কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

শান্তিরঞ্জন চক্রবর্তী

 

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

স্বর্গ এসেছে নেমে

 


(২১)

কলেজ সংসদের ইলেকশনে একদিকে রুদ্রাক্ষ আর তার প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড়িয়েছে মৃদুলা গুপ্ত। মৃদুলা কোন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নয়, তবে তার পেছনে সমর্থন রয়েছে কলেজের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ছাত্রের। রুদ্রাক্ষর কার্যবিধি কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীদের সিংহ ভাগের মনে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে সেটাই মূলধন মৃদুলার। রুদ্রাক্ষ নানা প্রক্রিয়ায় মৃদুলাকে নিরুৎসাহ করার চেষ্টা করে চলেছে। মৃদুলার বিশেষ বান্ধবীদের মধ্যে সব থেকে এগিয়ে আছে মনস্বিনী। মনস্বিনী প্রিন্সিপ্যাল স্যারের বাড়ির মিটিং-এ যেমন কথা দিয়েছিল তেমনই কাজ করে চলেছে। সে নিজে এবং তার বন্ধু ও বান্ধবীরা মৃদুলাকে আর্থিক মানসিক সব রকমের সহযোগিতা দিয়ে চলেছে। মৃদুলা নিজেই খুব ভাল বক্তা, সাথে রয়েছে মনস্বিনীর মত এক অতি বুদ্ধিমতী বান্ধবী যে তার সমর্থনে নানা যুক্তির অবতারণা করে রুদ্রাক্ষর সমর্থকদের মধ্যে ভাঙন ধরাচ্ছে। মনস্বিনীর উপর পুরনো রাগটা চিড়বিড় করে ওঠে  কিন্তু কিছু করে উঠতে পারে না। জমিয়ে রাখছে সুযোগের অপেক্ষায়।  মৃদুলাকে উড়ো চিঠি পাঠিয়ে কিডন্যাপিং-এর ভয় দেখানো হচ্ছে। প্রিন্সিপ্যাল বা থানায় জানালে চরম পরিণতির জন্য তৈরী থাকতে বলা হচ্ছে। এত কিছুতেও পিছু হটছে না মৃদুলা। মরিয়া হয়ে উঠছে রুদ্রাক্ষ। একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে মৃদুলার পথ আটকে দাঁড়ালো রুদ্রাক্ষ দলবল নিয়ে। মৃদুলার সঙ্গে ছিল তার সমর্থক কয়েকজন বান্ধবী। রুদ্রাক্ষর কোমড়ে হাত রেখে ভিলেনের মত দাঁড়ানোর ভঙ্গী, চোখের দৃষ্টি, সব ধরা রইল মোবাইল ক্যামেরায়। মৃদুলার কণ্ঠে দৃঢ়তা। আদেশের সুরেই বলল রুদ্রাক্ষকে, ‘পথ ছেড়ে দাঁড়াও রুদ্রাক্ষদা’। কথা যদি বলতে হয় তবে কলেজে, রাস্তায় নয়’। ভাল কথার মানুষ নয় রুদ্রাক্ষ।  সে দলের বলে বলীয়ান, নিয়ম নীতির কথায় সে পাত্তা দেবে কেন। বেশ তেরিয়া জবাব দিল একটা মৃদুলার কথার, ‘আমি রুদ্রাক্ষ, রুদ্রাক্ষ যেখানে যার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে তাকে সেখানেই কথা বলতে হবে’। মৃদুলার যে বান্ধবী তার মোবাইল ক্যামেরায় ফটো তুলে নিয়েছিল সে বলল, ‘এরপর যদি  আমরা থানায় খবর দি তবে কিন্তু আমাদের দোষ দিতে পারবে না রুদ্রাক্ষদা’! রুদ্রাক্ষর আচরণে কোন পরিবর্তন ধরা পড়ল না। বরঞ্চ আরও বেপরোয়া ভাব প্রকাশ পেল কথায়। দুদুবার তুড়ি বাজিয়ে বলল, ‘আমাকে থানার ভয় দেখানো হচ্ছে, থানাকে আমি পকেটে পুরে রাখি’। রুদ্রাক্ষ কি করে জানবে প্রিন্সিপ্যাল স্যারের বাড়িতে কি বলে গেছেন থানার বড়বাবু।

মৃদুলার নির্দেশে খবর পাঠানো হল থানায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন কনস্টেবল এসে হাজির। তাদের মধ্যে একজন রুদ্রাক্ষর পরিচিত। দলনেতার সঙ্গে থানায় যাওয়া আসার সুবাদে এই পরিচয়। সে অনুরোধ করলো রুদ্রাক্ষকে, ঝামেলা না বাঁধিয়ে সরে যেতে। রুদ্রাক্ষও পাল্টা ফোন লাগালো নেতাকে। নেতার নির্দেশ এল, ‘এ সব উটকো ঝামেলা বাঁধিয়ে কেন সিচ্যুয়েশন খারাপ করছ, কিছু করার আগে আমাকে জানাবে। এখন ঘরে যাও। পরে একসময় দেখা করো আমার সাথে’। উপায় নেই। বসের আদেশ। সরে দাঁড়ালো রুদ্রাক্ষ। যাবার আগে বলে গেল, ‘নমিনেশন উইথ ড্র কর মৃদুলা, নয়ত’— কথাটা শেষ করার প্রয়োজন বোধ করল না এই ভেবে যে বুদ্ধিমতী মৃদুলা যা বোঝার বুঝে গেছে। মৃদুলা ধন্যবাদ জানালো কনস্টেবল দুজনকে, তারপর থানার বড় বাবুকে ফোন করে বলল, ‘স্যার, মাঝে মাঝেই ওরা উৎপাত করবে, আপনাকে কিন্তু দেখতে হবে স্যার’। বড়বাবু আশ্বাস দিলেন, তিনি  দেখবেন। মৃদুলা বন্ধুদের বলে দিল, এ ব্যাপারটা নিয়ে যেন আর কোন কথা না হয়। এবার ঘরের দিকে পা বাড়ালো ওরা।  মৃদুলা সোজা ঘরে যাবে না এখন। মনস্বিনীর কাছে সমস্ত রিপোর্ট দিয়ে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী কার্যপ্রণালী কি ধরনের হবে এসব কিছু বিস্তারিত ভাবে আলোচনার পর ওর ঘরে ফেরা।


(২২)

না, মৃদুলা উইথড্র করেনি নমিনেশন। রুদ্রাক্ষও আর সাহস পায়নি ওকে রাস্তায় আটকে কোনরকম বিরক্ত করার। হতে পারে দলনেতার নির্দেশ বা থানা থেকে থ্রেটনিং। রুদ্রাক্ষ ও মৃদুলা উভয় পক্ষেরই প্রচার তুঙ্গে, তবে ভেতরকার খবর হল মৃদুলার জয় সুনিশ্চিত। রুদ্রাক্ষ এখন খাঁচায় বন্দী নখদন্তহীন একটি বাঘের মত। নিস্ফল গর্জন ছাড়া আর কিছুই করার ক্ষমতা নেই এই কিছুদিন আগের স্বেচ্ছাচারী সংসদ সভাপতির। তার বিরুদ্ধে মনস্বিনীর যুক্তিগুলো গপ্‌ গপ্‌ করে গিলছে বিপক্ষের সমর্থকেরা।

যতই এগিয়ে আসছে নির্বাচনের দিন ততই মরিয়া হয়ে উঠছে রুদ্রাক্ষ। কেউ আন্দাজ করতে পারছে না শেষ পর্যন্ত কি করতে পারে সে মুষ্টিমেয় কয়েকজন সমর্থক নিয়ে। মরণকামড় যে একটা দেবে রুদ্রাক্ষ এতে সন্দেহ নেই কারও। মৃদুলা মনস্বিনী আর ওদের ঘিরে আছে যারা তাদের মধ্যে উত্তেজনা নেই কোন কিন্তু উৎকন্ঠা রয়েছে। ইলেকশনের দিনে এমন কিছু ঘটাবে না তো রুদ্রাক্ষ যাতে ইলেকশনটাই ভেস্তে যায়! অবশ্য তাতে ফল হবে না কোন। রি-ইলেকশনে তবে গো-হারা হারবে রুদ্রাক্ষ।

ওদিকে বৈশ্বানর দিনভর ব্যস্ততার মধ্যেও মেসেজ পাঠিয়ে খবর নিচ্ছে মনস্বিনীর পড়াশুনোর। সতর্ক করে দিচ্ছে, কলেজের ব্যাপারে যেন বেশী না জড়ায় নিজেকে। যতদিন না ফিরে আসছে বৈশ্বানর দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার হয়ে ততদিন যেন কোন বিপত্তির সম্মুখীন না হতে হয় তাকে। দূরে থাকলেও বড় নিকট যেন বৈশ্বানর। কতখানি সচেতন সে মনস্বিনীর ব্যাপারে! মনস্বিনী ভাবে, কোন নারীর জীবনে আকাঙ্ক্ষিত আদর্শ পুরুষ বৈশ্বানর। নারী বলতে কার কথা ভাবছে মনস্বিনী? সে নিজেই কি? পর মুহূর্তেই মনে হয়, কেন সে ভাবছে এমন কথা। বৈশ্বানরের অভিব্যক্তিতে কখনো তো প্রকাশ ঘটেনি প্রেমের কোন ভাষা! তবে কি অন্য কোন নারী আছে বৈশ্বানরের জীবনে? না, সে হতে পারে না, ভাবে মনস্বিনী, তাই যদি হত, মনস্বিনী জানবেনা তাকে তা আবার হয় নাকি! এই মগ্নতার মধ্যেই একটা ফোন আসে। স্ক্রীনে অজানা কারোও নম্বর। কেটে দেবে ভেবেও আবার কি মনে করে ধরল ফোনটা। একটা অপরিচিত কন্ঠস্বর। কে হতে পারে? মনস্বিনী জানতে চাইল কে কথা বলছে, জবাবে সিনেমা সিরিয়ালে দেখা ভিলেনের স্টাইলে কে বলল একজন, ‘নাম জানতে হবে না, যা বলছি মন দিয়ে শোন, মাত্র দুদিন বাকী, তোমার প্রিয় বান্ধবীকে সরে দাঁড়াতে বল, নয়তো.!’ কেটে দিল ফোনটা। এ তো নির্ভেজাল ধমকি। কোন চ্যালাকে দিয়ে রুদ্রাক্ষই করিয়েছে ফোনটা, সন্দেহ নেই। মনস্বিনী কি করবে এখন? পুলিশে খবর দেবে না মৃদুলার সাথে পরামর্শ করে যা করার করবে। প্রথমে মৃদুলাকেই ফোন করে জানালো সব কথা জানতে চাইলো মৃদুলার কি অভিমত। বুদ্ধি করে রেকর্ড করে রেখেছিল মনস্বিনী বক্তার কথাগুলো। দুজনেরই একই সিদ্ধান্ত, পুলিশে জানানো হবে ব্যাপারটা। পাঁচ কান না করে মনস্বিনী বড়বাবুকে জানিয়ে রাখলো ঘটনার কথা। বড়োবাবু আশ্বাস দিলেন  প্রিন্সিপ্যাল স্যারের সঙ্গে কথা বলে দরকার হলে পুলিশ মোতায়ন করা হবে ইলেকশনের দিন।

হলও তাই। কলেজের প্রবেশমুখে দুজন সান্ত্রীকে পাহারারত অবস্থায় দেখে বুঝতে বাকী রইল না কারোও এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে অপ্রীতিকর কোন ঘটনার আশঙ্কায়। ঘটনার ঘটক কে হতে পারে সে ব্যাপারে সকলে নিশ্চিত। মৃদুলা সমর্থক বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করছে ইলেকশনের গতিপ্রকৃতি। ওদিকে রুদ্রাক্ষ নিষ্ফল আস্ফালন করে চলেছে তার অনুগামীদের সঙ্গে নিয়ে। এক সময় অন্ত হল সমস্ত আশংকা উত্তেজনার। নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হল ইলেকশন পর্ব। রুদ্রাক্ষর চোখে জ্বলে উঠলো প্রতিশোধের আগুন আর একবার। ব্যালট বাক্স কি জবাব দেবে সেটা সকলেরই জানা কিন্তু রুদ্রাক্ষর পরবর্তী পদক্ষেপ কি ধারার হতে পারে সে নিয়ে একটা বিশাল প্রশ্ন ঝুলে রইলো সকলের মনে। এখানে প্রতিপক্ষ বিপরীত লিঙ্গের আর তার সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে মনস্বিনী ও তার  বন্ধুবর্গ। কোন পথে যে আঘাত আসবে সে কথা ভেবে কারো কারো মনে আতঙ্কের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।

(ক্রমশ)

 

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন