কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / পঞ্চম সংখ্যা / ১৪৪

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

দীপক সেনগুপ্ত

 

সমকালীন ছোটগল্প


নাম অর্জন

তার কোনো ভালো নাম ছিল না। এমনটা তো সাধারণত হয় না। ওর ক্ষেত্রেও হয়নি। ওরও একটা ভালো নাম দেওয়া হয়েছিল বইকি। তখন তার মা বেঁচে ছিল। তাই পুরোহিত ডেকে ঠিকুজি কুষ্টি তৈরি করা হয়েছিল। ঠাকুরমশাই বলেছিলেন, জাতক খুব জনপ্রিয় হবে। আর তার নাম শ অক্ষর দিয়ে দিতে হবে। ছোটো কালো  সাদা একটা টিভি ছিল ওদের। ওর মা তাতে সিরিয়াল দেখতো। সেই সিরিয়ালেরই কোনো একটাতে এক নায়িকার নাম ছিল সুচিস্মিতা। ওর মা বলেছিলেন--

- ঠাকুরমশাই ওর নাম তবে সুচিস্মিতা হোক।

ঠাকুরমশাই বলেছিলেন--

- ও আবার কী নাম? সুচি রং পরে স্মিতা আবার কী? ওর নাম হোক সুচিবালা।

- সুচিস্মিতাতে কী দোষ?

- দোষ নয়। ও নাম অর্থহীন। আমি জন্মপত্রে সুচিবালা লিখে দিলুম। ভাগ্যলিপিও লিখে দিলুম। যত্ন করে রেখো। এ মেয়ের নামডাক হবে।

তাই রাখা হয়েছিল। কিন্তু বাড়ির সবাই আর পড়শীরা তাকে বুড়ি বলেই ডাকতো। বুড়ি তার বুড়ি ঠাকুরমার দেওয়া নাম। তবে সে নামকরণে স্নেহ ছিল। অনেকটাই।

তবে এসবই তার মায়ের জীবিত থাকার সময়কার কথা। মা ওকে ডাকতো সুচি বলে। তবে আড়ালে।

সবাই যদি শুনলে ঠাট্টা করে! ঠাট্টা যে বড়ো ব্যথা দেয়।

কিন্তু তার যখন বয়স চারবছর প্রথমে ঠাকুমা, তার মাসখানেকের মধ্যে মা, দুজনেই মারা গেল।

রোগটার নাম ওলাওঠা। গাঁয়ের অনেককেই মেরে তবে সে রোগ বিদায় নিল।

 

সুচির বাবা দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারে খুব বেশি দেরি করলেন না। মা মরা মেয়েটাকে দেখতে হবে তো! তাই ঘরে নুতন বউ এলো। তবে অচিরেই বোঝা গেল নতুন বউ নতুন মা নয়। তা হবার ছিঁটেফোঁটাও ইচ্ছে তার নেই। সে ষোলোআনা সৎ মা। তবে সৎ মায়ের ভুমিকায় তার কোনো রকম খুঁত ছিল না।

পাড়ার সবাই বল্ল--

- এখনই এই, এরপর নিজে ছেলেপুলে বিয়োলে তো কথাই নেই। বুড়িটাকে মেরেই ফেলবে।

কিন্তু বছর ঘুরে গেল। তার কোনো ছেলেপুলে হলো না। তা বলে কি বুড়ির কপাল ফিরলো? মোটেই না। ইতিমধ্যে ঘরের কালো সাদা টিভিটা বিদেয় হয়েছে। সে যায়গায় রঙ্গিন টিভি এসেছে। নতুন মা নতুন রঙ্গিন টিভিতে সিরিয়াল দেখে। সেখান থেকেই সে তার ছেলেপুলে না হবার কারণ খুঁজে পায়। দোষটা মিনসের। ওর বাপ হবার যোগ্যতাই নেই। তাহলে ও মা হবে কী করে? তা যদি হয়। তবে বুড়ির মা মা হলো কী করে?

- আরে সেটাই তো প্রশ্ন। আর তার জবাব হলো, ও মেয়ে অবৈধ সম্পর্কের ফল। তাই সে নোংরা। ওকে যত্ন করা মানে পাপ করা।

ব্যস হয়ে গেলো। সুচির মা স্বপ্ন দেখতো তার সুচি স্কুলে যাচ্ছে। সেখানে স্কুলের খাতায় তার নাম থাকবে। সুচিবালা নয় সুচিস্মিতা। সে নিজে যাবে মেয়েকে ভর্তি করতে। নিজে লিখিয়ে আসবে সে নাম। সব বয়ে গেল নোংরা নালির জলে।

অনাদরে বড়ো হতে লাগলো সুচি। তার বাপের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। ঘরের চেয়ে বাইরেই সে সময় কাটায় বেশি। তাতে নতুন মায়ের ভারি বয়ে গেল। সে তখন সংসারের মহারাণী। সেই ভুমিকাতেই চুটিয়ে অভিনয় করে চললো সে।

হঠাৎ একদিন মহারাণী ঘোষণা দিলেন--

- সৎ মা বলে তো আর বুড়িটাকে আজীবন আইবুড়ো রেখে দিতে পারি না। ওরও বিয়ে দেবো আমি।

তা বিয়ে তিনি দিলেন। দিলেন যার সঙ্গে সেই বরের পরিবার দূর দেশে থাকে। তাছাড়া আর উপায়ই বা কি? ঐ নোংরা বেজন্মা মেয়েকে আশেপাশের কে বিয়ে করবে? আছে নাকি তেমন কোনো পরিবার? বিয়েটাও হলো নম নম করে। ধুমধাম করে লোক জানিয়ে করলে কে না কে ভাঙচি দেবে! সৎমা হলেও সেটি তো করতে দেওয়া যায় না!

গাঁ থেকে বুড়ি বা সুচি যাই বলো এভাবেই উধাও হয়ে গেল। ওর নতুন জায়গা হলো। শহরের মন্দ বস্তীতে। নগদ টাকা গুনে নিয়ে ওর বর ওকে ওখানকার এক মাসীর কাছে গচ্ছিত রেখে গেল। যাবার সময় সুচিকে বলে গেলো--

- আসবো খন। তবে খুব ঘন ঘন আসতে পারবো না। তখন তো তোর সাথে দেখা করার জন্য এই মাসী পয়সা নেবে। তোর যা গা গতর সে রেট ভালোই হবে। সুখেই থাকবি তুই।

ওর বর টাকার গোছা ট্যাঁকে গুঁজে চলে গেল টা টা করে।

মাসী সুচির কাছে এসে বললো--

- এই মেয়ে তোর নাম কী?

সঙ্গে সঙ্গে সুচির সামনে ওর মায়ের মুখটা ভেসে উঠলো। কানে ভেসে এলো তার গলা।

- স্কুলের খাতায় তোর নাম লেখাবো শুচিস্মিতা।

সুচি চোখ তুলে জোর গলায় বললো--

- আমার নাম সুচিস্মিতা।

- মরণ!

অন্য একজন মেয়ে পাশ থেকে ফুট কাটলো--

- এতো বেশ মডান নাম। খদ্দের নিচ্চয় পছোন্দ করবে। ঐ নামটাই রেখে দাও মাসী।

- হুঁ।

এইভাবে অবশেষে সুচি তার ভালো নাম অর্জন করে ফেললো। এটা তাই নাম অর্জনের গল্প। মনে হয় তাতে কেউ আপত্তি করবে না!

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন