কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

দ্য ক্লাউড

 


(২৩)

রাতের শেষ প্রহরে আকাশটা একটু নিচে নেমে আসে। এমনটা প্রতি বর্ষাতেই হয়। কিন্তু সবাই দেখতে পায় না। যারা শুধু বৃষ্টি দেখে, তারা মেঘকে দেখতে পায় না। আর যারা মেঘকে দেখে, তারা জানেমেঘেরও স্মৃতি আছে।

উৎপল চিত্রকর ভোরের আগেই বেরিয়ে পড়েছে। কাঁধে তার পুরনো ব্যাগ। সেই ব্যাগে রং, তুলি, ক্যানভাস, আর একটি নীরব ডেটা-ডায়েরি। আজ ডায়েরিটা একবারও শব্দ করেনি। মনে হচ্ছে, সেও আকাশের কথা শুনছে। উৎপল হাঁটতে হাঁটতে আকাশের দিকে তাকায়। লোকের মুখে দেশটার নাম ভারতবর্ষ। কিন্তু মেঘের কাছে কোনো দেশের নাম নেই। সে প্রথমে ভিজিয়ে দেয় মেঘালয়ের পাহাড়। খাসি পাহাড়ের গায়ে গায়ে তার কালো শরীর ঘষে নেয়। তারপর নেমে আসে মিজোরামের ঢেউখেলানো সবুজে। বাঁশবনের মাথায় একটু থেমে বাতাস বদলায়। ত্রিপুরার বুকের উপর দিয়ে ভেসে এসে পশ্চিমবঙ্গে ঢোকে। উৎপলের মনে হয়, সে-ও যেন সেই মেঘের সঙ্গে হাঁটছে। তার হাতে ঝুলছে দ্য ক্লাউড। কেউ দেখলে বলবে একটা ব্যাগ। উৎপল জানেএটা ব্যাগ নয়। এখানে জমা আছে এমন সব নাম, যাদের উচ্চারণ পৃথিবী ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে। ঋতুর অমোঘ আয়োজনে সেই মেঘ আবার ঘুরে যায় আসামের দিকে। চা-বাগানের উপর দিয়ে তার দীর্ঘ ছায়া পড়ে। তারপর তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, মহানন্দার বাতাসে ভেসে  চা-বাগানগুলোর মাথায় আলতো হাত ছুঁইয়ে দিয়ে সমগ্র উত্তরবঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।

উৎপল দাঁড়িয়ে থাকে। মেঘকে কখনও আটকানো যায় না। যেমন আটকানো যায় না মানুষের শেষ প্রশ্নটাকে।

তার ব্যাগে অনেক রং। পলাশের লাল। ধানপাতার সবুজ। নদীর ধূসর। কাশফুলের সাদা। শিউলির কমলা। আকাশের নীল। শুধু কালো নেই। কালো রং শেষ হয়ে গেছে বহুদিন। তাই সুযোগ পেলেই উৎপল মেঘের কাছে যায়। দু'হাত বাড়িয়ে একটু কালো চেয়ে নেয়। মেঘও কৃপণ নয়। নিজের শরীর থেকে অল্প অল্প কালো ছিঁড়ে দেয়। কিন্তু সেই কালো ক্যানভাসে পড়তেই বিপত্তি ঘটে। কালো আর কালো থাকে না। তার ভিতর থেকে একে একে জেগে ওঠে সূর্যের সাতটি রং। বেগুনি – নীল - আকাশী - সবুজ - হলুদ - কমলা - লাল।

উৎপল বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে, অন্ধকার কখনও একা আসে না। আলো তার ভেতরেই বাসা বেঁধে থাকে।

ঠিক তখনই একটি ফটিকজল পাখি খুব নিচু দিয়ে উড়ে গেল। উৎপলের মনে হলো, সে পাখিটিকে চেনে।

হয়তো নিমচাঁদ দাগা। হয়তো নয়। পাখিরা এখন আর নিজেদের নাম বলে না। দূরে স্কুলের মাঠ দেখা যাচ্ছে।

পতাকাটা আজও উড়ছে। কিন্তু আজ তার কাপড়ের ভাঁজে বাতাসের চেয়ে বেশি কিছু নড়ছে। মনে হচ্ছে, অদৃশ্য অনেক মানুষের নিঃশ্বাস সেখানে এসে জমেছে।

উৎপল মাঠের দিকে এগোয়। তার ব্যাগের ভিতরে ডেটা-ডায়েরি নিজে থেকেই একবার কেঁপে ওঠে। কোনো শব্দ নেই। কোনো সতর্কবার্তা নেই। শুধু একটি বাক্য ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে "মেঘ কখনও কিছু মুছে দেয় না। মানুষই তাকে ক্লাউড বলে ভুল করে।"

উৎপল ডায়েরি বন্ধ করে। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলে। আজ তার মনে হয়

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর্কাইভ কোনো সার্ভার নয়। বর্ষার প্রথম মেঘ। যেখানে জল জমে, আলো জমে, মৃতেরা জমে, আর মানুষের উচ্চারণ না-করা নামগুলো ভেসে থাকে।

দূরে কোথাও বজ্রপাত হলো। আকাশ এক মুহূর্তের জন্য সাদা হয়ে উঠল। সেই আলোয় উৎপল দেখল মেঘের ভিতর দিয়ে যেন কেউ হাঁটছে। চেনা। তবু অচেনা।

সে আর তাকিয়ে রইল না। শুধু হাঁটতে লাগল। কারণ কিছু কিছু দৃশ্য চোখে নয়, ভবিষ্যতের স্মৃতিতে দেখা হয়।

(ক্রমশ)

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন