেন্দ্রনাথের হাতে দিতে বললেন, “আই উইশ টু মিট হিম।”

দল বেঁধে যাওয়ার পরিকল্পনা হল। শুনে বেঁকে বসেছিল লীলা আর শান্তি, “অ-রে মা-রে যামু না। গিয়া কী করুম? কী যে কয় একবন্ন বুঝি না!”

প্রথমে তাদের ধমক দিল বাসন্তী, পরে বুঝিয়েছিল দিলীপ। শেষে তাদের উৎসাহের অন্ত নেই। ভালো কাপড় নেই, যা ইস্কুলে পরে আসে সেসব রং-জ্বলা, রিফু-করা। লীলার বয়স যত কমই হোক, সাদা কাপড় পরে। শান্তি তার কাকিমার একখানা চলনসই সুতির কাপড় পরল। তারাসুন্দরী অমলার পাওয়া শাড়ি থেকে বাসন্তীকে একটা দিয়েছিলেন। সাধারণ তাঁতের কাপড়ই, কিন্তু নতুন। ধীরেন্দ্রনাথ ফর্সা ধুতি-পাঞ্জাবি-চাদর পরলেন, হাতে নিলেন লাঠিটা। দিলীপ যেমন থাকে রোজ, তেমনটাই—ধুতি আর দলামোচা হাওয়াই শার্ট। ধীরেন্দ্রনাথ তারাসুন্দরীকে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন। বাসন্তীও অনুরোধ করেছিল, “চলেন না খুড়িমা, ম্যামসাহেবের বাসা দেইখ্যা আসবেন—।” তারাসুন্দরী কিছুতেই রাজি হলেন না।

ছোট্ট দলটি যাওয়ার জন্য তৈরি, কিন্তু সবটা রাস্তা হেঁটে যাওয়া ধীরেন্দ্রনাথের জন্য পরিশ্রমসাধ্য। দিলীপ ঘুরে বেড়ায়—জনসংযোগ করে, গোপনে পার্টির কাজ করে। ট্রামডিপোর কাছে তার চেনা রিকশা আছে, ডেকে নিয়ে এল। ধীরেন্দ্রনাথ উঠে বসলেন, সঙ্গে আর কেউ বসতে রাজি হল না। রিকশাওয়ালা লোকটি বিহারি, রোগা হলেও শক্ত হাত-পা। গড়গড়িয়ে ধীরেন্দ্রনাথকে টেনে নিয়ে চলল। পেছন পেছন দিলীপ দৌড়াল, “রোককে রোককে! এত জোরসে দৌড়ায়গা ত হামলোক কেয়সে যাতা হ্যায়?” দিলীপের হাতে জোনাথনের বাড়ির ডিরেকশন আঁকা কাগজ।

ঠিক চারটেয় পৌঁছেতে হবে, ওই সময়টাই লেখা ছিল চিঠিতে। ধীরেন্দ্রনাথ বলছিলেন, “সাহেবেরা আর জাপানিরা আমগ মতন না। তারা ঘড়ির লগে চলে—খুবই নিয়মানুবর্তী। না হইলে ওইসব জাত এত দূর উটতে পারত না।”

(ক্রমশঃ)

 

 

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন