কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৯
না-দেখা সেই-লোকটা
জ্যৈষ্ঠের দমবন্ধ করা এক যন্ত্রণাদায়ক বিকেলে যাত্রীঠাসা বাস থেকে… ‘না-দেখা-সেই-লোকটা,’ এ শহরের প্রাচীনতম সেতুর কাছাকাছি নেমে যেতে বাধ্য হল। হাঁপানির আক্রমণ আর অস্বাভাবিক গুমোট থেকে বাঁচার জন্য তার কাছে এছাড়া আর কোন বিকল্প ছিল না। ইতিমধ্যে, অফিসপাড়ায় ছুটি হয়েছে, ফুটপাতে ভিড় ও ঠেলাঠেলির চিরাচরিত দৃশ্য, যেন সামনে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটতে চলেছে, দ্রুত পা চালিয়ে সবাইকে সবার আগে নদী পেরোতে হবে। দেখে… দুর্বল, ভীরু, মিনমিনে কথা বলা, ‘না-দেখা-সেই-লোকটা’, যে নিজেকে এত নিকৃষ্ট, এত ভঙ্গুর মনে করে, ভিড় ও কোলাহল দেখলে গা-হাত-পা কেঁপে ওঠে, আজ তাঁর মনে এতটাই সাহস এল যে, যখন পেছনের লোকটা চিৎকার করে বলে উঠল, ‘আগে বাড়ুন, আগে বাড়ুন’, পাঁচটা উনিশের বাগনান…’, ‘না-দেখা-সেই-লোকটা’ তাঁকে বলল, ‘স্যার, সবাই যখন একসাথেই পৌছবে, এত তাড়া কিসের’!
আর যখন সে কোনভাবে সেতুর মাঝখানে পৌঁছল, বুক ভরে বাতাস নেবার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল। নিচে নদীর জলে দু-পাড়ে গড়ে ওঠা শহরের অস্থির, অস্পষ্ট ও রহস্যময় প্রতিবিম্ব…, দেখে মনে হয়, এই-ই শহরের প্রকৃত রূপ, নদীর তীরে সে যা, তা একপ্রকার মোহ।
“কী স্যার, আত্মহত্যা করতে এসেছেন বুঝি? তা করতে পারেন” যে জন্য সে এসেছে, তার সেই কাজের দিকে কেউ লক্ষ্য রেখেছে, একথা জেনেই তাঁর গা-হাত-পা কাঁপতে লাগল।
“ঘাবড়াবেন না, আমিও কয়েকবার করেছি। অবাক হচ্ছেন? অবাক হবার কিছু নেই, এই দুনিয়ায় অনেক 'আমি' আছে, সত্যি বলতে, অসীম সংখ্যক মানুষ আত্মহত্যা করে বেঁচে থাকে, সুতরাং, আপনি নির্ভাবনায় জলে ঝাঁপ দিয়ে নিজের মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করতে পারেন, আর যাইহোক, ব্যাপারটা বেশ মজার, বাঁচার জন্য আত্মহত্যা, মানে জীবন থেকে স্বেচ্ছাবসর নেয়া, কেমন শিহরিত, কৌতূহলোদ্দীপক একটা ব্যাপার কেমন তাই না!”
গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে সে লোকটাকে দেখল। ‘অত্যন্ত সাধারণ’, মনে রাখার মত কিছতেই নয়, অনেক মানুষের মুখ দিয়ে তৈরি একটা মুখ, হয় লোকটাকে কোনদিন দেখা যাবে না, অথবা সব লোককেই ওই লোকটার মত মনে হবে।
“ভাই, দেখছি আপনি খুব কাজের লোক, আমার এ আমার বহুদিনের সখ, স্বেচ্ছামৃত্যু, তা আপনি আমাকে এ বিষয়ে কী প্রকারে সাহায্য করতে পারে্ন- মানে, এই তীর্থসেতুর কোথাও কোন নির্দিষ্ট স্থান আছে, যেখানে দাঁড়িয়ে নির্বিঘ্নে কাজটি সম্পন্ন করা যায়?” ‘না-দেখা-সেই-লোকটা’ বিনীত ভাবে আত্মহত্যায় বিশেষজ্ঞ লোকটাকে বলল,
“যদি আপনি রাজি থাকেন, আর নিরাপদে আত্মহত্যা করতে চান, এবং ‘মরণরে, তুহুঁ মম শ্যাম সমান’-এর, অবিরল সাক্ষী হওয়ার দুর্লভ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান…, তাহলে একেবারে সেতুর মাথায় চড়াই শ্রেয়, কেননা মনে হবে, এভাবে মরার জন্য আপনি বার বার জন্ম নিতে পারেন; অন্ধকার হয়ে গেছে, সবাই ব্যস্ত, আপনার দিকে নজর দেবার কারো ঠেকা পড়েনি…, এটাই জলে ঝাঁপ দেবার মাহেন্দ্রক্ষণ…, নিন, আর দেরি না করে আসুন, বরং সহজে ওপরে ওঠার পথটা দেখে নিন। অনেক রাত হয়েছে, আমি চললাম, শুভ রাত্রি।”

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন