কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

জয়িতা ভট্টাচার্য

 

বর্ণমালার সাতকাহন

 


(পর্ব ৪০)

ভাবি এক আর হয় আরেক। যখন একা একজন মানুষ আতান্তরের বন্যায় একা ভেসে যাচ্ছে তখন সে খড় কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরে। কোনটা খড় কোনটাই বা কুটো বাছবার মতো মনের অবস্থা থাকে না। সেভাবেই ভালোবাসা এসেছে অপরাহ্নে। তার জন্য সাজানো ছিলো না মণ্ডপ, ছিলো না মানসিক প্রস্তুতি। সেখানে ছিল না কোনো আদান প্রদানের শর্ত অথবা সংসার বাঁধার স্বপ্ন। সেই ভালোবাসা বন্ধনহীন এক মুক্তি। বদ্ধ ঘরের এক উন্মুক্ত বাতায়ন। সে কথা পরে।

একটা মানুষের একটা জীবন নয়। অনেকগুলো জীবন নিয়ে একটা আধার। শ্যামল মিত্রের একটা গান ছিল-  “আমার এই ছোট্ট ঝুরি তাতে রাম রাবণ আছে দেখে যা নিজের চোখে হনুমান কেমন নাচে, এ সুযোগ পাবে না আর বলো ভাই কী দাম দেবে…!” তা দাম চোকাতে হয় বৈকি একেকটা জীবনের জন্য। শিশুকাল একটা জীবন হলে বিবাহ জীবন আরেক। প্রণয় জীবন তফাতে মাছরাঙা পাখির মতো ডালে বসে থাকে তক্কে তক্কে। প্রেম আর মোহ, love আর infatuation আলাদা। আমাদের দেশে বিবাহকে পরখ করে নেবার সিস্টেম নেই তাই ওই মোহকে ভালোবাসা ভেবে কত জীবন ভেসে যায় সাঁকো ভেঙে। গরিব ঘরের মেয়েরা একটু ভাল থাকার নেশায় হাত ধরে বেরিয়ে যায় কানাগলিতে। আমাদের ছোটোবেলায় এরকম হামেশা শোনা যেত যে অমুকদের  ঘরের মেয়ে কোনও গরিব ঘরের ছেলে রিকশাচালক বা বেকার বা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা ক্যাডারকে বিয়ে করে পালিয়ে গেছে। সেই নিয়ে ঢেউ উঠত তারপর ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যেত পাড়া। এখন আর তেমন শোনা যায় না। কিন্তু এই যে আগে এই ধরনের তথাকথিত কেচ্ছা হতো আর এখন হয় না। তার একটা দিক যদি এই যে মেয়েরা যথেষ্ট সচেতন জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে। সেই সচেতনতা অবশ্যই শুধুই আর্থিক এবং দেখনদারির। যেন গড়ে তোলা প্রেম।

তারা যোগ্যতা সম্পন্ন ধনী ছেলে চৌকস ছেলের প্রতি আকর্ষিত হয়। ভুল করে না। এর থেকে আমার মনে  হয়েছে আগে প্রণয়ের সঙ্গে আর্থিক ও পার্থিব বিষয় যেমন যুক্ত ছিলো না আগে, তেমন হয়ত অন্তত অল্পবয়সী  ছেলেমেয়েদের কাছে দরিদ্র মানে কোনও ডিসকোয়ালিফিকেশন ছিলো না বা রোমান্টিকতার সম্পর্ক ছিল না।

বাংলা উপন্যাসের মতো প্রেম ছিল। বিবাহ পূর্ব যৌনতা তেমন ছিলো না। ভোগবাদী অর্থব্যবস্থা বা কনজ্যুমারিসম মানুষকে এখন শুধুই টাকার নিরিখে বিচার করে এই সত্য হতাশ করে। আমার ছোটোবেলায় গরিবরা অতোটাও বেপরোয়া হয়ে যায়নি বড়লোক হতে। বড়লোকরাও সবাই যে খুব অহংকারী ছিল তা নয়। কনজ্যুমারিসম একটা কর্কট রোগ গোটা সমাজ চোখের সামনে বদলে গেল। পয়লা বৈশাখ জন্মদিন আর পুজোর সময় শুধু নতুন জামা কেনা হতো। ফলে নতুন জামা হলে একটা আনন্দ উত্তেজনা ছিল। তেমনই যৌনতা অনেক অপেক্ষা অনেক ধৈর্য্য ধরার পর বিয়ে অবধি অপেক্ষা করতে হতো অর্থাৎ পঁচিশ ত্রিশ বছর তো বটেই। বিয়ের পরেও সঙ্গম বেশ জড়োসড়ো ভাবেই প্রবেশ করত সকলের জীবনে। এখন সেই সব সংকীর্ণ তা আর নেই, যৌনতা হাতের মুঠোয় যখন তখন। সতীপনার দিন নেই। যৌনতার সেই পূর্বরাগের সৌন্দর্যও নেই। গলির মুখেই বিরিয়ানি পাওয়া যায়।সস্তা। ঠাকুমা বলতেন, সস্তার তিন অবস্থা। যদিও ভিন্ন ভিন্ন সংকীর্ণতা দেখা দিয়েছে সমাজে। এই অর্থ সন্ধানী জীবন আমাদের একাকী বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে নিঃসন্দেহে। অনেক বই কত বছর আগেই লেখা হয়ে গেছে আমেরিকায় এই নিয়ে। আর্থার মিলারের নাটক ডেথ অব এ সেল্সম্যান এমন স্বপ্নভঙ্গের  ইতিকথা।

সে যাই হোক, আমাদের পরিবারে একটা ডিম সুতো দিয়ে কেটে আধখানা করে খেতে হয়নি। বাড়িতে চাল ডাল বাড়ন্ত ছিলো না কোনোদিন। বরং আমাদের বাড়িতে রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। লালের ওপর একটা কুকুর এইচ এম ভি লেখা গ্রামাফোন কোম্পানির বড়ো থালার মতো লং প্লেয়িং রেকর্ড বা মাঝারি এবং ছোটো রেকাবের মতো রেকর্ড। একটা দিক শেষ হলে ছোট্ট হাতটা তুলে উল্টে দিতে হতো। এসব কালেকশন মায়ের পছন্দ মতো হতো। “ছি ছি এত্তা জঞ্জাল, ইতনা বড়া বাড়ি ইসমে ইতনা জঞ্জাল...”। মর্জিনা ও আবদুল্লার পরস্পরের সংলাপ। এছাড়াও বাজত দেবব্রত বিশ্বাস কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান। এই সময় অনেকই তাঁর ভঙ্গী মতো রবীন্দ্রগীতি গাইবার চেষ্টা করতেন।

ছেলেবেলার একেকটা স্ন্যাপশট অম্লান হয়ে থাকে যেমন ছোটো জাগুলিয়ার ভেঙে পড়া ধ্বংসস্তুপের মত জমিদার বাড়ি। একটা দিক সারিয়ে বাস করতেন কিছু জ্ঞাতি সম্ভবত। আমরা ভেঙে পড়া সেই গৃহের ভেতর মাকড়সার জাল আর ধুলোর ভেতর অস্পষ্ট আঁধারে দাঁড়ালাম। আমার এক মাসির বাড়ির এঁরা আত্মীয়। আমার দাদামশায়ের অগ্রজ বন্ধু ও কলিগ। ওঁরা বার্ন স্ট্যান্ডার্ড-এ চাকরি করতেন এবং পৃথক একটি বন্ধু চক্র ছিলো। ছবি বিশ্বাস। তাঁকে দেখিনি কিন্তু তাঁর একমাত্র কন্যা মঞ্জু আমাদের জেম্মা অতি সাদামাটা একজন মানুষ ছিলেন। অপূর্ব তাঁর রান্নার হাত ছিল। যাইহোক, জাগুলিয়ার বাড়ির ভেতরের অন্ধকারের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা ঐশ্বর্য আর ঐতিহ্যর ভূত ওই শিশু বয়সেও ছাপ ফেলেছিল মনে। প্রত্নতত্ত্বের মতো সেই সব বিলাসের ছাপ আর বর্তমান শূন্যতার হাহাকার কোলাহলের মতো ভিড় করছিল ভাবনার মতো বয়স হয়নি তবু কী যেন ছিল বাড়িটায়। গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছিলেন। বড় হবার পর জেনেছি তিনি লেজেণ্ড। আমরা ছুটি ছাটায় সেই সময় নিউ আলিপুরে মাসির বাড়িতে থাকতাম। অনেকগুলি ভাইবোন সম্পর্কে জড়ো হতো। এতো সময় আমাদের ছিল নষ্ট করার মতো। উন্নততর প্রযুক্তি ছিলো না হয়ত কিন্তু আমাদের সেই পূরবের কালে এতোটাও বিকৃত ছিলো না সমাজ।

"পৃথিবী এখন ক্রমে হতেছে নিঝুম।

সকলেরই চোখ ক্রমে বিজড়িত হয়ে যেন আসে;

যদিও আকাশ সিন্ধু ভরে গেল উল্লাসে;

যেমন এখন বিকেলবেলা কাটা হয় খেতের গোধূম

চিলের কান্নার মতো শব্দ করে মেঠো ইঁদুর ভিড় ফসলের ঘুম

গাঢ় করে দিয়ে যায়।__এইবার কুয়াশা যাত্রা সকলের।"

একটা জীবন শেষ হয়ে স্মৃতি হলো। স্কুলে তখন খুব লেখা হতো "মনের মণিকোঠায়"। তা সেখানে রইল জমা। দ্বিতীয় আরেকটা জীবন। দারিদ্র্য সেখানে নিঃশব্দের ফল্গুধারা। ওখানেই দেখেছি পাঁঠার মাংস ধারে আনত। সুগার কিউবের মতো প্রায় পিস কাটিয়ে আনতে। তবে আবার যে কে সেই। রাতে দুজন পুরুষ পেতলের জামবাটিতে দুধ আর দিস্তে রুটি। আমার জন্য সরিয়ে রাখা ভাত। একেকটা পরিবারের একেক রীতি। সপ্তাহে একদিন মাছ হলে দুবেলাই। মাছ ভাজা মাছের ঝাল ঝোল এবং মুড়ো তেলে তরকারি। মেয়েদের এই কষ্টের দিকটা অলক্ষ্যেই থেকে যায়। খাবার কষ্ট। বাপ মার বাড়ি থেকে অন্য একটা বাড়িতে এসে হঠাৎ তার আশৈশব খাবার অভ্যাসের পরিবর্তন। তার প্রিয় খাবারটা না বলতেই বাবা আনে, না বলতেই মা রান্না করে। শ্বশুরবাড়িতে নিজস্ব মত পেতে কম সে কম বছর দশ ছেলে মেয়ের মা এবং গিন্নি হয়ে। ততদিনে ইচ্ছেরা অনেকটাই মরে যায়।

মরে যায় স্বপ্ন অনেক আবার ঘটে কিছু অভাবনীয়। যা অকল্পনীয় ছিল তাও ঘটে। জীবন মানে অপেক্ষা। একটা কুয়োর ভেতর যে পড়ে গেছে তার জীবন আবার অন্য কাহিনী নিয়ে আসে অনেক ঋতুবদলের পরে।

"I believe that we are put here in human form to decipher the hieroglyphs of love and suffering. And there is no degree of love or intensity of feeling that does not bring with it the possibility of a crippling hurt. But,it is a duty to take risk and love without reserve or defence."(Allen Ginsberg)

জীবনময় নিজের এই নিজস্ব পূর্ব-পশ্চিম এই কথা আমি অনুভব করেছি। পেয়েছি। তাই একেবারেই খাদের শেষে দাঁড়িয়ে নিচের অন্ধকার নয় নক্ষত্রখচিত আকাশ দেখেছি। আত্মহননের মুখে এসেও গিয়ার চেঞ্জ করেছি আলোর দিকে।

(ক্রমশ)

 

 

 

 

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন