কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

শুভ্রনীল চক্রবর্তী

 

ঋষি অরবিন্দ: বিপ্লবী থেকে বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের রূপকার

 


(প্রথম পর্ব: শৈশব, ইংল্যান্ড ও আই.সি.এস. কীভাবে গড়ে উঠলেন অরবিন্দ ঘোষ)

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অরবিন্দ ঘোষকে কেবল একজন যোগী বা আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবে দেখলে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি আড়াল হয়ে যায়। আবার তাঁকে শুধুমাত্র একজন বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী বললেও তাঁর চিন্তার পূর্ণতা ধরা পড়ে না। প্রকৃতপক্ষে অরবিন্দের জীবন ছিল এক ধারাবাহিক বিবর্তনের ইতিহাস। সেই বিবর্তনকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনে, কারণ এখানেই তৈরি হয়েছিল সেই ব্যক্তিত্ব, যিনি পরবর্তীকালে একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম কঠোর সমালোচক এবং অন্যদিকে আধুনিক ভারতের অন্যতম মৌলিক দার্শনিক হয়ে উঠবেন।

অরবিন্দ ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন ১৫ আগস্ট ১৮৭২ সালে কলকাতার থিয়েটার রোডে (বর্তমান শেক্সপিয়র সরণি)। তাঁর পিতা ডা. কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত চিকিৎসক এবং যুক্তিবাদী মননের মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সন্তানরা সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। অন্যদিকে তাঁর মা স্বর্ণলতা দেবী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। ফলে অরবিন্দের পারিবারিক পরিবেশে একদিকে ছিল পাশ্চাত্য যুক্তিবাদ, অন্যদিকে ভারতীয় নবজাগরণের সাংস্কৃতিক চেতনা। ইতিহাসবিদ পিটার হীস মন্তব্য করেছেন যে, এই দুই ধারার মিলনই অরবিন্দের পরবর্তী চিন্তাজগতের ভিত্তি নির্মাণ করে।

মাত্র সাত বছর বয়সে, ১৮৭৯ সালে, অরবিন্দকে তাঁর দুই দাদার সঙ্গে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। তাঁর পিতার স্পষ্ট নির্দেশ ছিল— ছেলেরা যেন ভারতীয় ভাষা, ধর্মীয় আচার বা সামাজিক পরিবেশের প্রভাব থেকে দূরে থাকে। প্রথমে ম্যানচেস্টারে রেভারেন্ড উইলিয়াম ড্রুয়েটের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা এবং পরে লন্ডনের সেন্ট পল'স স্কুল-এ তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। গ্রিক ও লাতিন ভাষায় তাঁর দক্ষতা এতটাই ছিল যে অল্প বয়সেই তিনি ইউরোপীয় ধ্রুপদি সাহিত্য মূল ভাষায় পড়তে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে তিনি ফরাসি, ইতালীয়, জার্মান ও কিছু স্প্যানিশ ভাষাও শেখেন। এই বহুভাষিক শিক্ষা তাঁর রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তাকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেয়।

১৮৯০ সালে অরবিন্দ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংস কলেজ-এ ভর্তি হন এবং একই সময়ে Indian Civil Service (ICS)-এর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এখানে একটি প্রচলিত ভুল ধারণার সংশোধন জরুরি। অনেক বই ও সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হয় যে অরবিন্দ "আই.সি.এস.-এ চাকরি করতে অস্বীকার করেছিলেন"। বাস্তবে ঘটনাটি কিছুটা ভিন্ন। তিনি লিখিত পরীক্ষায় সফল হলেও শেষ ধাপের ঘোড়ায় চড়ার (Horse Riding Test) পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে উপস্থিত হননি। ফলে তিনি আই.সি.এস.-এ নিয়োগ পাননি। ইতিহাসবিদ Peter Heehs এবং A. B. Purani উভয়েই উল্লেখ করেছেন যে এটি ছিল ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরিতে যোগ না দেওয়ার একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ, তিনি আই.সি.এস. থেকে পদত্যাগ করেননি; বরং চূড়ান্ত যোগ্যতা অর্জনের শেষ ধাপটি সম্পূর্ণ করেননি।

ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে অরবিন্দের রাজনৈতিক চেতনারও বিকাশ ঘটে। তিনি ভারতীয় ছাত্রদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। তাঁর ব্যক্তিগত চিঠি ও পরবর্তী স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় যে এই সময়েই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন— ভারতের স্বাধীনতা কেবল প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়; প্রয়োজন জাতীয় আত্মশক্তির জাগরণ। এই উপলব্ধিই পরবর্তীকালে তাঁকে কংগ্রেসের নরমপন্থী রাজনীতির পরিবর্তে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবির দিকে নিয়ে যায়।

১৮৯৩ সালে প্রায় চৌদ্দ বছর বিদেশে থাকার পর অরবিন্দ ভারতে ফিরে আসেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ভারতীয় ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিলেন। কিন্তু দেশে ফিরে বরোদায় কর্মজীবন শুরু করার পর তিনি নিজেই সংস্কৃত, বাংলা এবং ভারতীয় দর্শন অধ্যয়ন শুরু করেন। উপনিষদ, গীতা, কালিদাস, বঙ্কিমচন্দ্র ও স্বামী বিবেকানন্দের রচনা তাঁর চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় জীবন— যেখানে একজন পাশ্চাত্য-শিক্ষিত যুবক ধীরে ধীরে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

(ক্রমশ)

এই পর্বে ব্যবহৃত প্রধান সূত্র

 ১. Sri Aurobindo, On Himself (Complete Works of Sri Aurobindo)

২. Peter Heehs, The Lives of Sri Aurobindo (Columbia University Press, 2008)

৩. A. B. Purani, The Life of Sri Aurobindo

৪. K. R. Srinivasa Iyengar, Sri Aurobindo: A Biography and a History

৫. Dinendra Kumar Roy, Aurobindo Prasanga (বরোদা পর্বের সমসাময়িক স্মৃতিচারণ)

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন