কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

প্রদোষ ভট্টাচার্য

 

 

বড় পর্দায় হিন্দী ছবি (২০শ পর্বঃ সেরা তিনটি ছবির তৃতীয় ছবি) বান্দর (২০২৫)

 


সমর মেহরা (ববি দেওল) – এক অস্তগামী ‘পপ’ সঙ্গীতশিল্পী এবং অভিনেতা। তার ফ্ল্যাটের ই এম আই বাকি পড়ে আছে, তার বিশ্বস্ত এবং অনুগত চাকরকে সে নিয়মিত মাইনে দিতে পারছে না।

কিছুদিন আগে এক ‘ডেটিং অ্যাপে’-র মাধ্যমে সমরের পরিচয় হয় গায়ত্রী (স্বপ্না পাব্বি) নামে এক মহিলার সঙ্গে। দুজনে সম্পূর্ণ পারস্পরিক সম্মতিক্রমে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। সমর এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, কারণ গায়ত্রীর আচরণে বেশ কিছু অপ্রকৃতস্থতা প্রকাশ পেয়েছে, তদুপরি সমর ওই একই অ্যাপের মাধ্যমে খুশী (সাবা আজাদ) নামের অপর এক মহিলাকে পছন্দ করেছে । ফলে গায়ত্রী আরম্ভ করে সমরকে stalk করতে। বারংবার ফোন, সমরের ফ্ল্যাটের দরজায় এসে ‘কলিং বেল’ বাজানো, ফোনে অসংখ্য ‘মেসেজ’, stalking-এর ফলে খুশী-সমরকে একসঙ্গে দেখে উন্মত্ত হয়ে পড়া – সব সে করে। একদিন রাস্তায় সমরের ওপর হামলে পড়তে সমর গায়ত্রীকে বলে যে এরপর সে পুলিশের শরণাপন্ন হবে।

কোন পুরুষ কোন মহিলার সঙ্গে এই আচরণ করলে তার খুব শীঘ্রই হাজতবাস অনিবার্য। কিন্তু লিঙ্গ-নিরপেক্ষ আইন-বিহীন ভারতবর্ষে পুরুষেরা stalking, গার্হস্থ্য হিংসা, ধর্ষণ – সমস্ত ক্ষেত্রে অসহায়। রাজস্থানের সেই ইস্কুল অধ্যক্ষের কথা ভাবুন যাঁর স্ত্রী নিয়মিত তাঁকে ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে প্রহার করতেন এবং যিনি মহিয়সী স্ত্রীর অত্যাচার থেকে তখনই রক্ষা পেলেন যখন স্ত্রীর ক্রিয়াকলাপের ভিডিও-প্রমাণ পুলিশের কাছে দাখিল করতে পারলেন। স্ত্রী যদি স্বামীর নামে গার্হস্থ্য হিংসার মিথ্যা অভিযোগ মৌখিকভাবেও আনতেন, হতভাগ্য স্বামী তৎক্ষণাৎ জেলে ঢুকে যেতেন!

https://voiceformenindia.com/alwar-school-principalajit-yadav-domestic-violencecase/#:~:text=The%20couple%20has%20a%206,kept %20calm%20and%20ignored%20it. 13 November 2023

বেঙ্গালুরুতে এক মহিয়সী মা নিজের সমকামী ছেলেকে ‘সারাবার’ অভিপ্রায়ে তাকে ধর্ষণ করেন!

https://www.aajtak.in/india/story/mother-allegedly-raped-gay-son-to-cure-his-homosexuality-in-bengaluru-300334-2015-06-02 accessed 10 June 2026

ব্যাস! সমরের দরজায় এবার গায়ত্রী নয় – পুলিশ! সমরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ। থানায় আনীত হতভম্ব সমর দেখে যে ‘প্রমাণ’ হিসেবে গায়ত্রী দাখিল করেছে তার আর সমরের মধ্যে সম্পর্ক চলাকালীন সমরের একাধিক explicit ‘মেসেজ’। একটিতে সে নিজের পুরুষাঙ্গের ছবি পাঠিয়ে গায়ত্রীকে বলছে সেও যেন সমরকে তার নগ্ন ছবি পাঠায়, প্রত্যুত্তরে গায়ত্রী বলছে, “না।“ পুলিশ অফিসার এই উত্তরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সমরকে বলে, “জানিস না, অমিতাভ বচ্চন বলেছেন, ‘No means no!” এই সংলাপ পিঙ্ক ছবির, যার বিষয়বস্তু নারী-নির্যাতন। বান্দর ছবিতে নির্যাতিত কে? এই আদানপ্রদানের পর গায়ত্রী তো সমরের সঙ্গে সম্পর্কে ইতি টানেইনি, বরং সমানে সমরের ফ্ল্যাটে যাতায়াত জারি রেখেছে। সমর অব্যাহতি চাইবার ফলেই দাখিল হয়েছে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ।

এক toxic মহিলার মিথ্যা নালিশের ভিত্তিতে সমরের স্থান হয় শ্রীঘরে। জেলে ঢোকাবার আগে অন্যান্য সাধারণ অপরাধীদের মতো সমরকে বলা হয় সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় ‘বাঁদর’-এর মতো’ উবু হয়ে বসতে। এই থেকেই ছবির নামকরণ।

জেলের মধ্যে যেখানে কুড়ি জন থাকতে পারে এমন ঘরে রাখা হয় একশো জনকে। সমরকে আরেক বন্দী সাবধান করে যে অন্যান্যরা প্রশ্ন করলে সে যেন বলে যে সে ৩০২ ধারায়, অর্থাৎ খুনের দায়ে, অভিযুক্ত। ৩৭৬ ধারা – ধর্ষণ – বললে দিল্লী গণধর্ষণে দোষীদের যা হয়েছিল, তাইই হবেঃ মুখের মধ্যে সাধারণ অপরাধে বন্দী অপরাধীরা ঠুসে দেবে মনুষ্যবিষ্ঠা। ধর্ষণের দায়ে বন্দীদের ‘দল’ আলাদা। তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন  সমরের মতোই মিথ্যা অভিযোগের শিকার। একজন এক মহিলার সঙ্গে হোটেলবাস করেছিল, মহিলা যে বিবাহিত তা না জেনে। মহিলার স্বামী এই হতভাগ্যকে ফাঁসায় এবং আদালতে মহিলা মোটা করে সিঁদুর পরে এসে মিথ্যা অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। এই ব্যক্তিকে আমরা দেখি অবশেষে জেলের জঘন্য শৌচালয়ে আত্মহত্যা করতে। আরেকজন ছিল এক আবাসনের নিরাপত্তারক্ষী। তাকে এক আবাসিক কন্যাকে – যার অভ্যাস ছিল শরীর-দেখানো পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানো – ধর্ষণ করার ‘অপরাধে’ জেলে পাঠানো হয়। ‘প্রমাণ’ঃ সে মেয়েটির দিকে ‘তাকাতো’; স্বল্পবসনা মেয়েদের উদ্দেশ্যই হয় পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আর ‘সিসিটিভি’ ক্যামেরায় ‘দেখা’ গিয়েছিল যে ওই নিরাপত্তারক্ষী সিঁড়ি দিয়ে মেয়েটির ফ্ল্যাট যে তলায়, সেই তলায় সে উঠছে। বিভিন্ন তলায় উঠে তদারকি করা তার কাজের মধ্যেই পড়ে। ধনঞ্জয় আর হেতাল পারেখের কথা মনে পড়ছে কী? তৃতীয় জন এক নির্বাক বৃদ্ধ, যিনি মাঝে মধ্যেই হাহাকার করে কেঁদে ওঠেন। তাঁর ইতিহাসঃ ছেলে কাজে বেরিয়ে গেলে যাতে বৃদ্ধ শ্বশুরের দেখাশোনার মতো বিরক্তিকর কাজ না করতে হয়, সেই উদ্দেশ্যে পূত্রবধূ তাঁর নামে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ আনে। মহিলার মৌখিক নালিশই হতভাগ্য বৃদ্ধকে হাজতে পাঠাবার জন্য যথেষ্ট!

বিভিন্ন অজুহাতে সমরের জামিনের আবেদন খারিজ হতে থাকে বারবার। একবার তো পিউরিটান মানসিকতা-দুষ্ট বিচারক (উদয় টিকেকর) বলেই বসেন যে বিনোদনের জগতের সকল পুরুষই যৌন বিকৃতিতে আক্রান্ত এবং সমরকে দীর্ঘকাল হাজতবাস করিয়ে তিনি এক ‘দৃষ্টান্ত’ স্থাপন করতে বদ্ধ পরিকর।

ছবিটির শুরুতে দেখছি যে এক ছিঁচকে অপরাধীকে ধাওয়া ক’রে একজন পুলিশ অফিসার – যাঁকে পরে আমরা দেখব সমরের প্রতি সহানুভুতিশীল – সেই অপরাধীর কাছ থেকে কোন একজনের ওপর অ্যাসিড হামলা করার স্বীকারোক্তি আদায় করছেন। ছবির শেষের দিকে দেখি আসলে থানার যে উচ্চপদস্থ অফিসার সমরকে হেনস্থা করেছিল, সেইই গায়ত্রীর গায়ে ঢলে পড়ে বলছে, “আরে, বারবার কি সমরের জামিন খারিজ করাতে পারবে? এবার নাটক করো! নিজের ওপর অ্যাসিড হামলার ভাণ করো।” এবং গায়ত্রী ঠিক তাইই করে এবং সমরের জামিনের শুনানি আবার বাতিল হয়।

শেষ দৃশ্য, সহানুভুতিশীল অফিসারের উদ্যোগে বন্দী সেই অপরাধী জেলের মধ্যে সমরের মুখোমুখি।

দর্শকের ক্ষীণ আশা, ভবিষ্যতে কি সত্য উদ্ঘাটিত হবে?

ছবির কাহিনিকারদ্বয়, সুদীপ শর্মা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং পরিচালক কিন্তু স্পষ্ট করে কিছুই বলেননি!

ছবিটি দেখে বেরোবার পর অন্তর্জালে এক বাংলা দৈনিকে তার এক ‘প্রশংসাসূচক’ সমালোচনা পড়ি। সমালোচক পরিচালক অনুরাগ কশ্যপের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন দেশের কারাগারের মধ্যে যে অমানুষিক অবস্থা তাকে তুলে ধরার জন্য! প্রতিবেদনের মধ্যাংশে খুব আকস্মিকভাবে একটি বাক্যে উল্লেখ করেছেন যে কেন্দ্রীয় চরিত্র কারারুদ্ধ এক মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে! বাকি তিনজন যারা ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগে বন্দী, তাদের কোনও উল্লেখই নেই!

একেই বলে ইচ্ছাকৃত অপকর্ম। যেহেতু ছবির বিষয়বস্তু মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে পুরুষ নির্যাতন – একেবারেই প্রচলিত রীতি বিরুদ্ধ – তাই সেটিকে অকিঞ্চিৎকর করে দেওয়া। নারী নির্যাতন হলে অবশ্য পিতৃতন্ত্র, বিষাক্ত পৌরুষ ইত্যাদি নিয়ে বিষোদ্গারের অন্ত থাকত না। যেহেতু ছবির কেন্দ্রে বিষাক্ত নারীত্ব বা toxic femininity তাই এই হিরণ্ময় নীরবতা!

তদুপরি, সমরের বোন সুহানী (সানিয়া মালহোত্রা) সহানুভুতি দেখাবার সুকঠিন চেষ্টা করতে করতে অবশেষে নিজের স্বরূপ উন্মোচিত করে ফ্বেলে যখন জেলের খাঁচার ওপার থেকে সে চিৎকার করে সমরকে বলে, “তুমি জানো, তোমার জন্যে আমাদের কী সহ্য করতে হচ্ছে? আমাকে শুনতে হচ্ছে একজন মেয়ে হয়ে আমি কোন আক্কেলে তোমার – একজন নারী ধর্ষকের – পক্ষাবলম্বন করেছি!” সুহানীর কোনও ধারণা আছে জেলের মধ্যে কী নারকীয় পরিস্থিতিতে মিথ্যা অভিযোগে বন্দী তার ভাই বাস করছে? বান্ধবী খুশী তো একবার থানায় আসার পর থেকেই হাওয়া। মেয়েদের কোনও দায় আছে নাকি অভিযুক্ত পুরুষদের পাশে দাঁড়াবার?

সবশেষে বলি যে এসবের উত্তরে দেশে প্রতি মিনিটে ক’টা নারীধর্ষণ হচ্ছে তার পরিসংখ্যান দিয়ে মিথ্যাবাদী, ধর্ষকামী মেয়েদের কুকীর্তি ঢাকা দেওয়া যাবে না। প্রথমটি যেমন সত্যি, দ্বিতীয়টিও তাই!

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন