![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৯ |
দ্বন্দ্ব সমাস
“তারারা শত আলোকবর্ষ দূরে আরো দূরে” রিংটোন শেষ হতে বলাকা গেয়ে উঠল ফোনে “তুমি আর আর আমি যাই সরে সরে”। বাসব হেসে উঠতে পারল না। বলাকার অভিমান স্বাভাবিক। ফোনটা সুইচ অফ করে দেয় বাসব। গত দুমাসে একবারও যেতে পারেনি বাড়ি। বাড়ি মানে ফ্ল্যাট। বাঁশদ্রোণীর ফ্ল্যাট। বলাকারই বলা যায় কারণ হোমলোন তারই নামে ছিল, ফ্ল্যাটটাও বলাকার উৎসাহেই নেওয়া। সেক্টর ফাইভে চাকরি বলাকার। দুপুরের রোদ হলেও একটু নিস্তেজ এখন। বাসব সিমটা পাল্টে নিল। এই বাড়িটা প্রায় আটশ বছর পুরনো। তার পূর্বপুরুষের তৈরি। চারিদিকে আগাছা দেওয়াল বেয়ে নেমেছে শেকড় বটের। এই বাড়ির শ্যাওলা ধরা সবুজ পাঁচিলের ওপর বসে আছে গিরগিটিটা। বাসব গত দুবছর ধরে এই টানাপোড়েনের কবর খুঁড়েছে। পাঁচবছর এক জায়গায় তো পরের পাঁচবছর আরেক জায়গায়। সঙ্গীতা সঙ্গে ছিল প্রথমটা। তারপর বাবান হলো। তারপর তার স্কুল। মা শয্যাগত হতে সঙ্গীতা ফিরে এলো এখানে। সে উইকেণ্ডে আসত। এখনও তাদের পুকুরটা আছে। বর্ষার সময় গাঢ় সবুজ থেকে কালচে হয়ে যাওয়া গাছের সারি তার প্রতিবিম্ব পুকুরের জলে উদ্ভাসিত হতো। সকলের না হলেও অনেকেরই জীবনে প্রেম আসে স্কুল কলেজে। তারও এমন গল্পহীন একটা সংক্ষিপ্ত প্রেম এবং ম্যড়ম্যাড়ে বিয়ে হয়ে গেছিল। সঙ্গীতা আর সে প্রথম পাঁচবছর মালদা। তারপর থেকে একা একা। এর ভেতর সমাজ হঠাৎ বদলে গেল। ফোন থেকে মোবাইল ফোন আর তারপরে স্মার্ট সেই ফোনে এলো ফেসবুক এলো ওয়াটস্যাপ। ঝুল বারান্দা থেকে ইঁট খসছে। এত বড় প্রাচীন বাড়িতে একা সঙ্গীতার সংসার আজকাল যেন অতিথির মতো কুঁকড়ে থাকে সৌজন্যে। সঙ্গীতার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে পারে না। সঙ্গীতাও বিষয় সংসার নিয়ে কেমন পাল্টে গেছে। শীতল। মোবাইল নামের খেলাটা নিয়ে একা জীবনে ভালোই ছিল। বাসব আজকালের মধ্যেই ট্রান্সফারের চিঠি পাবে। ছুটি নিয়ে বসে আছে বাড়িতে। নাকি পালিয়ে! কলকাতা ট্রান্সফারটা না হলেই বোধহয় ভাল হতো। ফেসবুক থেকে ওয়াটস্যাপ আর ওয়াটস্যাপ থেকে রাস্তায় মিট করেছিল বাসব বলাকাকে। জীবনের মধ্য পর্বে এসে ফের পঁচিশের বলাকার প্রেমে পড়ে গেল বাসব। প্রেম নাকি দীর্ঘ একাকীত্ব, শরীর খিদে? গত দুবছর ছিন্ন ভিন্ন হচ্ছে বাসব। একদিকে বাবানের ফোন এলে গোপন সঙ্গীতার সঙ্গে ক্রমে শুধু দরকারের কথা আর আরেকদিকে বলাকার তুমুল ভালোবাসা। নতুন যৌবন জোয়ারের মুখে বাসব কিছুতেই বলতে পারেনি বলাকাকে। সঙ্গীতার কাছে কৃতজ্ঞতা। সংসার মাথায় করে আছে। তারা চার বছর লিভ ইন রিলেশনে অথচ সঙ্গীতাও কখনও তার স্বামীকে সন্দেহ করেনি। এতো নিশ্চিন্ত কেন তারা আপন পুরুষ নিয়ে! বাসব অপরাধবোধে দগ্ধ হয়। বলাকার ফ্ল্যাটে থাকলে আজকাল সচেতনভাবে এড়িয়ে থাকে। আর বাড়ি এলে মুখোমুখি হতে চায় না স্ত্রী সঙ্গীতার। তার মা তার সন্তান সেই তো মাথায় করে আছে। ট্রান্সফার কি সমাধান? ঘূর্ণির ভেতর পাক খেতে থাকে জীবন।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন