![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৯ |
মেঘের বারান্দা
রাতের খাওয়া শেষ করে বিল মিটিয়ে দিয়ে অর্ণব আর সেবন্তী সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে এলো। করিডোরের শেষ রুমটাই ওদের। শেষের রুমগুলোতে সচরাচর একটা একস্ট্রা জানলা পাওয়া যায় যেটা অর্ণবের পছন্দের আর সেবন্তীর ডিমান্ড ছিল এই পাহাড়ি শহরে মেঘের ভিতর ভেসে থাকা ছোট্ট একটা ব্যালকনি। এই অফ সিজনে নিশ্চয়ই ট্যুরিস্টের চাপ কম থাকবে, এই ইনটিউশনের ওপর ভরসা রেখেই হোটেলের আগাম বুকিং ছাড়াই ওরা চলে এসেছে লাভা বেড়াতে। পাইনগাছে ঘেরা ছোট্ট একটা ছিমছাম পাহাড়ি শহর।
ঘরে ঢুকেই সেবন্তী প্রথমে ব্যালকনির দিকের কাচের দরজাটা খুলে দিল। এক ঝলক ঠান্ডা, ভেজা বাতাস ঘরের ভেতরে ঢুকে এলো। ব্যালকনিতে পাশাপাশি দুটো চেয়ার। একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল সেবন্তী। হোটেলটা মন্দ নয়। বিশেষ করে এই বারান্দাটা। পাহাড়ের ঢালে ঘন সাদা মেঘ জমে আছে। তার ভেতরেই জোনাকির মত টিমটিম করছে কিছু মানুষের ঘরবসতের আলো।
দূরে তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না! না পাহাড়, না রাস্তা, না পাইনগাছের সারি। শুধু মেঘ আর মেঘ। মনে হচ্ছে, পৃথিবীর শেষপ্রান্তে এসে বসেছে সেবন্তী। অর্ণব রিমোট ঘুরিয়ে টিভি চালিয়েছে। সাংবাদিক উচ্চৈস্বরে হকার উচ্ছেদের ধারাবিবরণী দিয়ে চলেছে। সেবন্তী আধখোলা দরজা দিয়ে দেখল, অর্ণব বাইরের জামাকাপড় না ছেড়েই বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে রিমোট হাতে নিয়ে চ্যানেল ঘোরাচ্ছে। সেবন্তীর মনটা তিতকুটে হয়ে গেল, 'দুদিন বাইরে এসেও রেহাই নেই...'
কথাটা মনে হতেই নিজেকে কেমন ইনসেনসিটিভ মনে হল। এতোগুলো মানুষের রুটিরুজি বন্ধ হয়ে গেল! সেবন্তীর মনের সূক্ষ্ম তন্ত্রীগুলো বোধহয় ক্রমশই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! মানুষের যখন নিজের অভিযোগগুলো মস্তবড় হয়ে ওঠে তখন অন্যের দুঃখকষ্ট সেভাবে আর বেঁধে না মনে!
সেবন্তী উঠে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াল। বারান্দার ঠিক নিচেই কৃষ্ণগহ্বরের মত এক অনন্ত খাদ। ঠিক যেন তার মাঝবয়সের মনের মতই সমস্ত আলো শুষে নেয়। সেবন্তী মাথা ঝুঁকিয়ে নিচের দিকে দেখল তারপর আকাশের দিকে। গুঁড়োগুঁড়ো বৃষ্টি পড়ছে। ঠান্ডা বাতাসে গায়ের শালটা উড়ছে।
অর্ণব কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল করেনি। কাঁধের ওপর স্পর্শ পেয়ে সামান্য চমকে উঠল। অর্ণব বললো, 'জায়গাটা বেশ সুন্দর! না?'
সেবন্তী নিঃশব্দে সায় দিল। অর্ণব ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, 'আজ সারাদিন কিছুই লিখলে না তো!’
সেবন্তী ক্লান্ত স্বরে বলল,'কী লিখব?'
'কেন! কবিতা টবিতা...'
সেবন্তী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, 'টবিতাটা আবার কী?'
তারপর মুখ ফিরিয়ে দূরের পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা মেঘের দিকে চেয়ে রইল, ভাবল, আজ সারাদিন বাণীব্রত তার পত্রিকার জন্যে কবিতা চেয়ে মেসেজ করল না তো?'
অর্ণব পকেট হাতড়ে লাইটার বার করে একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়ার রিংগুলো চারপাশের থৈথৈ মেঘের ভিতর মিশে যাচ্ছে। সিগারেট শেষ করে বলল,'শোবে তো?'
সেবন্তী অন্যমনষ্কভাবে বলল,'উঁ?'
'শুতে যাবে না? রাত হল তো?'
সেবন্তী বলল, 'তুমি শুয়ে পড়ো, আমি আরো কিছুক্ষণ বসে থাকি এখানে...'

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন