প্রতিবেশী সাহিত্য
র্যান্ডাল জ্যারেলের কবিতা
(ভূমিকা ও ভাষান্তর: গৌরাঙ্গ মোহান্ত)
কবি পরিচিতিঃ র্যান্ডাল জ্যারেল (১৯১৪–১৯৬৫) ছিলেন বিশ শতকের প্রভাবশালী মার্কিন কবি, সাহিত্যসমালোচক ও ঔপন্যাসিক। তিনি টেনেসির ন্যাশভিলে জন্মগ্রহণ করেন। ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে জ্যারেল কেনিয়ন কলেজ ও টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর প্রথম দিকের রচনায় যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা ভাস্বর হয়ে ওঠে ; Little Friend, Little Friend (১৯৪৫) এবং Losses (১৯৪৮) কাব্যগ্রন্থে যুদ্ধ, ভয় ও মৃত্যুর চেতনা ব্যাপ্ত হয়েছে। পরবর্তী জীবনে তিনি নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং ১৯৫৬–৫৮ কালপরিসরে Library of Congress-এর Poetry Consultant হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কবি হিসেবে জ্যারেলের কণ্ঠ যেমন সংবেদনশীল, তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত ও ব্যঙ্গাত্মক। The Woman at the Washington Zoo (১৯৬০) গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে National Book Award লাভ করেন; The Lost World (১৯৬৫) তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ। কবিতার পাশাপাশি তাঁর সমালোচনামূলক রচনাও সুখ্যাতি অর্জন করে। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ Poetry and the Age (১৯৫৩) সহ অন্যান্য প্রবন্ধাবলি পাঠকসমাজে সমাদৃত হয়ে আসছে।
“The House in the Woods” এবং “The Orient Express”—এ দুটি কবিতায় জ্যারেলের কবিসত্তার বিশেষ দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমটিতে অরণ্য, রাত্রি, নিদ্রা ও দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে পরিচিত পৃথিবী ক্রমান্বয়ে এক অজ্ঞাত ভূখণ্ডে পরিণত হয়। দ্বিতীয়টিতে চলন্ত ট্রেন থেকে দৃষ্ট সাধারণ পৃথিবীর আড়ালে উন্মোচিত হয় এক অনিশ্চিত ও অনিয়ন্ত্রিত জীবন। অর্থাৎ, দৈনন্দিন দৃশ্যাবলির ভেতর দিয়েই জ্যারেল পৌঁছে যান সময়, মৃত্যু, একাকিত্ব এবং অস্তিত্বের গহন প্রদেশে।
জ্যারেলের কবিতা পৃথিবীর গভীরতর রূপের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে; দৃশ্যমান বাস্তবতার অন্তরালে যে অদৃশ্য, অনিশ্চিত ও ভীতিপ্রদ জীবন প্রবাহিত থাকে তা জ্যারেলের কবিতার অন্বিষ্ট বিষয়।
অরণ্যের বাড়ি
বাড়িগুলোর পেছনে রয়েছে অরণ্য।
গ্রীষ্মের একটি পাতাও যখন অবশিষ্ট থাকে, অরণ্য
এমন সব শব্দ করে, যা আমি আমার গানের কোথাও বসাতে পারি,
তার পথে পথে জেগে উঠে আমি হাঁটতে পারি, ভালো
কিংবা মন্দের দিকে: খাঁচার দিকে, চুল্লির দিকে, অরণ্যের বাড়ির দিকে।
এ জীবনেরই অংশ, অথবা সেই গল্পের,
যে গল্প আমরা জীবন দিয়ে তৈরি করি। তবে শেষ পাতাটির পরে,
শেষ আলোর পরে—কারণ প্রতি বছরই শেষে পাতাহীন,
প্রতিটি দিনই শেষে আলোকহীন—অরণ্য আরম্ভ করে
তার গম্ভীর অস্তিত্ব: তার কোনো পথ নেই,
কোনো বাড়ি নেই, কোনো আখ্যান নেই; সে তুলনা প্রতিরোধ করে…
একটি স্বচ্ছ, পুনরাবৃত্ত, ঢেউ-তোলা গড়গড় শব্দ—যেন চামচ
অথবা গ্লাসের নিঃশ্বাস, সেটিই ঝরনা,
অরণ্যের কলুষিত মধ্যরাত্রির জল। আমি যদি অরণ্যের ভেতর হাঁটি
যত দূর হাঁটা আমার পক্ষে সম্ভব, আমি পৌঁছে যাই নিজের দরজায়,
অরণ্যের বাড়ির দরজায়। সেটি নিঃশব্দে খুলে যায়:
বিছানার ওপর কিছু একটা আবরিত, কুঁজো হয়ে থাকা কিছু রয়েছে ঘুমন্ত, সেখানেই জেগে আছে—কিন্তু কী? আমি জানি না।
আমি তাকাই, শুয়ে পড়ি, তবু জানি না।
আমার বিশাল, প্রতিধ্বনিময়, বেঢপ অঙ্গগুলো
কত দূর প্রসারিত হয়ে আছে, চতুর্দিকে কেবল শূন্যতা! কারণ সময় আঘাত করেছে,
এখন সব ঘড়ি থেমে আছে, কত জীবনের জন্য,
একই সেকেন্ডে। অবশ, কাষ্ঠল, নিশ্চল,
আমরা রাতের পৃষ্ঠের বহু গভীরে।
এত গভীরে শব্দ ছাড়া আর কিছুই নেমে আসে না: গাড়ি, মালবাহী বগি,
একটি তারের মতো দীর্ঘায়িত উচ্চ মৃদু গুঞ্জনধ্বনি
চিরকাল ধরে চলে—এ কি সেই শব্দ, যা বানিয়ান শুনেছিলেন,
যাতে তাঁর মনে হয়েছিল, তাঁর অন্ত্র বুঝি তাঁর শরীরের ভেতর ফেটে যাবে?—
ভেসে চলে, ক্রমাগত শূন্যতার ভেতর। তারপর কেউ চিৎকার করে,
এ চিৎকার যেন একটি পুরোনো ছুরি যা শান দিতে দিতে ক্ষয়ে গেছে।
এ শুধু একটি দুঃস্বপ্ন। কেউ জেগে ওঠে না, কিছুই ঘটে না,
শুধু আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে—
আর সেটিও কিছুক্ষণ পরে মিলিয়ে যায়।
আমি এখানে পড়ে আছি একটি বিচ্ছিন্ন অঙ্গের মতো, অঙ্গটি কেটে নেওয়ার পর গোঁড়া থেকে গেছে...
এখানে পৃথিবীর তলায়, পৃথিবীর আগে যা ছিল
এবং পৃথিবীর পরে যা থাকবে, সেটি আমাকে তার পিঠে ধরে রাখে
আমার মুখোমুখি হয়ে আমাকে দোলায়: চুল্লি ঠান্ডা, খাঁচা শূন্য,
অরণ্যের বাড়িতে ডাইনি ও তার সন্তান ঘুমিয়ে আছে।
দি ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস
ট্রেন থেকে মানুষ প্রায় তেমনি তাকায়
শিশু হিসেবে যেমন সে তাকিয়েছে। সূর্যের আলোয়
যা দেখি, এখনও তা আমার কাছে সরল মনে হয়,
আমি নিরাপদ; তবে সন্ধ্যায়
ভূতলে যখন অন্ধকার ঘনায়,
সবকিছুর ওপর নেমে আসে এক প্রশ্নময় অনিশ্চয়তা।
একবার, সারাদিনের বৃষ্টির পর,
আমি শীতল হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় শুয়ে ছিলাম ; কিছুক্ষণ পরই
আবার আমি শীতল হলাম, এবং কুঁকড়ে কাঁপতে থাকলাম
লেপের নানা রঙের নিচে—
বিবর্ণ শীতের দিনের নিস্তেজ শেষাংশে,
আমার বাইরে ছিল
চেয়ার,টেবিলের কিছু আকৃতি, শিশুদের বর্ণপরিচয়ের জিনিস;
জানালার বাইরে ছিল
পৃথিবীর চেয়ার ও টেবিলগুলো...
আমি দেখেছিলাম এমন পৃথিবী,
যা আমার কাছে মনে হয়েছিল
যা-কিছু অদ্ভুত তার
সাদামাটা ধূসর মুখোশ
তার আড়ালে ছিল যা কিছু,
ছিল তা-ই সব।
কিন্তু তা বিশ্বাসেরও অতীত।
মানুষ ভাবে, “সবকিছুর পেছনে
এক স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ, এক অনিচ্ছাকৃত বিষাদ (এক স্বেচ্ছাবৃত বিষাদ, এক কৃত্রিম আনন্দ)
অপরিবর্তনীয়ভাবে চলাচল করে”; কেউ ট্রেন থেকে তাকায়
কিছু জিনিস দেখা যায়, সবকিছুর পেছনে রয়েছে একই জিনিস:
এই ক্ষুদ্র সমস্ত গ্রাম,
পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক নারী, শস্যভরা মাঠ,
কোনো মানুষ তার স্ত্রীকে বিদায় জানায়—
জীবনচাঞ্চল্যে পূর্ণ অরণ্যের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া একটি পথ, ও চলন্ত ট্রেন
যা শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তনীয়
একটি হৃদয়ের মতো
এখন আর কখনো থামবে না—
এ যেন অন্য যেকোনো শিল্পকর্মের মতো
এটি যেমন, তেমনই আছে, এবং কখনো এর পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সবকিছুর পেছনে সবসময় থাকে
অজ্ঞাত, অনাকাঙ্ক্ষিত জীবন।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন