কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

অম্লান বোস

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

মিমির মিনি পুতুল

মেয়েটিকে দেখেই সোমেনের শরীরটা কেমন ছ‍্যাঁক ছ‍্যাঁক করে উঠেছিল, কোন কারণ ছাড়াই। একটা রঙীন ককটেল সামনে নিয়ে একাই বসে। হাল্কা মেজেন্টা ট‍্যাঙ্কটপের সাথে কালো চেলানা ফর্সা সুশ্রী চেহারায় মানানসই। মেদহীন পেটের খোলা অংশ, অশালীন দৃষ্টিকটু তো নয়ই বরং কমনীয়। মেকআপে আপত্তিকর কিছুই নেই, তবে চোখে গভীর আই শ‍্যাডোটা সোমেনের একটু বেমানান লেগেছে। আর দীর্ঘ পাতা স্বাভাবিক না আইল‍্যাশ সিরাম দিয়ে সৃষ্টি সেটা বোঝার উপায় নেই। একটু কৌতুহল হচ্ছে ওর গলার লম্বা হারটা দেখে, ছোট ছোট পুতুলের সারি - সবার হাতেই নানারকমের অস্ত্র! লম্বা গলা বেষ্টন করে নীচের চড়াই উৎরাই ভেঙ্গে খোলা নাভির কাছে শকুনি ধরনের একটা বড় লকেট দুলছে। দৃষ্টি মোবাইল ফোনে। অনেকেই কাছে গিয়ে কথা বলে আসছে, একটু তফাৎ রেখে। হয়তো সম্ভ্রম জনিত দূরত্ব।

মেয়েটির হাবভাবে বা আকার ইঙ্গিতে আপত্তিকর কিছুই নেই তবু প্রথম দৃষ্টিতেই বুকটা কেমন ধকধক করে উঠেছিল সোমেনের। সাধারণের থেকে আলাদা।

জার্ণালিস্টসুলভ কৌতুহল চাড়া দিয়ে উঠেছে সুগঠিত, সুপুরুষ সোমেনের। পায়ে পায়ে চলে এলো সে এক দুর্বোধ‍্য আকর্ষণে মিয়োমি ফরাসী ওয়াইন পিনোঁ নয়ের লম্বা গ্লাসটা টেবিলে রেখেই। মুখের সহজ ভাব দেখে মনে হল ও সোমেনের জন‍্যই যেন অপেক্ষা করছিল। প্রচলিত সৌজন‍্য বিনিময়ের মুহূর্তে কেমন মনে হল ওর গভীর চোখের বাদামী তারায় একটি রক্তলাল বিন্দু ঝলসে উঠেই মিলিয়ে গেল। মাদকীয় হাসি ফুটলো, হাত বাড়িয়ে সামনের উঁচু চেয়ার দেখিয়ে বললো - “বসুন”।

কব্জিতে ঐ পুতুলের সারি দিয়ে ঢিলে এক ব‍্যান্ড।

“আপনি তো রিপোর্টার, ক্রিকেটে দুর্নীতি নিয়ে আপনারা খুব হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন।”

“হ‍্যাঁ, কিছু মানুষ শোনেন আমাদের বক্তব‍্য। তা আপনি জানলেন কী করে?”

“ওই যে, আপনার সিজক‍্যাম সি-ফরটি ক‍্যামেরাটা।” মিষ্টি হাসি কুলকুল করে গড়িয়ে নামল। “অবশ‍্য ভুল তো আমার হতেই পারে!”

“না, না, ভুল আপনার একেবারেই হয়নি”।

আবার নির্বাক মুগ্ধতা তার চোখ এড়ায়নি।

“ইউ টিউবে আমার একটা ছোট্ট চ‍্যানেল আছে, তার মাধ‍্যমে সত‍্যানুসন্ধানের ফলাফল মানুষকে জানাবার চেষ্টা করি। আমি সোমেন শিকদার।”

হাতটা বাড়িয়ে দিল। নরম ঠান্ডা হাতের সারিবদ্ধ পুতুলগুলো যেন ঝাঁপিয়ে কব্জিতে ঘষা দিল। হাতে, সারা শরীরে, মুহূর্তের জন‍্য একটা জোরালো বিদ‍্যুৎপ্রবাহ ঝিম ঝিম করে উঠেই নিমেষে মিলিয়ে গেল। এখন ওর চোখের দৃষ্টি সরাসরি সোমেনের চোখে আটকে। দু তিন সেকেন্ড, শরীরে এক অব‍্যক্ত অপ্রাকৃতিক কাঁপন ধরিয়েছে চাউ্নিটা।

ওর ইশারায় বারটেন্ডার স্টেমওয়‍্যার গ্লাসে একটা রঙীন পানীয় আর পেস্তা কাজুবাদামের পাত্র নামিয়ে দিল। কেমন দুর্বল লাগছে, পেটানো ব‍্যায়াম করা শরীর, তাও সারা শরীরে কেন অবশ অবশ ভাব। ডান কনুইটা বারটেবিলে আছে।

অনবদ‍্য মুদ্রায় অনাবৃত বাহু তুলে সে বলল,  “নিন - শুরু করুন। চিয়ার্স!”

“আমি তো রেড ওয়াইনে আছি, এখন এই ককটেলটা…”

হাসিতে মিষ্টি ঝাঁঝটা একটু চড়া লাগলো সোমেনের। নখে ম‍্যাচ করা মেজেন্টা রঙের নেলপলিশ করা আঙ্গুল জড়িয়ে পানীয়ের গ্লাস নিজের চোখ বরাবর তুলে বলল, “আমি মিমি, মিমি লাহিড়ী। ককটেল নেন না কখনও? এমন সুন্দর চোখে পড়ার মতো একটা ফিগার -  আপনার ভয় কিসের!”

পৌরুষত্বে কুঠার পড়ল। সোমেন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “হ‍্যাঁ, নিই তো।”

“তো এখন নিন এটা - এ‍্যাগেভ্ ডাইকুরি, টেকিলার ওপর। ভেতরে গিয়ে সুপার ককটেল হয়ে যাবে ওয়াইনের সাথে।” চোখে সম্মোহিনী মন গলিয়ে দেওয়া হাসি। মিমির বাড়িয়ে দেওয়া গ্লাসের লম্বা ডাঁটি ধরতে গিয়ে সোমেনের আঙুলে আবার ২৪০০ ভোল্টের ঝটকা - ঐ একমুহূর্তের ভগ্নাংশ। একটা অপ্রাকৃত বরফের স্রোত সরসরিয়ে নেমে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে পায়ের নখ পর্যন্ত ইচ্ছা-অনিচ্ছা একাকার করে দিয়ে। অনেকটা সম্মোহিত অবস্থায় গ্লাসে দু তিনটে সিপ্ দিতে না দিতেই রায়ন, সেদিনের নৈশভোজের হোস্ট, কোথা থেকে দৌড়ে এসে হ‍্যাঁচকা টানে নামিয়ে সোমেনকে ঠেলে নিয়ে গেল পাশের এ‍্যন্টিরুমে। অত‍্যন্ত উদ্বিগ্ন। জিজ্ঞেস করল, “তোকে কে মিমির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল, ও ডাকলো না তুই নিজেই গেলি?”

“নারে, বেচারী একা বসেছিল তাই খারাপ লাগছিল। লেখার নতুন কোন সুতো পাই কিনা! অন‍্য কোন উদ্দেশ‍্য ছিল না। কেন - তুই এত ওয়রিড্ হচ্ছিস কেন?”

অন‍্যমনস্কভাবে বিড়বিড় করে নিজের মনেই বললো - “অনেকদিনের গ‍্যাপ হয়ে গেছে ওর, এখানে সবাই ওকে চেনে তো”।

সোমেনের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলাতেই বললো, “তোর শরীরে কি কোথাও ছুঁয়েছিল? কিছু অস্বাভাবিক অনুভূতি ফিল করেছিস কথা বলতে বলতে?”

সোমেনের ইতিবাচক উত্তর শুনে বিপন্ন মনে হল রায়ানকে। চেয়ারে পুরোপুরি শরীরটা ছেড়ে দিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল, “ইস্, তোকে আগেই সাবধান করা উচিত ছিল। যাক্ গে, রাত্তিরটা সাবধানে থাকিস সোমেন।”

হাল্কা নীল আলোর মায়াবী ছায়ায় শোবার ঘরে দেওয়াল ঘড়িটা এগিয়ে চলছে - টিক্ টক টিক্ টক। এয়ার কন্ডিশনারের একঘেয়ে গুরগুরানি। মনটা অগোছালো, তাই হয়তো পায়ের খুব আবছা আওয়াজটা গুলিয়ে ফেলেছিল সোমেন। অস্থিরতার মধ‍্যে কম্বলটা ডানপাশে হেলে মাটি ছুঁয়েছে। টেনে তোলার সময়েই দৃষ্টি চলে গেল দুধসাদা মার্বেলের মেজেতে।

ধড়ফড় করে উঠে কম্বল ছুঁড়ে ফেলল সোমেন, কিন্তু ততক্ষণে নিঃশব্দ মিছিলের অনেকটাই তার খাট ছেয়ে ফেলেছে - সেই পুতুলগুলো, হাতে রকমারি অস্ত্র, বিষাক্ত। সারা বিছানায় ওরা সারা গায়ে পিলপিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর যেখানে সেখানে হুল ফোটাচ্ছে ধারালো ক্ষুদে অস্ত্র দিয়ে। প্রতি মূহূর্তে বেড়ে চলেছে ওদের মারাত্মক আক্রমণ, শরীরের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বিরামহীন, একটানা। প্রত‍্যেকটা খোঁচাতে অসহ‍্য জ্বালা আর অপরিমিত রক্তক্ষরণ। পাগলের মত হাত পা চালাচ্ছে সোমেন, উঠে দাঁড়িয়েছে ঝেড়ে ফেলার পিষে ফেলার চেষ্টায়। পুতুলগুলোর নির্মম আক্রোশ থামানো যাচ্ছে না, সরানো যাচ্ছে না ওদের। কিছুক্ষণের মধ‍্যেই অচল হয়ে গেল ব‍্যায়াম করা শরীর, চোখদুটো ফুলে উঠেছে, অন্ধকার দেখছে সোমেন। মাথাটা সামনে ঝুঁকে পড়েছে বুকের ওপর। টলতে টলতে কোনমতে বিছানায় শরীরটা ছেড়ে দিল সে, পেটানো শরীরটা নেতিয়ে পড়লো রক্তাক্ত বিছানাতেই।

অস্পষ্ট ঝাপসা চোখ একেবারে বন্ধ হয়ে যাবার আগে সোমেনের চোখে ভেসে উঠলো সেই মূর্তিটার ভয়ঙ্কর অশুভ হাসি। আপাদমস্তক কালো সাটিন ঢাকা, অনাবৃত মুখ, দুচোখে জিঘাংসার সংকেত, হাতে বড় একটা কালোব‍্যাগ।

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন