কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

পি. শাশ্বতী

 

বাংলা ও বাঙালির নবজাগরণের নির্ণায়ক 'বাঙালিবাবু'

 


বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু সামাজিক শ্রেণির আবির্ভাব ঘটেছে, যারা কেবল সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল নয়, বরং একটি যুগের মানসিকতা, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়েরও প্রতীক। ‘বাবু’ এবং ‘ভদ্রলোক’ এমনই দুটি শব্দ— যা কেবল কোনো ব্যক্তিবিশেষকে বোঝায় না; বরং সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যাবে যে, এই শব্দ যুগল একটি সমগ্র সামাজিক ইতিহাসকে ধারণ করে। আধুনিক বাঙালি সমাজে শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারার পেছনে এই দুই শ্রেণির প্রভাব এত গভীর যে এই ইতিহাসের সঙ্গে অবধারিত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে আধুনিক বাংলার জন্মকাহিনি। ‘বাবু’ এবং ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির আতুর ঘর হিসাবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা নিয়ে আছে ব্রিটিশ শাসিত কলকাতা। আজকের কলকাতাকে আমরা যেভাবে দেখি, স্বাভাবিক ভাবেই এর শুরুর ইতিহাস তো আর তেমন ছিল না! এর শুরুটা ছিল অতি সাধারণ আর পাঁচটা গ্রামের মতোই এক জনপদ হিসাবে। ষোড়শ শতকে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে কলকাতার উল্লেখ ছিল একটি ছোট্ট গ্রাম হিসাবে। সতেরো শতকের শেষভাগে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চলে তাদের বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। গঙ্গা তীরের এই জনপদটি কয়েকটি গ্রামের সমন্বয়ে কলকাতার গুরুত্ব ছিল কেবলই একটি বাণিজ্যিক জায়গা হিসাবে। কিন্তু পলাশির যুদ্ধের পর ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি দৃঢ় হলে কলকাতার ভাগ্য আমূল বদলে যায়। অল্প কয়েক দশকের মধ্যেই এটি বাংলা-বিহার-ওড়িশার রাজধানী মুর্শিদাবাদের গুরুত্বকে অতিক্রম করে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীতে পরিণত হয়।

এর ফল স্বরূপ রাজনৈতিক ক্ষমতা, বাণিজ্যিক সুযোগ এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র এই কলকাতায় প্রত্যক্ষ বাণিজ্যের পাশাপাশি নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। ইংরেজদের প্রশাসন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল সংখ্যক কেরানি, হিসাবরক্ষক, অনুবাদক এবং নকলনবিশের। এই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে জন্ম নেয় বাংলার এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এরা কিন্তু কেউ অর্থনৈতিক ভাবে বিত্তশালী বা কোনো বংশের উত্তরাধিকারীও ছিল না। এদের পুঁজি বলতে ছিল শিক্ষা— বিশেষত আধা ইংরেজি শিক্ষা। এই শ্রেণীকেই প্রাথমিক ভাবে বলা হতো ‘বাবু’।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে বাংলার গ্রামীণ বা নগর সমাজে আর আগে কি ‘বাবু’ শব্দটির কোনো প্রচলন ছিল না? উত্তরে বলতে হয়— নিশ্চয়ই ছিল। তবে সেটি ব্যবহার করা হতো সম্মানসূচক সম্বোধন হিসেবে। ব্রিটিশ আমলে এসে এটি বিশেষ একটি সামাজিক অর্থ লাভ করে। আঠারো শতকের শেষদিকে ইংরেজদের কাছে ‘বাবু’ বলতে বোঝাত ইংরেজি জানা বাঙালি কেরানিকে। এই দলে ইংরেজি না জানা মানুষেরও ঠাঁই হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশদের কাছে এক মজাদার কৌশলকে আশ্রয় করে। এই দলে ছিল মূলত মুনশি শ্রেণির ইংরেজ অনুগৃহীত একশ্রেণির মানুষ। মজার বিষয় হল, তখন অনেক মুনশি ইংরেজি না বুঝেই ইংরেজি দলিল নকল করত। আর যারা সামান্য ইংরেজি জানত, তারাও হয়ে উঠত ‘বাবু’। অর্থাৎ ইংরেজি ভাষাজ্ঞান তখন শুধু শিক্ষার পরিচয় নয়, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক উন্নতিরও চাবিকাঠি ছিল।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ব্রিটিশ শাসিত ভারতে ব্রিটিশদের অনুগত হয়ে তাদের কৃপাপ্রার্থী একশ্রেণির সুবিধাভোগী বাঙালিই 'বাবু' নামের মর্যাদা পেয়েছিল। ক্রমে  আধা ইংরেজি জানা এবং না জানা  এই শ্রেণির মধ্যে একটি বাস্তববোধের সৃষ্টি হয় যে, ইংরেজি শিক্ষাটা কেবল মাত্র শেখার বিষয় নয়, এই ভাষা শিখতে পারলে সমাজে এক বিশেষ আসনের অধিকারী হওয়া যায়। ফলে কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষার এক অভূতপূর্ব প্রসার ঘটে। হিন্দু সমাজের উচ্চবর্ণীয় শিক্ষিত ব্যক্তিরা নিজেদের উদ্যোগে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই কলকাতা ইংরেজি শিক্ষার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। ওই সময়ে কলকাতায় যেখানে কয়েক ডজন ইংরেজি স্কুল ও কলেজ ছিল, তখন ভারতের অন্যান্য বড় শহর সেই তুলনায় প্রায় কিছুই ছিল না।

এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বেশির ভাগই তখন ইংরেজ প্রশাসনের চাকরি করে, কেউ কেউ ব্যবসা করে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অনেক বিত্তশালী মানুষ জমিদারি কিনে সমাজে এক বিশেষ প্রতিষ্ঠা পায়। চিরায়ত নিয়ম মেনে অর্থের সমাগমের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনযাত্রাও আমূল বদলে যায়। ব্যক্তিগত রুচি, এবং ভাবনাচিন্তা মায়  পোশাক-পরিচ্ছদেও ভিন্নতর বদল ঘটতে শুরু করে আধুনিকতার চূড়ান্ত ছাপ পড়তে থাকে। কিন্তু সামাজিক দিক থেকে সব ক্ষেত্রে এর ফল ভালো হয়নি দ্বিধাগ্রস্ত এক মানসিকতায়। কারণ একদিকে তারা পাশ্চাত্য শিক্ষা, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের অনুসারী; অন্যদিকে নিজেদের সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে বাবুয়ানার ঘাটতি— এই ছিল দ্বন্দ্ব!

এই দ্বন্দ্বমূলক দ্বিধা থেকেই জন্ম নেয় ‘বাবু’ চরিত্রকে ঘিরে নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। উনিশ শতকের সাহিত্য ও সংবাদপত্রে বাবুদের নিয়ে অসংখ্য রচনা প্রকাশিত হয়। বিশেষত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাবুদের যে ব্যঙ্গচিত্র এঁকেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর বাবু ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হতে চায়, কিন্তু নিজের মাতৃভাষাকে অবহেলা করে; বিদেশি সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ মনে করে, অথচ নিজের সমাজকে তুচ্ছজ্ঞান করে; কথায় দেশপ্রেম দেখায়, কিন্তু বাস্তবে সাহস ও কর্মক্ষমতার অভাব থাকে। বঙ্কিমের এই সমালোচনা কেবল ব্যক্তিকে নয়, একটি যুগের মানসিক সংকটকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে বাবুদের যতই টানাপোড়েন থাকুক না কেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের ক্ষেত্রে তাদের অবদান কিন্তু অস্বীকার করা যায় না। আধুনিক শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা থেকে শুরু করে নাট্যআন্দোলন ও  বাংলা সংবাদপত্র প্রচলন তারাই করেছিল। তাদের সবথেকে বড় অবদান; এঁদের মধ্যে কেউ কেউ সমাজসংস্কার আন্দোলনে রাজা রামমোহন বা বিদ্যাসাগরের সঙ্গে একই পথে এগিয়ে এসেছিলেন। সেইসঙ্গে ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনার বীজ প্রথম এই বাবুশ্রেণির মধ্যেই রোপিত হয়েছিল। বিদ্যাসাগর, রামমোহন, মধুসূদন, বঙ্কিম আধুনিক বঙ্গ সমাজের ভিত্তি নির্মাণের প্রতিভূ একথা আমরা সকলেই জানি। এঁরা কিন্তু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজেরই প্রতিনিধি।

কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগে এসে ‘বাবু’ শব্দটি সামাজিক পরিবর্তনের আঙ্গিকে ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে পড়ায় কোনো একটি সামাজিক পরিচায়কের তকমা হারায়। স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জন্য একটি নতুন পরিচয়ের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যার ফল স্বরূপ ‘ভদ্রলোক’ শব্দের উদ্ভব। সাধারণের সম্বোধনে এত ‘ভদ্রলোক’ শব্দটি কিন্তু কোনো আরোপিত শব্দ নয়। প্রয়োজনের খাতিরে এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাবন। তবে এর পেছনে নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে একটা ভাবনা কাজ করেছিল। ভদ্রলোক শব্দটির আক্ষরিক অর্থ যেহেতু ‘ভদ্র মানুষ’; তাই সেই দিক থেকে বিচার করলে যে-কোনো শিক্ষিত মানুষই নিশ্চয়ই ভদ্র মানুষ হয়েই থাকেন। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, সংস্কৃতিচর্চায় আগ্রহী এবং সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন মানুষের ভদ্রলোক হয়ে ওঠার সঙ্গে অর্থ বা সম্পদের কোনো সম্পর্ক থাকে না। সেখানে শিক্ষাই ছিল তাঁর একমাত্র প্রধান পরিচয়। একজন অশিক্ষিত ধনী জমিদার ভদ্রলোক নাও হতে পারেন, কিন্তু একজন শিক্ষিত, মার্জিত মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র মানুষ ভদ্রলোক হিসেবে সব সময়ই স্বীকৃতি পেতে পারেন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ‘ভদ্রলোক’ পরিচয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে কার্যত শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের জন্য। বলে রাখা ভালো, মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু ব্যক্তিত্ব শিক্ষাদীক্ষা এবং বাহ্যিক আচরণে ভদ্রলোক হয়ে উঠতে পারলেও তখনও পর্যন্ত তাঁদের সংখ্যাগুরু জনসংখ্যা শিক্ষার আলোয় স্নাত হওয়া ধর্ম বিরোধী বলেই মনে করতেন। আগেই বলা হয়েছে, বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, শিল্পকলা এবং সমাজসংস্কারের প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই শ্রেণির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক বাঙালি জাতিসত্তার যে ধারণা আমরা আজ জানি, তার পেছনে বাবু ও ভদ্রলোক শ্রেণির প্রভাব ছিল নির্ণায়ক। বাংলার নবজাগরণে যা একটি সমাজকে মধ্যযুগীয় চিন্তা থেকে আধুনিকতার পথে নিয়ে যেতে প্রভূত সাহায্য করেছিল।

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন