গ্রন্থালোচনা
শিবশঙ্কর পালের ‘শঙ্খ ঘোষ : মননে সন্ধানে’
প্রয়াত হয়েছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। রেখে গেছেন তাঁর কবিতার সম্ভার। সেসব কবিতা শুধু সময়ের শব্দ নয়, অধিক জীবনের ছবি। শঙ্খ ঘোষ কবিতায় নানা কারুকাজ রেখে গেছেন। কিন্তু সেসব নিয়ে এ-যাবৎ তেমন কোনও পূর্ণাঙ্গ বই রচিত হয়নি। যেটি করেছেন শিবশঙ্কর পাল তাঁর ‘শঙ্খ ঘোষ : মননে সন্ধানে’ বইয়ে। প্রকাশক - বইওয়ালা প্রকাশন। প্রকাশকাল - ২০২৫ সালের জানুয়ারি। বইটির ভূমিকা অংশে লেখকের জবানী— ‘যুগচেতনার প্রতিভূ কবি শঙ্খ ঘোষ। তিনি জীবনবাদী, পথচারী। কালের শীর্ষে তাঁর অবস্থান। জীবন অন্বেষার যে ব্রত তিনি গ্রহণ করেছিলেন, সেই ব্রতকথায় তাঁর কবিতা। যার মর্মে মর্মে নিহিত আছে তাঁর আক্ষেপ-বেদনা, যার শব্দকণায় আছে জীবনের গান।’ শিবশঙ্কর পালের এই জবানী বলে দেয় কবিকে কত নিবিড়ভাবে তিনি দেখতে চেয়েছেন। কত বিশ্লেষণী নজরে তুলে এনেছেন কবিতার নানা দিক।
মোট বারোটি প্রবন্ধের সমষ্টি এই বই। কলেবর ক্ষুদ্র। কিন্তু যার মর্মার্থ গভীরে নিহিত। ‘শঙ্খ : ঘোষ-অঘোষ’ নামক প্রবন্ধে ‘শঙ্খ’ শব্দের ব্যঞ্জনার মধ্যে দিয়ে কবিতার দেহ মিলিয়ে দেখেছেন লেখক। শঙ্খ-শব্দ কখনও শান্তির সুর। কখনও যুদ্ধ শেষে আক্ষেপ-হতাশা নিয়ে ক্লান্তির গান যেন। কখনও প্রতিবাদের হাতিয়ার। শঙ্খ ঘোষের কাব্যে শব্দের যে ঘোষ-নিনাদ, যে প্রতিবাদ বা চুপকথা তাও দেখা হয়েছে এখানে। এভাবে তাঁর কাব্যময় ঘোরাফেরা করে লেখক লিখছেন— “শঙ্খ ঘোষের পূর্বাপর কাব্যে কিছু চুপকথা আছে তেমনি আছে রণতুর্য টঙ্কার। যে শব্দকণা ছুটন্ত, বেগবতী। শোণিতে শোণিতে যার শব্দকম্পন ধাবিত। সমাজ থেকে জীবন, ভিতর থেকে বাহির, স্বকাল থেকে মহাকালে যে শব্দে ঘোষিত হয় কম্বুনাদ”। ‘জউঘর’ কবিতার বিশ্লেষণে কে গুরু কে শিষ্য আর তার সঙ্গে সমাজের বর্তমান চলমানতা, মহাভারতকে মিলিয়ে দেখা আছে। কবিতাটির ব্যপকতা কতদূর, এর নাটকীয়তা কতটা, ভিতরে মিশে থাকা অ-শান্তিবার্তা, ছদ্মস্তুতি, বিষমন্ত্র, কবিতার বিস্তৃতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রভৃতি নিয়ে কবিতাটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন শিবশঙ্কর পাল। যাঁরা শিবশঙ্কর পালের কবি ও কবিতা বিষয়ক অন্যান্য বইগুলি পড়েছেন তাঁরা জানেন লেখক সূক্ষ্ম বিষয়বস্তুকেও পিছনে ছেড়ে আসেন না, সর্বাঙ্গীন বিশ্লেষণে কবিতার নতুন নতুন দিক খুলে দেন। বইটির বলো তারে ‘শান্তি-শান্তি’ কবিতার আলোচনায় ভালোবাসার নানা ধরন উঠে এসেছে। এসেছে বিপরীতধর্মী বিষয়ের সহবস্থান, বাক্যগঠন শৈলীর সঙ্গে শান্তিকামনার ভবিষ্যতবাণী। কেন বাজনা শব্দটি ৯ বার ব্যবহৃত হয়েছে তারও গাণিতিক ও সাহিত্যিক ব্যাখ্যা আছে এখানে। ‘কবির মেয়েরা’ প্রবন্ধে এসেছে সমকালীন ঘটনার ছায়া এবং সেখানে কবির নারীভাবনা, নারীর প্রতি মর্মবেদনা। প্রবন্ধে যমুনাবতীর কথা ধরে লেখক বলছেন— “কবিতাটি যেন ওই পথ শব্দে আরও অতল হয়ে উঠল। যে মিছিলে যে পথে পা ফেলে যমুনাবতীর এই অবস্থা, সেই পথ কি আজও প্রাসঙ্গিক? প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে যুবতী মেয়েদের উপর এরকম বহু বহু ঘটনা আজও বহাল তবিয়তে চলছে”।
গ্রন্থটিতে কবির ছন্দখেলা, সাংবাদিকতা, কোমল অনুভূতি, কবিতার গতি-স্থিতি-গতি, আত্ম-জিজ্ঞাসা আছে। ‘অন্ধবিলাপ’ কবিতার বিশ্লেষণে কবিতার নানা স্তর ধরে ধরে অঙ্কের মতো হিসাব মিলিয়েছেন লেখক। ধৃতরাষ্ট্রকে দেখেছেন মেঘনাদবধের রাবণের মতো। ‘বাঁধনের ডোর’ প্রবন্ধে শঙ্খ ঘোষের কবিতাশৈলীর আলোচনাও পাঠককে ভাবিয়ে তোলে। শঙ্খ ঘোষকে নতুন করে চিনতে শেখায়। আবার ‘যাবার সময়ে বলেছিলেন’ কবিতাটির মধ্যে লেখক শঙ্খ ঘোষের চিন্তার ষোলটি দিক খুঁজে পেয়েছেন। সবমিলিয়ে বলা চলে শিবশঙ্কর পালের এই গবেষণাধর্মী বইয়ে শঙ্খ ঘোষের নানা অনালোচিত দিককে আমরা দেখতে পাই। যুগশঙ্খের কবিকে পুনরায় পড়তে উদ্বুদ্ধ হই।


0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন