কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

 

সেমসাইড

পাথরঘাটা থেকে ঢাকায় ফিরছিল শায়ক। রুদ্র শায়ক। সদ্য বিদেশ থেকে আসা এক যৌবনোত্তীর্ণ একজন মানুষ। স্টিমারে। ভোর সাড়ে পাঁচটায় স্টিমার পাথরঘাটা থেকে ছেড়েছে, সন্ধ্যে নাগাদ সদরঘাটে পৌঁছে যাবে।

সারাদিন কেবিনে শুয়ে-বসে, বই পড়ে, টিভি দেখে বোর হয়ে যাচ্ছিল। এসি কেবিন হওয়ায় কিছুটা রক্ষে। যে গরম পড়ছে, এসি না থাকলে গরমে আলুসেদ্ধ হয়ে যেত।

স্টিমার চাঁদপুর ছেড়ে এসেছে অনেক আগে। মেঘনার পশ্চিমাকাশ সূর্যাস্তের রবির রক্তিম আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। আর একটু পরেই সন্ধ্যে নামবে।

কেবিন থেকে বাইরে এলো রুদ্র। ডেক-এ রেলিং-এ ভর করে দাঁড়ালো । সামনে তাকালো। পানি! যদ্দূর চোখ যায় শুধুই অথৈ পানি। সীমাহীন।

কতদিন পর, আবার কতদিন পর মেঘনার খোলা হাওয়ায় নিজেকে মেলে দিলো।

- কত বছর হবে? নিজের মনের কাছে প্রশ্ন করলো রুদ্র।

- তা হবে দু’যুগ তো হবেই।

তার মানে চব্বিশটা বছর পর আবার সেই মেঘনার উন্মুক্ত ডেক-এ দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে দু’চোখ ভরে তাকানো, বুক ভ’রে প্রশান্তির নিঃশ্বাস নেয়া।

চব্বিশ বছর আগে শেষবার এই স্টিমারে ঢাকা থেকে আমতলি গিয়েছিল রুদ্র। সেবার ওর পাশে ছিল শ্রেয়শী।   ওর ক্লাশমেট। যাকে ও মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছিল। বিয়ে করবে বলে ঠিকও করে ফেলেছিল।

মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ। কথা ছিল, গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে ওরা রেজিস্ট্রিটা করে রাখবে। তারপর একটা চাকরি-বাকরি জুটে গেলে ছোট্ট সুখের নীড় বাঁধবে। তারপর ওরা দুজন দুজনার, শুধুই দুজনার।

শ্রেয়শীকে আমতলি পৌঁছে দিয়ে পাথরঘাটা গেল রুদ্র। সপ্তাহখানেক গ্রামে থেকে ঢাকায় ফিরে চাকরি খুঁজতে লেগে গেল। যে করেই হোক ওকে একটা চাকরি জোগাড় করতেই হবে। নইলে ওর জীবনের সব স্বপ্ন তছনছ হয়ে যাবে।

ওদিকে শ্রেয়শী সেই যে বাড়ি গেছে  আর ফেরার নাম নেই। দিন গেল, সপ্তাহ গেল; মাস গেল শ্রেয়শী আর ঢাকায় ফিরলো না।

চিঠি লিখলো রুদ্র। উত্তর এলো না। শ্রেয়শীর বিরহে পাগল-প্রায় হয়ে উঠলো রুদ্র।

একদিন মতিঝিল অফিস পাড়ায় বন্ধু হাসান মাসুদের সাথে দেখা। মাস্টার্স করে ওর মতোই চাকরি খুঁজছে। হাসান মাসুদের কাছে জানলো, শ্রেয়শীর বিয়ে হয়ে গ্যাছে। স্বামীর সাথে চিটাগাং থাকে। শ্রেয়শীর হ্যাজবেন্ড চিটাগাং য়্যুনির্ভাসির্র্টির টিচার।

শুনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো রুদ্রর। এ জন্যে বুঝি ওর চিঠিরও কোন উত্তর দ্যায় না!

চাকরি খোঁজা বন্ধ হলো রুদ্রর । বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ করলো। রাগে-ক্ষোভে-অপমনে তাবৎ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন; বাইরের পৃথিবীর সাথে সব সম্পর্ক ছেদ করে দিলো।

হঠাৎ করেই য়্যুরোপ যাওয়ার একটা সুযোগ পেয়ে গ্যালো রুদ্র। ফিনল্যান্ডে। সুযোগটা হাতছাড়া করলো না। শ্রেয়শীহীন এ শহর ওর আর ভাল্লাগছিল না। তারচে’ এই ভালো।

এই শহর, এই দেশ, বন্ধু-বান্ধব; আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে চলে যাবে দূরে, বহু দূরে। যেখানে কেউ ওকে চিনবে না। চেনা পৃথিবীর সাথে আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। শ্রেয়শী নামে কোন মেয়ের স্মৃতি ওকে তাড়িয়ে ফিরবে না।

যা ভাবা তাই কাজ। একদিন সত্যি সত্যি চিরচেনা এই দেশটা ছেড়ে চলেও গ্যালো সেই সুদূর ফিনল্যান্ডে। তারপর কেটে গ্যালো একে একে চব্বিশটা বছর। চব্বিশ বছর পর এই প্রথম দেশে ফেরা। দেশে ফিরেই গিয়েছিল পাথরঘাটায় অনেক স্মৃতি বিজড়িত গ্রামের বাড়িতে। সেখান থেকেই ঢাকায় ফিরছিল। ওর পাশে একজন ভদ্রমহিলাও রেলিং-এ ভর দিয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রবির অস্তগমন দেখার অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে অনেকক্ষণ ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

ভদ্রমহিলার পুরো মুখটা দেখা যাচ্ছে না। মুখের একপাশ দেখতে পাচ্ছে রুদ্র। অনেকটা শ্রেয়শীর মতো। বুকের ভেতোরটা ধক্ করে ওঠে। এক অজানা ব্যথায় মোচড় দিয়ে ওঠে।

না, ও নাম আর মনে করতে চায় না, রুদ্র। চোখ ফিরিয়ে নিলো। কিন্তু চোখ আর মন তো কারো শাসন মানে না। রুদ্ররও না। আবার তাকালো রুদ্র। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো।

এবার ওর দিকে তাকালেন ভদ্রমহিলা। চমকে উঠলেঅ রুদ্র। দেখলো, শ্রেয়শীর মতো নয়; শ্রেয়শীই।

চব্বিশ বছর পরও ওকে চিনতে এতটুকু কষ্ট হলো না রুদ্রর। সেই একই রকম আছে। একটু ফ্যাটি হয়ে গেছে, তবে রূপ-লাবণ্য ঠিক ধরে রেখেছে।

নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। প্রতিজ্ঞা করেছিল, জীবনে আর কোনদিন ওর মুখ দেখবে না। নিজের প্রতিজ্ঞা নিজেই ভঙ্গ করলো।

মনে ভয়-সংশয়, দ্বিধা-সংকোচ নিয়ে শ্রেয়শীর দিকে এগিয়ে গ্যালো রুদ্র শায়ক। বললো- তুমি!

শ্রেয়শী ওকে আগেই দেখেছিল। তাই একটুও চমকালো না। উত্তর দিলো- চিনতে পারছো না, নাকি স্ত্রীর ভয়ে চিনেও না চেনার ভান করছো?

- ঠিক বুঝলাম না।

- বুঝেছো ঠিকই। তা আমাকে না চেনার ভান করার মানে?

- না, মানে তোমার সাথে আর কেউ নেই তো, তাই।

- আর কেউ? আর কেউ কে থাকবে?

- তোমার স্বামী, সন্তানেরা।

- বিয়ে হলেই না স্বামী-সন্তান!

- তাহলে হাসান মাসুদ যে আমাকে বলেছিল...

- কী বলেছিল?

- তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। তোমার স্বামী নাকি চিটাগাং য়্যুনির্ভাসির্র্টির টিচার?

- তুমি ওর কথা বিশ্বাস করেছিলে?

- হ্যাঁ, মানে....

- মাসুদ তো আমকেও বলেছিল, তুমিও নাকি বিয়ে করে বউ নিয়ে বিদেশে চলে গ্যাছো। তুমি ওর কথা বিশ্বাস করলে? আমি তো ওর কথা বিশ্বাস করিনি।

- তার মানে তুমি বিয়ে করনি?

- করলে খুশি হতে?

- তোমার কী তাই মনে হয়?

-ক্যানো, তুমি বিয়ে না করে থাকতে পারো আমি পারি না? ভালোবাসার সোল এজেন্সি কী তুমি একাই নিয়েছো নাকি?

শ্রেয়শীর এ কথার কোন উত্তর দিলো না রুদ্র। দিতে পারলো না। দুচোখে একরাশ স্নিগ্ধ মুগ্ধতা নিয়ে অপলক নয়নে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

তখন সূযর্টা লাল হতে হতে ফিকে হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে মেঘনার নীল জলে। মেঘনার জলোচ্ছ্বাসের মতোই ওদের হৃদয়েরও দু’কূল ছাপিয়ে আছড়ে পড়ছে প্রণয়ের জলোচ্ছ্বাস। তখনও মুগ্ধ চোখে শ্রেয়শীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে রুদ্র। পলকহীন চোখে।

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন