নারী, সংগ্রাম এবং মুক্তি
(১)
‘নারীমুক্তি’ একটি মৌলিক সামাজিক আন্দোলন। এর মূল উদ্দেশ্য পুরুষতান্ত্রিক ধারণার পরিবর্তন করা। এই মুক্তি’র পথে অনেক নারী সংগ্রাম করেছেন। তাঁদের মধ্যে সিমন দ্যা বোভোয়ার (ফরাসী দার্শনিক ও নারীবাদী চিন্তাবিদ) এবং মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট (ব্রিটিশ দার্শনিক ও নারীবাদী চিন্তাবিদ) ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। যদিও তাঁরা ভিন্ন সংস্কৃতির বাহক, তবে দুজনেই পুরুষতন্ত্রের মূল কাঠামো বিবাহ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান করেছেন, দুজনই ছিলেন পুরুষ এবং প্রেমের জন্য কাতর। মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট বিয়ে করে দুই সন্তানের জননী হলেও সিমন দ্যা বোভোয়ার বিয়ে বা সন্তান গ্রহণ করেননি। তিনি জ্যা পল সাত্রের সাথে ৫১ বছর কাটিয়েছেন। এই সময় অন্য পুরুষের প্রেমে পড়েছেন, করেছেন গর্ভপাত।
এই যে পুরুষতন্ত্রের প্রতিষ্ঠিত বিয়ে প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কর্তা পুরুষের সাথে প্রেম বা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়েছেন, এতে ব্যক্তিগত দর্শন (ব্যক্তিগত দর্শন হলো নিজস্ব বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি) এবং সামাজিক বাস্তবতার (সমাজ দ্বারা নির্ধারিত প্রথা, নিয়ম, মূল্যবোধ এবং বাস্তবতা সম্পর্কে সকলের ধারণা) মধ্যে একটা পার্থক্য রচিত হয়েছে। এই পার্থক্য ব্যক্তিগত দিক থেকে কোনো সমস্যা নয়। তবে ব্যক্তিগত মতাদর্শ এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে গরমিলের ফলে সমাজে যে ভারসাম্যহীনতা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তা রাষ্ট্র নিজ প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করার সুযোগ পায় এবং এতে সংঘাত ও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার সম্ভবনা বৃদ্ধি পায়।
(২)
অনেকে নারী পরাধীনতার দায় একতরফাভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বা বিবাহ প্রথার উপর চাপিয়ে থাকেন। আমার ধারণা, এই পরাধীনতার দায় যতখানি পুরুষতন্ত্র এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উপর বর্তায়, ততখানি বর্তায় নারী মানসিকতায় বিদ্যমান দাসত্বের উপর।
নিবিড়ভাবে খেয়াল করলে স্পষ্ট হবে ‘নারীমুক্তি’র প্রেক্ষাপটে যে-সমস্যাগুলো কাজ করে, তার দুটো দিক বিদ্যমান। এক, পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক সিস্টেম, যা নারীকে দৃশ্যমানভাবে দমিয়ে রাখে এবং সমুখে অগ্রসর হতে দেয় না। দুই, নারী মানসিকতায় বিদ্যমান দাসত্ব, যা নারীকে অদৃশ্যভাবে দুর্বল করে রাখে এবং পুরুষকে ঈশ্বর হিসেবে ভাবতে বাধ্য করে। উপরোক্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যায়, ‘নারীমুক্তি’ শুধু পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে না, বরং নারীর ডিএনএ’র ভেতর যে-দাসত্ব, কুসংস্কার, অন্ধত্ব এবং মোহ তাকে যুগযুগ ধরে গতানুগতিক সিস্টেমে বন্দি করে রাখছে, সেসব মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বের পরিবর্তনের উপরেও নির্ভর করে।
এসব কারণে নারীবাদ যখন পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক সিস্টেমের বিরুদ্ধে কাজ করে, নারীকে মুক্তির পথ প্রদর্শন করে, তখন অর্ধেক কার্য সম্পাদিত হয়। কিন্তু বাকি সমস্যার ক্ষেত্রে অর্থাৎ নারী মানসিকতায় মিশে থাকা দাসত্ব দূরীকরণে ‘নারীবাদ’ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। মূলত পুঁজিবাদ (বর্তমানে সারা বিশ্বে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান) কোনো সমস্যারই মূলোৎপাদন করতে দেয় না, পরিবর্তে তারা এমন পথ অবলম্বন করে, যাতে সমস্যাগুলো অদৃশ্যভাবে কার্যকর থাকে। এর প্রেক্ষিতে তারা ‘ভাগ করো এবং শাসন করো (Divide and rule)’ নীতি অবলম্বন করে নারীবাদকে দু’ভাগে বিভক্ত করেছে।
এতে মূলধারা এবং প্রান্তিক নারীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিচ্ছিন্নতা, যা নারীমুক্তির সার্বিক অগ্রগতির পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতিটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম রাজনৈতিক কৌশল। এই কৌশলের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বিভাজন এবং মতভেদ তৈরি করে, (নারীবাদের মূলধারা এবং প্রান্তিক নারীদের মধ্যে পার্থক্যের ফলে সমাজে প্রথমে পক্ষ-বিপক্ষ দল তৈরি হয়েছে, এতে একদিকে নারীমুক্তি সামগ্রিকভাবে কাজ করতে পারছে না, অন্যদিকে রাষ্ট্র এই বিভাজনকে ব্যবহার করে নিজ স্বার্থ রক্ষা করছে) শাসনকার্য পরিচালনা করা হত। যাহোক, এই প্রবন্ধে আমরা নারীর মানসিক দাসত্বের কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করব। তার পূর্বে বিবাহের ব্যাপারে আমার অবস্থান স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক।
আমি বিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে নই। এমনকি বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের বিরুদ্ধেও আমার অবস্থান নয়। আমার উদ্দেশ্য একটাই – ‘নারীমুক্তি’। এখানে ‘মুক্তি’ বলতে আবহমান কাল ধরে নারী মননে যেসব মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বের শেকড়-বাকড় প্রোথিত আছে, আমি সেসব অধীনতা থেকে মুক্তির কথা বলছি।
‘মানসিক মুক্তি’র প্রসঙ্গ, হাওয়া থেকে আমদানি করা নয়। রাসুল (সা.), গৌতম বুদ্ধ এই শক্তির চর্চা করেছেন। ড. জো ডিসপেঞ্জা (Dr. Joe Dispenza- আমেরিকান গবেষক ও লেখক), ব্রুস লিপটনের (Bruce Harold Lipton- আমেরিকান কোষীয় জীববিজ্ঞানী ও লেখক) মতো ব্যক্তিরাও এই পথ নির্দেশ করেছেন। ডেভিড হকিংস তাঁর বই ‘The maps of consciousness explained’ গ্রন্থেও মানসিক শক্তির কথা ব্যক্ত করেছেন, যেখানে তিনি চেতনার স্তরকে (চেতনার স্তর উন্নত হওয়ার সাথে সাথে মানসিক শক্তি এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পায়) শ্রেণিভুক্ত করেছেন এক থেকে এক হাজার পর্যন্ত।
মনোবিজ্ঞান, সংজ্ঞানাত্মক বিজ্ঞান (Cognitive Science), স্নায়ুবিজ্ঞান এবং দর্শন অনুসারে, একজন মানুষের যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি এবং আচরণের কেন্দ্রস্থল হলো মন। এই মনে যাবতীয় শক্তি সুপ্ত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। তাপ গতিবিদ্যার সূত্রানুসারে যেমন শক্তিকে এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তর করা যায়, তেমনভাবে আমাদের মনে যে-শক্তি বিদ্যমান থাকে, তাকেও মনোযোগ বা সচেতনতার মাধ্যমে রূপান্তর বা জাগ্রত করা সম্ভব। কিন্তু শক্তি উন্মেষের জন্য জাগতিক কোনো উপাদানের দরকার নেই, প্রয়োজন শুধু আত্মজগতে মনোযোগ দেওয়া। মানসিক শক্তির উপলব্ধি ব্যতীত পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে কখনোই সম্পূর্ণ ‘নারীমুক্তি’ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
সাধারণত জন্ম থেকে সাত বছরের মধ্যে প্রতিটি মানুষের অভ্যাস, আচার-আচরণ ও চিন্তা-ভাবনা ইত্যাদি গঠিত হয়। এই গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে পরিবার, সমাজ ও পরিবেশ। তাই যদি কোনো সমাজে সুশিক্ষার অভাবে ত্রুটিপূর্ণ সামাজিকীকরণ ঘটে থাকে, তবে তা ব্যক্তির মধ্যেও প্রবাহিত হয়। যুগযুগ ধরে এই প্রক্রিয়ায় বাঙালি নারীদের মধ্যেও বিভিন্ন নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে সহজাত বা অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে হয়। কিন্তু এই প্রোগ্রাম সচেতনতার মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব।
(৩)
এখান থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন একই সমাজ, একই পরিবেশে বেড়ে উঠলেও একটা ছেলে শিশু পুরুষতন্ত্রকে ধারণ করে, অথচ একটা মেয়ে শিশু হারিয়ে ফেলে তার সহজাত বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ এই সমাজের মধ্যেই এমন কিছু উপাদান (সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি) হাজির আছে, যা নারীকে নারী বা মানুষ হয়ে উঠতে দেয় না, বরঞ্চ তার মধ্যে গড়ে তোলে দাস প্রবৃত্তি। এই প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে, নারী মানসিকতায় যেভাবে পুরুষতন্ত্র, অর্থনৈতিক অসাম্য, রাজনৈতিক প্রভাব ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতার দেয়াল তুলে রেখেছে, সেসব বাস্তবতা বোঝা আবশ্যক, আবার একজন ছেলে কীভাবে পুরুষতান্ত্রিক হয়ে উঠছে, সেই পারম্পর্যগত ধারাবাহিকতাও বুঝতে হবে। এতে সামাজিক দুর্বলতা এবং সবলতাগুলো চিহ্নিত করে, সহজ হবে উত্তরণের পথ।
বিশ্বায়নের যুগে এখনো বাঙালি সমাজে মেয়ে শিশুর জন্মকে স্বাগত জানানো হয় না। তাদেরকে কম পুষ্টিকর খাবার-দাবার সরবরাহ করা হয়, পরতে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক। তাদের বেলায় গায়ের রঙকে ধরা হয় সৌন্দর্যের মাপকাঠি হিসেবে। অথচ ছেলেদের (সামগ্রিকভাবে পুরুষ প্রজাতি) ক্ষেত্রে প্রচলিত আছে ‘সোনার আংটি বাঁকাও ভালো’। পড়ালেখা এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ছেলেদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। মোদ্দা কথা, গৃহস্থালি কাজকর্ম একতরফাভাবে মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। আর বাইরের কাজের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পায় ছেলেরা। এ সকল পারিবারিক বৈষম্য এবং সুযোগ-সুবিধার অভাব মেয়েদের মনে আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি করে।
শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানেও এই আত্মবিশ্বাসের শূন্যতা গড়ে উঠতে পারে না। কারণ বহু মেয়ে পড়ালেখাকে বিয়ের প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে দেখে থাকে। এতে তাদের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় না, যা তাদের আত্মবিশ্বাস গঠনে বাধা দেয়। অনেকক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের কম সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়, পার্থক্য থাকে খেলাধুলার ক্ষেত্রেও। এমনকি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ব্যবহারেও অনেক সময় পক্ষপাত দেখা যায়। প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় মনস্তত্ত্ব ও দর্শনের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত না থাকাও একটা সমস্যা, যা সামগ্রিক সংকটকে আরও বেশি প্রকট করে তুলেছে। কারণ এই বিষয়গুলো আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং সংকট মোকাবেলার দক্ষতা তৈরি করে।
প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা নারীদের নিজস্ব ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তা সম্বন্ধে সন্দিহান করে তোলে। ফলে তাদের মধ্যে বিজ্ঞান ও গণিতের মতো কঠিন বিষয়গুলোর প্রতি আগ্রহ জন্মায় না। তারা কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতামূলক পরিসরে অংশগ্রহণ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। যারা সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করে, কর্মক্ষেত্রে যোগ দেয়, প্রায়শই যোগ্যতায় এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও তাদের পদোন্নতি উপেক্ষা করা হয়। অনেকক্ষেত্রে তারা নির্যাতন বা যৌন হয়রানির সম্মুখীনও হয়। অনেক সময় মাতৃত্বকালীন ছুটির কারণে পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাঙালি সমাজের অধিকাংশ আর্থ-সামাজিক অসমতাকে নারী ও পুরুষের শারীরিক-মানসিক পার্থক্য এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে জায়েজ করা হয়। যুগ যুগ ধরে চলমান ধর্মীয় অপব্যাখ্যাগুলোর প্রভাব এতটাই গভীর যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষা নারী মন থেকে প্রচলিত কুসংস্কারগুলো পুরোপুরি দূর করতে পারে না। সকল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা জরুরি। কারণ পুঁজিবাদী সময়ে রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া কোনো দাবি-দাওয়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ কম, বহু ক্ষেত্রে নারীদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো রাজনৈতিক এজেন্ডায় গ্রহণও করা হয় না।
সামগ্রিকভাবে পারিবারিক-সামাজিক বৈষম্য, অশিক্ষা, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা এবং মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার প্রভাবে নারীদের মধ্যে যুক্তিবোধের পরিবর্তে দাসত্ব বা অধস্তন বোধ তৈরি হয়। অপরদিকে একজন ছেলে সকল সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার পাওয়ায় হয়ে উঠতে পারে পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি।
(৪)
নারীমুক্তির লক্ষ্যে সর্বপ্রথম পারিবারিক কাঠামোতে এমনভাবে পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে ছেলে-মেয়ের অধিকার ও দায়িত্বের মধ্যে সমতা তৈরি হয়। সেই সাথে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা-ব্যবস্থায় মনস্তত্ত্ব ও দর্শনের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর পাশাপাশি তুলে ধরতে হবে ফরাসি, আফ্রিকান, আমেরিকান ইত্যাদি নারীদের শারীরিক সমতার দৃষ্টান্তগুলো।
বাস্তবিক পক্ষে, নারী-পুরুষের দৈহিক পার্থক্যের বিষয়টা সাংস্কৃতিক। এটা স্পষ্ট হয়, কার্ল ইয়ুং-এর ‘এনালিটিক্যাল সাইকোলজি (Analytical Psychology)’ তত্ত্বে। তিনি বলেছেন, ‘নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মধ্যেই অ্যানিমা (ফেমিনিন) এবং অ্যানিমাস (ম্যাস্কুলিন) বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়’ অর্থাৎ নারীর মধ্যে পুরুষালী দিক এবং পুরুষের মধ্যে নারীত্বের দিক বিদ্যমান আছে, যার বিকাশের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে অবিরাম চর্চা। বস্তুত মানসিক শক্তির চর্চার মাধ্যমেই মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তা বিকশিত হয় (কিন্তু যুগ যুগ ধরে পুরুষরা শিকারী ভূমিকা এবং সম্পত্তির মতো বিষয়গুলো চর্চা করায়, তাদের মধ্যে শক্তির সবল দিকটা বিরাজ করছে। ফলে সবার মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে যে, অ্যানিমা পুরুষ এবং অ্যানিমাস নারীদের জন্য নির্দিষ্ট শক্তি)।
যেহেতু শিক্ষা কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন করা একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, তাই দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে নারীকে নিজের ভেতরের সত্তার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এতে বোধগম্য হবে, মন শুধু মন নয়। এর গভীরে চেতন (Conscious) ও অবচেতন (Subconscious) মনের অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে। অবচেতন মন হলো দমিত স্মৃতি ও আবেগের ভাণ্ডার, যা মনের প্রায় ৯৫ শতাংশ জুড়ে অবস্থান করে আর সচেতন মন হলো ৫ শতাংশ (সচেতন অংশ ক্ষুদ্র হলেও একে দিয়েই অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়)। প্রকৃতপক্ষে অবচেতন মনের গভীরেই প্রোথিত আছে নারী দাসত্বের শেকড়। অতএব অবচেতন মনকে নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
এক্ষেত্রে মানসিক শক্তিকে উজ্জীবিত করার জন্য ভাববাদী চিন্তাধারা (Idealistic ideology), বস্তুবাদী জ্ঞানচর্চা (Materialist Knowledge) বা সমন্বয়বাদী দর্শনের (Syncretic Philosophy) যে কোনোটাকে বেছে নেওয়া যায়। প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের মতো পশ্চিমা দার্শনিকগণ যুক্তি ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে (Western Philosophies) সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগ্রত করেছেন। ওদিকে গৌতম বুদ্ধ এবং শঙ্করাচার্যের মতো প্রাচ্যের দার্শনিকগণ ধ্যানের মাধ্যমে (Eastern Philosophies) মনের শক্তিসমূহকে জাগিয়ে তোলার কথা বলেছেন। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের দর্শনকে একত্রিত করেও মানসিক শক্তিকে উন্নত করা যায়। একে বলা হয় সমন্বয়বাদী দর্শন। এই দর্শন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের সেরা দিকগুলো নিয়ে একটি নতুন চিন্তাধারা তৈরির প্রয়াস করেছে।
এই চর্চাগুলো নারীকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে, নিজ অধিকার ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন করবে। এতে মানসিক দৃঢ়তা অর্জনের মাধ্যমে পরিবার ও সামাজিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলা সহজ হবে। আর একবার মানসিক শক্তিকে জাগ্রত করা গেলে, পুরুষতান্ত্রিকতা বা বিয়ে প্রথা বাধার প্রাচীর তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
(৫)
আমরা এতক্ষণ ‘নারীমুক্তি’র বিভিন্ন তাত্ত্বিক দিক নিয়ে আলোচনা করলাম। পরিশেষে, একজন নারী হিসেবে আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাই। আঠারো সাল থেকে আমি ‘মুক্তির পথ’ অনুসন্ধান করছিলাম। ‘মুক্তি’ বলতে পারিবারিক, সামাজিক এবং লৈঙ্গিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ‘ব্যক্তিসত্তা’কে জাগ্রত করার কথা বলছি। নতুন পথে ‘আমি মুক্তি চাই’, ‘আমি শুধু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ছায়াতলে আশ্রিত পরজীবী হয়ে বাঁচবো না’ ইত্যাদি ভাবনাগুলো কাজ করেছিলো। এসময় খেয়াল করেছি, একজন নারী হিসেবে আমি শুধু পিতৃতান্ত্রিক সমাজের দাস নই, আমার চিন্তা-চেতনা এবং স্বভাবে অসংখ্য দাসত্ব ছায়ার মতো ওত পেতে ছিল, যা পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে আমার সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। তাই পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় বাধা, যা আমার ব্যক্তিসত্তার সাথে সংঘর্ষ করছিল, সেগুলোকে দীর্ঘ সময় নিয়ে চিহ্নিত করতে হয়েছে। তৎপরবর্তী মনস্তত্ত্ব ও দর্শন চর্চা করায় উন্মুক্ত হয়েছে মোকাবেলার বিভিন্ন পথ।
আমার পারিপার্শ্বিক পটভূমিতে নারীশক্তি রূপান্তরের কোনো দৃষ্টান্ত ছিল না, তাই নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগ্রত করতে নিজেকেই দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থিত করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে ল্যাঙস্টোন হিউজের ‘I, too’ নামের একটি কবিতা বেশ অনুপ্রাণিত করেছে। আমেরিকান ড্রিম এবং আফ্রিকান আমেরিকানদের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখিত এই কবিতায় কবি দেখিয়েছেন, কীভাবে তিনি সমস্ত নির্যাতন সহ্য করে রান্নাঘরে খাবার খেয়ে নিজের মানসিক এবং দৈহিক শক্তিকে সুসংহত করেছেন। একইভাবে আমিও নিজেকে প্রস্তুত করেছি। এক্ষেত্রে নিয়মিত ‘সচেতনতার চর্চা’ আমাকে মুক্তির পথে অটল থাকতে সাহায্য করেছে।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন