![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
চুলের
তদন্ত চলছে
তাই হলো, যা আদৌ হবার কথা নয়। কাকুরাম কুরকুরির ঘুম ভাঙলো তিনগাছা চুল মুখে নিয়ে। কী করে হলো? গভীর চিন্তায় কাকুরামের সকালের হাগু আটকে গেলো। বেশরম চুল মুখ হাঁ করতেই কেমন জড়িয়ে দিলো মুখ। কোথায় ঘুম থেকে উঠে একটু রামগান ভাবতে ভাবতে তিন দাগ গোচোনা পান করে তারপর দিনের বাকি সব কর্মকাণ্ড। হাতমুখ ধোয়া, গোবর গায়ে ঘষে শুদ্ধ স্নানটান, তারপর একগ্লাস কাজুপেস্তাকিসমিসের বাটা সরবৎ। দশ মিনিট তেড়ে রামগান আজ তেগড়ে গিয়ে মাথায় লাট খাচ্ছে তিনগাছা চুল। চরম ষড়যন্ত্র। কেউ কি তাকে মুখে চুল ঠুসে মেরে দিতে চেয়েছিলো! ভাবতে গিয়ে হাত পা কাঁপতে লাগলো। সে নিজেই তো গোটা চারেক ম্যানেজার, গোটা দুয়েক বিশ্বস্ত চাকরবাকরকে হাত-পা-মুখ ঠুসে বেঁধে কুয়োয় ফেলে কুয়োর মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। তার শত্রুতা তবে কে করতে পারে? কাকুরাম জীবনে এই প্রথম ভয় পেতে শুরু করলো।
তার বাপের বাপ সেই ইংরেজ আমলে এ বঙ্গে এসেছিলো। সাথে এনেছিলো
বিপুল পরিমাণ চোরাই টাকা সোনা হীরে আর তিন ডজন মেয়েছেলে। তারপর তাদের একে একে ইংরেজদের
কাছে বেচে জমিজমা দোকান ব্যবসায় ভরিয়ে দিয়েছে বাংলার মাঠ। তাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে
বেশ্যা হয়েছে, কেউ আবার মাথায় নানারকম জিনিষপত্র নিয়ে ফিরিয়লা হয়ে ঝুপড়িটুপড়ি বানিয়ে
কোথায় স্বাধীনভাবে জীবন বানিয়েছে। কিন্তু এই খুনোখুনির ব্যাপারে ঠাকুর্দার আমল থেকেই
কুরকুরি পরিবার বিখ্যাত। অনেকে সেটা জানলেও ইংরেজদদের সঙ্গে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে ঘেয়ো
হবার কারণে কেউ বিশেষ ঘাটাতো না। মাঝেমাঝেই শোনা যেত কুরকুরি বাড়ির কোন বিশ্বস্ত দাসী
চুরি করে ধরা পড়ার ফলে তাকে নাকি হাত-পা বেঁধে গুম ঘরে ফেলে রেখেছে। ব্যাস। গল্প খতম।
আসলে গুম ঘর মানে সেই বিরাট ঢাকনা ফেলা গভীর ইঁদারা।
ইংরেজদের চাবুকের শখ ছিলো কিংবদন্তী। কাকুরামের বিরাট
বাগানবাড়িতে মেহফিল বসতো আর রাত বাড়তেই সেই ঠাকুদ্দার সাপ্লাই করা দেশোয়ালী মহিলাদের
কারও কারও ভীত সন্ত্রস্ত অনিচ্ছুক উল্লঙ্গ চামড়ায় কামড়ে বসতো চাবুকের অমানুষিক সপাং
সপাং ক্ষুধার্ত আঘাত। ইংরেজ সেপাই সুবোদের ক্ষুধা হয়ে উঠতো নেকড়ের মতো। যৌনতার এ পাশবিক
অত্যাচার যারা সহ্য করতে পারতো পরবর্তীতে তাদের ঠিকানা হতো বেশ্যালয়, যারা সহ্য করতে
না পেরে টেঁসে যেত, তারা যেত ইঁদারায়। কাকুরামের বাপ অবশ্য তার বাপের ধনসম্পদ পাকা
ব্যবসাদারের বুদ্ধিতে অনেক বাড়িয়েছে তার সাথেই সুদের ব্যবসায় সিদ্ধহস্ত। শুধু সুদের
ব্যবসা চালানোর জন্যেই কোম্পানী খুলে দাপিয়ে তার ব্যবসা প্রায় আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে
দিয়েছে।
এমন এক বাপের সুযোগ্য পুত্তুর কাকুরাম কুরকুরি। কাকুরামের
বাপ ছিলো ঘোড়ার মাঠের তুখোড় বাজীবাজ। তার স্ট্যাটাসই আলাদা ছিলো। হারুক জিতুক কিছুতেই
কিছু আসে যায় না, বাজীতে ঘোড়া ছোটানোতেই তার মস্তী। মাঠে যেতেই গোটা পাঁচেক মশলা মহিলা
তাকে ঘিরে থাকতো যাদের কাজই ছিলো উল্লাস আর কাকুরামের বাপের সঙ্গে গলা মিলিয়ে মাঝে
মাঝেই উৎসুক চিৎকার। বাপের সঙ্গে দুয়েকবার সেই রেসের মাঠে ঢুকে কাকুরাম বুঝেছিলো ঘরের
মায়েরা শুধু গয়না পড়ে সেজেগুজে বসে ঠাকুর চাকর সামলায়, কিন্তু বাপের ঘোড়া ছোটে এই রংদার
মহিলাদের সাথে পাঁচতারা হোটেলের ঘরে। সে এক মহা-উৎসব। যার স্বাদ থেকে বাপ তাকেও বঞ্চিত
করেনি। পেশাদারি মহিলাদের হাতে তাকে ট্রেনিঙ করিয়েছে। সেইসব মেয়েদেরই কেউ কেউ হোটেলের
অন্য কোন ঘরে কাকুরামকে পুরুষপাঠ শিখিয়েছে সহজ আয়াসে। চামড়া মাংসের উত্তপ্ত কড়াইয়ে
সিদ্ধ হতে হতে সে পরিণত হয়ে উঠেছে খুবই দ্রুত। পুরুষ মানুষ পয়সা কীভাবে করবে যদি মেয়েছেলের
স্বাদ না পায়-- বাপের এই জীবন দর্শন কাকুরামকে ক্রমেই পরিণত করেছে বিছানায় এবং ব্যবসার
টাটে। কাকুরাম বাপঠাকুদ্দার পরম্পরা শক্ত থাবায় টেনে নিয়ে চলেছে।
বাপ তাকে শিখিয়েছে ব্যবসায় পয়সা করতে গেলে অনেক ছল্লিবল্লি
ভুলভুলাইয়ায় প্রায়শই হাঁটতে হয়। যে পথে অন্ধকার, কাদা, রক্ত মাখামাখি। পাশাপাশি এটাও শিখিয়েছে সেইসব গোপন যোগাযোগ, মালের
আসা যাওয়ার খোঁজ সে ছাড়া আর তো কাউকে জানতেই হবে, কারণ সেই আর কাউকে লোকটিকে সামনে
রেখেই এসব অন্ধকারের কাজ করিয়ে নিতে হয়। সুতরাং সেই ‘'আর কেউ'’-কে বেশিদিন এ কাজে ব্যবহার
করলে যে কোনও সময় ব্যবসায় মহাবিপর্যয় আসতে পারে, তাই কিছুদিন পরপরই এরকম বিশ্বস্ত লোককে
‘নেই’ করে দিতে ইঁদারায় পাঠাতে হবে হাত-পা-বাঁধা। তারপর নতুন 'আর কেউ' খুঁজে নিতে হবে।
কাকুরাম বাপের কাছ থেকে এইসব মহান শিক্ষা পেয়েই তো আজ একজন কেউকেটা হয়ে এই রাজধানির
বুকে ধুলোর ঘূর্ণি নাচিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে বিরাট রাজ্যপাট।
এ হেন কাকুরামের মুখে তিন গাছা চুল। কি করে হলো! অবশ্যই
কোনো গভীর ষড়যন্ত্র। কারণ, গত রাত্রে কাকুরামের বিছানায় কোন মেয়েছেলে ছিলো না। গত রাত
ছিলো তার নির্ভেজাল উপোষী রাত কারণ গতরাত্রে তার গুরুদেব দেহ রেখেছিলো। ঠিক গতরাত্রে
নয় মানে গত তারিখে তার গুরুদেবের তিরোধান হয়েছিলো সুতরাং গোটা দিনরাত জুড়েই কাল ছিলো
ড্রাই-ডে। তথাপি এই চুল। এ চুলগুচ্ছ কি মেয়েদের নাকি ছেলেদের, মাথার নাকি গুপ্তপ্রদেশের-- ছিঃ ছিঃ সেটা তো জানা হয় নি! কাকুরাম তাই চুল খুঁজতে
ঝুলে পড়লো ঘরের আনাচেকানাচে। কোথায় গেলো সেই চুল! তার ডাকে জনা দশেক ঝি-চাকর চুল খুঁজতে
ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। কাকুরামের রাগী আদেশ-- চুল না পেলে পিঠের চামড়া তুলে নেবে। অনেক
খোঁজার পর হয়রান হয়ে অবশেষে একজন দাসী চুপিচুপি এসে বললো, মালিক, চুল আমি পেয়েছি। এই
যে চুল। সে খুশি হয়ে দাসীকে বললো, আজ রাতে তুই আমার সাথে শুবি। পিঠের চামড়া তোলার ভয়ে
কাজের মহিলা বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের চুল ছিঁড়ে পিঠ বাঁচাতে চেয়েছিলো, সে রাত্রে মালিকের
সঙ্গে শোবার কথা শুনে তার হাত পা কাঁপতে শুরু করলো। এদিকে কাকুরাম সেই চুল হাতে চলে
গেলো ঘরে। বড় ম্যাগনিফাইং গ্লাসে চোখ রেখে খুঁজতে লাগলো চুলের উৎস। সে নিশ্চিত হলো
এটা মেয়েছেলের চুল। কিন্তু কে সেই মাগী তার মুখে চুল ঠুসে তাকে মারতে চেয়েছিলো?
পাচ্ছে না, কিছুতেই তার হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না। সে সিয়াইডির
উচ্চতম কর্তাকে ফোন করে পুরো কেসটা জানালো। তিনি কাকুরামের ফোন পেয়ে দ্রুত চলে এলেন,
বললেন ফরেন্সিক করলেই ষড়যন্ত্রকারী ধরা পড়ে যাবে। ফরেন্সিক রিপোর্ট আসতে দেরী হলেও
কাকুরামের ভয় গেড়ে বসলো তার মাথায়। সে টাটে বসছে না, রাত্রে দাসীকে আসতে বললেও তাকে
ফিরিয়ে দিলো হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে। সিয়াইডির উচ্চতম কর্তা জানালো কেসটা অনেক জটিল,
বোধহয় সিবিয়াইকে ডাকতে হবে। কাকুরাম একই কথা বারবার বলছে, ষড়যন্ত্রকারীকে ধরতেই হবে।
সিয়াইডি পরামর্শ দিলো-- কোর্টে একটা কেস কোরে বিচারকের কাছ থেকে সিবিয়াই তদন্তের আদেশ
আনিয়ে নিতে হবে। এব্যাপারে আপনার কথা শুনবে এমন বিচারক থাকলে কাজ সহজ হয়ে যাবে।...
কাকুরাম ফোন তুলে এক পরিচিত বিচারককে কেসটা জানিয়ে সিবিয়াই তদন্তের আদেশ দেবার প্রয়োজন
জানালো। বিচারক জানালো আপনি যেমন চাইছেন তেমনই হবে। তাই হলো। কেস সিবিয়াই হাতে নিলো।
তদন্ত শুরু হলো। গত একমাস যে যে মেয়েছেলের সঙ্গে কাকুরাম শুয়েছে তাদের হেফাজতে নিয়ে
জিজ্ঞাসাবাদ চললো, টিভি ক্যামেরায় প্রচুর ছবি উঠলো, হৈহৈ করে সংবাদপাঠক-পাঠিকা কাকুরামের
তিনপুরুষের যে মহান কর্মকাণ্ড সব বিস্তারিত জানাতে থাকলো। দেশের জন্যে তাদের হাগা-খাওয়া
বন্ধ করা যে বিরাট অবদান, ছড়িয়ে পড়লো গাঁয়েগঞ্জে, শুধু সেই দাসী ভয়ে ভয়ে তার সব যৌনকেশ
চেঁছে ফেললো, কারণ যদি সিবিয়াই তাকে ধরে! কয়েকজন মহিলাকে বিচারকের সামনে দাঁড় করিয়ে
সিবিয়াই বললো, এরা বাইরে বেরোলেই সব নমুনাটমুনা নষ্ট করে ফেলবে, কারণ এরা খুব প্রভাবশালী,
তাই এদের জামিন দেয়া যাবে না। বিচারক তাদের জামিন বাতিল ক’রে জেলকাস্টডিতে আবার পাঠিয়ে
দিলেন। কেস চলতে থাকলো, সিবিয়াই তদন্ত চলতে থাকলো, কিন্তু কেসের কোনো কিনারাই হচ্ছে
না। কাকুরাম তিনগাছা চুলের ছবি হাতে খাওয়া ঘুম বরবাদ কোরে শুধু তাকে খুন করার ষড়যন্ত্রকারীকে
খুঁজতে লাগলো। একমাস, দুমাস, তিনমাস, পাঁচমাস, বছর পার হয়ে গেলো ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড়,
সম্পত্তি বেচা শুরু হলো, ব্যাঙ্কের গচ্ছিত টাকায় হাত পড়লো। কেস চলছে। সিবিয়াই দু-মাস
তিনমাস পর পর নতুন নতুন নমুণার গল্প আদালতে তোলে, টিভিতে সেই গল্প সারা দিনরাত গাঁক
গাঁক করে বাজতে থাকে। বাজার বস্তী প্যাসেঞ্জার ট্রেনের ডেইলি প্যাসেঞ্জার থেকে হকার
মুটে সবার মুখেই কাকুরামের চুল, চুলের রহস্যময় হাতছানি এবং সিবিয়াইয়ের আদালতে দেয়া
চুল বিষয়ক মুখরোচক গল্পের চাটনী মুখে মুখে ঘুরছে। কাকুরাম সিয়াইডি, সিবিয়াই এইসব হাবিজাবি
তদন্তের উপর হতাশ হয়ে অবশেষে পুরষ্কার ঘোষণা করে বসলো-- চুল মুখে ঠুসে গুপ্তহত্যার
ষড়যন্ত্রকারী যদি নিজে থেকেই এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে স্বীকারোক্তি দিয়ে বলে, সেই তাকে
হত্যা করতে চেয়েছিলো, কাকুরাম তাকে ৫০ লক্ষ টাকা এককালীন হাতে তুলে দেবে। তবে তাকে
প্রতিশ্রুতি দিতে হবে সে আর কাকুরামকে মারবার কোনরকম চেষ্টা করবে না। ব্যাস খেল খতম।
চুল চুলের জায়গায় থাকবে, কাকুরাম কাকুরামের জায়গায় নিরাপদ অবস্থানে চালিয়ে যাবে সব
ব্যবসায়িক ও ইত্যাদি কর্মকাণ্ড।
কিন্তু তদন্তে সুদক্ষ সিবিয়াই কিছুতেই অপরাধীকে ধরবার
এমন মওকা হাতছাড়া করতে রাজী নয়। বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেলাম, তদন্তের জাল গুটিয়ে তুলতে
গভীর দক্ষতায় প্রায় আড়াই বছর সরকারী খরচে সিবিয়াই, কাকুরামের বাড়ীর আশেপাশে ক্যাম্প
করে বসে আছে। পুরষ্কার কেউ নিতে এলেই তাকে ধরে আদালতে পেশ করবে...

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন