কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

মধুবন চক্রবর্তী

 

 

উষ্ণতার জন্য বাঁচা না কি বাঁচার জন্য উষ্ণতা

(‘রুক্ষ এক পৃথিবীর গল্প বলে নীহারিকা)  

 


কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার সময় কেমন যেন লাগে। অনেকক্ষণ ‘নৈঃশব্দ’ যদি আপনাকে ঘিরে রাখে, সব ধাঁধা লেগে যায়। আবার প্রচুর কোলাহল একসময় অস্থির এক মুহূর্তের দিকে ঠেলে দেয়। সেখান থেকে  নির্জনতায় পাড়ি দিতে চায় মন। 'নীরবতা' একটি ভাষার নাম। স্তব্ধতা যেখানে কথা বলে। কখনোও একাকী, কখনোও একে অপরের সঙ্গে। নীরবতা না বলা প্রেমের গল্প হতে পারে। নীরবতা সম্পর্কের শীতলতার কথাও বলতে পারে। কখনোও বা কোনোও ভয়ংকর অস্বস্তি। পৃথিবীতে বহুমাত্রিক ভাষার ওপরে হল নীরবতার ভাষা। যা কখনো প্রতিবাদের, কখনো অপেক্ষার, কখনও সম্মতিসূচক।

‘নীহারিকা’ হল দীপার জীবন-যাপনের একাকিত্ব, বহু থেকে একা হয়ে যাওয়ার এক নীরব গল্প, অজানা ভয় থেকে অমোঘ আকর্ষণের প্রতি যখন ধাবিত হয় মন_তখনও ডানা মেলে উড়ে যেতে যায় অপার সুখের কাছে। কিন্তু সুখে থাকার হাতছানি কখনোও অসুখে পরিণত হয়। মেঘের পরে মেঘ জমে যেভাবে আঁধার করে আসে। এভাবেই সুখের ভাবনা ভাবতে ভাবতে কখন যে অসুখ নেমে আসে অবসরে আমরা টের পাই না। যেভাবে বিচ্ছিন্ন হতে হতে একসময় অন্তরে রাক্ষস হয়ে উঠেছিল। আমাদের সকলের মধ্যেই সে রাক্ষস লুকিয়ে আছে, দীপাও সেই অজানা ভয়কে স্বীকার করে নিয়ে বলতে পারে আমি খারাপ হয়ে গেছি ছোটমামা। অদ্ভুত এক মনস্তাত্ত্বিক সত্যর মুখোমুখি নিয়েছে ফেলেন পরিচালক।

এই ছবিতে' নৈঃশব্দ' কখনও কখনও শব্দের থেকেও বেশি জোরালো হয়েছে। বাক্যের চেয়েও গভীর অর্থ বহন করেছে। সম্পর্কের মধ্যে গভীরতম যে সংযোগ যা কথার মাধ্যমে সম্ভব হয় না, সেখানে এসেছে সঙ্গীত। আবহ সৃষ্টি করতে বীণার মন্দ্রালাপ, গভীরতার তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে দেয় আমাদের। সম্পর্কের গভীরতা মাপার মাধ্যম হতে পারে সেই নীরবতার 'স্তব্ধতা'। কিছু সম্পর্কে গভীরতা মাপার যন্ত্র আবিষ্কার করলে হয়তো বোঝা যেত, পরিচালক ইন্দ্রশিস আচার্য চমৎকারভাবে কিভাবে এঁকেছেন সম্পর্কের এক গভীর ছায়াপথ।

একদিন AI হয়ত সেই পথ দেখাতেই পারে।

তবে পরিচালক এই ছবিতে তৈরি করেছেন এক নতুন ভাষা। যার নাম নীহারিকা। পাহাড়ের মতো নিবিড় আঁধারে সন্ধ্যা নামে কখনোও পাহাড়ি রাস্তায়, যেখানে শীতের প্রিলিউড বেজে ওঠে। দীপার দিন যাপনের সঙ্গে কখনোও ঝর্ণার শব্দ, বৃষ্টির সিম্ফনি, পাখির আওয়াজ প্রকৃতির অপার্থিব রূপ, শব্দ, গন্ধ তাকে উদ্বেলিত করে তোলে। প্রকৃতিকে যেরকম কোন সীমায় আবদ্ধ করা যায় না, সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাই। সীমারেখা অতিক্রম করে সম্পর্ক এগোতে থাকে। ‘নীহারিকা’ ছবিতেও সম্পর্কের শেষ প্রান্ত থেকে শুরু হয় সম্পর্কের আর এক অভিযান। পাশাপাশি ছবিতে সম্পর্কের বহুমুখী দিক উঠে আসে। পরিচালক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সম্পর্ক ছাড়া কোন গল্প হয় না। 'জুরাসিক পার্কে'ও সম্পর্কের গল্প আছে। সম্পর্কের যে সীমারেখা থেকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, সেই জায়গা থেকে পরিচালকের যে কোনও গল্প শুরু হয়। নীহারিকা থেকে শুরু করে পিউপা, গুডবাই মাউন্টেন, সব ছবিতেই সম্পর্কের নিরাপদ কোন সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়নি।। ইন্দ্রাশিষ আচার্য বরাবরই স্বতন্ত্রভাবে সম্পর্কের কথা বলতে ভালবাসেন তাঁর ছবিতে।

নীহারিকা মহাকাশে ধুলো ও গ্যাসের বিশাল মেঘকে বোঝানো হয়, যা দেখতে অনেকটা কুয়াশার মতো। ‘নীহারিকা' শব্দটি ল্যাটিন ‘কুয়াশা’ থেকে এসেছে, যা মহাকাশের অন্ধকার, ঠান্ডা এবং বিশাল অঞ্চল জুড়ে  থাকে। যেখানে গ্যাস ধূলিকণা জমা হয়ে নতুন নক্ষত্র তৈরি করে। সম্পর্কের অন্তরেও তৈরি হয় নীহারিকা। কখনও কাছের মানুষ হয়ে যায় দূরের। কুহেলিকা যেন, কখনওবা রক্তের সম্পর্কের মধ্যেও ঢুকে যায় কামনার আগুন। শুধু সম্পর্কের সীমারেখার কারণে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েও হতে পারে না আত্মিক। শহরের কোলাহল পারিবারিক অনিয়ন্ত্রিত প্রতিবেশ, কাছের মানুষের কাছে ভালোবাসার প্রত্যাশী দীপা বিকৃত ব্যবহার পেতে পেতে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে পরিবার থেকে। বাবার পাশবিক রূপ, মায়ের অসহায়তা, কাকার লোলুপ হাতছানি, বিশাল বাড়িটার চারিদিকে কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার তৈরি করে। ক্রমশ ভীত সংশয়াতীত মন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যায় দীপাকে। একা হতে হতে খুঁজে পায় আরেক একাকীত্বকে। দাদুর চিকিৎসা করতে আসা নার্স হয়ে ওঠে তার একমাত্র অন্তরঙ্গ বন্ধু। সেই বন্ধুত্ব থেকে আর এক বন্ধুত্বের দিকে পাড়ি দেয় দীপা। এক রুক্ষ প্রান্তরে, সেখানে তৈরি হয় আর এক অজানা ভয়, নীরব ভালবাসা প্রকাশ করতে না পেরে অস্থির হয়ে ওঠে। জীবনের রুক্ষতা কঠোরতা বাস্তবকে মেনে নেওয়া সেইসঙ্গে হৃদয় ঘনীভূত হয় প্রেমের প্লাবনে-- দীপার চরিত্রকে দিকশূন্যপুরের দিকে নিয়ে চলে।

বুদ্ধদেব গুহর কালজয়ী উপন্যাস ‘একটু উষ্ণতার জন্য' পড়েছিলাম একেবারে স্কুলবেলায়। বোঝা না বোঝার আড়ালে যে বোঝা থাকে, যেখানে লুকিয়ে থাকে কিছু গন্ধ। সেই স্মৃতিগন্ধ আমাদের টানে আজীবন। লেখক আর ছুটির সীমা পেরিয়ে সেই অনন্ত প্রেমের আখর ও বর্ণনা অনেকদিন পর 'নীহারিকা' ফিরিয়ে দিল আমাকে।

জানলা খুলেই অঝোর বৃষ্টিতে ঝাপসা দৃষ্টি যতদূর যায় তার থেকেও বেশি শব্দ যেন কড়া নেড়েছিল প্রথম দৃশ্যে। দীপার সঙ্গে এখন আছে শুধু শব্দ ধ্বনি গন্ধ। প্রকৃতি কথা বলে, আর একার সঙ্গে কথা প্রতিদিন। এরপর ফিরে অতীতে ফিরে যাই আমরা। রুক্ষ প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের রুক্ষতা কঠোরতা বাস্তবতাকে অপূর্ব সুন্দর মেলবন্ধনে বৈচিত্র্যময় একাকীত্বের মনস্তাত্ত্বিক জটিল দিকগুলো নির্মাণ করেছেন পরিচালক প্রতি দৃশ্যের মধ্যে।

সঙ্গীত ও বিশেষ করে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার শব্দ ধ্বনির অর্কেস্ট্রা তাঁর ছবিতে যেন মুখ্য চরিত্র হয়ে ওঠে। চরিত্রগুলো যেন প্রতিটি দৃশ্যে সাঙ্গীতিক যাত্রায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। আলো ছায়া খেলা করে জীবনের উপত্যকায়। সম্পর্কের গভীরতা, একাকীত্ব, সেই আলোতে জেগে ওঠে। অন্ধকার মুছে আলোয় ফেরার কাহিনী নীহারিকা। নীহারিকা সম্পর্কের মহাকাশে বিচরণ করে। আমাদের জীবন বৃত্তাকারে ঘুরতে ঘুরতে কখন সেই ভ্যাকুয়াম স্পেসের মধ্যে আবর্তিত হবে আমরা জানি না।

মুখ্য চরিত্রে শিলাজিত মজুমদার, অনুরাধা মুখোপাধ্যায়, মল্লিকা মজুমদার অসাধারণ। সম্পাদক লুব্ধক চ্যাটার্জি অসামান্য কাজ করেছেন। সেইসঙ্গে সুরকার জয় সরকার সুর ও মূর্ছনায় নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন চমৎকার ভাবে। ২০২৩এ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি চিত্র পরিচালক ইন্দ্রশিষ আচার্যের ‘নীহারিকা ইন দা মিস্ট’

যেন কবিতার মত গল্প বলে। একটু উষ্ণতার জন্য, নাকি, বাঁচার জন্য উষ্ণতা? ‘নীহারিকা’ জুড়ে সেই কথা ঘুরে বেড়ায়।

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন