![]() |
| কবিতার কালিমাটি ১৫৯ |
সময়ের রূপ
দীর্ঘদিন পর ফিরে এসে সময়ের পরিবর্তিত রূপ দেখলাম। পথগুলো ইস্পাতের অভ্যাস রপ্ত করেছে, ঘরবাড়িগুলো পরে নিয়েছে চতুর্ভুজ মুখোশ, এমনকি বিকেলের ছায়ারাও পোস্টমডার্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। অন্তর্গত জাদুঘরে রক্ষিত প্রত্নসামগ্রী স্থানটির কাছে অপরিচিত হয়ে উঠল।
বাতাসের ভেতর নতুন বর্ণমালা ভেসে বেড়াচ্ছিল। যে গাছগুলো একসময় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বায়োরিদমিক তরঙ্গে শিক্ষার্থীদের আন্দোলিত করত, তারা এখন দূরবর্তী ভৌগোলিক কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
উঠোনগুলো সঙ্কীর্ণ হয়ে এসেছে, প্রাচীরগুলো উঁচু হয়েছে, আর নীরবতাও ভূষিত হয়েছে নানা রত্নে। আমি এ পরিবর্তনের ভেতর স্বপ্নবিন্দু থেকে স্বপ্নকুয়াশার দিকে হেঁটে চলেছি।
কথা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমার মস্তিষ্কের সাথে স্বরতন্ত্রীর সমন্বয় দুরূহ হয়ে উঠেছিল। পরিচিত পরিবেশ নতুন বর্ণ বিকিরণ করছিল—আমি অতিথির সংকোচ নিয়ে বসে পড়েছিলাম।
যাদের সঙ্গে একসময় মিশেছি, তাদের আত্মবিশ্বাস কাচের দীপ্তিকে অনুসরণ করেছিল। তাদের ভাষায় ছিল নাটকশৈলীর সংশ্লেষ।
তাদের উপাস্য ছিল শহরসংস্কৃতি— আলোকিত রাজপথে হেঁটে হেঁটে কেউ নিজের নীরবতাকে অদৃশ্য জলাধারে রূপান্তরিত করেছিল। আবার কেউ অবিরাম শব্দ ছড়িয়ে দিয়েছিল বাতাসে, অন্য স্বরের উড়ানদৃশ্যের দিকে ছিল না ভ্রূক্ষেপ।
তাদের শব্দে দ্রুত পূর্ণ হতো বাতাসের শূন্যতা।তাদের কাছে শ্রুতি মূল্যহীন ছিল বলে উচ্চারণ শৈলীর তীক্ষ্ণতা নিয়ে তারা সচেতন ছিল—তারা যখন বাক্য বিনিময় করত, জেগে উঠত ব্লেড ও মুদ্রার সমন্বিত ধ্বনি।
গ্রাম আমাকে শিখিয়েছিল অন্য বিন্যাসসূত্র। গ্রামে বাগ্মিতার কোনো প্রয়োজন ছিল না। মাটির সাথে রোদ বা বৃষ্টি কিংবা দিগন্তের সাথে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না।
বিকেলের বাতাসে নৃত্যরত কলাপাতার জন্য নতুন ভাষার প্রয়োজন নেই। সবুজ শরীরের কম্পন, ঝুঁকে পড়া ও পূর্বাবস্থায় ফিরে আসার বার্তা, যে-কোনো ভাষার চেয়েও প্রাচীন।
মাছেরও রয়েছে নিজস্ব ব্যাকরণ। জলের নিচে তারা তাদের শরীর দিয়ে রুপালি বাক্য রচনা করে যা কেবল জলপাঠ্য।
মাঠের ওপার থেকে যখন কোনো গরু উদ্বিগ্ন স্বরে ডেকে ওঠে, তখন ক্ষুধা, ব্যাকুলতা বা শঙ্কার যে অনুভূতি প্রকাশিত হয় তার আভিধানিক সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। ভাষার বিশেষ সত্যকে গভীরতর করা যায় না।
সময় নিরন্তর পরিবর্তনের পথ দেখায়। হাটবাজার আমাকে দর-কষাকষির ভাষা শিখিয়েছে। অফিস-আদালত আমাকে দেখিয়েছে আনুষ্ঠানিক শব্দ ও বাক্যের সংরক্ষিত কোষ। বিবিধ শব্দের সাহায্যে আমি পরিবর্তিত পথ চিনে নিতে শিখেছি।
শব্দ ক্রমান্বয়ে বহনযোগ্য এক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজনে তাকে শান দিয়ে ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছি। বিস্তীর্ণ মাঠের নীরবতার পাশে এখন হেঁটে চলে অসংখ্য শব্দ ও বাক্য।
মানুষের আচরণের নিচে লুকিয়ে থাকা নকশাগুলো এখন পড়তে শিখেছি। মানুষের অভিব্যক্তি বা নীরবতার সংকেত আমার বোধকে জাগ্রত রাখে।
পর্যবেক্ষণের ভেতর দিয়ে কবিতার পঙ্ক্তিগুলো স্বসজ্জিত হবার সুযোগ পায়। একটি দৃষ্টি চিত্রকল্পের উৎসমুখ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে, কোনো স্মৃতিখণ্ড রূপকের আশ্রয় হয়ে ওঠে, এবং একটি রাত অস্তিত্বের উষ্ণতার প্রতীক রূপে চিহ্নিত হয়।
বৃষ্টি ও রূপান্তরণ
থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে—বৃষ্টির কোনো পরিকল্পনা থাকে না। পথঘাট বৃষ্টির পুনর্লিখিত পাণ্ডুলিপিতে পরিণত হলে গাড়ির চাকায় ঘূর্ণায়মান জল ধুম্রচক্র নির্মাণ করে।
বৃক্ষ প্রতিরোধ করতে ভুলে গেছে। অদৃশ্য বাতাসের চেয়ে শক্তিধর হয়ে উঠেছে বৃষ্টিজল—পাতাকে ক্রমাগত কাঁপাচ্ছে, পাতা থেকে ঝরে পড়ছে স্বচ্ছতর অশ্রু। ম্লান হয়ে পড়েছে সবুজ পত্রালির ঔজ্জ্বল্য; কোথাও কোথাও সুপারি ফুল প্রবোধ দিচ্ছে সবুজকে।
ভেজা মাটির গভীরে কোথাও বীজেরা জেনে নিচ্ছে অন্ধকারের শুশ্রূষাপ্রকৃতি। অন্ধকার দিতে জানে উত্থানের নিশ্চয়তা।
প্রবল বৃষ্টি মানুষের পরিকল্পনা ও আত্মবিশ্বাসের বর্ণকে ফ্যাকাসে করে তুলছে। জলরাশির আবরণে পথ মুখ লুকালে মানুষ অসহায় বোধ করে। অথচ বৃক্ষ বৃষ্টিকে দুর্যোগ বলে জানে না—এটি তার অপরূপ স্নান। স্নানের ভেতর কখনো বাসা বাঁধে মৃদু শঙ্কা। অঙ্কুরের নিমজ্জন-সম্ভাবনা বৃক্ষকে ব্যাকুল রাখে।
প্রাচীন দেবতারা আবহাওয়ার ভেতর দ্রবীভূত হয়ে আছে। বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধ ও আর্দ্রতা তাদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে।
মহাসড়কের পাশে চায়ের দোকানগুলো বৃষ্টিহীন দিনের স্মৃতির ভেতর নিমগ্ন। পথিকেরা এখানে চা খেতে আসে এবং নিজেদের অজান্তে একাকীত্বের বিরুদ্ধে প্রাচীন আচার অনুসরণ করে।
পাখিরা বৃষ্টি উপভোগ করে না। ঘন পাতার কুটিরে তারা নিজেদের লুকিয়ে রাখে, যেখানে প্রতিটি সিক্ত পালক বিরামচিহ্নের বিবিধ আকৃতি অনুসন্ধান করে।
পরিত্যক্ত বাড়িগুলো অডেন-দৃষ্ট গির্জা হয়ে ওঠে—মানুষের পরিবর্তে বৃষ্টিকেই তারা আশ্রয় দেয়। ভাঙা ছাদের নিচে টলবলাতে থাকে বৃষ্টিজলের আয়না।
পাথরগুলোকে আজ জীবন্ত মনে হয়। জলে তাদের প্রকৃত রং প্রকট হয়ে ওঠে—শ্যাওলার ঈষৎ বিস্তার থেকে ধ্বনিত হতে থাকে বৃষ্টিগান।
বৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে শিশুদের কোনো জিজ্ঞাস্য থাকে না। তারা সহজস্বভাবী বলে বৃষ্টির ভেতর আকাশ নেমে এসে তাদের সাথে খেলা করে এবং পৃথিবী কিছুক্ষণের জন্য ক্ষয়প্রবণতার আশঙ্কা ভুলে যায়।
রাত্রি ধীরে ঘনিয়ে আসে, ভেজা বাতাসের চাপ অনুভূত হয়। অন্ধকারের চিত্রকল্প অনুধাবনে বৃষ্টি উন্মুখ হয়ে ওঠে।
দূরের বাঁশবনে কিছু ন্যারেটিভ নির্মিত হতে থাকে। মাঠ পেরোতে পেরোতে প্রতিটি ন্যারেটিভ রূপান্তরিত হয় এবং সত্যের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে।
ভোরের আগে বৃষ্টি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বিদায় সংবর্ধনার জন্য সমস্ত বৃক্ষ প্রস্তুত হয়ে ওঠে। পাতার দৃষ্টি থেকে ঝরে পড়ে বিলম্বিত অশ্রুবিন্দু।
বৃষ্টি পৃথিবীকে ধুয়ে দেয় তবে ভূমণ্ডলের পবিত্রতা নিশ্চিত করে না। রূপান্তরণের সহচর বিশৃঙ্খলা—এ সত্য প্রচারে বৃষ্টির কোনো জুড়ি নেই।
সূর্যের প্রথম আলোয় দৃশ্যমান হয় জলকাদাময় ভূখণ্ড যেখানে জন্ম নেয় আলো-অন্ধকারের আকাশ, প্রশ্নমুখর মানুষের মন।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন