সুবর্ণরেখা: মিথের বিমিশ্রণের আড়ালে আত্মধবংসী ঋত্বিক (পর্ব ২)
ঊষর পাথুরে দেশে এসে চরিত্র-সীতা দেখে সেখানে আয়রন ফাউন্ড্রির পরিত্যক্ত এরোড্রোম ছাড়া আর কিছু নেই। মুখার্জি যে স্বপ্ন বুনেছিল সীতার মনে তার কিছুমাত্র নেই ওই আলো না ঢোকা পুরোনো ফ্যাক্টরি আবাসনে। যমরাজ পুণ্য-আত্মাকে স্বর্গ উপহার দিতে পারতেন। ঈশ্বর চক্রবর্তী স্বর্গের স্বপ্নটুকুও দেখাতে পারেন না। তিনি শুধু বিদ্রোহী ভগিনীর মরণ কামনা করতে পারেন। আজকের শিল্পায়িত নগর সভ্যতার ব্যর্থ যমরাজ তিনি। তিনি ধর্মচ্যুত। সুবর্ণরেখা-সোনার রেখা তাঁর অন্তরাত্মার গোল্ডরাশের সুপ্তবাসনার ব্যক্ত রূপক- আলেয়া মাত্র। তাঁর ভগিনী সীতার কাছে সুবর্ণরেখা মারীচ-মুখার্জি নির্মিত মরীচিকা মাত্র। সেখানে আয়রন ফাউন্ড্রির ম্যানেজারদের দুহিতা, ভগিনীরা ক্রমান্বয়ে কূলত্যাগিনী হয়। আর, ফলস্বরূপ, ম্যানেজাররা উন্মাদ-হতাশাগ্রস্ত হয়ে যায়। এই পতন যেন আইকারাসের পতন। মোমের ডানায় ভর করে যে সূর্যের উচ্চতা স্পর্শ করতে চেয়েছিল।
উচ্চাকাঙ্ক্ষার উড়ান আর ভয়াল পতনের প্রতীক হয়ে পড়ে থাকে ভাঙা বিমানটি। এরোড্রোমটিকে ভেঙে মাটিতে গভীর গর্ত সৃষ্টি করে যেন সীতার পাতাল প্রবেশ কালে বিভাজিত বসুধা- সেটি পড়ে আছে। এটি যুদ্ধ-ধ্বংসের কথা যেমন স্মরণ করায় তেমনই স্মরণ করায় পুষ্পক বিমানের কথা। রামায়ণে উল্লিখিত পুষ্পক বিমান ছিল যক্ষপতি কুবেরের অধিকারে। রক্ষপতি রাবণ তাঁকে পরাস্ত করে এটি লাভ করে। রামচন্দ্র রাবণকে বধ করে পুষ্পক অধিকার করেন। সীতাকে নিয়ে তিনি পুষ্পকে সওয়ার হয়ে ভারত মহাসাগর পার হন। পুষ্পককে কেন্দ্র করে জড়িয়ে থাকে অনেক পরাজয়, রাজ্য হারানো, মৃত্যু এবং বিচ্ছেদের কাহিনি। রাম তো সীতাকে পেয়েও হারিয়েছিলেন। পরিত্যক্ত এরোড্রোমে বালক অভিরামকে দেখি উড়োজাহাজের ভঙ্গিতে ছুটে বেড়াতে- তার কল্পনার উড়ান দাঁড়িয়ে দেখে বালিকা সীতা- পশ্চাৎপটে পড়ে থাকে ধ্বস্ত যুদ্ধ বিমান আর সাহেবদের ভাঙা প্রমোদগৃহ- ক্লাবঘর। অভিরাম বড়ো হয়ে মেধাবী ছাত্র হয়ে ওঠে। ঈশ্বর চক্রবর্তী তাঁকে জার্মানি পাঠিয়ে ইঞ্জিনিয়ার করতে চেয়েছিলেন। তারও তো কথা ছিল আধুনিক পুষ্পকে সওয়ার হয়ে সমুদ্র পারের দেশ জার্মানিতে যাবার। কিন্তু অনেক আগেই ঋত্বিক প্রতীকীভাবে দেখিয়ে দিয়েছেন- ওই পরিত্যক্ত যুদ্ধ বিমানের প্রেক্ষাপটে অভিরামের কল্পনার উড়ান দেখিয়ে তা সম্ভব হবে না। দর্শককে ঋত্বিক মহাকাব্যিক নাট্যভঙ্গিমায় সচেতন করতে থাকেন এই আশার উড়ানের বিপরীতে হতাশাময় পতনের নিষ্ঠুরতায়। অভিরাম লেখক হতে চেয়েছিল। হতাশাময় বাস্তবকে সে ফুটিয়ে তুলত তার লেখায়। কিন্তু ব্যবসা বুদ্ধি সম্পন্ন প্রকাশকের দল জানে যে বইয়ের বাজারে কোনো পাঠক হতাশা কিনবে না। ইঞ্জিনিয়ার কিংবা অধ্যাপক কিম্বা লেখক কিছুই হওয়া হল না অভিরামের। এমনকি ভালো বাসচালকও হওয়া হল না। দুর্ঘটনায় তার অকালমৃত্যু হল। অভিরামের এই পরিণতির আড়ালে ঋত্বিক লুকিয়ে রাখেন আরেক মহাকাব্যিক অন্যায়- অনৈতিক পরাজয়ের পুরাণকথা। শম্বুকের কাহিনি। রামায়ণের প্রক্ষেপিত অংশে পাওয়া যায় অন্ত্যজ জাতির এই উদীয়মান বেদজ্ঞ পণ্ডিতের কথা। উচ্চ জাতির বিদ্যা-কৃষ্টিকে আয়ত্ত করার অপরাধে ক্ষত্রিয় রাম যাঁকে বধ করেন।
ব্রাহ্মণ ঈশ্বর চক্রবর্তী যখন জানতে পারলেন যে তাঁর পালিত অভিরাম আসলে অন্ত্যজ বাগদী বউয়ের পুত্র তিনি একপ্রকার তাকে তাড়িয়েই দিলেন। অন্ত্যজ পুরুষের উচ্চবংশীয় নারীকে বিবাহ করাও পাপ এই জাতিভেদের ভারতবর্ষে। অথচ অভিরাম ও সীতা দুজনেই পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু। ছবির শুরুতে অভিরামের মা- গীতা দে অভিনীত চরিত্র- বাগদী বউ আশ্রয় চায় উদ্বাস্তু পল্লীতে। ঋত্বিক দেখান ভিটে হারা সর্বস্ব হারার মধ্যেও কত বিভেদ- জেলায় জেলায় ভেদ, উচ্চ জাত-নিম্ন জাত ভেদ। আর ধর্মগত সম্প্রদায়গত ভেদ তো আছেই। যার জন্য দেশটাই ভাগ হয়ে গেল।
দুর্দান্ত সাফল্য নিশ্চিত যার ভবিষ্যতে সেই অভিরাম যেন জীবন নিয়ে পাশা খেলতে বসেছিল। লেখক হওয়ার উদ্দাম নেশা তাকে পাশার-ব্যাসনের মতোই তাকে জড়িয়ে ধরেছিল। মহাভারতে ব্যাসনামত্ত যুধিষ্ঠির তাঁর স্ত্রী দ্রৌপদীকেও পণ রাখতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু অভিরাম অতদূর নামেনি। তার স্ত্রী সীতা যখন নেশা আসরে গান শুনিয়ে কিছু রোজগার করার কথা বলে তখন অভিরামই তাকে প্রতিহত করে। নিজের স্ত্রী অন্যের দাসত্ব করবে এটা সে বেঁচে থাকতে হতে দেয়নি। এখানে তার ভূমিকা অনেকটা নিষাদরাজ নলের মতো। ব্যাসনাসক্ত হয়েও তিনি তাঁর স্ত্রী দময়ন্তীকে পণ রাখেননি। যেভাবে সর্বগুণান্বিত হয়েও সর্বস্ব হারিয়ে নলরাজকে একদিন অন্যের দাসত্ব করতে হয়েছে, করতে হয়েছে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ, সেভাবেই মেধাবী ছাত্র অভিরামও করেছে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ। দময়ন্তীর মতোই সীতা তার পাশে থেকেছে। অশ্বহৃদয় প্রাজ্ঞ মহারথী নলরাজ রথ চালনার পারদর্শিতায় ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর হৃতসর্বস্ব। কিন্তু অভিরাম প্রথম বার বাস চালাতে গিয়েই দুর্ঘটনার বলি হল। ঋত্বিকের নল মহাভারতের বিপরীতে-এক পরাজিত নায়ক। আধুনিক ভারত না পারে নলকে বাঁচাতে, না পারে দময়ন্তীর মর্যাদা রক্ষা করতে। পৌরাণিক নল ছিলেন শুদ্ধাচারী রাজা। শুধু একদিন আলস্যবশত শৌচাচারী না হয়ে তিনি সন্ধ্যা-আহ্নিক করেন। এই সুযোগে কালদেব কলি তাঁকে গ্রাস করে। তার প্রকোপেই ব্যাসনাসক্ত হয়ে নল সর্বস্ব হারান। অশৌচ অবস্থায় আহ্নিক, শ্রাদ্ধ, বিবাহ, যজ্ঞ সনাতন ধর্মে নিষিদ্ধ- মহাপাপ। অভিরাম মৃত-অশৌচ পালনের সময় সীতাকে নয়ে পলায়ন করে বা একপ্রকার দার সরিগ্রহ করে। সেই বিবাহ চূড়ান্ত পরিণতিতে শেষ হয়।
সনাতন ধর্মে এই রূপ স্যাক্রিলেজ করলে বা নিষিদ্ধ আচার করলে সেই মহাপাতকের চণ্ডালত্ব প্রাপ্তি হত। সে জাতিচ্যুত, সমাজচ্যুত হয়ে মৃতদেহ সৎকারের মতো অন্ত্যজ কর্ম করত। ধর্ম-সমাজ তাকে এই রূপ কঠিন শাস্তি দিত। পৌরাণিক রাজা, রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্রও চণ্ডালত্ব প্রাপ্তির পর কাশীর শ্মশানে শব-সৎকারের কাজে নিযুক্ত হন শ্মশানপতি মহাচণ্ডালের অধীনে। কাহিনির অন্তিমে দেখা যায় সেই মহাচণ্ডাল ছিলেন ছদ্মবেশধারী যমরাজ। যমরাজের আশীর্বাদে ক্ষত্রিয়ত্ব ফিরে পান হরিশ্চন্দ্র। কিন্তু ঋত্বিক নির্মিত আধুনিক যমরাজ- ঈশ্বর চক্রবর্তী পারেননি কন্যাসমা ভগিনী সীতার প্রণয়ী অভিরামকে উচ্চ জাতি বর্গে তুলে আনতে। অভিরামের প্রতি ঈশ্বরের মমতা মুহূর্তে ক্রোধ ও ঘৃণায় পরিবর্তিত হয় যখন তিনি জানতে পারেন যে, সে দলিত জাতি বাগদী বউয়ের ছেলে। প্রাচীন ভারত- পুরাণ-মহাকাব্য-মঙ্গলকাব্য- যার প্রমাণ ইতি-হ-আস্ সে পারত অন্ত্যজকে উচ্চবর্গে, উচ্চ বর্ণে তুলে আনতে। বেশ্যা পুত্র বশিষ্ঠ ব্রহ্মর্ষি হন; বেশ্যা জবালা পুত্র সত্যকাম হন ব্রহ্মজ্ঞানী জবালা গোত্রীয় ব্রাহ্মণ; হরিশ্চন্দ্র, বিশ্বামিত্র প্রমুখ জাতিচ্যুত হয়েও, চণ্ডালত্ব প্রাপ্তির পরেও হয়ে ওঠেন রাজর্ষি; নলরাজ, ত্রিগর্তরাজ সুশর্মা, রাজা যুধিষ্ঠির দাস জাতিতে পতিত হয়েও ফিরে পান ক্ষত্রিয়ত্ব; পরশুরামের নেতৃত্বে ভারত মহাসাগরের তীরের জেলেরা হয় লবণাম্বু-উদ্রী ব্রাহ্মণ; কৃষ্ণের নেতৃত্বে ব্রজ ও মথুরা বাণী গোপগণ হয়ে ওঠেন বীর যোদ্ধা- নারায়ণ সেনা- ক্ষত্রিয়; দেবী দুর্গার বরে উপজাতীয় মহিষাসুর হয় উপবীতধারী ব্রাহ্মণ। কিন্তু আধুনিক ভারত- দেশভাগের ভারত- জাতিভেদের ভারত- সে আজ নিঃস্ব রিক্ত। এখানে শুধু শম্বুকের পরিণতিই রূঢ় সত্য; হরিশ্চন্দ্রের উত্থান হাস্যকর গল্পমাত্র।
চলচ্চিত্রের শেষে বৃদ্ধ-ধ্বস্ত ঈশ্বর চক্রবর্তীর মুখ দিয়ে এই সত্যই বলান ঋত্বিক। চক্রবর্তী শ্যামল ঘোষাল অভিনীত চরিত্র সাংবাদিককে বলেন: “তুমিও বাদ পড়বে না, তুমিও দোষী, তুমি আমি সবাই। ভেবেছ আমার বোনেরই শুধু এই দুর্দশা? তোমাদের বোন নেই?” সত্যই দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যর্থ ভারতীয় পুরুষরাই তো জাতিভেদ-দেশভাগ-অর্থনৈতিক শোষণ, কুটিল পঙ্কিল রাজনীতির পাকচক্রে মাতা-কন্যা-ভগিনীর পক্ষে অবাসযোগ্য করে তুলেছে সীতা-সতী-সাবিত্রী-দময়ন্তী-দ্রৌপদীর দেশ এই ভারতবর্ষকে। অধঃপতিত পুরুষ আর অবহেলিত নারী- এই হল ভারতের আধুনিক রূপ। এই সত্যই প্রকাশিত এই চলচ্চিত্রে। অপপুরুষায়নের এই চলচ্চিত্রায়ণ ঋত্বিক শুরু করেছিলেন অযান্ত্রিক', 'মেঘে ঢাকা তারা', 'সুবর্ণরেখা' হয়ে যা পরিণতি পায় 'যুক্তি তক্কো আর গপ্পে’।
স্বামীজি বলতেন ধর্ম এখন ভাতের হাঁড়িতে এসে ঠেকেছে। স্বামীজির এই উক্তির ৫০ বছর বাদেও পরিস্থিতির কিছুমাত্র বদল হয়নি। ভারত এখন স্বাধীন। এই স্বাধীনতা-গণতন্ত্র নিয়েই অদ্ভুত মকারি বা ঠাট্টা আরম্ভ করেন ঋত্বিক। ছবির শুরুতে গান্ধিজি মৃত্যু সংবাদ দেখিয়ে তিনি তার সূচনা করেন। পতিতপাবন সীতারামের দেশ তখনও এমনকি আজও সহ্য করতে পারে না অন্ত্যজ পুরুষ উচ্চবর্ণের গর্ভ-নারী লাভ কিম্বা অধিকার করছে। মুখার্জি অনেক আগে থেকেই এ ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন চক্রবর্তীকে। পরে রামবিলাস- উভয়েরই মালিক বা নিয়োগকর্তা- একদম সরাসরি আপত্তি তোলেন অভিরামের ঈশ্বর চক্রবর্তীর বাংলোয়- যার আসল মালিক রামবিলাস-থাকার বিষয়ে। ঈশ্বর চক্রবর্তী আজকের যুগেও জাতপাত না মানার কথা বলতে গেলেই রামবিলাম তাঁকে থামিয়ে দেন। উলটে বলেন জাতপাতই তো সব। মুখার্জি কথায় কথায় রামবিলাসের ধর্মপ্রাণতার প্রশংসা করত। এ যেন মারীচের মুখে রাবণের প্রশংসা। রাবণ যেমন মারীচকে লঙ্কার ভাগ দেবার প্রলোভন দেখিয়েছিল তেমন মুখার্জির সামনে দোদুল্যমান ফাউন্ড্রির ১২.৫%-র ভাগ একদিন যা চক্রবর্তীর পাওয়ার কথা ছিল।
এসেছিল একটা চিঠি চক্রবর্তীর কাছে, রামবিলাসের থেকে। তাতে বলা হয়েছিল অভিরামের জাতের ব্যাপারে ঈশ্বর চক্রবর্তীকে ' শকড্ না হতে'। এবং আরও বলেছিল যে ইউরোপ থেকে ঘুরে এসে ফাউন্ড্রির শেয়ার হস্তান্তরের কথা ভাববে রামবিলাস। কিন্তু ইতিমধ্যেই শেয়ার হস্তান্তরের ব্যাপারটা পাকাপাকি হয়ে গিয়েছিল। অভিরামের জাত জানতে পারার পর ব্যাপারটি যেন একেবারে থামিয়ে দিলেন রামবিলাস। এই শেয়ার হাতে পেয়েও না পাওয়াটা চক্রবর্তীর কাছে যেন জেতা জুয়ার হারার মতো। সাহেব পাইলটদের ধ্বংসপ্রাপ্ত ক্লাবঘরের চিহ্নস্বরূপ দেওয়ালটিকে বারবার দেখান ঋত্বিক চলচ্চিত্রে। দেওয়ালটি অনেকটা তাসের স্পেড-এর মতো। ইউরোপে মধ্যযুগে এটিকে গ্যাম্বলিং বা জুয়ার প্রতীক রূপে ব্যবহার করা হত। এটি মৃত্যু বা যুদ্ধেরও প্রতীক। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ভিয়েতনামের সৈনিকরা এস অব স্পেড যুদ্ধক্ষেত্রে ফেলে রাখত বিপরীত পক্ষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার জন্য। ইংল্যান্ডে কুইন অ্যানের সময় প্রতারণার কারণে প্রাপ্ত শাস্তির প্রতীক হিসাবে এস অব স্পেড ব্যবহার করা হত। চলচ্চিত্রে এই প্রতীকের ব্যবহার করে জীবনের জুয়া খেলায় চক্রবর্তীর পরাজয়কেই ইঙ্গিত করেন ঋত্বিক। আবার অভিরাম ও সীতার আবাল্য প্রেমের পশ্চাৎপটে এই চিহ্নকে বারবার এনে চূড়ান্ত বিপর্যয়কে, মৃত্যুর হাতছানিকে সূচিত করেন ঋত্বিক।
যুদ্ধধ্বস্ত এরোড্রোমে স্পেড চিহ্নকে দেখিয়ে ঋত্বিক বরঞ্চ মনোজাগতিক যুদ্ধকে বেশি করে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। প্রাচীন যুগের তাসে ব্যবহৃত স্পিয়ার বা বর্শা চিহ্ন সময়ের সাথে স্পেড চিহ্নে পরিবর্তিত হয়। এই চলচ্চিত্রের পুরুষ চরিত্রগুলির চিন্তাভূমি যেন বর্শাবিদ্ধ। তাদের কেউ ঈর্ষাপরায়ণ যেমন হরপ্রসাদ কেউবা অন্যের দুঃখের মুহূর্তের সুযোগসন্ধানী যেমন মুখার্জি। চক্রবর্তীর চিন্তনে তীব্র বিশৃঙ্খলা। তাই তার চোখের দৃষ্টি "খুনির" মতো, হাড়হিম করা। মুখার্জি মজা লুটতে থাকে পরিস্থিতির। ইউরি গ্যাগারিনের নভোগমনের খবর যে এত চিৎকার করে পড়তে থাকে সে কারখানার মেশিনের আওয়াজ ছাপিয়ে ওঠে তার পুলকিত কণ্ঠস্বর। যেন আচরণে বোঝাতে চাইছে যে আসলে তারও উড়ান শুরু হয়েছে আর চক্রবর্তীর স্বপ্নের পুষ্পক মুখ থুবড়ে পড়তে চলেছে। আর সহ্য করতে পারেননি চক্রবর্তী। উন্মাদের মতো গোটা খবরের কাগজটিকেই ফার্নেসের অগ্নির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেন তিনি। বিদেশিদের গৌরবগাথা মুদ্রিত করে যে সংবাদপত্র সেই সংবাদপত্রই স্বদেশের বালকের হারানো মাকে খুঁজে দিতে ব্যর্থ। এমনকি অভিরামের মা-এর নিরুদ্দেশের সন্ধানের বিজ্ঞাপন বা সংবাদটিকে ছাপতে অবধি তারা একপ্রকার নারাজ ছিল। অথচ কন্যাসম ভগিনীহারা ভ্রাতার বেদনার হতাশার পরাজয়ের খবর তারা বিক্রি করেছে। বিদেশিদের আকাশচারণ মুখার্জির মতো মানুষদের উল্লসিত করে কিন্তু তাদের জাতপাত, ধর্মভেদের বেড়াজাল থেকে বার করতে অক্ষম আধুনিক সংবাদপত্র।
সংবাদপত্র তাই সশব্দে পড়ে যেতে থাকে ব্রয়লারের আগুনে। সেই বিশৃঙ্খল শব্দকে ঋত্বিক লয় করান বৃষ্টিস্নাত মল্লার রাগে। দেখা যায় সেই সুরে নিমজ্জিত হয়ে আছে সীতা। যেন বীণাবাদনরতা সরস্বতী। এই সুরই যেন পারে মনের আগুন নেভাতে। রাম মনোভূমিকে সজল করে তুলতে। যেন শয়তানের নরকের বিপরীতে সরস্বতীর স্বর্গীয় সুর মূর্ছনা। নরক মুক্তির আনন্দ। প্রচণ্ড অনটনের মধ্যেও এই সরস্বতীকে বাঁচিয়ে রাখে সীতা। কিন্তু, দেখা যায়, অভিরাম তার লেখার ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ হতাশ। তার লেখার একেবারে যে পাঠক নেই তা নয়। হরপ্রসাদের স্ত্রীর মৃত্যুর খবর দিতে আসা বিনোদ বলে অভিরামের লেখা তারা পড়ে। বেশ লাগে তাদের। আসলে অভিরামের লেখা যাদের ভালো লাগে বই বা পুস্তিকা কিনে পড়বার মতো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ তাদের নেই। স্বাধীন ভারতবর্ষের বাস্তববাদী রিয়ালিস্টিক লেখকদের সঙ্গে এ যেন বাজারের করা ঠাট্টা। ঋত্বিক অতি সচেতনভাবে নিজের চলচ্চিত্রগুলিকেও এই বাজারি ঠাট্টার বলি করেন। চলচ্চিত্রের প্রথম দিকেই তাই বাউলকে দিয়ে ঋত্বিক গাওয়ান- "বাজাইরারা বাজার করে দয়াল..."
বিনোদ এসেছিল হরপ্রসাদের স্ত্রীর শেষ চিঠি ঈশ্বর চক্রবর্তীকে হস্তান্তরিত করতে। বোঝা যায় মৃত্যুর আগে এই বধূটি- মা-টি একাধিক পত্র লিখেছিলেন চক্রবর্তীর উদ্দেশ্যে নিজের সন্তানদের চূড়ান্ত অনটন থেকে বাঁচাবার জন্য। হরপ্রসাদ কোনো চিঠিই পৌঁছতে দেননি এই শেষটি ছাড়া। ঈর্ষাকাতর হরপ্রসাদ কোনোভাবেই পরাজয় স্বীকার করতে চায় না চক্রবর্তীর কাছে। এমনই তাঁর অহং যে স্ত্রীর চিঠিগুলির ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই তাঁর কাছে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর 'শেষ চিঠি'টুকু শুধু পৌঁছে দেন সঠিক ঠিকানায়, তাও নিজে নয়, বিনোদের মাধ্যমে। তাঁর স্ত্রীর ইচ্ছা ছিল তাঁর সন্তানরা পাক ঈশ্বর চক্রবর্তীর আশ্রয়। হরপ্রসাদ তা হতে দেন না। উপরন্তু বলেন তিনি 'আলোর সন্ধানে" চললেন। আলোর দূত হতে পারেননি হরপ্রসাদ। উপরন্তু অন্ধকারের প্রতিভূ হয়ে প্রবলভাবে টেনে নেন চক্রবর্তীকে। এই জমাট বদ্ধ অন্ধকার এসে দাঁড়ায় বিধবা সীতার উদ্বাস্তু আঙিনায়। চশমা খোয়ানো মাতাল অন্ধকার, অস্পষ্ট দৃষ্টিপথ সেই অন্ধকারের। এই হল ঋত্বিকের হতাশার, অন্ধকারের মেলোড্রামাটিক বুনোট।
এই অন্ধকারেই মা হারা হয় বিনু। শুধু কি বিনুই মা হারা হল? চক্রবর্তীও তো হলেন মা হারা। একদিন বোন সীতার মধ্যেই তিনি ফিরে পেয়েছিলেন বহুকাল আগে গত হওয়া মাকে। সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রটি জুড়েই যেন মাতৃহারা হওয়ার ধারা নেমেছে। পরপর মাতৃহারা হতে থাকেন চক্রবর্তী, হরপ্রসাদের সন্তানরা, অভিরাম, বিনু। কিন্তু পড়ে থাকে বিগত মা-এর ছায়া- ভীষণভাবে, দারুণভাবে। ভারত মাতা। বিভক্ত ভারত- মাতৃবিচ্ছেদ। তবুও মা ভারতের অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। মা কী ছিলেন। কী হইলেন। মা-এর যেটুকু পড়ে থাকে সেটুকুও তো মা। মা নেই বিনুর। কিন্তু আছে মা-এর গান- "ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার লুকোচুরির" গান। আর প্রকটভাবে থাকে মা-এর জাত। সন্তানকে বইতে হয় সেই জাত-কালিমা- বাগদি বউ নাকি ব্রাহ্মণ কন্যা? ঋত্বিক আবার ঠাট্টা শুরু করেন যুগব্যাপী সেই আপ্তবাক্য নিয়ে- "মায়ের আবার জাত হয়!"
অভিরামের মা-কে হারানো এবং মা-কে খুঁজে পাওয়া বড়ো বেশি মেলোড্রামাটিক। ঋত্বিক ইচ্ছা করেই এরূপ তীব্র অতি নাটকীয়তায় চোখ ধাঁধিয়ে দেন দর্শকের, বাস্তব-অবাস্তবের দোলাচল চলতে থাকে। তাই কৌশল্যা-মায়ের মৃত্যু দৃশ্যে তীব্রভাবে দোদুল্যমান এক বালককে উপস্থিত করেন ঋত্বিক। এই মেলোড্রামার আড়ালে আরও একটি পৌরাণিক মাত্রার ইঙ্গিত দিয়ে যান ঋত্বিক- 'বজ্রযোগিনী' শব্দটির মাধ্যমে। কৌশল্যা-অভিরাম ঢাকা বিক্রমপুরের নিকটে বজ্রযোগিনী গ্রামের বাসিন্দা। বজ্রযোগিনী শব্দটি বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে যুক্ত। বৌদ্ধ মহাবিহারের জন্য ইতিহাসখ্যাত স্থান বিক্রমপুর। বজ্রযোগিনী গ্রাম তান্ত্রিক বৌদ্ধাচারের ইতিহাস বহন করে। এখানেই জন্ম হয়েছিল বিশ্বখ্যাত বৌদ্ধ দার্শনিক অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান-এর। এইভাবে ঋত্বিক রামায়ণের বৌদ্ধ আখ্যানের দিকে অর্থাৎ দশরথ জাতকের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেন। 'দশরথ জাতক'-এর কাহিনি অনুসারে রামসীতা দুজনেই দশরথের সন্তান, তারা ভ্রাতা-ভগিনী। চলচ্চিত্রের সীতা এবং অভিরাম দুজনেই ঈশ্বর চক্রবর্তীর সন্তানসম। ভ্রাতা এবং ভগিনীর মতোই তারা বড়ো হচ্ছিল। হিন্দুধর্ম মতে একই পিতার সন্ততিদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। সীতা এবং অভিরামের বিবাহ ঘটিয়ে ঋত্বিক যেন সেই প্রাচীন বৌদ্ধাচারকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
আবার জৈন রামায়ণ অনুযায়ী প্রতি অর্ধকাল চক্রে বাসুদেব এবং প্রতি বাসুদেব আবির্ভূত হন। বাসুদেব লক্ষণ, প্রতিবাসুদেব-রাবণকে বধ করেন। দুজনেরই গতি হয় নরকে। এখানে সীতাকে কেন্দ্র করে অভিরাম এবং ঈশ্বর চক্রবর্তীর মধ্যে বাসুদেব-প্রতি বাসুদেব দ্বন্দু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুজনেরই অন্তিমে নির্দিষ্ট থাকে ভয়ঙ্কর ট্রাজেডি- নরক যন্ত্রণা। এই চলচ্চিত্রে শুধু মিথের সঙ্গে মিথের উপরিস্থাপন বা ওভারল্যাপ করান না ঋত্বিক তিনি একই মিথের ধর্ম-কাল-স্থান ভেদে বিভিন্ন আখ্যানের সমাপতন ঘটান। বৌদ্ধ জাতক এবং জৈন রামায়ণ দুটিতেই সীতাকে মহিমান্বিত করা হয়- তাঁরা অন্তিমে স্বর্গলাভ করেন। কিন্তু চলচ্চিত্রের সীতার অন্তিম হয় চরম পরিণতিতে অনেকটা বাল্মীকি রামায়ণের সীতার পাতাল প্রবেশের ভঙ্গিতে। ঋত্বিক মায়ের মৃত্যু, মেয়ের মৃত্যু যুগপৎ ঘটান।
চলচ্চিত্রের পর চলচ্চিত্রে ঋত্বিক তাঁর বয়ান-দর্শন তুলে ধরেন। চলচ্চিত্রগুলিতে তাই খুব কৌশলে বেশ কিছু কো-রিলেটিভ রেখে যান ঋত্বিক। যেমন বিবাহ। 'তিতাস একটি নদীর নাম', 'কোমল গান্ধার', 'মেঘে ঢাকা তারা', 'অযান্ত্রিক', 'সুবর্ণরেখা' এই সব চলচ্চিত্রে বিবাহ কো-রিলেটিভ থেকে প্রধান বিন্দু হয়ে উঠেছে। এমনকি 'বাড়ি থেকে পালিয়ে'-তেও বালক-চরিত্রকে একটি বিয়ে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তোলেন ঋত্বিক। 'যুক্তি তক্কো আর গপ্পো'-তেও অনুপ্রেরণা সেই বিবাহ এবং দাম্পত্য। বেশির ভাগ চলচ্চিত্রেই বিবাহ যেন ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় নায়ক-নায়িকাকে। 'অযান্ত্রিক'-এ দেখি বিমলের ব্যর্থ পৌরুষত্বের উপর ভরসা করে না পরপুরুষের হাত ধরে বিবাহ বাসর থেকে পালিয়ে আসা নারী (কাজল গুপ্ত অভিনীত চরিত্র) যার প্রেমিক (অনিল চ্যাটার্জি অভিনীত) তাকে বিপদগ্রস্ত করে পালিয়েছে। ঋত্বিক বিমলকে (কালি ব্যানার্জি অভিনীত) নিয়ে যান আদিবাসীদের কৃষি উৎসবে- দেখান সাঁওতাল রমণীর মরদ ত্যাগ এবং তৎপরবর্তী নতুন প্রেমিক নির্বাচনের সাবলীলতা। বিবাহকে কো-রিলেটিভ হিসাবে ব্যবহার করে উপরিউক্ত চলচ্চিত্রগুলিতে ('তিতাস একটি নদীর নাম' ব্যতিরেকে যেখানে নিম্নবর্গীয় জেলেদের বিবাহ প্রধান বিষয়) ঋত্বিক উচ্চবর্গীয় বাঙালিদের সংস্কৃতিকে আক্রমণ করেন। বিপরীতে, আদিবাসী সমাজের সহজ সরল প্রাকৃতিক পরিণয়কে তুলে ধরেন দর্শকের সামনে।
'সুবর্ণরেখা' চলচ্চিত্রে শালবনে, নির্জনে একে অপরকে উজাড় করে দেয় অভিরাম ও সীতা। অরণ্যে দুজনে যেন গোপনাচারী দুষ্মন্ত ও শকুন্তলা। মহাকবি কালিদাসের 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম'-এর মতোই অভিরাম একটি অভিজ্ঞান দেয় সীতাকে- সাঁওতালি বিবাহের মঙ্গলসূত্র মালা। যা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ঈশ্বর চক্রবর্তী। অনেকটা দুর্বাসা মুনির মতো-যে কিনা নবপরিণীতার প্রণয়ী মননকে সহ্য করতে পারে না। ঋত্বিক তাঁর চলচ্চিত্রে আধুনিক শকুন্তলাকে সাঁওতালি বিবাহের মঙ্গলসূত্র পরিয়ে দেন- আর্য গান্ধর্ব বিবাহ আর্যেতর আদিবাসীদের মিলন প্রেক্ষিতে বিনির্মাণ করেন ঋত্বিক। আদিবাসী বিবাহ ও জীবন আরো একটি কো-রিলেটিভ হয়ে দাঁড়ায় তাঁর চলচ্চিত্রগুলিতে। সীতা, শকুন্তলা, দময়ন্তী, দ্রৌপদী- এঁদের জীবনের অনেকটা সময় কাটে অরণ্যে। নির্বাসিতা হয়ে তাঁরা আশ্রয় খোঁজেন অরণ্যে। সীতা, শকুন্তলা এঁরা তো, একপ্রকার অরণ্যলক্ষ্মী। আধুনিক ভারতবর্ষে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গোল্ডরাশের কিংবা শিল্পায়ন, নগরায়ন, যুদ্ধায়নের প্রথম বলি হয় অরণ্য। উৎখাত হতে থাকে অরণ্যের অধিবাসী-আদিবাসীরা। আজকের নির্বাসিতা সীতা-শকুন্তলারা তবে কোথায় খুঁজে পাবে আশ্রয়?
ঋত্বিক এই আশ্রয়হীনতা প্রতীকায়িত করেন কালীর মধ্য দিয়ে। পরিত্যক্ত এরোড্রোমে- যুদ্ধক্ষেত্রে একা একা ঘুরে বেড়ায় বেশভূষাহীন কালী হাতে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে। মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকালে এবং যদু বংশ ধ্বংসকারী মুষল যুদ্ধের প্রাক্কালে এক কৃষ্ণবর্ণা নারীকে দেখা যেত পুরাঙ্গনাদের মঙ্গলসূত্র চুরি করতে। কৃষ্ণ একে ধ্বংস-ইঙ্গিতকারী দুর্লক্ষণ বলেই জানতেন। মহাকালীর এই রূপ যদু বংশীয় বীর পুরুষগণের মধ্যেও ভীতি উদ্রেক করেছিল। কিশোরী সীতাও চলচ্চিত্রে, ভয় পেয়েছিল বহুরূপী চৈতন্যার কালী রূপ দেখে। আপন মনে, অনুর্বর ধ্বংসক্ষেত্রের উপর দিয়ে, একাকিনী চলতে চলতে সীতা স্বতোৎসারিতভাবে গাইছিল ধানের ক্ষেতের গান-সমৃদ্ধির স্বপ্ন সঙ্গীত। কালী দর্শন যেন বুঝিয়ে দিল সমৃদ্ধির লক্ষ্মী হয়ে ওঠা সীতার হবে না। সে সময় সে পাবে না। সে তো হয়ে উঠেওছিল অকৃতদার দাদার সংসারের লক্ষ্মী-মায়েরই মতো আগলে রেখেওছিল কাজপাগল জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে। সীতার বিদায় ঈশ্বর চক্রবর্তীকে লক্ষ্মীছাড়া করেছিল। লোক-রামায়ণের হনুমান সীতা ত্যাগী রামকে বলেছিল "লক্ষ্মীছাড়া রাম"। অভিরামের সংসারে সীতা লক্ষ্মী ও সরস্বতী দুই-ই হয়ে উঠেছিল। ঠোঙা তৈরি করে অভাব দূরীকরণের চেষ্টা থেকে মোহনবীণার সুরে অভাবকে ভুলিয়ে রাখা পর্যন্ত। অভিরামকে সে প্রতিহত করেছে ঈশ্বর চক্রবর্তীর কাছে অনটনের কারণে নতিস্বীকার থেকে। কিন্তু সবই যেন সহসা কালগ্রাসে বিলীন হল। এল মৃত্যু। আশ্রয়হীন হল তার সন্তান বিনু।
শেষদৃশ্যে দেখি সারা পৃথিবীতে তার একমাত্র আপন, মামা ঈশ্বর চক্রবর্তীর হাত ধরে বিনু বেরিয়েছে তার স্বপ্নের নতুন বাড়ির সন্ধানে। স্টেশনের বেঞ্চে বসে নব আগন্তুক বিনুর চোখ চলে যায় সুবর্ণরেখার দিকে। ক্যামেরায় ব্যাপকভাবে তুলে ধরেন ঋত্বিক ভরন্ত পরিপূর্ণ ধানের ক্ষেতের দৃশ্য। দু চোখ ভরে দেখে নিতে থাকে বিনু সেই সুখ দৃশ্য। তার মায়ের মতো হাততালি দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গেয়ে ওঠে ধানের ক্ষেতের রৌদ্রছায়ার গান। কালের নিয়মে পরিবর্তন এসেছে বালুময় সুবর্ণরেখার উষর কূলে। পাথুরে জমিতে ফলেছে মাটির ফসল ধান। ধানের ক্ষেতের গান যে একদিন সত্য ফসল ফলাবে তারও ইঙ্গিত ছিল ওই কালীদর্শনে যখন কোজাগরী লক্ষ্মীর মতো সীতা গান গাইছিল অকৃষিসম্ভব পরিত্যক্ত এরোড্রোমে চলতে চলতে। গ্রাম্য লোককথা অনুযায়ী কোজাগরী পূর্ণিমায় দেবী লক্ষ্মী সে সব ক্ষেতে-জমিতে পদার্পণ করেন। গান সেই সব জমি ফসলে পূর্ণ হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রে সীতা যেন সেই ফসলের গান গাওয়া ধান্যলক্ষ্মী। কালীর আবির্ভাব বোঝায় যে কালের নিয়মে তার এই গান একদিন সত্য হবে। ধান ফলবে সুবর্ণরেখার তীরে-মানুষের পরিশ্রমে নাকি মানুষীর পরিশ্রমে?
কারা ফলাল এই ধান? সচকিতে একটি দৃশ্যে, পূর্বাপরহীনভাবে ঋত্বিক এনেছিলেন দশজন সাঁওতাল কৃষক রমণীর দৃশ্য গা-এ গা ভাসিয়ে আদিবাসী নৃত্যের ছন্দে যারা হেঁটে চলেছিল আয়রন ফাউন্ড্রির পথ পেরিয়ে সকালবেলা। এরাই কি তবে বন্ধ্যা জমিকে করেছে ফলবতী? যে জমিতে কূপ খননও দুঃসাধ্য। শিল্পপতির দান ছাড়া কূপ কাটা যেখানে অসম্ভব। ঋত্বিক যেন বলতে চাইছেন আধুনিক ভারত গড়ে উঠবে মেয়েদের পরিশ্রমে-শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের মেয়েদের বিশেষ করে আদিবাসী নারীদের পরিশ্রমে। স্বামীজি বলেছিলেন নতুন ভারত বেরোবে চাষার লাঙল থেকে। ঋত্বিক যেন এই বাণীটিকে আরো এগিয়ে দিলেন- আধুনিক ভারত বেরোবে কৃষক-নারীর নিবিড় পরিশ্রমের ফলে।
এই কৃষক রমণীদের সংখ্যা দশ। ঋত্বিক সংখ্যা সচেতন। ঋত্বিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল চলচ্চিত্রের মধ্যে পূর্বাপরহীন সহসা-দৃশ্য আনয়ন। যদিও দৃশ্যগুলি চলচ্চিত্রের সঙ্গে বিসদৃশ নয়। এটিই ঋত্বিকের অনন্য দক্ষতা। উদাহরণ স্বরূপ 'অযান্ত্রিক'-এ কয়লা যাওয়ার - ইলেকট্রিক্যাল ট্রলিগুলির সহসা আগমন এবং তাদের একটির উপর ক্যামেরা সম্পাতের কথা বলা যায়, দর্শক সেখানে স্পষ্টভাবে একটি তিন সাংখ্যিক বিজোড় নম্বর দেখতে পান। পরে ওই সংখ্যাটিই একটি দুর্দান্ত প্রতীক হয়ে ওঠে চলচ্চিত্রে। সুবর্ণরেখা চলচ্চিত্রে ওই দশজন সাঁওতাল নারী দশজন ভারতীয় পৌরাণিক মহানায়িকার প্রতীক- যেন তাঁদের আদিবাসী উত্তরাধিকার প্রতিভূ স্বরূপ। এঁরা হলেন সীতা, সতী, সাবিত্রী, দময়ন্তী, দ্রৌপদী, সরস্বতী, লক্ষ্মী, শকুন্তলা, রাধা এবং মহাকালী।
এঁদের মধ্যে প্রথম নয়জনকেই চলচ্চিত্রে সীতার মধ্য দিয়ে নিজের দর্শন অনুযায়ী রূপদান করেছেন ঋত্বিক, যা এই প্রবন্ধে পূর্বের আলোচনাতেই দেখানো হয়েছে। সুবর্ণরেখার তীরে বসে, অভিরামের সান্নিধ্যে, ঝুলন গান গাইছিল সীতা- "আজু কি আনন্দ"। পুরো চলচ্চিত্র জুড়ে বেদন বিস্বনের মধ্যে সীতা মাত্র দুটি গান গেয়েছিল যা মনের আনন্দে গাওয়া- "ধানের ক্ষেতের রৌদ্রচ্ছায়া" এবং "আজু কি আনন্দ"। বাকি সব গানই ছিল তার একাকিত্বের বেদনা-উৎসারিত- যে গানগুলি হয় গাওয়া হয়েছে নির্জন, ফাটলযুক্ত, আকর্ষণীয় পরিত্যক্ত এরোড্রোমে নয়, গাওয়া হয়েছে সুবর্ণরেখার বালুকাবেলায় যেখানে নদী হয়ে গেছে জীর্ণ শীর্ণ প্রায় ধারাহীন শুষ্ক। কিন্তু, "আজু কি আনন্দ" গাওয়া হয়েছিল সুবর্ণরেখা নদীর সেই অংশে যেখানে নদী যথেষ্ট প্রশস্ত, ধারার অভাব নেই। বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যে পদকর্তাগণ নায়িকা শ্রীরাধার মানসিক অবস্থার প্রেক্ষিতেই প্রকৃতি রচনা করতেন। সেই একই ব্যাপার ফুটিয়ে তুললেন ঋত্বিক তাঁরা রাধা-সীতার মধ্যে। অভিরামকে পেয়ে সে পূর্বরাগের পরম পরিণতিতে মিলন শৃঙ্গারে আবেশিত কিন্তু রাধারই মতো সংযত। সুবর্ণরেখা তখন যেন নদী যমুনা- "ধীরে সমীরে যমুনার তীরে বসতি বনে বনমালী"।
মহাকালীকে ঋত্বিক অনেকটা নৈর্ব্যক্তিক করে রেখেছেন। ভারতীয় পুরাণের পূর্বোক্ত নায়িকাগণ যাঁরা আজও দেবী মাহাত্ম্যে পূজিতা হন তাঁদের রূপকের অন্তরালে রাখলেও একমাত্র কালী রূপকেই রূপকের অবগুণ্ঠন মুক্ত করান ঋত্বিক চৈতন্যা বহুরূপীর মাধ্যমে-মহাকালী এখানে রুদ্রমূর্তি-ধ্বংসমূর্তি প্রকট ভীষণভাবে। পুরাণ অনুযায়ী সতী-দুর্গাই কালী রূপ পরিগ্রহ করেন। সতী-মিথকে চলচ্চিত্রে সীতার মধ্য দিয়ে বিনির্মাণ কালে কালী মিথকেও সীতার মধ্যে আনেন ঋত্বিক। তবে একটু অন্যভাবে- রূপকেরই আড়ালে। দেবীর দশ মহাবিদ্যা রূপের মধ্যে একটি যেমন কালী- মহাকালে স্বরূপিনী তেমনই আরেকটি হলেন দেবী ছিন্নমস্তা- আত্মধ্বংসকারিণী। ছিন্নমস্তা নিজের হাতেই নিজের মুণ্ডচ্ছেদ করেন। বিকৃতকাম যখন সৃষ্টিকে পঙ্কিল করে তোলে তখনই দেবী এই রূপ ধারণ করেন। হস্তে স্ব-মণ্ডধারিণী রক্তস্রোতা কবন্ধরূপিণী ছিন্নমস্তা তাই দাঁড়িয়ে থাকেন বিপরীত রত্যাতুরা রতি ও মদনের উপর। ঈশ্বর চক্রবর্তীর- বিকৃতকাম- ভগিনী গমনের মুহূর্তে সীতা ছিন্নমস্তা হয়ে ওঠে। নিজ হস্তে নিজ মুণ্ড ছেদ করে সে। এই বীভৎসতার পূর্ব ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন ঋত্বিক দেবীর মহাকালী রূপকে প্রকট করে। সাঁওতাল রমণীদের সংখ্যাও তাই দশ রাখেন ঋত্বিক।
পুরাণকথিত ভারতীয় এই সকল মাতৃগণকে সগৌরবে স্মরণ করতেন স্বামী বিবেকানন্দ। যে স্বপ্ন স্বামীজি দেখেছিলেন ভারতের ভবিষ্যৎ জননীগণ-নারীগণের উন্নতির, প্রগতির তাকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে ঋত্বিক যেন স্বামীজির কাছেই একপ্রকার নতিস্বীকার করলেন শেষ পর্যন্ত। যে প্রগতিশীল কর্মী ভারতের স্বপ্ন দেখতেন স্বামীজি, আন্তরিকভাবে চাইতেন নারীগণ তাতে সমঅধিকারে সমমর্যাদায় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করুক। ওই দশজন সাঁওতাল রমণী সেই কর্মী ভারতেরই তো নার্যায়ন। বাঙালির আত্মায় বাস করা স্বামীজিকে কিছুতেই অস্বীকার করতে পারেন না ঋত্বিক।
তাঁর নিজের আত্মার ভিতরেও যে স্বামীজির বিজয় ক্ষেত্র সে ব্যাপারেও সচেতন ছিলেন ঋত্বিক। স্বামীজি বলেছিলেন "হে ভারত ভুলিও না, মুচি, মেথর, দরিদ্র ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী তোমার রক্ত...।" আধুনিক ভারতের গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্র যেন এই কথাটিকেই ভুলে যেতে চাইছে। তাই তো দরিদ্রের খবর, অসহায়ের খবর, পিছড়ে বর্গের খবর প্রকাশে তাদের আগ্রহ নেই। পিছড়ে বর্গের জীবনে ঘটে যাওয়া চরম দুর্গতি তাদের কাছে ব্যবসার খোরাক মাত্র। এরই প্রতিবাদ করেছিলেন ঈশ্বর চক্রবর্তী সাংবাদিককে যখন বলেছিলেন "তুমিও দোষী।" "তুমিও বাদ পড়বে না।" এই প্রতিবাদ আসলে ঋত্বিকের প্রতিবাদ সংবাদপত্র নামক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যেগুলি কেবল ভদ্রলোকের কাগজ।
শাস্ত্রমতে ব্রাহ্মণকন্যা শূদ্র কিংবা অন্ত্যজ পতির সন্তান গর্ভে ধারণ করলে সেই সন্তান হয় সমাজচ্যুত চণ্ডাল- বর্ণাশ্রম ধর্মে যার কোনও স্থান নেই। বিনুর জন্মও ওইরূপ প্রতিলোম বিবাহের ফল। কিন্তু অন্তিমে, বিনুকে বুকে তুলে নেন চক্রবর্তী-ব্রাহ্মণ। বৃদ্ধ, শিশুর হাত ধরে খোঁজে ভবিষ্যতের পথ। পূর্ব পুরুষ ব্রাহ্মণকে পথ দেখায় চণ্ডাল উত্তর পুরুষ। ঋত্বিক দেখালেন এই হল নতুন ভারতের ভবিষ্যৎ পথ। চণ্ডাল তোমার রক্ত, তোমার উত্তরাধিকার হে উচ্চবর্ণের ভারত। নিম্নবর্গকে, অন্ত্যজকে এই স্বীকৃতি দিতেই হবে বর্ণহিন্দু ভারতকে। চক্রবর্তী যখন বলেন- "ভেবেছ আমার বোনেরই শুধু দুর্দশা? তোমাদের বোন নেই?"- যেন ইঙ্গিত করেন একদিন ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে এইরূপ প্রতিলোম বা মিশ্র বিবাহ হবে। উচ্চবর্ণ ভারত যদি তা না মেনে নেয় তবে তার অন্তিম পরিণতি হবে মারাত্মক। কালের নিয়মে কোনো চণ্ডাল জাতককে আর ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। আধুনিক ভারত হবে চণ্ডাল, শবর, শম্বুকদের স্বাধীন ক্ষেত্র। যেন বহুযুগ আগে বলা স্বপ্নসন্ধানী স্বামীজির বাণীর ইন্টার সেমিওটিক ট্রান্সক্রিপশন বা চিহ্নকের আন্তরূপান্তরকরণ করলেন ঋত্বিক তাঁর নিজস্ব দর্শনের আবরণে। দেখালেন স্বামীজির চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা, যা দেখাবার জন্যই স্বামীজিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন তিনি চলচ্চিত্রের প্রথমাংশে। জিতে গেলেন ঋত্বিক। কালজয়ী হল চলচ্চিত্র সুবর্ণরেখা।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন