ধারাবাহিক উপন্যাস
রক্তগোলাপের উত্তরাধিকার
(এক)
তীক্ষ্ম বুদ্ধি, মেধা আর সাহসিকতার অনন্য নজির আমি অন্তত মামনিদি ছাড়া আর দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। রেনুআপাও প্রায়শই এই একই কথা বলে। বুদ্ধি আর সাহসের এমন মেলবন্ধন না থাকলে সত্যিই কিছু কিছু কেসের সমাধান আদৌ সম্ভব হতো না বলেই আমার মনে হয়।
কলকাতার এমন বেশ কিছু জটিল কেস আছে, যেগুলো পুলিশ একা সমাধান করতে পারেনি। আর প্রত্যেকবারই তারা সাহায্য নিয়েছিল আমাদের মামনিদি ওরফে অন্বেষা সেনের। আজ সেরকমই একটা কেসের কথা বলব।
বালিগঞ্জ প্লেসের পুরনো বনেদি বাড়িগুলোর একটা হলো চৌধুরী ভিলা যেটা প্রায় একশো বছরের পুরনো। যেমন দেখতে সুন্দর তেমনই তার আভিজাত্য। সামনে বিশাল লোহার গেট দিয়ে ঢুকে সামনে গোলাকার ড্রাইভওয়ে, দুপাশে ছাঁটা সাইপ্রেস গাছ শোভা বাড়াচ্ছে, আর তার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে এক রাজকীয় তিনতলা অট্টালিকা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে যেন কোনো পুরনো জমিদারবাড়ি। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেটা এখন আধুনিকতার পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে।
বাড়িটা কলকাতার বিখ্যাত শিল্পপতি অমিয়েশ চৌধুরীর। রিয়েল এস্টেট, ফার্মাসিউটিক্যালস, শিপিং, লজিস্টিকস, এমনকি তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও চৌধুরী গ্রুপের ব্যবসা। সংবাদপত্রে তাঁর ছবি প্রায়ই ছাপা হতো।
গত কয়েক মাস ধরে চৌধুরী পরিবারের ভেতরে এমন এক অশান্তি চলছিল, যার খবর বাইরের কেউ জানত না।
অমিয়েশবাবুর বয়স বাহাত্তর, যথেষ্ট শক্ত সবল মানুষ, যদিও বছরখানেক আগে হৃদযন্ত্রের সমস্যা ধরা পড়েছিল। বিশ্রাম নিতে বলেছিলেন ডাক্তাররা। তিনি নাকি সেটা শুনে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, "আমি বিশ্রাম নিলে আমার কোম্পানিও বিশ্রামে চলে যাবে। বিশ্রাম আমার হবে না, ডাক্তার।" কথাটা যে তিনি মজা করে বলছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই ঠিকই। তবু এর মধ্যে সত্যিও কিছুটা লুকিয়ে ছিল। তার গোটা সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ তখনও পর্যন্ত তাঁর হাতে ছিল। আর এইটাই ছিল এই কেসের মূল সমস্যা।
কারণ তাঁর সন্তানরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, কেউ প্রকাশ্যে, কেউ গোপনে, কবে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের ভাগ বাটোয়ারা করে দেবেন তাঁর উত্তরসূরিদের মধ্যে। বড় ছেলে অরিন্দম চৌধুরীর বয়স পঁয়তাল্লিশ। তিনি চৌধুরী গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। ভদ্রলোক বেশ শিক্ষিত, মার্জিত, ঠান্ডা মাথার মানুষ।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো নিখুঁত কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ, যদিও ব্যবসায়িক মহলে অবশ্য গুঞ্জন শোনা যেত তিনি বাবার সিদ্ধান্তে খুশি নন। বহু বছর ধরেই তিনি নাকি কোম্পানির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাইতেন। ছোট ছেলে অর্ক চৌধুরীর বয়স চল্লিশ। একদম ভিন্ন স্বভাবের মানুষ তিনি। খুব উচ্ছৃঙ্খল, আবেগপ্রবণ আর রাগী। ব্যবসার চেয়ে জীবন উপভোগেই নাকি বেশি আগ্রহ তাঁর। অবশ্য গত কয়েক বছরে তিনিও নাকি কোম্পানিতে অল্প বিস্তর কাজকর্ম করছেন। জানা যায় বড় ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নাকি মোটেই ভালো নয়। অমিয়েশবাবুর মেয়ে মল্লিকা চৌধুরীর বয়স বেয়াল্লিশ। তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী, শান্ত, সংযত ধরনের মানুষ। চৌধুরী ফাউন্ডেশনের সমস্ত সামাজিক কাজকর্ম তিনিই দেখাশোনা করতেন। শুধু তাই নয় পরিবারের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে ব্যালান্সড চরিত্রের বলে পরিচিত ছিলেন।
যে রাতে অমিয়েশবাবু খুন হন, সেই রাতে পুরো পরিবার একসঙ্গে ডিনার টেবিলে রাতের খাবার খেতে বসেছিল। এমন ঘটনা অবশ্য ইদানিংকালে খুব একটা ঘটত না। সাধারণত যে যার সময় মতো আলাদা আলাদা খাওয়া দাওয়া সেরে নিত। কিন্তু সেদিন নাকি অমিয়েশবাবু নিজেই সবাইকে ডেকেছিলেন। বলেছিলেন, "সকলের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।" কথাটা শুনেই বাড়ির পরিবেশটা বদলে গিয়েছিল জানা যায়। কেননা গত একমাস ধরে একটি বিষয় নিয়েই সবাই উত্তেজিত ছিল। সেটা ছিল নতুন উইল।
অমিয়েশ চৌধুরী তাঁর সম্পত্তি নতুন করে ভাগ করতে চলেছেন এমন একটা আভাস তাতে পাওয়া গিয়েছিল। তবে ছেলেমেয়েরা কেউ জানত না, তারা কে কত পাবে।
চৌধুরী ভিলার ডাইনিং হলটা বিশাল। বারো জন বসার মতো সেগুন কাঠের বিশাল টেবিল। ওপরে ঝাড়বাতি লাগানো। দেয়ালে পুরনো তেলরঙের ছবি।
খাওয়ার মাঝখানে সেদিন অমিয়েশবাবু জল খান। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, "আমার বয়স হয়েছে। তাই সব এবার কিছু গুছিয়ে নেওয়া দরকার।" কেউ কিছু বলেনি। তিনি আবার বললেন, "উইলের খসড়া তৈরি হয়েছে।"
অরিন্দমের হাত থেমে গেল। অর্ক মুখ তুলল। মল্লিকার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত ঝলক দেখা গেল।
অমিয়েশবাবু বলেছিলেন, "আগামী সপ্তাহে সই করব, তার আগে আমি আরেকবার দেখে নেব।"
অর্ক হঠাৎ বলে উঠল, "আমাদের তো জানার অধিকার আছে, বাবা।"
অমিয়েশবাবু ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন, "কী জানার অধিকার?"
"কে কী পাচ্ছে।"
ডাইনিং হলের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে বলা বাহুল্য এ কথায়। অমিয়েশবাবু ঠান্ডা গলায় বলেন, "আমি এখনও বেঁচে আছি, অর্ক।"
অর্ক মুখ শক্ত করে বলেন, "আমি শুধু জানতে চেয়েছি।"
উত্তরে অমিয়েশবাবু বলেন, "যখন সময় হবে, তখন নিশ্চয়ই জানতে পারবে।"
অরিন্দম শান্ত গলায় বলল, "বাবা, অর্কের প্রশ্নটা কিন্তু অযৌক্তিক নয়।"
অমিয়েশবাবু এবার বড় ছেলের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন, "তুমিও?"
"আমি শুধু বলছি, অনিশ্চয়তা থাকলে সমস্যা বাড়ে।"
"সমস্যা তো তোমরাই বাড়াচ্ছ।"
কয়েক সেকেন্ড সবাই চুপচাপ। তারপর অমিয়েশবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, "আমি স্টাডিতে যাচ্ছি।" ন্যাপকিনটা টেবিলে রেখে তিনি বলেন, "উইলটা শেষবার দেখব।" এই বলে তিনি চলে যান। জানা যায় তাঁর পায়ের শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পর কেউ কোনো কথা বলছিল না আর।
রাত এগারোটার একটু আগে হঠাৎ গোটা বাড়ি কাঁপিয়ে একটা চিৎকার শোনা যায় একজন মহিলা কর্মচারীর।
সবাই ছুটে বেরিয়ে এসে বুঝতে পারে চিৎকারটা আসছে দ্বিতীয় তলা থেকে। অমিয়েশবাবুর ব্যক্তিগত স্টাডির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপছেন মহিলা আর বলছেন, "দরজা খুলছে না!"
অরিন্দম দরজায় ধাক্কা দিল,"বাবা!"
কোনো উত্তর নেই।
আবার ধাক্কা দিয়ে ডাকেন তিনি, "বাবা!"
কোনো সাড়া শব্দ নেই। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। সবাই একে অন্যের দিকে তাকায়। একটা অজানা আতঙ্ক সকলের বুকের ভেতর ধীরে ধীরে জমতে লাগল।
অর্ক চেঁচিয়ে বলে, "দরজা ভাঙো!"
দুজন নিরাপত্তারক্ষী এগিয়ে এল।
চারবারের ধাক্কায় পুরনো কাঠের দরজা শেষ পর্যন্ত ভাঙে। আর তারপর যে দৃশ্য দেখা যায়, তা উপস্থিত কেউ কোনোদিন ভুলতে পারেনি।
ঘরের মাঝখানে বড় মেহগনি ডেস্ক। তার ওপরে ঝুঁকে পড়ে আছেন অমিয়েশ চৌধুরী। সাদা শার্ট রক্তে লাল হয়ে গেছে একেবারে। বুকের মধ্যে গাঁথা রুপোর পেপার নাইফ। মেঝেতে রক্তের ধারা। আর ডেস্কের ওপর রাখা একটি মাত্র লাল গোলাপ। সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল দেয়ালটা। কেননা সাদা দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা ছিল "বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি মৃত্যু।"
কেউ কোনো কথা বলতে পারছিল না। মল্লিকা মুখে হাত চাপা দেয়। অর্ক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অরিন্দমের মুখ সাদা হয়ে যায়।
পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ পৌঁছাতেও খুব বেশি সময় লাগেনি। খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শহরের অন্যতম ধনী ব্যবসায়ীর রহস্যময় মৃত্যু। মিডিয়া উত্তেজিত। পুলিশ যথেষ্ট চাপে। প্রাথমিক তদন্তে আরও অদ্ভুত তথ্য সামনে আসে। ঘরের সব জানালা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। দরজাও ভেতর থেকে লক। অথচ কোনো গোপন পথ নেই। সিসিটিভিতেও কাউকে ঢুকতে দেখা যায়নি। ইন্সপেক্টর সৌমেন গুহ মাথা চুলকে বললেন, "এটা কী করে সম্ভব?"
সেদিন রাতেই তিনি সাহায্য চেয়ে ফোন করেন মামনিদি ওরফে অন্বেষা সেনকে।
রাত একটা নাগাদ চৌধুরী ভিলার সামনে মামনিদির সঙ্গে আমি আর রেনুআপা নামলাম। কিন্তু সত্যি বলতে কি তখনও জানতাম না, আমি এমন এক রহস্যের সাক্ষী হতে চলেছি যা কলকাতার ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত তদন্ত হয়ে থাকবে।
যাইহোক চৌধুরী ভিলায় পৌঁছেই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে মামনিদি স্টাডি রুমে ঢুকল। কেউ কিছু বলল না।
ও ধীরে ধীরে চারপাশ দেখল। ডেস্ক, চেয়ার, রক্ত, গোলাপ, জানালা, বইয়ের তাক, কার্পেট প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে কোনো প্রশ্ন বা মন্তব্য ছাড়াই। তারপর ডেস্কের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। মেঝে থেকে কি একটা তুলে নিল।
রেনুআপা জিজ্ঞেস করলে মামনিদি হাতের তালু খুলে দেখাল এক টুকরো ভাঙা চশমার কাঁচ।
ইন্সপেক্টর বললেন, "সম্ভবত মৃতের।"
মামনিদি মাথা নাড়লেন,"না।"
মৃতদেহের পাশের টেবিল থেকে চশমাটা তুলে দেখিয়ে ও বলল, "অমিয়েশবাবুর চশমার পাওয়ার অনেক বেশি। কাঁচটাও তাই অনেক মোটা।"
ও হাতের টুকরোটার দিকে তাকাল। বলল," উঁহু। এটা অন্য কারও।"
ঘরের ভেতর সবাই চুপ। মামনিদি ডেস্কের ওপর রাখা গোলাপটার দিকে তাকাল খুব মন দিয়ে। তারপর হঠাৎ মৃদু হাসল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার দিকে হেঁটে গিয়ে বাইরেটা দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর বলল, "খুনি একটা ভুল করেছে।"
ইন্সপেক্টর দেখলাম চমকে উঠে বললেন, "ভুল?"
মামনিদি উত্তর না দিয়ে বরং ঘরের সবাইকে একবার করে দেখল। তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল, "এই বাড়ির মধ্যেই এখনও খুনি আছে।"
কথাটা শোনা মাত্রই আমি খেয়াল করলাম ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেল। কেউ কোনো প্রতিবাদও করল না। কেউ কোনো কথাও বলল না। শুধু দূরে কোথাও একটা ঘড়িতে ঢং ঢং করে বারোটা বাজার ঘণ্টা শুনতে পেলাম। আমি আর রেনুআপা দুজনে চোখ চাওয়া চাওয়ি করলাম।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন