কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা

 

প্রতিবেশী সাহিত্য

অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা

(ভূমিকা ও ভাষান্তর: গৌরাঙ্গ মোহান্ত)

 


কবি পরিচিতিঃ অ্যালেন গিন্সবার্গ (১৯২৬১৯৯৭) বিংশ শতাব্দীর অ্যামেরিকান কবিতার প্রভাবশালী কবি এবং বিট জেনারেশনের অন্যতম সারথি। তিনি কবিতাকে শুধু নান্দনিক শিল্পমাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেননি; বরং একে ব্যক্তিস্বাধীনতা, প্রতিবাদ, আত্মান্বেষণ ও মানবিক সত্য উন্মোচনের নন্দনকলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর কবিতায় প্রেম, উন্মাদনা, নৈঃসঙ্গ্য, যুদ্ধ, রাজনীতি, যৌনতা, আধ্যাত্মিকতা ও আধুনিক সভ্যতার সংকটএসব বিষয় সাবলীলতার সাথে উচ্চারিত হয়েছে।

১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হাউল (Howl) কাব্যগ্রন্থ তাঁর আন্তর্জাতিক প্রসিদ্ধি নিশ্চিত করে; মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এ কাব্যের প্রকাশনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ঘটনা হিসেবে মূল্যায়িত।

গিন্সবার্গের কবিতা বাংলা ভাষার কিছু পাঠকের কাছে নতুন মেজাজের শিল্পকর্ম বলে প্রতিভাত হতে পারে। তাঁর দীর্ঘ, প্রবহমান পঙ্ক্তি, কথোপকথনসদৃশ স্বরপ্রবাহ, জ্যাজ সংগীতের ছন্দ, হুইটম্যানীয় ব্যাপ্তি ও ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তির নির্বিশঙ্কতা বাংলা কাব্যঐতিহ্যের প্রচলিত গীতলতার অনুগামী নয়। তবে তাঁর কবিতার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, অন্যায়ের প্রতিবাদ, প্রেমের অনুসন্ধান, মানসিক যন্ত্রণার স্বীকৃতি ও জীবনের গভীর অর্থের সন্ধান বিষয়ক কিছু শাশ্বত মানবিক প্রশ্ন যা ভাষা ও সংস্কৃতির সীমা অতিক্রম করে সকল পাঠকের কাছেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

গিন্সবার্গের ভাষা অত্যন্ত প্রভাববিস্তারী। তাঁর ভাষায় যেমন বাইবেলীয় অনুরণন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অ্যামেরিকান কথ্যভাষা, রাজনৈতিক ইঙ্গিত, জনপ্রিয় সংস্কৃতির অনুষঙ্গ এবং আকস্মিক আবেগের বিস্ফোরণ। অনূদিত কবিতায় শব্দের আক্ষরিক অর্থের চেয়ে তাঁর স্বর, প্রাণশক্তি এবং আবেগের তীব্রতাকে যতদূর সম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কবিতা পাঠে পাঠক যেমন এক অস্থির কালখণ্ডের মুখোমুখি হবেন, তেমনি মানুষের স্বাধীন চেতনা, আত্মসংগ্রাম এবং অস্তিবাদী অনুসন্ধানেরও দ্রষ্টা হবেন।

 

ক্যালিফোর্নিয়ার একটি সুপারমার্কেট

আজ রাতে তোমার কথা মনে পড়ছে, ওয়াল্ট হুইটম্যান, মাথাব্যথা ও আত্মসচেতনতা নিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে আমি গাছতলার গলি পথ ধরে হাঁটলাম।

আমার ক্ষুধার্ত অবসাদে, চিত্রকল্পের খোঁজে, তোমার কবিতার তালিকা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি ঢুকে পড়লাম নিয়ন-আলোয় উজ্জ্বল ফলের সুপারমার্কেটে!

কী অপূর্ব সব পিচ ফল, আর কী অপরূপ আলো-ছায়ার সমারোহ! রাতে পুরো পরিবার নিয়ে লোকজন কেনাকাটা করছে! শেলফের মধ্যবর্তী পথে স্বামীদের ভিড়! অ্যাভোকাডোর মাঝে স্ত্রীরা, টমেটোর পাশে শিশুরা!—আর তুমি, গার্সিয়া লোরকা, তরমুজের পাশে নিচু হয়ে কী করছিলে?

আমি তোমাকে দেখেছি, ওয়াল্ট হুইটম্যানসন্তানহীন, নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধ পরিশ্রমী মানুষ, রেফ্রিজারেটরের মাংসগুলোর ভেতর হাতড়ে বেড়াচ্ছ আর দোকানের ছেলেদের দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছ।

আমি তোমাকে প্রশ্ন করতে শুনলাম : এই শূকরের মাংসের টুকরোগুলোকে কে ধ্বংস করেছে? কলার দাম কত? তুমি কি আমার দেবদূত?

ক্যানের উজ্জ্বল স্তূপগুলোর ফাঁক দিয়ে আমি তোমাকে অনুসরণ করে ঘুরে বেড়ালাম, এবং আমার কল্পনায় দোকানের গোয়েন্দাটি যেন আমাকে তাড়া করে ফিরছিল।

আমরা আর্টিচোকের স্বাদ নিয়ে, ফ্রিজে রাখা প্রত্যেকটি হিমায়িত সুস্বাদু খাবারের ধারণা নিয়ে একসাথে নিঃসঙ্গ খেয়ালের বশে খোলা বারান্দাগুলোর দিকে হেঁটে গেলাম এবং ক্যাশিয়ারের সামনের দিক দিয়ে কখনও যাওয়া হলো না।

আমরা কোথায় যাচ্ছি, ওয়াল্ট হুইটম্যান? এক ঘণ্টার মধ্যেই দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আজ রাতে তোমার দাড়ি কোন দিকের ইশারা দেয়?

(আমি তোমার বইটি স্পর্শ করি, এবং সুপারমার্কেটে আমাদের অডিসির স্বপ্ন দেখি, এবং নিজেকে বেখাপ্পা মনে হয়।)

আমরা কি নির্জন রাস্তা ধরে সারারাত হেঁটে বেড়াব? গাছেরা অন্ধকারের ওপর আরও অন্ধকার চাপিয়ে দিচ্ছে, বাড়িগুলোর আলো নিভে গেছে, আমরা দুজনেই আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ব।

নীল রঙের গাড়িগুলো পেরিয়ে, ভালোবাসার সেই হারিয়ে যাওয়া আমেরিকার স্বপ্ন দেখতে দেখতে, আমরা কি হেঁটে যাব আমাদের নীরব কুটিরের দিকে?

পলিতকেশ প্রিয় পিতা, সাহস জাগানিয়া নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ শিক্ষক, তোমার কেমন ছিল সেই আমেরিকা —যখন খেয়াঘাটের মাঝি ক্যারন তার নৌকা চালানো বন্ধ করে দিল, আর তুমি নেমে পড়লে এক ধোঁয়াটে তীরে, দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলে লিথির কালো জলে সেই নৌকার অন্তর্ধান?

(বার্কলে, ১৯৫৫)

 

অপূর্ব করুণার জন্য নতুন স্তবক

স্বপ্নে দেখলাম, আমি বাস করেছি এক গৃহহীন স্থানে,

যেখানে আমি একা ,হারিয়ে গেছি।

মানুষজন আমার ভেতর দিয়ে শূন্যতার দিকে তাকিয়েছে,

আর পাথরচোখে পাশ কাটিয়ে গেছে চলে।

 

ওহে গৃহহীন হাত, কত শত রাজপথে তুমি প্রসারিত

আমার যৎসামান্য খুচরো পয়সাটুকু নাও,

একটি বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি বা কথা

ভয়হীন দানের মতোই মধুর।

 

দুর্দশাগ্রস্ত মেহনতি মানুষ ক্রন্দন শোনে,

আর একটা আনাও খরচ করতে পারে না,

কিংবা কোনো গৃহহীনের চোখের দিকে পারে না তাকাতে,

একটু সময় দিতেও তারা শঙ্কিত।

 

তাই ধনী বা গরীব হও, কথা বলার স্বর্ণমূল্য না-ই বা থাকল,

তোমার মুখে একটু হাসি থাকুক;

যেখানে তুমি হাঁটবে, সেখানকার গৃহহীন মানুষেরা

যেন পায় অপূর্ব করুণার স্পর্শ।

 

আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি বাস করেছি এক গৃহহীন স্থানে,

যেখানে আমি একা, হারিয়ে গেছি।

মানুষজন আমার ভেতর দিয়ে শূন্যতায় দিকে তাকিয়েছে।

আর পাথরচোখে পাশ কাটিয়ে গেছে চলে।

(২ এপ্রিল, ১৯৯৪)

 

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন