![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
ছুটির দিন
নাঃ, একটা দিন ছুটি না নিলে আর চলছে না। বড় চাপের মধ্যে দিন কাটছে। বেশি কিছু না ভেবে বুধবার ছুটিটা নিয়েই নিলাম।
ঘুম থেকে উঠলাম বেলা করে। ল্যাপটপ, একগাদা ছাপানো কাগজপত্র ব্যাগে যেমন আছে রইল, ওদিকে তাকালামই না। ওরাও একটা দিন বিশ্রাম নিক। জিনসের প্যান্ট আর হালকা সবুজ টি-শার্টটা পরে সটান বেরিয়ে পড়লাম। কোথায় যাওয়া যায়! শহীদ-মিনারের দিকটায় যাওয়া যাক। ময়দানে একটু ঘুরেফিরে তারপর নয় বেণ্টিক স্ট্রীটের কোনো একটা রেস্তোঁরায় দুপুরের খাওয়াটা সেরে নেওয়া যাবে।
বেশ লাগছিল। আজ কোন কাজ নেই, মানে ছুটি নিয়েছি তো। দুপুরের দিকটায় ময়দানে খোলা আকাশের নিচে তেমন-কাজ-না-থাকা মানুষের বেশ এক মজলিশ বসে। কটা ছেলে ফুটবল ম্যাচ খেলছে, ইস্কুল বনাম ইস্কুল মনে হলো। ধারে বসে খেলা দেখছে তিন চারটে বুড়ো, এরা মনে হয় বাড়িতে খাতির-যত্ন পায় না। দুপুরটা মাঠেঘাটেই কাটিয়ে দেয়। একটা জায়গায় গোল করে লোক জমেছে – মাদারি খেলা। যাদুকরের অ্যাসিস্ট্যান্ট একটি ন-দশ বছরের মেয়ে। ডুগডুগি বাজলেই মেয়েটি ডিগবাজি দিচ্ছে। সরঞ্জামের মধ্যে – একটা বড় ঝুড়ি, বোধ হয় সাপটাপ আছে। একটা বাঁদর, দুটো পায়রা। লাঠি, দড়ি, লাট্টু। এখনো তেমন লোক হয়নি তাই ভীড় জমাতে লোকটি অর্নগল বকে যাচ্ছে। একটু দূরে দেখি আর একটি ছোট জটলা। একটা জটাওয়ালা লোক গাছ-গাছালি শেকড়-বাকড় ইত্যাদি অব্যর্থ ওষুধ নিয়ে বসেছে। তার মধ্যে একটা ওষুধের বিবরণ আমার মন টানলো। বৌ বা প্রেমিকার মন পাবার ওষুধ। হিমালয়ের এক ত্রিকালজ্ঞ ঋষির যুগান্তকারী আবিষ্কার। দুষ্প্রাপ্য এই ওষুধ প্রতি শিশি দশ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। দুজনকেই খেতে হবে, হাতেনাতে ফল এক মাসের মধ্যে।
এক শিশি নেবো না কি? কিন্তু রচনাকে খাওয়াবো কী করে? রচনার সঙ্গে আমার বেশ স্টেডি চলছিল মাস ছয়েক, আমি তো ভালোই জড়িয়ে পড়েছিলাম। মানে প্রেম জাতীয় কিছু একটা হয়ে গিয়েছিল মনে হয়। যাই হয়ে থাক তার ছাপ এখনো রয়ে গেছে। রচনাকে এখানে খুব মনে পড়ছে। কত দিন অফিসের পর এখানে এসেছি, গোলগাপ্পা খেয়েছি। গায়ে গা ঠেকিয়ে বসে থেকেছি। একদিন রচনা আমাকে ছেড়ে দিল। কারণটা জানি কিন্তু তবু মন মানতে চায় না। মন না মানলেও করবটা কী? রচনাকে কাছে পেলে নয় এক শিশি ওষুধ দুজনে খাওয়া যেত! তবে আমার যা কেস তাতে এ ওষুধে কাজ হতো কি!
খিদে পাচ্ছে। ধর্মতলা পার হয়ে, প্যারাডাইস সিনেমা বাঁ-দিকে রেখে গণেশ অ্যভেনিউ-এর দিকে এগোলাম। এ জায়গাটিতে বহু ছোটবড় আপিস, পাঁচমেশালি দোকান আর ফুটপাধে নানা ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেনের ভীড়। দুপুরের খাওয়ার আয়োজন ফুটপাথে ফুটপাথে। চাইনিজ থেকে মোগলাই, মাছের-ঝোল ভাত থেকে রুটি তরকারী। পেট রোগাদের জন্য চিঁড়ে-দই, স্বাস্থ্য সচেতনদের জন্য ফল, আখের রস। রিক্সা বা ঠেলাওয়ালদের মতো খেটে খাওয়া মানুষেরা বসেছে পেতলের থালায় ছাতু, তেলেভাজা আর পেয়াজ-লঙ্কা নিয়ে।
রচনা আর আমি কত রেস্তোঁরায় যে খেয়েছি! আধো-অন্ধকার পরদা ফেলা এসি রেস্তোঁরায় আমরা পায়রার মতো বকুম-বকুম করে অনেক কথা বলতাম! ওই ধরনের রেস্তোঁরায় আজ আর যেতে মন চাইল না। তার চেয়ে বরং খোলা রাস্তার দোকানে বসে খেলে কেমন হয়! অনেক কিছুই তো পাওয়া যাচ্ছে! ছুটির দিনে এরকম মধ্যাহ্ন-ভোজন ভালো মানাবে।
একটা জায়গায় বড় কড়াতে ভাজা হতে থাকা চাউমিনের মন-মাতানো সুঘ্রাণ আমাকে এমন টানল যে সেখানেই সরু বেঞ্চিতে বসে পড়লাম। আরও অনেকে ছিল দোকানটায়। খুব হৈচৈ হচ্ছিল। আমি কিছু অর্ডার করার আগেই সকলের মতো আমাকে একথালা চাউমিন আর চিলি-পনীর দিয়ে গেল। কী ব্যাপার? এটা কি চিনে-লঙ্গরখানা? পাত পেড়ে বসলেই হলো! যাকগে খেয়ে তো নিই! অসাধারণ স্বাদ! ভরপেট খেলাম। এবার দাম দিতে হবে – ও বাবা, দোকানদারের হেল্পার আমার হাতে দাম লেখা চিরকুট না দিয়ে একটা ছোট কাপ-আইসক্রীম ধরিয়ে দিল।
সেটা হাতে নিয়েই ঘটনাটা বুঝলাম। কোনো এক ব্যাক্তি জন্মদিন কিংবা চাকরিতে উন্নতির খাওয়া খাওয়াচ্ছে সহকর্মীদের। দোকানদার আমাকে ভুল করে খাইয়েছে। দোকানদারের অবশ্য কোনো দোষ নেই, সে চিনবে কী করে? তবে এবার যদি হিসেবের জন্য গোণাগুন্তি শুরু হয় তাহলে আমি কী করব! কিছু একটা করতে হবে তবে ছুটির দিনে অত মাথা খাটাবার দরকার নেই। আমি আইসক্রিমের কাপটা নিয়ে শান্তভাবে কেটে পড়লাম।
হেঁটে হেঁটে চলে গেলাম নদীর ধার অবধি। মনে হচ্ছিল রচনা যেন সঙ্গেই আছে। একা একা বসে রইলাম চুপ করে। অনেক দিন পরে সূর্যদেবকে ডুবতে দেখলাম। সুখের দিন দুঃখের দিন ছুটির দিন কাজের দিন – সূর্যদেব নিয়ম ভাঙেন না। মেঘে মেঘে একগাদা লাল-হলদে রং ছড়িয়ে সময় ধরে টুপ করে ডুবে যান রোজ। এবারে কী করা যায়? কী আর করি – বেশ মোজ করে এক ভাঁড় চা খেলাম। তারপর আপিস ভাঙার ভীড় শুরু হবার আগেই মেট্রো ধরে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
ছুটির দিনটা ভালোই কাটল। শুধু রচনা পাশে না থাকায় মনটা থেকে থেকে খালি মাঠের মত খাঁ খাঁ করছিল। রচনা আমাদের আপিসেই কাজ করত, এখনো করে। রচনা আমার কাছে আর আসে না। চার মাস আগে আমার চাকরিটা চলে গেছে যে! রচনাকে অবশ্য এর জন্য আমি দোষ দিইনি কখনো।
ছুটি শেষ। কাল থেকে আবার কাজ শুরু। ছাপান্নটা বিফল দরখাস্তের পর কাল সকালে সাতান্ন নম্বর থেকে শুরু করব।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন