কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

সন্দীপন দাশ

 উপন্যাসিকা 

 

আনকোরা শহর অথবা পতঙ্গভুকের সূত্র

 


(প্রথম পর্ব)

আপনি বসে আছেন একটা ঘরে। ঘরে একটা সোফা আছে। সেখানে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছেন। সোফার সামনে একটা টি-টেবল। তাতে কিছু ম্যাগাজিন পড়ে আছে। সোফার ডানদিকে একটা শোকেস। তাতে বই সাজানো আছে। তার ওপরের মোমদানিতে দুটো মোমবাতি জ্বলছে। ঘরে ঐটুকুই আলো। ঐ আলোতেই ঘরটা যা দেখা যায়। আপনি কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন। অধৈর্যভাবে পা দোলাচ্ছেন। একটা ম্যাগাজিন উল্টেপাল্টে দেখে রেখে দিলেন। ঘরের কোথাও একটা ঘড়ি নেই। আপনার কাছেও কোনো ঘড়ি নেই। শুধু মোমবাতিগুলো পুড়ে যাচ্ছে। ঘরটার দেয়ালের রং, দেয়ালের গায়ে আটকানো ছবি, দেয়াল ক্যালেন্ডার একটু একটু করে যেন অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।

অপেক্ষা করছেন শ্রী ‘ঙ’-এর জন্য। অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেই এসেছেন। শ্রী ‘ঙ’ এই বাড়িতেই থাকেন। শ্রী ‘ঙ’ অন্তত তাই বলেছেন। বাড়ির কলিং বেলটা বাজানোর আগে ঠিকানাটা দু-বার করে মিলিয়ে নিয়েছেন, আপনার হাতে থাকা কাগজটার সঙ্গে। কাগজে লেখা আছে ঠিকানা, বাসস্টপেজ, স্টপেজ থেকে কীভাবে আসতে হবে তার রেখাচিত্র। নির্দেশ মতো এসে দেখলেন বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে আছে। হাতড়াতে হাতড়াতে ঢুকে পড়লেন বাড়িটার মধ্যে।

এবার আপনি শ্রী ‘ঙ’-এর সামনে বসে আছেন। যদিও আগের মুহূর্তেও শ্রী ‘ঙ’ আপনার সামনে ছিল না।

“বলুন কী জানতে চান? আপনার নামটা কী যেন? আপনি তো গোয়েন্দা?” ভীষণ ভারী কণ্ঠস্বরের অধিকারী।

আপনি ছোট্ট একটা নমস্কার করে আপনার কার্ডটা বুকপকেট থেকে বের করে শ্রী ‘ঙ’-এর হাতে দিলেন।

“হ্যাঁ, ডিটেকটিভ ‘প”। (আপনি ভাবছেন একটা দরজা বন্ধ হলে আরেকটা চাঁদ আকাশে)

“বলুন কী জানতে চান?” পায়ের ওপর পা তুলে। পা থেকে মাথা আভিজত্য ফুটে আছে।

“আপনার এক সময়ের ভাড়াটে শ্রী ‘র’ সম্পর্কে কিছু কথা জানার ছিল”। আপনিও একটু ভারিক্কি ভাব আনার চেষ্টা করছেন।

“বলুন”! (আপনি লোকটার হাতের আঙুলগুলো গুণতে থাকেন)

“এই ছবির ব্যক্তিই আপনার ভাড়াটে ছিলেন তো?” একটা ছবি বার করে এগিয়ে দিলেন।

“হ্যাঁ, ইনিই”। (আপনি লোকটার পায়ের চপ্পলটা কী কোম্পানির বোঝার চেষ্টা করছেন)

“শ্রী ‘র’?” (আপনি ভেবে পাচ্ছেন না কেন এত দামি আসবাবপত্রের মধ্যে একটা ঘড়ি নেই)

“হ্যাঁ”। (আপনি বোঝার চেষ্টা করছেন মানুষটা শরীরী না অশরীরী)

“ইনি কি একাই থাকতেন?” আপনি ডান কানটা চুলকাতে চুলকাতে জিজ্ঞেস করলেন,

“না। উনি আর ওনার মা। দুজনে থাকতেন” শ্রী ‘ঙ’ আপনাকে সিগারেট অফার করলে আপনি না করে দিলেন।

“আমি খেলে কি অসুবিধা হবে আপনার?” আপনার গলায় যেন একটা কুমির শুয়ে আছে।

“হ্যাঁ। দয়া করে খাবেন না”! কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। যাকে বলে পিন ড্রপ সাইলেন্স। সেই নীরবতার মধ্যেই প্রশ্ন করা শুরু হয়ে গেল।

“কতদিন হলো ওনারা চলে গেছেন”? আপনার গলায় এখনও কুমির। কুমির নড়ে না চড়ে না।

“হুম। তা সাত-আট মাস হবে। আরো বেশিই হবে”।

“কেন চলে যাচ্ছেন কিছু বলেছিলেন”?

“নিজেদের ফ্ল্যাট কিনেছেন। বিয়ে করবেন”।

“কোথায় ফ্ল্যাট কিনেছেন বলতে পারবেন?”

কিছুক্ষণ ভাবার পর “না। বলেছিল। মনে নেই আর। বোধহয় ‘ন’-পুরে”।

“এখান থেকে চলে যাওয়ার পর শ্রী ‘র’-এর সাথে কখনও দেখা হয়েছিল?”

“হ্যাঁ এই তো মাস খানেক আগে ব্যাঙ্কে দেখা হয়েছিল”। (শ্রী ‘ঙ’ সিগারেট খাচ্ছেন না তবু আপনার মনের হলো শ্রী ‘ঙ’ কণ্ঠস্বর ক্রমশ ধোঁয়াশায় ভরে যাচ্ছে)

“আর দেখা হয়নি?” (আপনি লোকটার চোখগুলো দেখছেন)

“না। অবশ্য ওনার বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছিল। সেখানে দেখা হয়েছিল”।

“কোনো অনুষ্ঠান বাড়িতে?”

“হ্যাঁ। ‘ঐ’ মহল। ‘কখ’ রাস্তায়”। (আপনার মনে হচ্ছে লোকটা ঘুমোচ্ছে)

“কতদিন আগে সেটা?”

“হ্যাঁ সেটাও তো মনে হয় তিন-চার মাস আগে হবে”।

“ধন্যবাদ”! আপনি ছোট একটা নমস্কার করে উঠে দাঁড়ালেন। ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার  কাছে গিয়ে আবার শ্রী ‘ঙ’-এর দিকে ফিরে, “শ্রী ‘র’ যে ঘরটাতে ছিলেন সেই ঘরটা একবার দেখা যাবে?”

“সে ঘরে এখন অন্য ভাড়াটে আছেন। যদি তারা দেখতে দেন তাহলে দেখতেই পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই”।

“ঘরটা কোন দিকে?” (আপনি কি ঘরের মধ্যে আছেন না শরীরের মধ্যে?)

“সিঁড়ি দিয়ে নেমে ডান দিকের প্রথম ঘরটা”।

“আচ্ছা”, আপনি আরেকবার নমস্কার করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।

 

××××××

 

আনকোরা এক শহর। তুমি হেঁটে চলেছ সেই শহরের রাস্তা দিয়ে। আনকোরা রাস্তা। আনকোরা আলো। আলো আর ছায়া ভিজিয়ে দিচ্ছে তোমার পা। তুমি হেঁটে চলেছ হোটেলের দিকে। যদিও এখানে সব হোটেল, সব রাস্তা, সব বাড়ি, সব ফোয়ারা, সব মানুষ, সব পতঙ্গ – একই রকমের। ঝাঁ চকচকে, আবর্জনায় ঢাকা। আসলে এই আনকোরা শহরের সব কিছুই স্থির, নিঃশ্চল। কোথাও কোনো ক্ষয় নেই। কোথাও কোনো গতি নেই। গাড়ি-ঘোড়া, মানুষ সব এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে, অপরিবর্তনীয় – চিরটাকাল। সবাই নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত। যেমন, এই যে রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ এখন নিস্তব্ধ শুনশান। দূরে গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দূরত্ব কমছে না। কাছে এগিয়ে আসছে না। ফুটপাতে লোকগুলোর হাঁটার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। একজন ঝুঁকে কিছু তুলছে। তুলছে তো তুলছেই। সবাই যেন ফটোগ্রাফের ফ্রেমে বন্দী।

“আজ কী তিথি?”

“বলতে পারবো না। হয়তো এই অন্ধকার টানেলটা একটা নতুন প্রতিধ্বনির জন্ম দিচ্ছে”।

“হয় কাল-পরশু পূর্ণিমা। নয়তো সবে পূর্ণিমা গেছে”!

“হতে পারে সব চরিত্রই একদিন বাস্তব হয়ে যাবে”।

“আচ্ছা, এই রাস্তাটাই কি জঙ্গলের দিকে গেছে?”

“হ্যাঁ”।

“একদিন জঙ্গলে যেতে হবে”।

“না গেলেই ভালো। ওখানে সব কিছুই সক্রিয়, আদিম, বিপজ্জনক। চারিদিকে শুধু ভয় ঘুরে বেড়ায়”।

“এখানে অনেকগুলো সুন্দর দ্বীপ আছে না? দেখবার মতো নাকি সেগুলো?”

“হুম”।

“চলো একদিন যাই”!

“চাঁদটাকে নিয়ে অন্ধকার কেমন বিড়ালের মতন খেলা করছে দেখ”!

“এখন হাঁটার সময় নয়”।

“বা আরো নিবিড়তা তৈরি হচ্ছে”।

“কিংবা একটা দ্বীপ”।

 

××××××

 

পাখাটা বনবন করে ঘুরছে। ঘটঘট করে একটা একঘেয়ে আওয়াজ করে চলেছে। আপনি চেয়ারে হেলান দিয়ে পাখার সেই ঘোরা দেখে চলেছেন। আপনার কোনো কাজ নেই শুধু ঐ পাখাটাকে দেখা ছাড়া। আপনার সামনের টেবিলটাকে প্রায় ফাঁকাই বলা যায়। একটা টেবিল ক্যালেন্ডার, পেন স্ট্যান্ড, দুটো পেপার ওয়েট। জানলার ফাঁক দিয়ে যে অল্প আলো আসছে সেখান দিয়ে কেউ যেন উঁকি মেরে দেখছে ঘরের মধ্যে কী হচ্ছে। এটা সব সময়ই হয়ে থাকে। এখানে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কেউ না কেউ উঁকি মারে বাইরে থেকে। উঁকি দেখে ঘরের ভিতরে কী ঘটছে।

দরজা ঠেলে একজন ভিতরে ঢুকল। প্রথমে ভেবেছিলেন অতীতের কোনো স্মৃতি। অথবা এই ঘরেরই কোনো পরিচিত পুরাতন অতিথি। যে আগে আশ্রয় পেয়েছে এই ঘরের। আপনার মুখোমুখি যে দেয়ালটা সেখানে একটা ছবি ছিল। এখন নেই। আছে শুধু চারকোণা দাগ। ছোপ। ছাপ। অতীতের। এই কাঠের টেবিলটার অতীত সেই ছাপ থেকে একটা ফোটনের দিকে। একজন শ্যামাঙ্গী। দীর্ঘাঙ্গী। বিবাহিতা। যুবতী। পরনে শাড়ি।

“আপনি গোয়েন্দা ‘প’ তো?”

“আজ্ঞে, হ্যাঁ”, নমস্কার করে, “বসুন”।

প্রতি নমস্কারের পর আপনার সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলেন।

সিঁড়ি দিয়ে তিনতলা উঠতে হয়েছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আপনি তাকিয়ে আছেন। সাজগোজ তেমন কিছু নয়। যেমন আর পাঁচ জনের হয়। বলবার মতো কিছু নয়। এখন আপনি চোখের দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখের পলক পড়ছে না। উনিও আপনার দিকে তাকিয়ে আছেন। আপনার অস্বস্তি হচ্ছে। ভদ্রমহিলা নিজের পরিচয় দিলেন। শ্রীমতি ‘ট’। থাকেন ‘ক-তলা’য়। শ্রীমতি ‘ট’ ওনার হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ। আপনি কাগজটা নিলেন ওনার হাত থেকে। ভাঁজটা খুললেন। একটা ছবি। একজন লোকের। ছেলেও বলা যায়। কোনো ফ্ল্যাটের বারান্দার রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। ছবিটার উল্টো দিকে দুটো ঠিকানা। একটা এই শহরেরই। আরেকটা অন্য জায়গার। “একটা ঠিকানা অতীতের। আরেকটা হয়তো বর্তমানের। লোকটার নাম শ্রী ‘র’। এই শহরের ঠিকানাটায় উনি আগে থাকতেন। আরেকটা ঠিকানায় উনি যখন এই শহর ছেড়ে চলে যান, ওখানেই যান। এখন ওখানেই আছেন কিনা জানি না। আপনাকে সেটা জানতে হবে। ঐ ঠিকানাতেই আছে কিনা। নাকি এখন অন্য কোথাও আছে। অন্য কোথাও থাকলে সেখানকার ঠিকানা। এছাড়াও এখন কী করছে? কার সঙ্গে আছে? এই সব খবর নিয়ে আমাকে রিপোর্ট করবেন। আমি পরশু আবার আসব। এর মধ্যে আপনি ওখানে কোথায় থাকবেন ঠিক করে রাখবেন। আমি সেই ঠিকানা নিয়ে যাব। এবং আমি চিঠি লিখে জানাব কীভাবে আপনি আপনার রিপোর্ট পাঠাবেন। আপনি অন্য কোনোভাবে আমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করবেন না। আপনার পেমেন্টের অর্ধেক আর আপনার যাতায়াতের ভাড়া”… একটা খাম বাড়িয়ে দিলেন শ্রীমতি ‘ট’।

খাম থেকে টাকাটা বার করে গুণে আবার খামে ভরে টাকাটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলেন। শ্রীমতি ‘ট’ উঠে দাঁড়ালেন। “আমি পরশু আসব। আপনি হোটেলটা এর মধ্যে অবশ্যই বুকিং করে রাখবেন। আর হোটেলের ভাড়াটা তখন দিয়ে দেবো”। শ্রীমতি ‘ট’ নমস্কার করলেন। আপনিও প্রতি নমস্কার।

আপনি চুপ করে বসে আছেন। ঘর এখন ফাঁকা। ছোপ লাগা দেয়ালটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। পলেস্তরা খসে পড়েছে। টিকটিকিটা চুপচাপ এক জায়গাতেই রয়ে গেছে। কতক্ষণ কে জানে! আপনি ভাবছেন (বা দেখছেন) কারা যেন হেঁটে যাচ্ছে। একটা ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উঠে চলেছে তারা। একি আপনার দূরদৃষ্ট না দূরদৃষ্টি? হঠাৎ আপনার মনে প্রশ্ন জাগল, আজকের তারিখ কত? কী বার আজকে?  আপনি ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালেন। কিছুই বুঝতে পারলেন না। মনে হলো সংখ্যাগুলো একটা নাটক মঞ্চস্থ করছে। দাঁড়িয়ে আছে যে যার নির্দিষ্ট স্থানে। আপনার দিন-রাতের হিসাব নেই। বার-মাস-বছর – কিছুই মনে নেই। যে সালের ক্যালেন্ডার এখন কি সেই সালই চলছে? কী করে বুঝবেন? যেন আপনি কোনো কালেই এই ঘর থেকে বেরোননি।

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। আনকোরা শহরে যেতে হবে। আপনার পরিচিত ট্রাভেল এজেন্সির অফিসে যেতে হবে। টিকিটের, হোটেলের ব্যবস্থা করতে হবে। আপাতত তিন দিনের জন্য ঘর বুক করলেই চলবে। সেই মতো কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিতে হবে। ড্রয়ার খুলে একটা ম্যাপ বার করলেন। টেবিলে বিছিয়ে দিলেন মানচিত্র। টেবিল জুড়ে নদী-নালা, পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র, শহর, সবুজ, বাদামী, নীল, ফিতে, স্টার, ফুটকি, ক-খ-গ-ঘ-ঙ ইত্যাদি বর্ণ, ১-২-৩-৪-৫ ইত্যাদি সংখ্যা। খুঁজতে থাকেন আনকোরা শহর। ‘অ’ সমুদ্রের ধারেই বড় ফুটকির পাশে লেখা আনকোরা শহর। সময় খুঁজে পাচ্ছে থাকার জায়গা। সময় পশ্চিমদিকে মুখ করে পাঁচ হাত হেঁটে গেল। বালির ওপর শুয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকে। আর আপনার মনে পড়ে আনকোরা শহরটাকে। আপনার পরিচয় হয় আনকোরা শহরের সঙ্গে। একটা সিগারেট ধরিয়ে চেয়ারটায় বসে পড়লেন। পাখাটা ঘুরে চলেছে। ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে।

 

××××××

 

আপনি সিঁড়ি দিয়ে নেমে ডানদিকে ঘুরতেই একটা দরজার মুখোমুখি হলেন। আপনি দুবার টোকা দিলেন। দরজা খুলে গেল। একটা লোক বা বলা ভালো একটা লোকের ছায়া দাঁড়িয়ে। লোকটার পিছনে একটা হাল্কা হলুদ আলো। সেই আলোয় একটা চেয়ার আর তক্তপোশ। আপনি নিজের পরিচয় দিলেন। আপনার আসার উদ্দেশ্যটা বললেন।

“কিন্তু এই ব্যাপারে আমি কী বলব! আমি কয়েকদিন হলো এখানে এসেছি”।

“তবু আপনি যদি কিছু জেনে থাকেন বা পেয়ে থাকেন। শ্রী ‘র’দের কোনো জিনিস”।

“না, না। আমি যখন আসি ঘর একদম পরিষ্কার। কিছুই ছিল না”।

“আচ্ছা ঐদিকে কি আরেকটা দরজা রয়েছে?”

“হ্যাঁ ঐ দরজাটা রাস্তার দিকে সরাসরি যাওয়ার জন্য”।

“ঐ রাস্তাটা দিয়েই তো শিউলিতলার দিকে যাওয়া যায়?”

কথাগুলো যেন ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে। আপনার নিজের গলাও যেন বহুদূর থেকে শুনতে পাচ্ছেন।

“হ্যাঁ, তাই তো জানি”।

“আসলে শিউলিতলা নিয়ে একটা স্বপ্ন ছিল আর সেই স্বপ্নটার কথাই মনে পড়ে গেল”।

“কিন্তু শিউলিতলায় তো এখন আর কেউ থাকে না!”

“শিউলিতলায় যাওয়ার ইচ্ছাটা বারবার ফিরে ফিরে আসে। ঠিক আছে। হোটেল ‘দ’-এ যাব কী করে বলুন তো?”

“বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে যাবেন। কিছুটা গেলে একটা চায়ের দোকান দেখতে পাবেন। চায়ের দোকানটার পাশ দিয়ে একটা সরু গলি ঢুকে গেছে। ঐ রাস্তাটা ধরে নেবেন। তাহলে তাড়াতড়ি হবে”।

আপনি রাস্তায় উঠে নির্দেশমতো হাঁটতেই চায়ের দোকানটা পেয়ে গেলেন। কিন্তু আপনি ভেবে অবাক হলেন যে আপনি ঐ ঘরটার প্রতি একটা টান অনুভব করছেন। ঘরটা যেন আপনার অনেক দিনের চেনা। ঐ ঘরটার ভিতরে যাবার একটা অদম্য ইচ্ছা আপনাকে পেয়ে বসছে। যেন ঘরটাতে গিয়ে বসলেই একটা ভুলে যাওয়া কথা মনে পড়ে যাবে। কিংবা যা স্মৃতি নয় তারই মুখোমুখি হতে চান।

আপনার পায়ের ওপর দিয়ে একটা ইঁদুর চলে গেল। আপনার মনে পড়ল আপনি যে হোটেলটায় উঠেছেন সেখানেও খুব ইঁদুরের উপদ্রব। কে যেন বলছিল এই শহরটার নীচে ইঁদুরেরা এর থেকে অনেক বড় একটা শহর গড়ে তুলেছে। আপনি চায়ের দোকানটায় গিয়ে বসলেন। উনুনে ডিম টোস্ট হচ্ছিল। এটা দেখে আপনারও খেতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু আপনি একটা কেক আর চা নিয়ে বসলেন। ধীরে ধীরে খেতে লাগলেন। সামনের বেঞ্চে কয়েকজন আড্ডা মারছিল। সাইকেলে করে এসে একজন সিগারেট কিনে নিয়ে গেল। আপনিও এক প্যাকেট সিগারেট কিনলেন। তারপর ছবিটা দেখিয়ে বললেন, “এই লোকটাকে চেনেন?”

“হ্যাঁ। এ তো শ্রী ‘র’-দা। এই তো সামনের বাড়িটাতেই থাকত। কিন্তু ওনারা তো অনেক দিন হলো চলে গেছেন”।

“কোথায় গেছে বলতে পারবেন?”

“সময়ের অন্য দিকে যেতে হবে। অবশ্য গাড়ির ইন্ডিকেটর জ্বাললে হবে না”।

“দিক এখন সমান্তরাল আছে। সুতরাং, ছায়াপথ থেকে কিছু মৃত্তিকা বাদ দাও”।

“এই রাস্তাটা শিউলিতলার দিকে গেছে?”

“এখানে সব রাস্তাই শিউলিতলার দিকে রয়েছে”।

“শিউলিতলা নিয়ে একটা স্বপ্ন যেন সময়ের গর্তে পড়ে রয়েছে আজও”!

“নাকি স্মৃতির গর্তে? একটু ভালো করে ভেবে বলবেন। অনেক কিছু নির্ভর করছে এর ওপর”।

“গর্তে না গর্ভে? গর্ভও হতে পারে কিন্তু”।

“বড্ড খেলো। চায়ের দোকানে বাটার টোস্টের সেলটাই যেরকম বেশি সেইরকমই যেন”।

“কিন্তু স্বপ্নটা তো বারবার আসছে। অথচ শিউলিতলার কোনো স্মৃতি নেই। আচ্ছা, স্বপ্ন স্মৃতির পুনরুত্থান না দিব্যদর্শন?”

আপনি ফিরে যাচ্ছেন। অন্ধকার রাস্তা। রাস্তাটা একটা দিকনির্দেশ করছিল। দূরে দেখলেন একটা ইঁদুরের পরিবার তাদের গর্তে ফিরে যাচ্ছে। এই শহরের সব মানুষই যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আপনি হোটেলে পৌঁছে গেলেন। নীচের দোকান থেকে রুটি-তরকা কিনে আপনার ঘরে চলে গেলেন।

 

×××××

 

আপনার ঘরে এসে দেখলেন ইঁদুরগুলো আবার তাদের ভবিষ্যদ্বাণী রেখে গেছে। রোজ একটা করে ভবিষ্যদ্বাণী রেখে যায়। আপনার মনে হয় এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো একদিন আপনার নিয়তি হয়ে যাবে।

“অন্ধকারের দিকটায় গিয়ে দাঁড়াবে। যখন বিদ্যুৎ আসবে। নারকেল গাছটার কথা মনে পড়লে। একটা চমক হেঁটে আসছে ধীরে ধীরে”।

খাওয়া-দাওয়া সেরে একটা সিগারেট ধরিয়ে জানলার সামনে দাঁড়ালেন। গোটা শহরটা সেই একই রকম ভাবে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ইঁদুরগুলো এখনও ফিসফিস করে কথা বলে চলেছে। আপনি এরই মধ্যে ফিরে যেতে লাগলেন। আপনার ভালো লাগল ঐ নরম আলোটাকে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে গাড়িটা। তাতে বসে থাকা মেয়েটা। তাকিয়েছিল আপনার দিকে। জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে অন্ধকার আরো একবার ফিসফিস করে উঠল। আপনি গাড়িতে বসে থাকা মেয়েটার চোখের কথা ভাবছেন। চোখ দুটোর মধ্যে একটা অদৃশ্য আকর্ষণ ছিল। বা একটা অশরীরী অস্তিত্ব ছিল চোখ দুটোর পিছনে।

দ্রুত গতিতে এই আনকোরা শহর আপনার দিকে এগিয়ে আসছে। না। আপনি আসছেন আনকোরা শহরে। পুকুরে স্নান করছে অন্ধকার মেয়েগুলো। কাকতাড়ুয়া কাদায় লুটোপুটি খাওয়ার আগের মুহূর্তে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। সমস্ত সবুজ যখন চারিদিক থেকে এগিয়ে আসছে আপনি ফিরে এলেন। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন দূরে অন্ধকারের মধ্যে একটা অস্পষ্ট আলো মিটমিট করে জ্বলছে।

টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে আপনার নোটবইটা নিয়ে বসলেন। লিখে রাখলেন আজকে যা যা করেছেন। কালকে কী কী করবেন। এখনও ঢেউ সীমান্তে পৌঁছাতে পারেনি। আপনি ভাবছেন। পরিকল্পনা করছেন। আপনি জানেন আপনাকে কোথায় কোথায় যেতে হবে। কোথায় কোথায় যেতে হবে না। কোথায় কোথায় না গেলেও চলবে। কোথায় কোথায় না যেতে চাইলেও যেতে হবে। কোথায় কোথায় যেতে হবে না জেনেও যেতে হবে। নোটবই এটাও বলছে যাওয়া আর না-যাওয়ার মাঝে একটা ক্রিয়াপদ থাকে, তারই নাম বেঁচে থাকা। ক্রমশ আলোটা দূরে চলে যাচ্ছে। কপালের সেই বিন্দু বিন্দু ঘামগুলো আরো উগ্র হয়ে উঠছে। আপনি জলের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনি অপেক্ষা করছেন। ইঁদুরগুলো আরো একটা ভবিষ্যদ্বাণী রেখে গেছে।

“মেঘগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে পাথরের গুহাটা কথা বলবে”।

 

×××××

 

‘ঐ’ মহলের রাস্তা খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধা হলো না। হোটেলের ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতেই বলে দিল। বেঁটে-খাটো, টাক মাথার ‘অ’ বাবু খুবই অমায়িক মানুষ। আপনি অপেক্ষার কাছে ফিরে যাচ্ছেন। সেই পুরনো অপেক্ষার কাছে। অন্ধকার নেমে আসছে আপনার কাছে। আপনি জানেন চেনা সমুদ্রে দ্বীপের কথা। আপনি জানেন প্রত্যেকটা ঢেউয়ের ফিরে আসার মুহূর্ত।

“আমাকে ওই দ্বীপটায় নিয়ে যাবে একদিন?” আঙুল তুলে সে দেখায়।

আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বারবার ফিরে তাকাচ্ছেন। বুঝে নিতে চাইছেন যে রাস্তা দিয়ে এলেন সেই রাস্তাটা একই রকম রয়ে গেছে কিনা। রাস্তার পাল্টে যাওয়া আর একই রকম থেকে যাওয়া শুধুই যেন আপনার দূরদৃষ্টি আর দূরদৃষ্টের তফাৎ।

আপনি চলুন সবাই যে দিকে চলেছে অথবা সবাই যে দিকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি দিক খুঁজে না পেলে আকাশের দিকে চেয়ে দেখলেন কোনো সূর্য নেই, নক্ষত্র নেই।

“১২১/খ বাস ধরে ‘থ’ মোড়ে নামবেন। ওখানে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে ‘ঐ’ মহল দেখিয়ে দেবে। বাস স্ট্যান্ড থেকে দু মিনিট লাগবে।“

আপনি পান-সিগারেটের দোকানের লোকটাকে জিজ্ঞেস করতেই আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল ‘ঐ’ মহলের রাস্তা।

একটা তিনতলা বাড়ি। সাদা রঙের। সিঁড়িগুলো দেখা যাচ্ছে স্বচ্ছ কাচের দেয়াল ভেদ করে। বাড়ির সামনে সাদা রঙের দুটি স্তম্ভ। মাথায় মুখোমুখি কুকুরের আয়তনের দুটি সিংহ। একেই বলে সিংহ দরজা। একটা হলুদ রঙের লোহার গেট। ঠেলে ঢুকে পড়লেন। ঢুকতেই সামনে এসে একটা মোটা লোক দাঁড়াল। দারোয়ান।

“কী চাই?”

“এই বাড়ি অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া নেব। কার সাথে কথা বলতে হবে?”

“অফিসে চলে যান। সোজা গিয়ে বাঁ দিকে গেলেই অফিস”।

আপনি নির্দেশ মতো সেখানে গিয়ে দেখলেন ছোট একটা ঘরে একজন টেবিল পেতে বসে আছে। মোটামুটি ফাঁকা টেবিল। শুধু একটা বড় রেজিস্টার লোকটার বাঁ দিকে রাখা। আর একটা কলমদানিতে কয়েকটা কলম। দুটো জলের বোতল। এই ঘরটার পিছনে আরেকটা ঘর আছে। কাঠের পাটাতন দিয়ে আলাদা করা। একটা দরজার মতো ফাঁকা জায়গা কিন্তু কোনো দরজা নেই, শুধু পর্দা দিয়ে আড়াল করা। “আপনার সাথে কিছু কথা ছিল” বলতে বলতে ঢুকলেন ও ভিজিটিং কার্ডটা লোকটাকে দিলেন। লোকটা সেটা দেখে বুকপকেটে রেখে আপনাকে বসার ইশারা করল। “বলুন কী ব্যাপারে কথা বলতে চান?” শ্রী ‘র’-এর ছবিটা এগিয়ে দিতে দিতে, “এই লোকটা আপনাদের এই অনুষ্ঠান বাড়িটা ভাড়া নিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ, মনে তো হচ্ছে নিয়েছিলেন” রেজিস্টারের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে, “নামটা কী বললেন যেন?”

সমস্ত শহর নিস্তব্ধ, নিশ্চিন্ত, নিরাপদ। শহরের কোথাও কিছু ঘটছে না। নিশ্চল শহর। তাও এই অরব শহরের ভিতরে ঝড় উঠেছে। প্রতিটা কণার ভিতরে ঝড় উঠেছে। কণায় কণায় সব কিছু অনিশ্চিত। একটা অবস্থা জানা গেলে, আরেকটা অবস্থা না জানা গেলেও চলবে। সেটাই নিরাপদ। একদিক জানা, অপর দিক অজানা – এই ব্যবস্থাতেই নিরাপত্তা বাড়ে। সেই ব্যবস্থাতেই না হয় থাকলেন। কিন্তু মাঝে মাঝে ঝড় ওঠে। সেই ঝড়ে সব অবস্থা অজানায় চলে যায়, সব দিক অজানায়। তখন কোনো কিছুই নিরাপদ নয়। কণায় কণায় সেই রকম ঝড় উঠেছে। শহর তবু দাঁড়িয়ে আছে এক জায়গাতেই। যেখান থেকে শুরু করেছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।

তবু কোথাও শহর বলছে শহরের ভিতরে ভিতরে একটা অবিরাম জেগে থাকার মধ্য দিয়ে, একটা অবিরাম ঘুমের মধ্য দিয়ে –

ওটা পুঁতে ফেলুন, পুড়িয়ে ফেলুন, ঝালিয়ে জোড়া লাগান দুটোকে, কিছুক্ষণ পরে থাকুন আর তারপর ফেলে দিন যেমন আকারে ছিল সেই ভাবেই, ওটাকে জলে ডুবিয়ে ফেলুন, ধুলোয় ফেলে রাখুন, রোদের মধ্যে, খোলা বাতাসে, বৃষ্টির মধ্যে, ভোরের শিশির পড়তে দিন ছাদের ওপর থেকে; আপনার যদি এটা যা, তা ভালো না লাগে, ধুয়ে নিন এবং এটা অন্য কিছুতে পাল্টে যাবে। অথবা আপনি এটাকে অনুভব করেন, সেলাই করেন, নকশা করেন, ছাঁচে ফেলেন, গেঁথে তোলেন, আকার দেন, এঁকে রাখেন, বরফের ওপর রাখেন এবং এটা নিজেই নিজের মধ্যে গলে যায়। নদীতে ভাসিয়ে দিন, কাদায় ফেলে দিন, পশুর হাড়ে ভরে দিন, চুল পড়ে থাকুক, পাতা পড়ে থাকুক, ঘরের দেয়ালে সাজিয়ে রাখুন, অন্য লোকেদের ধরতে বলুন, যত্ন করতে বলুন, আচার-অনুষ্ঠান করতে বলুন, মা অথবা সন্তানের মতো দেখতে বলুন, এবং কোনো বাধা দেবেন না যখন তারা এটাকে প্রিয়জনের নজরে দেখে, কারণ এটাই আমাদের প্রকৃতি যে আমরা সব কিছু পাল্টে নিতে ভালোবাসি, প্রতিটা মাটির কণা আর জিনিসের টুকরোকে আমরা স্মৃতিতে পাল্টাই, অথবা লবণে।

পর্দাটা মাঝে মাঝে হাল্কা উড়ে গেলে দেখা যাচ্ছে পাটাতনের ওপারের ঘরটা। জগতটা। অল্প কিছুক্ষণের জন্য। আবছা ভাবে। স্বপ্নের মতো। আপনার কি ঐ অন্য জগতটা সম্পর্কে কোনো কৌতূহল আছে? নাকি আপনার মাথায় ঘুরছে শুধু শ্রী ‘র’-কে খোঁজার কথা। আপনিও পাল্টে ফেলুন শ্রী ‘র’-কে খোঁজার পদ্ধতি শুধু নয়, উদ্দেশ্যও।

 

××××

 

যাযাবর শব্দটা থাকলেও বাস্তবে আজ আর কেউ যাযাবর নয়। যদিও বাস্তব নিজেই হয়তো যাযাবর। বাস্তবের মধ্যে রয়ে গেছে যাযাবর (বাস্তবের কোনো সীমা নেই, সীমার উল্লেখ করা হলো না)। কিন্তু তোমার কি সীমা আছে? তুমি কে? তুমি কী? কেমন তোমার জীবনযাপন? হয়তো তুমি শুধু হাঁটতে থেকেছ। উদ্দেশ্যহীন। অগোছালো। অস্পষ্ট। এক অজানা কারণে সাড়ে চোদ্দ আনার জীবন। তবু তোমার উপর থেকে নীচ, নীচ থেকে উপর। যাওয়া আর আসা। দেখা আর শোনা। ধুলোবালি, স্মৃতিতে মরচে পড়ার শব্দ, পাগলের যৌনাঙ্গ, রেললাইন, লোকের হাসিঠাট্টা, ঘটিগরমের ঘটাং ঘটাং, ব্রিজের রেলিং, ভাঙা কাচের টুকরো, রুমাল, জ্যোতিহীন যতি, বীর্য, ফাঁকা জমি, না দেখা বাড়ি, সন্ধ্যার কলকাকলি, বেকারের নিমজীবনী, পিছন দিকের দরজা, নদীর ধারের বালি, ছোটবেলার যৌনসাধ, পিঁপড়ের সারি, কাঠ কাটার শব্দ। তুমি কোথাও স্মৃতিহীন হতে চেয়েছিলে! তোমার আসলে আয়নার সঙ্গে থাকা উচিত ছিল, অথচ বসেছ জানলার পাশে!বক্তব্য তোমার আছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো আসলে কথার কাচ বা আয়না। তুমি অদ্ভুতভাবে শুরু করেছিলে। যেভাবে হাঁটতে যাওয়ার কোনো মানেই হাঁটার মধ্যে থাকে না, সেভাবে হাঁটতে চাওয়ার ইচ্ছা কোনো কোনো মানুষের থাকে। থেকে যায়। হেঁটে যায়। অদ্ভুতভাবে শুরু করেছিলে। কথা বলছিলে। হাঁটছিলে। খাচ্ছিলে। ঘুমাচ্ছিলে। সব কিছুর মধ্যেই একটা মাত্রা রেখে। মাত্রাবোধ না রাখার মধ্যেও মাত্রা এসেছিল। একটা তারল্য ছিল তোমার মধ্যে। অথবা দেখার মধ্যে তোমার বায়বিয়তা। আসলে বসে থাকতে থাকতে, আলাদা হতে হতে বিমূর্ত। ভেসে আসছে যে সব কাল্পনিক গ্রহ-নক্ষত্র, সবারই তুমি নাম দেবে। আগে থেকেই ঠিক হয়েছিল। অত্যন্ত বেয়াড়া তোমার বৃত্তগুলো। কেমন একটা দিগন্তহীন ব্যাপার। কোথাও কোনো মন কেমন নেই। কিন্তু তোমার কাছে অনেক গোপন তথ্য আছে। যদিও তথ্যগুলোর মধ্যে কোনো সম্ভাবনা নেই। তথ্যগুলো কেমন একটা যেন বেহদ্দ হয়ে গেছে। বারবার, ফিরে ফিরে কয়েকটা একই শব্দের কাছে ফিরে যাচ্ছে। তথ্যের মধ্যে অনেক জানলা-দরজা আছে, কিন্তু সেগুলো সব বন্ধ করা। হাওয়া বাতাস নেই। দমবন্ধ অবস্থা। নিজের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দের মধ্যে ছলাৎ ছলাৎ শুনতে পাও। আর ভাবতে থাক আরেক ঘরের কথা। ত্রিশঙ্কুত্ব নিয়েই যে পেয়ারা পাতা চিবানো – সে তোমার বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং অথবা দিগন্তের আলো। আদতে কোথাও যেতে পারো না। বৃত্তাকার তোমার যাত্রাপথ। অথচ তারমধ্যেই কেন্দ্রাতিগকে খুঁজেছিলে। বস্তুত কেন্দ্রের প্রতি ভালোবাসাই তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল এক বৃত্ত থেকে আরেক বৃত্তের দিকে। পেচ্ছাপ করতে করতে, গামছায় হাত মুছতে মুছতে, খেতে খেতে এই সব বৃত্তের সংশ্লেষ-বিশ্লেষের কথা ভেবে গেছ। সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব সম্ভাবনায় হারিয়ে যেতে চায়। উপমার মধ্যে দিয়ে তোমাকে দেখতে গেলে দূরত্ব ও সেতুবন্ধন। অথচ তুমি যে জীবন যাপন করো, যে চৌহদ্দির মধ্যে তোমার চলাফেরা সেখানে প্রত্যেকেই নিজস্ব অর্থ ও বোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ; তারা প্রত্যেকে এক একটি একক, পরস্পর পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন, আলাদা, ভিন্ন। যোজনের কাছাকাছি বসে আছে অন্তঃরঙ্গতা। কোনো ডাকের অপেক্ষায় না থেকে জেগে থাকা। জেগে থাকার মধ্যে প্রতিলিপি। অনেক রঙিন আলো। পাখির ডাক। জন্তুর চলাচল। ভেজা রাস্তা। পাতার দুলুনি। দূরের সাইরেন। কোনো এক বাড়ি থেকে ভেসে আসা রেডিও। প্রজাপতির উড়ে যাওয়া। কালো পিঁপড়ে সার বেঁধে কোথায় যেন যায় – এই সবই অবিরাম শাফল ও রিশাফল হতে থাকে। রিশাফলের সময় নিমেষ চলে আসে। নিমেষ চিরকালই তোমার কাছে একজন তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে থেকে গেল। নিমেষের সঙ্গে তোমার মানা না-মানার যে সম্পর্ক তাকে বলা যেতে পারে বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে চলাচল বিন্দুগ্রাহ্যতার সঙ্গে। শেষ পৃষ্ঠায় কোনো নামকরণের প্রসঙ্গ না থাকায় তুমি আর নিমেষ পরস্পরের বেশ কিছুটা কিংবা অনেকটা বিন্যাস মুখরিত। এবং দীর্ঘ এক অন্ধকার, এভাবেই বেঁচে থাকার, পোকার সাদা পৃষ্ঠার ওপর অবস্থানে। বেঁচে থাকা বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবার মধ্য দিয়ে। প্রসারিত দুটো ডানা। খাঁজকাটা শরীর। যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে দেখার দিকে ফিরিয়ে নেওয়া। আসলে তুমি কখনও শরীর চাওনি, শরীরের প্রতি অতিরিক্ত বিশ্বাসে। এক নিঃশ্বাস সাদা পৃষ্ঠার ওপর দিয়ে। ঘনীভূত সকল প্রতীক সমূহ। তুমি কখনও প্রত্যুত্তর করো না। আবার তুমি সুযোগ হারালে। কবিতার ভাঙা দরজা-জানলায়। তুমি ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ছ। সে বহুবার তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও, তুমি দেখা করোনি। তোমাদের দুজনের সম্পর্কটাকে তুমি কোনো পরিণতি দিতে চাইছ না। তারচেয়ে বরং ধরে নেওয়া যাক তুমি অতীতের দিকে যেতে পারো। সময়ের বিপরীতে হাঁটতে পারো। এবং সেভাবেই তোমাদের আলাপ। আলাপ থেকে বন্ধুত্ব। নাম দেওয়া যাক কবিতা। কবিতার সঙ্গে সম্পর্কটা সব সময় তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। নিমেষের সঙ্গে তোমার এই ব্যাপারে বহুবার কথা হয়েছে। কোনো লাভ হয়নি। আসলে লাভ-ক্ষতির হিসেবটাই নিমেষ বোঝে না। নিমেষ হাওয়া খেতে ভালোবাসে। হাওয়ায় ক্যালেন্ডার দুলতে থাকে। জানলার পর্দা উথাল-পাথাল। পুরো ঘরটাই যেন বুঝতে চাওয়ার অপেক্ষায়। কী যেন ছিটকে পড়ার শব্দ। বসে বসে শুধু ভেবে যাচ্ছ। নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশটুকু দিচ্ছে না। সাইকেলটা বেল দিতে দিতে সাঁ করে বেরিয়ে গেল। কানের পাশ দিয়ে। হাতের পাশ দিয়ে। বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে। অনেকটা জায়গা জুড়ে দিবাস্বপ্ন। মিলে যাওয়ার ইচ্ছা। দূরে কারা যেন কথা বলছে। টিনের ছাদ উপড়ে আসতে চাইছে। ধড়াম করে দরজাটা পড়ল। হতাশা অথবা জিঘাংসা পড়ল। ভিতরে ভিতরে গুমরে মরবার ইচ্ছা। নিমেষ আসলে সেই বাজনা বাজাতে চায় যার থেকে কোনো ধ্বনি নির্গত হবে না। কিন্তু তা এখনও হয় ওঠেনি। যদিও নিমেষও হাল ছাড়েনি। কবিতার সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা ঠিক কী? এখন বৃষ্টি পড়া উচিত ছিল। কিন্তু দেখা গেল কে যেন কমিক চিত্র আঁকছে। আঁকবার ভাষা খুঁজছে। দৃশ্যের ভাষা খুঁজছে। বা ভাষার দৃশ্য খুঁজছে। এসব কথা তুমি কখনও ভাবো না। ভাবতে পারো না। কিন্তু একদিন হয়তো ভাববে, এমন একটা আশা নিমেষের মধ্যে কোথাও যেন থেকে গেছে। ধড়ফড় করে উঠল এখনও না হওয়া স্মৃতিগুলো। আয়ু নিয়ে সবসময়ই একটা মোহান্ধতা কাজ করে তোমার মধ্যে। কিন্তু এখনও কি তুমি সেই মোহান্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারনি? এটা নিয়ে আমি কবিতার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে তো সব সময়ই বিরক্ত আমার উপর। আমি কিছু বলতে গেলেই সে বিরক্ত হয়। কবিতাকে আমার প্রথম থেকেই ভালো লাগে না। অত্যন্ত খারাপ, চরিত্রহীন, ঘৃণ্য চরিত্রের এক মহিলা। নিমেষকে অনেক বার বলেছি কবিতা যেন না আসে আমাদের বাড়িতে। (এই “আমি” কে? কথক? নাকি লেখক? কথকের অস্তিত্ব যে কোনো গল্প পড়ার সময় টের পাওয়া যায়। কিন্তু লেখকের বা স্রষ্টার কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি উত্তম পুরুষে বললেও সে ব্যক্তি কথক; লেখক বা স্রষ্টা নন। কিন্তু এক্ষেত্রে জেনে রাখুন পাঠক-পাঠিকা মহোদয়গণ, যে এই “আমি” হচ্ছে লেখক বা স্রষ্টা স্বয়ং। লেখক বা স্রষ্টার নাম সন্দীপন দাশ। তাহলে কি সন্দীপন দাশও একটি চরিত্র?) নিমেষ কিন্তু সব কিছুতেই নিরপেক্ষ থাকতে চায়। নিমেষের এই এক দোষ। সব কিছুতেই উদাসীনতার ভান। নিমেষ ভালো অভিনয় জানে। তুমি আর নিমেষ, দুজনে মিলে, রোজ নাটক দেখতে যাও। তাহলে আসুন একটা গল্প শোনা যাক। এই গল্পটা থেকেও একটা ভালো নাটক হতে পারে। (বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ গল্পটা টোকাও হতে পারে)।

 

(পরবর্তী সংখ্যায় শেষ হবে)

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন