![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
অমলকান্তির ঘুম আসে না
(১)
আজকাল অমলকান্তির ঘুম আসতে চায় না। এলেও রাত বিরেতে, ভোরে ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে গেলে অমলকান্তি কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে, কখনো উঠে বসে থাকে বিছানায়। টের পেলে কালিন্দীও (অমলকান্তি স্ত্রী অপরাজিতাকে আদর করে এই নামে ডাকে) উঠে বসে। উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞেস করে, “কী গো কী হলো, শরীর খারাপ লাগছে?” অমলকান্তি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে ওঠে, “শরীর তো মনে হয় ঠিকই আছে, তবে ঘুম আসে না কালিন্দী, ঘুম আসতে চায় না।” অপরাজিতা বলে, “কাল চলো, একবার ডাক্তার দেখিয়ে আসি”। অমলকান্তি বলে, “এ ডাক্তারের কম্ম নয় কালিন্দী, এ মনের অসুখ”। অপরাজিতা আঁতকে উঠে বলে “সে কি, তোমার আবার কবে থেকে মনোরোগ ধরল, কিসের ডিপ্রেশন তোমার?”
“জানি না,
শুধু
জানি আমার ভীষণ রাগ হয়,
কষ্ট
হয় আর একটা ছটফটানি সবসময় তাড়া করে। বন্ধুরাও বলে, আজকাল আমি নাকি অকারণে ভীষণ রিঅ্যাক্ট করি, আর ওরাও তাতে দুঃখ পায়।
অথচ আমি আগে তো এরকম ছিলাম না!”
“বয়স হলে মানুষ একটু আধটু খিটখিটে হয়, ও আর এমন কী; সব ঠিক হয়ে যাবে, এখন চোখমুখে জল দিয়ে, একটু জল খেয়ে ঘুমোনোর
চেষ্টা করো”।
একথা বলে অপরাজিতা অমলকান্তির পিঠে, মাথায়, হাত বুলিয়ে দেয়। অমলকান্তি বাধ্য ছেলের মত
বেসিনে চোখে-মুখে-ঘাড়ে জল দেয়। ডাইনিং টেবিলে রাখা জলের বোতল থেকে জল খায়।
অপরাজিতার গায়ে হাত রেখে শুয়ে পড়ে। কোনো কোনো দিন ও সত্যিই ভোরের শিরশিরে বাতাসের
শীতল স্পর্শে ঘুমিয়ে পড়ে। যেদিন ঘুম আসে না সেদিন পুবের খোলা জানালায় তাকিয়ে থাকে; ভোরের পাখির মিষ্টি ডাক
শোনে।
(২)
কম বয়সে অমলকান্তি ভীষণ ঘুম কাতুরে ছিল। সারাদিনের খেলা, দুষ্টুমি, গাছে চড়া, সাঁতার কাটার পর সন্ধ্যায় পড়তে বসলেই অমলকান্তি ঘুমে নেতিয়ে পড়ত। এর মধ্যে হয়ত পড়া ফাঁকি দেওয়ার একটু নাটকও মিশে থাকত। ওর যে পড়তে ভাল লাগত না! একটু বড় হয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময়ও ওর স্বভাব এক চুল পাল্টায়নি। অনেক সময় সীট না পেলে বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একঘণ্টা পর ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরত। বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুম সেরে নিত। গ্রীষ্মের ছুটিতে পেঁয়াজ পান্তা কাঁঠাল খেয়ে ভ্যাপসা গরমে সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমোত। ভাবত, ঘুমের সঙ্গে ক্লান্তি আর শান্তির নিশ্চয়ই গভীর সম্পর্ক আছে।
এই সত্তরবছর বয়সে অবসর জীবনে অধ্যাপক অমলকান্তি বিশ্বাসের
তেমন কাজ নেই। কাজ বলতে সপ্তাহে দু-তিন দিন বাজারে যাওয়া, মাসে এক দুদিন ব্যাঙ্কে যাওয়া। দু-তিনজন
বন্ধু আছে, ওদের সঙ্গে
কালেভদ্রে সান্ধ্য-আড্ডা। বাকী সময় বই পড়া, পত্র-পত্রিকায় টুকটাক লেখালেখি। মাঝে মাঝে
খোলা গলায় গান গেয়ে ওঠা। অনেকটা দেবব্রতর মত। কিছুদিন রবীন্দ্রসংগীত শিখেছিল
অমলকান্তি। অভ্যাসে তাই গেয়ে ওঠে। অন্য গানও গায়। লাতিন আমেরিকার ফোক ওর খুব প্রিয়, গ্রানাডার ফোক, পর্তুগালের ফোক, লালনের গান। প্রাণে ভরা
বাঁধন হারা সেসব গান। গান শুনতে শুনতে একটু স্প্যানিশ শিখে নিয়েছে অমলকান্তি। ও ভাবে, ভাষা না জানলেও
গান শোনা যায়, সুরে যাদু আছে যে! অপরাজিতা অমলকান্তির গান শুনে মজা পায়, পেছনে লাগে। সুর আর শব্দ
বিকৃত করে অপরাজিতাও মাঝে মাঝে দু-এক কলি গেয়ে ওঠে অমলকান্তিকে রাগানোর জন্য।
অমলকান্তি আগে রাগ করত;
বলত, “কালিন্দী, শিল্পীদের ভ্যাঙ্গাতে
নেই, একটু উৎসাহ তো
দিতে পার।” এখন ও হাসে।
দূরে ছড়িয়ে থাকা কাছের মানুষ, ছাত্র-ছাত্রীরা মাঝে মধ্যে ফোন করে, খবর নেয়। তবে আজকাল ফোন
কমই আসে। আগে অনেকে খবর নিত,
বাড়ি
এসে গিফ্ট হাতে স্কলাররা দেখা করত। এখন আর তেমন কেউ বাড়িতে আসে না। অমলকান্তি ভাবে, মানুষ বুড়ো হলে তাদের
প্রয়োজন এভাবেই ফুরিয়ে যায়। তাদের একা একা বাঁচার অভ্যাস করে নিতে হয়। চোখের সামনে
প্রতিবেশী, কাছের মানুষ –
সবাই অকারণে নিজেদের গুটিয়ে গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। অমলকান্তির ভয় হয়, “হঠাৎ মরে গেলে, লোকজন আসবে তো, শেষকৃত্য …!” অমলকান্তি
অপরাজিতাকে ডেকে বলে,
“এই
ক’জন বন্ধুর নাম আর ফোন নম্বর সেভ করে রাখো; দুর্দিনে ডাকলে ওরা আসবে নিশ্চয়ই!”
পড়তে পড়তে লিখতে লিখতে অমলকান্তি কোথায় ভেসে যায়, আনমনা হয়ে কীসব ভাবে। আলোর গতির চেয়েও দ্রুত মন ভেসে বেড়ায় কোন অজানায়। আজকাল অমলকান্তি সব কিছু ভুলে ভুলে যায়। দরকারে পরিচিত জনের নামগুলোও মনে আসে না। ফোনে সেভ করা আছে অথচ নাম মনে আসছে না। এ যে কী যন্ত্রণা! সেদিন প্রাতঃভ্রমণে রাস্তায় এক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা। সে হাসি মুখে বলে উঠল, “কী অমলবাবু, কেমন আছেন?” অমলকান্তিও হাসিমুখে বললেন, “ভাল আছি, আপনি ভাল তো, শরীর …?” সহকর্মী বলল, “ভালই আছি, তবে সত্যি কথা বলতে কি, আজকাল কেউ ভাল নেই; আমরা মিছিমিছি বলি ‘ভাল আছি’”। অমলকান্তি বলল, “তা যা বলেছেন, এরকম সত্যি কথা আর ক’জন বলতে পারে?” সহকর্মী বলে, আচ্ছা আপনার শ্যালক কেমন আছে?
কার কথা বলছেন বলুন তো?
আরে ওই যে ছিপছিপে ছেলেটি, আপনার বাড়িতে থাকতো, কী যেন পড়তে এসেছিল। আমার ছেলের খুব বন্ধু
ছিল। আমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে আসত, আমাকে কাকু বলে ডাকত। চমৎকার ছেলে ছিল। কী যেন নাম…?
হ্যাঁ,
মনে
পড়েছে, আমার শালা
আমাদের কাছে ছ’মাস ছিল। তবে নামটা যেন কী …, নামটা … ঠিক কী বলুন তো … নামটা না …
কিছুতেই…!
অমলকান্তির কিছুতেই নিজের শ্যালকের নাম মনে পড়ল না।
অমলকান্তি সহকর্মীর অবাক মুখের দিকে কিছুক্ষণ অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকল, তারপর বিড় বিড় করতে লাগল, “নামটা না … নামটা … কী
যেন, কিছুতেই মনে পড়ে
না…, আমি কি তবে
ডিমেনশিয়ায়…! অমলকান্তির নিজের উপর রাগ হয় মনে না পড়ার এই সব মুহূর্তে; আজকাল যা ঘন ঘন ঘটছে।
(৩)
অপরাজিতার অনেক দিনের মডুলার কিচেনের সখ। অমলকান্তি রাজী ছিল না, বলত, “কী আর হবে কালিন্দী? আমার মা গ্রামের বাড়িতে সারাজীবন ঘুঁটে আর খড়ি দিয়ে রান্না করেছে। রান্নাঘরের তাকগুলো ঢেকে দিলে আরশোলারা নিজেদের মুক্ত সাম্রাজ্য গড়ে তুলবে; তুমি যে আরশোলা দেখলে চীৎকার করো”।
সব জমানো টাকা আর লোন নিয়ে অনেক দিনের সখের বাড়ি। সামনে
একটু ফাঁকা জায়গা, ছোট্ট বাগান।
তাও কুড়ি বছর পেরিয়ে গেল। অপরাজিতা মাঝে মাঝে মনে করায়, “কি গো আমার মডুলার কিচেনের কী হল?” অমলকান্তি নানা বাহানায়
আজ করি কাল করি করে করে এতদিন পিছিয়ে দিয়েছে। মাস খানেক বাদে ওদের বিয়াল্লিশতম
বিবাহ বার্ষিকী। এক শীতের বিকেলে দুজনে মুখোমুখি বসে চা খাচ্ছিল; অপরাজিতা হঠাৎ বলে উঠল,
“আমার মডুলার কিচেনের সখ আর এ জীবনে পূরণ হবে না। জীবন তো
কেটেই গেল। মেরেকেটে আর দশ,
বেশি
হলে পনের…। দেখবে একদিন আমি চোখ বুজব আর পেত্নি হয়ে তোমার ঘুমের মধ্যে এসে বলব, “কী গো আমার মডুলার
কিচেনের কী হল, সারা জীবনে
একটাই আবদার করলাম, সেটাও পূরণ করলে
না!”
অমলকান্তি অপরাজিতার চোখের দিকে তাকাল। কত মায়া, কত সারল্য অপরাজিতার
দু’চোখে। সারা জীবন অমলের ছায়া হয়ে অপরাজিতা ওকে আগলে রেখেছে। উজাড় করে ভালবেসেছে।
খুব সখ ছিল ওদের একটা মেয়ে,
একটা
ছেলে হবে; ঘরময় খেলে
বেড়াবে, দুষ্টুমি করবে…।
নিঃসন্তান অপরাজিতার গভীর চোখে অমলকান্তি অনেক বছর ভাল করে চেয়ে দেখেনি। কত না-বলা
কথা পড়া হয়নি। নিজের মনের গভীরে লুকিয়ে রাখা বাবা না হতে পারার ব্যথা কোনোদিন মুখ
ফুটে বলা হয়নি। পরস্পরকে কষ্ট দেওয়ার ভয়ে কেউ এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা পর্যন্ত করেনি।
দুজনই যুক্তি সাজিয়ে মনে মনে এ ব্যথা ভুলে থাকতে চেয়েছে। সাতপাঁচ ভেবে অমলকান্তি
নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করে,
সামনের
বিবাহ বার্ষিকীর আগেই অপরাজিতার সাধের মডুলার কিচেন বানিয়ে দেবে।
একটু খোঁজ খবর নিয়ে জানল, ওর স্কুলের বন্ধু স্বপন বসুর ছেলে রাহুল ইঞ্জিনিরারিং পাশ করে ক’বছর কর্পোরেটের দাসত্ব করে চাকরি ছেড়ে এখন নিজের ইনটেরিয়র ডিজাইনিং-এর ব্যবসা খুলেছে। স্বপন একটু বেশী কথা বলে, নিজের কথা একটু বাড়িয়ে বলে। তবে ওর মধ্যে কোনোদিন কোনো কপটতা চোখে পড়েনি অমলকান্তির। ছোট্ট রাহুলকে কয়েকবার দেখেছে অমল, তবে তা অনেক বছর আগে, তাই চেহারাও ঠিক ঠাক মনে নেই। মনে থাকবেই বা কেন? স্বপন ব্যাঙ্কে চাকরি পাওয়ার পর সারা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছে। হঠাৎ-মটাৎ দেখা হয়েছে বাজারে বা স্টেশনে। দু-চার কথা হয়েছে নিশ্চয়ই, কে কেমন আছে, বউ, ছেলেপুলের খবর, তারপর যে যার পথে। কিছুদিন আগে এরকম এক অনুষ্ঠানে দুই বন্ধুর দেখা হয়। পাঁচ কথার মধ্যে স্বপন অমলকান্তিকে জানায় যে রাহুল এখন এসব কাজ করে। কথাটা অমলকান্তির মনে ছিল।
ফোনে মডুলার কিচেনের কথা পাড়তেই স্বপন বলে উঠে –
আরে অমল,
চিন্তা
করিস না। আমি কালকেই রাহুলকে পাঠিয়ে দেব। চমৎকার ছেলে রাহুল, খুব ভাল কাজ করছে। ওর
মিস্ত্রিরাও সব টপ ক্লাস। তুই ওকে বুঝিয়ে বলিস, সব ওরা করে দেবে। তুই চোখ বন্ধ করে ওদের
ভরসা করতে পারিস।
বন্ধু স্বপনের কথায় অমলকান্তির মুখে হাসি ফুটল। এক গাল হেসে
অপরাজিতাকে ডেকে বলল,
দেখলে
কালিন্দী, দরকারে স্কুলের
বন্ধুরাই কাজে আসে। ওরাই পরিষ্কার মনে স্বার্থহীনভাবে বন্ধুর পাশে দাঁড়ায়। ওর ছেলে
রাহুল, নিশ্চয়ই ওর মতই
ভাল মানুষ হবে। ছোটবেলায় আমি ওকে কতবার চকলেট দিয়েছি, গল্প শুনিয়েছি, অবশ্য, ওর সেসব কথা নাও মনে থাকতে পারে। ওকে কাজ
বুঝিয়ে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হব। তাহলে, শেষমেষ তোমার মডুলার কিচেন হচ্ছে বল!
অপরাজিতা জানে অমলকান্তি এখনো ছেলেমানুষ। সবাইকে বিশ্বাস
করে। বারবার ঠকে, দুঃখ পায়, তাও বিশ্বাস করে। যেন, কাউকে অবিশ্বাস করা ওর
রক্তে নেই। তা জানে বলেই অপরাজিতা অমলকান্তিকে সাবধান করে। কিন্তু মানুষকে বিশ্বাস
করার অভ্যাস ও কিছুতেই ছাড়তে রাজি নয়।
পরদিন সকালে অমলকান্তি সামনের বারান্দায় বেতের চেয়ারে শরীর
এলিয়ে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছিল। পৌষের সকালের মিষ্টি রোদ ওর শরীরে উষ্ণতা
ছড়িয়ে দিচ্ছিল। বাড়ির সামনে একটা বাইক এসে দাঁড়াল। অমলকান্তি সে দিকে তাকাতেই এক
৩৫-৩৬ বছরের যুবক বলে উঠল,
“কাকু, আমি রাহুল”। অমল হেসে
বলল, “হ্যাঁ রাহুল, বুঝতে পেরেছি, উপরে উঠে এস”।
অমলকান্তি নিচে গিয়ে দরজা খুলে দিল। ফর্সা গোলগাল ছোটখাটো
চেহারার রাহুল। ওর ছোট ছোট পায়ে দুলকি চলনে একটু মেয়েলী ভঙ্গি মিশে আছে। ওর পেছন
পেছন একজন কালো লম্বা,
পেটানো
শরীর লোক এল। রাহুল পরিচয় করিয়ে দিল, “কাকু এ হল চিত্ত, আমার হেড মিস্ত্রী”।
রাহুল স্মার্ট ছেলে। ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে কথা বলে। কিছু
পারিবারিক কথা শেষে অমলকান্তি আর অপরাজিতা রান্নাঘর দেখাল; রান্নাঘরের পেছনের ব্যালকনি দেখাল। অপরাজিতা
অমলকান্তিকে বলল, “কাজ যখন হচ্ছেই
তখন আমাদের পুরনো ড্রেসিংটেবিল আর তার লাগোয়া ঠাকুর রাখার সেলফটাও হোক। অমলকান্তির
বই কেনার সখ সারা জীবনের;
ঘরে
অনেক বই জমেছে, ঢাই হয়ে পড়ে আছে
যত্র তত্র অবহেলায়। অমলকান্তি অনেকদিন ধরে ভাবছে বইগুলো একটু ভদ্র-সভ্য ভাবে রাখার
ব্যবস্থা করা দরকার; ওরা যে ঠাকুর
দেবতার মতোই পবিত্র, অবহেলা করতে
নেই। তাই পড়ার ঘরে একটা বইয়ের আলমারি চাই। সব মিলিয়ে অনেক সখ, অনেক কাজ। সেগুন কাঠ এখন
মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। প্লাইয়ের উপর সানমাইকা পেস্ট করে বানালে খরচ সাধ্যের
মধ্যে থাকবে। অমলকান্তির একটা ধারণা ছিল আড়াই লাখের মধ্যে সবকিছু হয়ে যাবে।
অমলকান্তি আর অপরাজিতা মিলে ওদের ইচ্ছের কথা খুলে বলল।
রাহুল এক গাল হেসে (হাসলে ওর গালে হালকা টোল পড়ে আর একটা সারল্য ছড়ায়) বলল, “কাকু তুমি চিন্তা করো না, সব হয়ে যাবে”। এরপর
ডিজাইন বই থেকে অনেক মডুলার কিচেনের ছবি দেখাল, মাইকার শেড নিয়ে কথা হল। অপরাজিতা মাতৃস্নেহে
ফ্রিজ থেকে মিষ্টি আর চা বানিয়ে খেতে দিল। রাহুল বলল, “কাকু আমি কাল প্লাইবোর্ডের স্যাম্পল নিয়ে
আসব। পরশু সব মাল কেনা হলে তার পরদিন থেকে কাজ শুরু হবে”। অমলকান্তির বিবাহ
বার্ষিকীর কথা মাথায় ছিল তাই আবদারের সঙ্গে বলল, “রাহুল, দু সপ্তাহের মধ্যে কাজ কমপ্লিট করা চাই”। রাহুল চিত্তর
সঙ্গে আলোচনা শেষে বলল,
“কাকু, দুসপ্তাহে হবে না, তবে তিন সপ্তাহের মধ্যে
অবশ্যই সব কাজ শেষ হবে”।
পরদিন সকালে রাহুল আবার এল চিত্তকে সঙ্গে নিয়ে। বিভিন্ন ব্রান্ডের প্লাইয়ের স্যাম্পল দেখাল। আলোচনা করে একটা সিলেক্ট করা হল। রাহুল খাতা কলম, ক্যালকুলেটর নিয়ে হিসেব করে বলল, “কাকু আপনার সাড়ে তিন লাখ টাকার আসেপাশে খরচ হবে”। টাকার অংক শুনে অমলকান্তি আঁতকে উঠল, এ যে ওর ধারণার বাইরে। অমলকান্তি কিছুক্ষ্ণ চুপ করে থাকল, অপরাজিতার মুখে তাকিয়ে একটা মলিন হাসি হাসল। আবার ভাবল, অপরাজিতার সখ পূরণের ব্যাপার, খরচের কথা ভাবলে চলবে কেন। অপরাজিতার মুখে হাসি দেখতে হলে একটু খরচ তো করতে হবে। একটা ছোটখাটো ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙলেই টাকার জোগাড় হয়ে যাবে। অমলকান্তি তাও ভাবল এত খরচ নিশ্চয়ই হবে না। একটু কাচুমাচু করে রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলল, “রাহুল, তিনের মধ্যে রাখার চেষ্টা করো”। রাহুল বলল, “কাকু, খরচা নিয়ে আপনি ভাববেন না, আমার উপর ভরসা রাখুন, আমি নিশ্চয়ই আপনার বেশি খরচ হোক তা চাইব না”। বন্ধুর ছেলে, তাই বেশি দরকষাকষি করতে অমলকান্তির বাঁধল। তাই কথা না বাড়িয়ে বলল, “ঠিক আছে রাহুল, আই ট্রাস্ট ইউ”।
পরদিন সকালে ট্রলি করে মাল এল। মাল নামানোর সময় চিত্ত ওর
দুই সাগরেদ নিয়ে হাজির হল। অমলকান্তি মালের বিল আর ট্রান্সপোর্ট খরচ মিটিয়ে দিল।
সেদিন থেকেই কাজ শুরু হয়ে গেল। টিনের চাল দেওয়া চারদিক খোলা ছাতে কাজের ব্যবস্থা
হলো। মিস্ত্রিরা সারাদিন,
এমনকি
সন্ধ্যার দিকেও কাজ করতে লাগল। কাজের সুবিধের জন্য ছাদে অতিরিক্ত আলোর ব্যবস্থা
করা হল। মিস্ত্রিরা কাজ করে,
অমলকান্তি
আর অপরাজিতা পালা করে দেখে আসে,
মিস্ত্রিদের
খোঁজখবর নেয়। অপরাজিতা নিজের হাতে চা বানিয়ে দেয়। বিস্কুট দেয়, ফিলটার থেকে খাওয়ার জল
ভরিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে গল্প করে,
ওদের
পরিবারের কথা, জীবনের কথা
জানতে চায়। ওরাও অপরাজিতাকে “কাকিমা” বলে ডাকে; অপরাজিতা স্নেহভরা চোখে ওদের বিরামহীন কাজ
করা দেখে। ওদের মধ্যে একটু কম বয়সি যে সে সারাদিন মোবাইলে ভজন আর হরিনাম শোনে।
চটুল হিন্দি গানও শোনে পালা করে। চোখের সামনে অপরাজিতার এবং নিজের ধুলো পড়া
শখ ডানা মেলছে দেখে দুজনের মনেই এখন খুশির
হাওয়া।
(৪)
কাজ এগোলেও অমলকান্তির মনে একটা সন্দেহ বার বার খোঁচা দিচ্ছিল - রাহুল এত টাকা চাইছে কেন? ও বাড়িয়ে চড়িয়ে বলছে না তো? অমলকান্তি তো বন্ধু স্বপনকে যে বিশ্বাসের চোখে দেখে সেই চোখ দিয়েই রাহুলকে দেখেছে। ও বিশ্বাসের সুযোগ নিচ্ছে না তো? বিছানায় শুয়ে নিজের সন্দেহের কথা ও অপরাজিতাকে বলে। অপরাজিতা জীবনে কোনোদিন হিসেব নিকেশ করেনি। তবু ও অমলকান্তির কথায় সায় দিয়ে বলে, “আমারও কিন্তু তাই মনে হয়, এত টাকা লাগার কথা নয়”। একথা ভেবে ভেবে অমলকান্তি সারারাত ছটফট করে। আবার এক নিদ্রাহীন রাত। স্কুলে পড়া রবিঠাকুরের কবিতার একটা লাইন – “মুক্তি? ওরে মুক্তি কোথায় পাবি, মুক্তি কোথায় আছে?” – অমলকান্তির চেতনায় দাপিয়ে বেড়ায় সাঁজোয়া গাড়ির মত বিরক্তিকর ঘড় ঘড় শব্দে।
অমলকান্তি মনে মনে রাহুলকে প্রথম দেখার পর যে সব ঘটনা ঘটেছে
তা একটু একটু করে বিশ্লেষণ করতে শুরু করে। এবার অমলকান্তির গোয়েন্দা সত্ত্বা জেগে উঠল।
সত্তরবছর বয়স, সারাজীবনে কত
দায়িত্ব সামলেছে, কত রকমের
মানুষের সঙ্গে কাজ করেছে,
রাহুলের
চালাকি ধরা ওর কাছে জলভাত। অমলকান্তির প্রথমেই মনে পড়ল প্রথমে রাহুল যে প্লাই
দেখিয়েছিল তার দাম যা বলেছিল এবং বিলে যে দাম ধরা হয়েছে দুটোর মধ্যে প্রতি স্কয়ার
ফুটে পনের কুড়ি টাকার পার্থক্য। দ্বিতীয়ত, স্যাম্পল প্লাইয়ে ২৫
বছর গ্যারান্টি অথচ কেনা প্লাইয়ে লেখা ২০ বছর। অমলকান্তির মনে পড়ল ব্রান্ডের নাম
এক হলেওস্যাম্পল প্লাইয়ে
“গোল্ড”
লেখা ছিল অথচ কেনা প্লাইয়ে লেখা “সিলভার”। অর্থাৎ, নিম্ন মানের প্লাই কেনা হয়েছে। এবার
অমলকান্তির মনে হল রাহুল ওকে ঠকিয়েছে। একলক্ষ তিরিশ হাজার টাকার প্লাই কেনা হয়েছে।
আনুষঙ্গিক জিনিস কেনা হয়েছে আরও ৩০-৪০ হাজার টাকার। নিজের সন্দেহ সম্পর্কে
সুনিশ্চিত হতে অমলকান্তি এক বিকেলে শিলিগুড়ি চার্চ রোডে গেল। ওখানে নির্মাণ-সামগ্রীর
সারি সারি দোকান। অমলকান্তি তিন-চার দোকান ঘুরে ওই ব্রান্ডের প্লাইয়ের রেট নিল।
এবং সুনিশ্চিত হল যে,
প্রতি
স্কয়ার ফুটে ১৫-২০ টাকা বেশি ধরা হয়েছে। সব জিনিস মিলিয়ে প্রকৃত দামের থেকে প্রায়
কুড়ি পঁচিশ হাজার টাকা বেশি!
বিশ্বাস ভাঙলে সবার দুঃখ হয়। অমলকান্তিরও দুঃখ হল। এক লহমায়
রাহুলের উপর সব বিশ্বাসের সলিল সমাধি ঘটল। রাতে আবার অমলকান্তি বিছানায় ছটফট করল। অপরাজিতাকে সব কথা
খুলে বলল। আবার নিদ্রাহীন একরাত। অপরাজিতা সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “রাহুলকে তোমার সব কথা
খুলে বলা উচিৎ।” অমলকান্তি চুপ করে ভাবে কী করা উচিত। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “দেখি, ভেবে! তবে, জানো কালিন্দী, কাজটা সহজ নয়।”
পরদিন সকালে চিত্ত আর অন্যান্য মিস্ত্রীর সঙ্গে রাহুলও এল। কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখল। অমলকান্তির সঙ্গে অনেক গালগল্প করল। অমলকান্তি এখন রাহুলকে ভিন্ন চোখে দেখছে তাই কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছে। অপরাজিতা অন্যদিনের মতো চা বানিয়ে দিল। ফ্রীজ থেকে মিষ্টি খেতে দিল। ঘণ্টা খানেক বাদে যাওয়ার জন্য রাহুল উঠে দাঁড়াল। বলল, “কাকু, আজ তবে আসি। আবার পরশু আসব”। অমলকান্তি রাহুলের সঙ্গে অন্যদিনের মতো স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। বুঝতে দিল না, ভিতরে কী ঝড় বইছে। দু’একবার মনে হল, সব বলে, কিন্তু অদ্ভুত এক জড়তা ওকে নিবৃত্ত করল। শুধু বলল, “রাহুল আমাকে কোন খাতে কতো খরচ হবে একটু বুঝিয়ে বললে ভাল হত; যাকে বলে হেডওয়াইজ ব্রেক আপ”। এ কথা শুনে রাহুল একটু হকচকিয়ে গেল; তবে মুখে বলল, “নিশ্চয়ই কাকু, পরশু যখন আসব, তখন বুঝিয়ে দেব”।
রাহুল চলে গেলে অমলকান্তি ছাতে গেল। চিত্তর সঙ্গে দু’চার কথা সেরে জিজ্ঞেস
করল, “আচ্ছা চিত্ত, তুমি এই কাজের জন্য কত
টাকা পাবে”? চিত্ত এ
প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিল না। এক মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “কাকু, আমরা কাজ শেষ হলে সব
কাজের সামনের দিক মেপে প্রতি স্কয়ার ফুট ৩৫০ টাকা করে নেব, ওটাই আমাদের স্ট্যান্ডার্ড রেট। এখন দেখুন রাহুলদা
কী বলে”।
দুদিন পর সকালে রাহুল এল। এক গাল হাসল। অপরাজিতা চা বানিয়ে
দিল। অমলকান্তি বলল,
“হিসেব
এনেছ?” রাহুল বলল,
বলছি কাকু। আমাকে মাল কেনার রসিদ একবার দেখাবে?
অমলকান্তি একগুচ্ছ রসিদ এনে রাহুলের হাতে দিল। রাহুল একটা
কাগজে সব প্লাইয়ের হিসেব লিখল। ফোনের ক্যাল্কুলেটার বের করে হিসেব করে বলল, “কাকু সব কাজের মজুরি
আসছে এক লাখ আটষট্টি হাজার টাকা;
তুমি, একলাখ ষাট হাজার দিয়ো।”
অমলকান্তি আঁতকে উঠে বলল,
“এত!”
রাহুল বলল,
দাঁড়াও,
তোমাকে
বুঝিয়ে বলছি। তোমার যত প্লাই এসেছে প্রতি স্কয়ার ফুট দুশো করে ধরলে এই অংক আসে। চিত্ত
২৫০ টাকা চেয়েছিল, আমি বলেছি, কাকুর কাছ থেকে ২০০
টাকার বেশি নেওয়া যাবে না।
চিত্ত যে আমাকে বলল, ওরা কাজ শেষ হলে ফ্রন্ট মেপে হিসেব করে!
তাহলে তো তোমার অনেক বেশি পড়বে। প্রতি স্কয়ার ফুট ৪৫০ টাকা
করে।
চিত্ত যে বলল, ৩৫০ টাকা,
আমার
তো মনে হয় তাতে অনেক কম আসবে।
না কাকু ও ঠিক বলেনি।
চিত্ত আর রাহুলের কথা না মেলায় অমলকান্তির অবিশ্বাস আরও
বাড়ল। কিন্তু রাহুলের সঙ্গে দর কষাকষি করতে ওর মন সায় দিল না। তাই ও আর কথা বাড়াল
না। এরপর রাহুল বলল,
কাকু আমার কনসালটেন্সি ফী কিছু দেবে না? তোমার যা মন চায় তাই
দিও। তবে বাবাকে এ ব্যাপারে কিছু বলো না।
অমলকান্তির এবার ভীষণ রাগ হল। বন্ধুর ছেলে এতটা লোভী আর
নির্লজ্জ হতে পারে ভেবে ও অবাক হল। বন্ধু স্বপনের সদা-হাস্য মুখ মনে পড়ল। মনে হল, ভিতরে ভিতরে
গুমরানো কথাগুলো উগলে দিয়ে হালকা হয়। কিন্তু ও তা পারল না। নিজের সব রাগ চেপে গিয়ে
বিরক্তি-ভরা মুখে বলল,
“দেখি!”
(৫)
সারাক্ষণ একটা ছটফটানি অমলকান্তিকে গ্রাস করল। ও এখন এর কাজের অগ্রগতি দেখতে ছাতে বা রান্নাঘরে যায় না। ওদিকে চোখ পড়লেই মনে হয়, সবাই মিলে ওকে ঠকানোর ফাঁদ পেতেছে। মনে হয়, নগ্ন প্লাইগুলো ওর দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। রাতে ঘুম আসে না অমলকান্তির। একটু ঝিমুনি এলে আধো-স্বপ্নে দেখতে পায় ঘূণধরা প্লাই খসে খসে পড়ছে। ভাবে, রাহুলকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিৎ হয়নি। অপরাজিতা একটু ইঙ্গিত দিয়েছিল; কিন্তু, ঐ যে অমলকান্তির মানুষকে বিশ্বাস করার পুরনো অসুখ! অমলকান্তির সাবধানী হওয়া উচিত ছিল। একটু কষ্ট করে চার্চ রোডে গিয়ে তিন দোকান দেখে দাম-দর করে অনেক ভাল মানের প্লাই কেনা যেত। তাতে কাজ ভালো হতো। অন্তত কুড়ি-পঁচিশ হাজার টাকা বাঁচত।
পরদিন সকালে অমলকান্তি নিজে টেপ হাতে সমস্ত কাজ মেপে দেখল।
দেখল, কিছুতেই ২৫০
স্কয়ার ফুটের উপর আসছে না। চিত্তর দেওয়া রেট (৩৫০ প্রতি স্কয়ার ফুট) ধরলে মোট মজুরি হয় একলক্ষ
টাকারও কম। সেখানে রাহুল ধরেছে একলক্ষ ষাট হাজার। অর্থাৎ মাল এবং মজুরি মিলিয়ে
প্রায় আশি-নব্বই হাজার টাকা বেশি নিচ্ছে রাহুল। তার উপর লজ্জাহীনের মতো
কনসালটেন্সি ফী চেয়ে বসে আছে। অমলকান্তির মনে হল অন্য কোনো কোম্পানির কাছে কোটেশন
নিয়ে কাজে নামা উচিত ছিল। টাকার চেয়েও বড় হল বিশ্বাস ভেঙে যাওয়া। আর এ ব্যাপারটা ও
কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। ভাবে, কেন যে মানুষ ছলচাতুরি করে, লাভ কি হয় তাতে কিছু? তবে ওর মনে ঠিক কী চলছে
রাহুলকে তা বুঝতে দিল না। রাহুল সেয়ানা ছেলে; ও বুঝতে পারল যে অমলকান্তি এখন ওকে সন্দেহের
চোখে দেখছে। মানুষের মনের কথা আচরণে অগোচরেই প্রকাশ পায়। অমলকান্তি লক্ষ্য করল, রাহুল প্রথম দিকে একদিন
পর পর আসত কাজের অগ্রগতি দেখতে;
ইদানিং
আর আসছে না। তবে কি ওর মনে পাপবোধ কাজ করছে?
কাজ এগিয়ে চলল। রোজকার মতো অপরাজিতা মিস্ত্রীদের দু’বেলা চা বানিয়ে দেয়। অমলকান্তি নিজেকে ভোলাতে পড়তে বসে, লেখায় মন দেয়। কাজ যখন শেষের দিকে তখন একদিন রাহুলের ফোন এল,
কাকু ভালো আছ; আমি ক’দিন আসতে পারিনি, কাটিহার যেতে হয়েছিল প্রজেক্টের কাজে। কাল
একবার আসব।
এস
কিন্তু পরদিন রাহুল এল না। অমলকান্তি ভাবল হয়ত রাহুল চাপে
আছে, ওর মুখোমুখি হতে
চাইছে না। কাজ শেষ হওয়ার দুদিন আগে অমলকান্তিকে কলকাতায় যেতে হল হেলথ চেক আপের
জন্য। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আগেই করা ছিল। অপরাজিতা মিস্ত্রিদের বলল কাজ বন্ধ
রাখতে। চিত্ত বলল, “কাকীমা, আমাদের অন্য জায়গায় কাজ
ধরা আছে, পরশু দিনের মধ্যে
আমরা কাজ শেষ করতে চাই। আপনি কাকুকে বলবেন আরও দশ হাজার টাকা মজুরি রেখে যেতে”।
দুদিন বাদে অমলকান্তি ডাক্তার দেখিয়ে ফিরল। মিস্ত্রিরা এর মধ্যে কাজ শেষ করে চলে গেছে। সব হিসেব মেলানো হয়নি। অমলকান্তি চাইছে রাহুল একদিন আসুক; ওর সঙ্গে একবার মুখোমুখি কথা বলা দরকার। এরই মধ্যে ১১০,০০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়েছে। রাহুলের হিসেব অনুযায়ী ওদের তখনো পঞ্চাশ হাজার পাওনা। একদিন বাদে চিত্ত ফোন করল,
কাকু,
আপনি
ফিরেছেন?
হ্যাঁ,
গতকাল
সকালে ফিরেছি।
আজ আসব বাকী টাকা নিতে?
আজ নয় কাল সকালে এস। তবে রাহুলকে সঙ্গে নিয়ে এস।
পরদিন সকাল এগারটা নাগাদ একটা বাইক এসে বাড়ির সামনে দাঁড়াল। রাহুল আর চিত্ত দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল। অমলকান্তি ওদের বসতে বলল। রাহুল বলল, ‘কাকু এবার তাহলে মেপে দেখা যাক”।
চিত্ত টেপ বের করে সব কাজ মাপতে শুরু করল। সেলফ, ড্রেসিংটেবিল, বইয়ের র্যাক। সামনে, পাশে, ভিতরে সব মেপে বলল, “৪০০ স্কয়ার ফুট”। মাপার
পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে অমলকান্তি বলল, চিত্ত,
আমি
তোমাকে আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
তোমরা
কি ভাবে মাপ? তুমি বলেছিলে
কাজের ফ্রন্টের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপি। আজ তুমি কথা ঘুরিয়ে পাশ এমনকি ভিতরটাও মাপছ!
আমার মাপে ২৫০ স্কয়ার ফুটের বেশি আসে না; সেখানে ৩০০ হতে পারে, ৪০০ কী করে হয়?
না কাকু আমরা এভাবেই মাপি।
দাঁড়াও,
আমার
বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে। স্কয়ার ফুটের হিসেব সব সময় দৈর্ঘ-প্রস্থ গুণ করেই তো আসবে।
তোমরা তো তিন দিক মেপে গুণ করছ! ধরা যাক তুমি এক ফুটের একটা স্কয়ার বক্স বানালে।
তাহলে উপরের মাপ আসবে এক স্কয়ার ফুট। আর তুমি যদি চারদিক মাপ তাহলে চার স্কয়ার ফুট; তোমার হিসেবে মজুরি
দাঁড়াবে ১৪০০ টাকা। ঐ বক্স বানাতে তোমার এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। মজুরির
সঙ্গে মালের দাম ধরলে দাঁড়াবে ২০০০ টাকা। আমি যদি ও বক্স বাজার থেকে কিনি তাহলে
দাম পড়বে খুব বেশি হলে ৫০০-৭০০ টাকা।
চিত্ত এবার একটা মলিন হাসি হাসল। রাহুল একটাও কথা বলল না।
ক্যালকুলেটার বের করে হিসেব কষে বলল ৪০০ স্কয়ার ফুট ধরলে আসছে ১৪০,০০০ টাকা। ও চিত্তর
দেওয়া মাপটাই ঠিক ধরে নিল।
অমলকান্তি ভাবল, এরা নির্লজ্জ, আর কথা বলতে, তর্ক করতে ওর মন সায় দিল না। ওর মাথা ঝিম ঝিম আর গা ঘিন ঘিন করতে লাগল। মনে হল প্রেসার বেড়েছে। ও শোওয়ার ঘরে গিয়ে একটা প্রেসারের ট্যাবলেট খেল। জল খেল। মনে হল, ঘাড়ের দিকটা মাথার পেছনদিকটা ভারি হয়ে আসছে। অমলকান্তি ভয় পেল, “সেরিব্রাল অ্যাটাক হবে না তো, হার্ট অ্যাটাক?” বেসিনে গিয়ে ও চোখে, মুখে ঘাড়ে জলের ঝাপটা দিয়ে ফ্যানের নিচে এসে বসল। অপরাজিতা সবার জন্য চা নিয়ে এল। শরীরে মনে অস্বস্তি নিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে অমলকান্তি বলল, আজ আমার কাছে ক্যাশ নেই, কাল এসে টাকা নিয়ে যেও।
রাহুল বলল, ঠিক আছে কাকু। কাল আর আমি আসব না। চিত্ত এসে নিয়ে যাবে।
পরদিন সকাল নটা নাগাদ চিত্ত এল। অমলকান্তি বাক্য ব্যয় না করে মজুরির বাকী ৩০,০০০ টাকা ওর হাতে দিয়ে বলল, “গুনে নাও”। আর একটা খামে ৫০০০ টাকা আর একটা এক লাইন লেখা কাগজ ভরে চিত্তর হাতে দিয়ে বলল, “এটা রাহুলকে দিয়ো।” কাগজে লেখা, Uncontrolled greed can spoil one’s happiness
চিত্ত চলে যেতে অপরাজিতা চা হাতে সোফায় অমলকান্তির পাশে এসে
বসল। অমলকান্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখে হাসি টেনে বলল, ‘তাহলে কালিন্দী, তোমার মডুলার কিচেন শেষমেশ হল বল!” অপরাজিতা
বলল, “হলো ঠিকই, তবে তুমি অনেক কষ্ট পেলে!” তুমি এবার স্বপনদাকে
(রাহুলের বাবা) সব খুলে বলো।” অমলকান্তি বলল, ছেড়ে দাও কালিন্দী। সব কথা বলতে নেই। স্বপন সাদাসিধে
মানুষ, রাহুল ওর
একমাত্র ছেলে, কত উঁচু ধারণা
…! বরং ওকে কাল রাতে লেখা আমার এই কবিতাটা পাঠিয়ে দিই,
বিষাক্ত পরিসর
কেটে কেটে ছোট
করা যায়
ছোট বাগান
সাজানো অনেক সহজ
প্রিয় ফুল ঘাসে
কুয়াশারা মিশে থাকে
সব বিষফল ফেলে
দেওয়া যায়
নষ্ট মানুষ
মিথ্যে সময়
প্রাচীন কানুন, পচে যাওয়া
স্বপ্ন
সবকিছু ফেলে
দেওয়া যায় অবহেলায়।
এর পর পড়ে থাকে
বৃদ্ধ সময়
স্বেচ্ছাচারী বন্ধু
ক’জন,
নিবিড় ছায়ানীড়!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন