কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

রাজেশ গঙ্গোপাধ্যায়

 

সমকালীন ছোটগল্প


রিলেশনশিপ

আজ তিতাসের সম্বন্ধ দেখতে আসা। আলমারি থেকে হ্যাঙ্গারসুদ্ধ তিনটে শাড়ি বের করে বিছানার ওপর রাখা। অমুর মিষ্টি নিয়ে আসার দায়িত্ত্ব পড়েছিল। এনে ডাইনিং টেবলের ওপর রাখতে না রাখতেই কাকীমা বললেন, এক্ষুণি ওপরে যা। রেগে কাঁই হয়ে আছে। কেন তোকে অন্য কাজে লাগিয়েছি, এই হল রাগের কারণ। ক্ষেপি একটা!

ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ছিটকে এল - তোর কোন টাইম সেন্স নেই।

তাড়াতাড়ি বল, কী দরকার? ওদিকে কাজ আছে।

আজ কোনটা পড়ব?

তিনটের একটাও না।

তিতাস অবাক হয়ে তাকালো অমুর দিকে।

লক্ষ্মীপূজোর দিন যে হলুদ শাড়িটা পড়েছিলি না… সেটা পড়।

ওই তাঁতের শাড়িটা! আজ সিল্ক পড়ব না?

অমু চুপ করে থেকে বলল, দ্যাখ তোর যেটা পছন্দ। আমার যা মনে হল বললাম। ওরা চলে এলেন বলে। নিচে যাচ্ছি।

তিতাস হলুদ তাঁতের শাড়িটা পড়েই বসেছিল পাত্রপক্ষর সামনে। অমু একটুও অবাক হয়নি। ও জানত তিতাস এটাই পড়বে।

পাত্রপক্ষ আগে থেকেই তিতাসের গানের সুনামের কথা শুনেছিল। যথারীতি গান গাওয়ার কথা উঠল। তিতাস হারমোনিয়ামটা দিয়ে যেতে বলল ভেতর থেকে। অমু রেখে যাওয়ার সময় আলতো করে বলে গেল –‘হিয়ার মাঝে'। তিতাস এই গানটা অপূর্ব গায়।

এরপর অনেক আলোচনার অবশেষ হিসেবে বিয়ের দিন ঠিক হল ১৭ই অঘ্রাণ। তিতাসের হবু বর শ্যামল খুব ভালো ছেলে। সুদর্শন, ভদ্র, ভালো চাকরি করে, রুচিবান। যেদিন শ্যামল দেখতে এসেছিল, সেদিন অমুর মামাতো দাদার অ্যানজিওপ্লাস্টি অপারেশনের জন্য ও থাকতে পারেনি। ইয়াং ছেলের হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে অমলেন্দু ও ওদের গোটা রিলেটিভ সার্কেলের সকলে খুবই টেনশনে ছিল।

তিতাস মাকে বলেছিল ডেটটা চেঞ্জ করতে। কিন্তু শ্যামল একটা ট্রেনিং-এ একমাসের জন্য শিকাগো চলে যাবে বলে অন্য ডেট অ্যারেঞ্জ করা গেল না।

অমুর মন পড়েছিল এদিকে। আজ সবকিছু ঠিকঠাক মিটে যাওয়াটা দরকার। তুতাইয়ের অপারেশন হচ্ছে। অমু এমনভাবে মুষড়ে আছে…

মাইমাকে বলা মেজমাসির কথায় অমু লজ্জা পেয়ে গেল। তুতাইদার অপারেশনের ব্যাপারটা কিছুক্ষণের জন্য হলেও তো ওর মাথা থেকে সরে গিয়েছিল। আর সবাই ভুল ভাবছে। অমু গিয়ে ওদের দুজনের কাছে বসল। মাইমার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল – চিন্তা কোরো না। ডঃ কাহালি এইমুহূর্তে কলকাতার বেস্ট অ্যানজিও সার্জন। তুতাইদা ঠিক হয়ে যাবে দেখো। তবে রেস্ট্রিকশন মানতে হবে।

মেজমাসি বলল, হ্যাঁ রে অমু, সারাজীবন এত যে খেলাম, আমাদের চেয়েও এই তেত্রিশ বছরের ছেলেটা কি বেশী খেয়েছে? এ কি হয়!

ব্যাপারটা এভাবে দেখার নয়, মাসি। একেকজনের কোলেস্টেরলের টেন্ডেন্সি থাকে। আর তুতাইদা নতুন চাকরিটা পাওয়ার পর থেকে ওর ফুড হ্যাবিট বদলে যাচ্ছিল। ফাস্টফুড, জাংকফুড কি আগে এত খেত?

মাইমা মাথা নেড়ে অমুকে সমর্থন করল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল – আমার কপাল।

ওঃ মাইমা, এখানে কপাল গোপালের কোন ব্যাপারই নেই। আজকাল হার্ট অ্যাটাকের অ্যাভারেজ এজ নেমে এসেছে ত্রিশে। এ খবর রাখো? স্ট্রেস, আনহেলদি ডায়েট, ইরেগুলার লাইফস্টাইল – এসবই কারণ।

রাঙাদাও এসে জুড়ল ওদের আলোচনায়– আচ্ছা অমু, সুমো রেসলারগুলোর হার্ট অ্যাটাক হয় না কেন বল তো?

ওরা কত রেস্ট্রিকশনে থাকে জানো?

রাখ তোর রেস্ট্রিকশন। ভিটামিন, প্রোটিন খেয়ে তো আর ওরকম ফ্যাট হয় না? ফ্যাট কনজিউম করতেই হয়।

রাঙাদার ফিচলেমোতে পরিস্থিতি হালকা হয়ে গেল অনেকটাই। মাইমাও হেসে ফেলল। মেজমাসি গুম করে রাঙাদার পিঠে একটা কিল মেরে বলল, তুই থামবি?

চ অমু ওদিকে যাই। রাঙাদার সঙ্গে একা হতে অমুর অস্বস্তি হয়। এমন কথা এমনভাবে বলে বসবে যে তার নাগপাশ থেকে বেরোনো কঠিন হয়ে পড়ে।

অমলেন্দু বাবু, তুমি কি অন্য কোন চিন্তার গভীরে ডুবে আছো, ভায়া?

মানে!

তুতাইয়ের এমন একটা মেজর অপারেশনে তোর টেনশন স্বাভাবিক, তোরা তো ভাই কম, বন্ধু বেশী। কিন্তু কেন জানি না মনে হচ্ছে তুই আরও কিছু ভেবে চলেছিস!

কী যে বল, রাঙাদা!

তোর সেই বন্ধুনীর কী খবর রে?

আছে একপ্রকার।

এই তো ধরে ফেলেছি।

রাঙাদা একটু জোরেই বলে ফেলল কথাটা। একজন ভদ্রমহিলা ফিরে তাকালেন এদিকে।

কী! অমু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

ডেলিকেটলি ডেডিকেটেড। তুই তাকে নিয়েই ভাবছিস।

ধ্যাৎ! যত্ত বাজে কথা তোমার। চল, ওদিকে গিয়ে দেখি। অমুর অ্যাভয়েড করে যেতে চাওয়াটাও কি জোরালো হল না!

তুতাইদার অপারেশন সাকসেসফুল। ভাবা যায় নাইন্টি পার্সেন্ট ব্লক ছিল! স্টেন্ট বসিয়েছে।

রাঙাদা কিছুক্ষণ পর উপস্থিত সবাইকে বলল, আমি বেরোচ্ছি। অমুও কি যাবি এখন?

অমু বলল, রাঙাদা, আমিও বেরোবো। রাতে তোমাকে ফোন করব মাইমা।

বেরিয়ে ওরা দুজন দুদিকে চলে যাবে। তার আগে রাঙাদা ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, ডিসাইড ইয়োর লাইফ, ব্রো। তোর স্টেবল হওয়াটা দরকার। অমু মাথা নেড়ে হাসল। ইতিমধ্যে বাস চলে আসতেই হাত নেড়ে উঠে পড়ল ও। সিটও একটা পেয়ে গেল জানলার ধারে। ঘড়িতে দেখল সাড়ে ছটা বেজে গেছে। এখন কি আর তিতাসদের বাড়ি যাবে!

তুতাইদার অপারেশন সাকসেসফুল, মা। অমু একটা বুথ থেকে বাড়িতে ফোন করে জানালো।

তুই বাড়িতে আসবি না? সারাদিন নার্সিংহোমে কেটেছে। কিছুই তো খাসনি বোধহয়!

হ্যাঁ খেয়েছি। তুমি ভেবো না। একটু পরে আসছি।

সবাই এসেছিল?

হ্যাঁ হ্যাঁ অনেকে এসেছিল। বাড়ি এসে বলছি।

বুথ থেকে বেরিয়ে অমু তিতাসদের বাড়ির দিকেই হাঁটতে লাগল। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই কাকীমা হেসে একটা বড় মিষ্টি ঠেসে দিল মুখের ভেতর।

আজ শ্যামল এসেছিল। সঙ্গে ওর এক বন্ধু। বাড়ি ফিরে জানিয়েছে, ফাইনাল।

মুখে মিষ্টি থাকায় অমু কোন কথা বলতে পারছে না। আস্তে আস্তে চেবাতে চেবাতে ও উঠতে থাকল সিঁড়ি দিয়ে।

দাদার অপারেশন মিটল?

তিতাসের প্রশ্নের উত্তরে অমু মাথা নেড়ে জানালো – মিটেছে।

এরপর জলের বোতল থেকে জল খেয়ে অমু জিজ্ঞেস করল – ১৭ই অঘ্রাণ?

তিতাস কিছু বলল না।

অমু উঠে পড়ল – মাইমাকে একটা ফোন করতে হবে।

ফোনের রিসিভারটা যেখানে থাকে, সেখানে লাইট জ্বালিয়ে নিয়ে ও সবেমাত্র চেয়ারে বসেছে, একটা ফোন এল। অমুই রিসিভ করল।

তিতাস আছে?

কে বলছেন?

শ্যামল।

একটু ধরুন। দিচ্ছি।

রিসিভারটা উল্টে রেখে অমু সিঁড়ির সামনে গিয়ে গলা চড়িয়ে ডাকল – তিতাস, তোর ফোন।

তিতাস ওপর থেকে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল – কে?

অমু ফিসফিস করে বলল – শ্যামলদা।

তিতাসের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসায় কি সামান্য বিরক্তি ফুটে উঠল? অমু বেরিয়ে যাচ্ছিল দেখে তিতাস জিজ্ঞেস করল – চলে যাচ্ছিস?

মাইমাকে ফোনটা করতেই হবে রে! আমি বরং বুথ থেকে করে নিই।

তুই এখান থেকেই করবি। একটু অপেক্ষা কর।

অগত্যা অমু কাকীমার সাথে পাশে রান্নাঘরে গ্যাজাতে লাগল।

হ্যালো। হ্যাঁ। না না ঠিক আছে। আমার কিছু বলার নেই। আচ্ছা। আপনি বরং বাবার সঙ্গে কথা বলে নেবেন এই ব্যাপারে।

ওপাশ থেকে বলা কথার উত্তরে ভাবলেশহীন গলায় বলা টুকরো কথাগুলো শুনে কে বলবে যে হবু বরের সঙ্গে কথা বলে রিসিভারটা রাখল তিতাস। অমুকে ইশারায় ফোন করতে বলে, হয়ে গেলে ওপরে আসতে বলে গেল।

মাইমার থেকে তুতাইদা সম্পর্কে লাস্ট আপডেট নেওয়া হয়ে গেলে অমু যখন ফোনটা ছাড়ছে ইতিমধ্যে আরেকটা ফোন এল। অমুই ধরল। কাকুর বন্ধু সুবীরকাকু। কাকুকে ডেকে ও ওপরে চলে গেল।

বিয়ের কেনাকাটা করতে গেলে তোকে কিন্তু সঙ্গে থাকতেই হবে। দাদাকে বাড়ি নিয়ে আসার পরই না হয় প্রোগ্রাম রাখা হোক। নাকি? তিতাসের জানানোটা একপ্রকার হুকুমের মত শোনায়।

অমু মাথা নাড়ে। তারপর কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে ও বলল, আজ চলি রে! সারাটা দিন খুব ধকল গেছে।

তিতাস ওর দিকে তাকালো, কিছু বলল না।

বিয়ের ঠিক আগের দিন সন্ধ্যাবেলা এক সাঙ্ঘাতিক অ্যাক্সিডেন্টে অমু প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এল। রাস্তার লোকজনই হসপিটালাইজড করে বাড়িতে জানিয়েছিল। তিতাস তখন বোন, বন্ধু, বউদি পরিবৃত হয়ে শাঁখা-পলা পড়তে যাচ্ছিল দোকানে। ওখান থেকে পার্লার হয়ে বাড়ি ফিরে এসে যখন খবর পেল, তখন ‘বিয়ের আগের রাতে কনেকে এভাবে বেরোতে দেওয়া যায় না’ বলে ওর আর অমুর সাথে দেখা হল না। তিতাস ওর ঘরে ভিড় করে থাকা সবার সামনে ইচ্ছেপ্রকাশ করল, মাথাটা খুব ধরেছে। একটু ঘুমোতে পারলে হত। কাল আবার সারাদিন খুবই স্ট্রেস যাবে।

সবাই সঙ্গে সঙ্গে ঘর ফাঁকা করে দিল। তিতাস দরজাটা বন্ধ করে, আলো নিভিয়ে, এক গহীন কান্নায় গলে যেতে লাগল নিঃশব্দে। অমুর জন্য বড্ড মনকেমন করছিল তিতাসের, এ কাউকেই বোঝানো যায় না। মা অনেকক্ষণ পর বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন কিন্তু ডাকলেন না, ফিরে গেলেন।

পরদিন সকালে এদিকে তিতাসের গায়ে হলুদ হচ্ছে, আর ওদিকে অমুকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কলার বোন ভেঙেছে, পায়ের সিন বোনও অক্ষত নেই। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচঘন্টা ধরে দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করছিল নার্সিংহোমে ভিড় করে থাকা অমুর আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীরা অনেকেই। সার্জন যখন এসে জানালেন অপারেশন সাকসেসফুল, সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। রাঙাদা আজ সারাদিনে একটাও কথা বলেনি। তুতাইদাও এসেছিল কিছুক্ষণের জন্য। অমুর বন্ধুরা ফিরে এসে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিল বিয়েতে। তখন বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে বলে ওদের আর তিতাসের সঙ্গে দেখা করা হয়নি। কাকীমার হাতে গিফট দিয়ে চলে এসেছিল। ওদের কারো খেতে ইচ্ছে করেনি।

ক্লিনিক্যালি অমুর সেন্স ফিরে এলেও আইসিইউতে কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হল না। চৌকো কাঁচের ভেতর দিয়ে একটুকরো অমুকেই দেখল সবাই।

তিতাসের সঙ্গে অমুর দেখা হল অষ্টমঙ্গলায় এসে। শ্যামল ও তিতাস দেখতে এসেছিল অমুকে। ওদের জন্য একটা করুণ হাসি ছাড়া আর কিছু ছিল না অমুর কাছে। শ্যামলদা কত কথা বলছিলেন। ভালো মানুষ! তিতাস কিছুই বলেনি। শুধু তাকিয়ে ছিল চুপ করে। ওর চোখটা কেন যে…

অমু এখন ওয়াকার নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটাচলা করতে পারে ফ্ল্যাট সার্ফেসে। একদিন কাকীমা এলেন। মাকে নমস্কারীর শাড়ি, মিষ্টি দিতে আর অমুকে দেখতে।

অমুর ঘরে এসে একথা সেকথার পর চলে যাওয়ার আগে মায়ের আড়ালে অমুর হাত দুটো ধরে বললেন –আমাকে কথা দে, তুই আমাদের বাড়ি আসা বন্ধ করবি না!

সেদিন রাতে রাঙাদা ফোন করল। অমু এখন রিসিভার অবধি যেতে পারছে বলে মা ওকে ডেকে ঠাকুরঘরে গেল।

শোন অমু, তোকে যা জানানোর সেটা হল, আসানসোলে আমাদের কোম্পানী একটা নতুন সাইট ওপেন করছে। আমি তোর নাম সাজেস্ট করেছি সাইট সুপারভাইজার পোস্টে।

লজঝড়ে সুপারভাইজার!

এটাই ক্রাইটেরিয়া ছিল। তুই একমাত্র কোয়ালিফাই করেছিস। রাঙাদা যথারীতি ইয়ার্কির ভঙ্গীতে বলল।

কবে জয়েনিং?

এখনো মাস দুয়েক সময় আছে। ফিট হয়ে নে। নো এক্সকিউজ।

আশ্চর্য! সবাই সহজেই ভেবে নিল অমু এক ব্যর্থ প্রেমিক। প্রেমিকার বিয়ে হয়ে যেতে ও বিরহকাতর। সে কাকীমা হোক কি রাঙাদা বা ওর বন্ধুরা। এজন্যই সবাই যে যার মত করে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অমুর হঠাৎ জানতে ইচ্ছে হল, তুই কী ভেবেছিস তিতাস?


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন