কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রণব চক্রবর্তী

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

 

পঞ্চায়েত সদস্যের ক্যারিশ্মা

নাম গোলোকবিহারী পাটোয়ারি। বয়স ৩৫। চঞ্চলতা ব্যতিক্রমী। ঠিকুজী কুষ্টি নেই। চোখ সর্বদা ঘূর্ণিত। ঘাড়ের দ্রুত এদিক ওদিক ঘোরা পর্যবেক্ষণ করে গ্রামের মাস্টারমশাই বলেছিলেন, ছেলেটার বিয়ে না দিলে বটতলায় দাঁড়িয়ে সকাল থেকে মেয়ে-বউ দেখতে দেখতেই ওর চোখে ধনুষ্টঙ্কার হয়ে যেতে পারে। রোগ বিশারদ নই, ধনুষ্টঙ্কার কেন হয়, কখন হয় সে ব্যাপারে বিশেষ কিছুই বলতে পারবো না। তবে মাষ্টারমশাই অভিজ্ঞ মানুষ যখন বলেছেন, ভেবেচিন্তেই নিশ্চয়ই বলেছেন, এই ভেবে প্রশ্ন করিনি।  

সকালবেলা হৈচৈ শুনে গোলোকবিহারীদের বাড়িতে গিয়ে ঘরে ঢুকেই দেখলাম, গোলোকবিহারী ঝুলছে। জিভ বেরিয়ে গেছে, প্যান্ট পেচ্ছাপে ভেজা। একটা ভাঙাচোরা টুল পাশে ছিটকে পড়ে আছে। লাশে এখন হাত লাগালেই কেস খেতে হবে। গাঁয়ের দুয়েকজন লোক এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও কেউই কাছে আসছে না বোধহয় কেস খাবার ভয়েই। পুলিশের ঝামেলা হবে। মালটা শেষ। পাশেই দেখি দেয়ালের কাছে ঘুরে দাঁড়িয়ে 'চক্ষুলোচনই তার সর্বনাশের কারণ' এ কথা বলতে বলতে তার মা, মানে মাসী্মা, মাথা ঠুকছে দেয়ালে। ব্যাপারটা কী? মনে হলো মাসীমার ফাটা কপালে ওষুধ না মাখালে, মহিলাকে ভুগতে হবে। কপালটা ছেঁচে গেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে পাড়ার হাতুড়েকে গিয়ে কপাল ছেঁচার ওষুধ চাইতেই, লাল ওষুধ মানে মারিকিউরিক ক্রোমের ছোটো শিশি সাথে তুলো হাতে ধরিয়ে দিলেন। তিরিশ টাকা নগদ দিতে হবে। ধার বাকি নেই। দিলাম। বাজারটা আজ করা হবে না। বাড়িতে ক্যালানী খেতে হবে। সে হোক। মাসীমা মানে গোলকবিহারীর মায়ের কপাল যদি উদ্ধার হয়, হোক। ঘরে ঢুকতেই আবারও দেখলাম মালটা ঝুলছে। ঝুলুক। তুলো করে মাসীমার কপাল মাখালাম লাল ওষুধে। আর সেই অবসরেই গোটা দুই হাফ প্যান্ট পরা ঠোলা মানে কনস্টবল এসে লাঠি উঁচিয়ে বিরাট হম্বিতম্বি। হঠাৎই ফটাস থাবায় আমার কলার চেপে ধরে একজন হাফপ্যান্ট চেঁচিয়ে উঠলো-- 'মালটাকে লটকে দিয়ে এখন পীড়িত হচ্ছে, বোকাচোদা, থানায় চল'।

বুঝলাম আমার হয়ে গেছে। মাসীমা আর আমার বয়সের ফারাক প্রায় ২৫। সুতরাং সমীকরণ সোজা। ছেলেকে লটকে দিয়ে মালগুলো নিজেদের পথ পরিষ্কার করলো।

একটা লজঝড়ে গাড়ীতে চাপিয়ে মাসীমা ও আমাকে সোজা পুলিশ ক্যাম্পে এনে ফেললো। জিজ্ঞেস করলাম, লাশটার কি হবে?-    এই প্রথম ডান্ডার বারি পাছায় টের পেলাম।

-- মালটাকে ঝুলিয়ে দিয়ে আবার লাশের খবর? আবার কথা বললে, তোকেও লাশ কোরে দেবো খানকির ছেলে...।

-- বিশ্বাস করুন, মাসীমা আমার মায়ের বয়েসী, কপাল ঠুকে ফাটিয়ে ফেলেছেন তাই ওষুধ এনে লাগাচ্ছিলাম।

-- লাগাচ্ছিলি!- কথাটা বলেই সবাই মিলে একসঙ্গে কেমন খ্যালখ্যাল করে হাসতে শুরু করলো।

-- সে তো চোখেই দেখলাম। আমাদের যেতে দেরী হলে তো পুরোটাই লাগিয়ে দিতিস!

ঘরের এককোণায় বসে মাসীমা তখন গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছেন, ওরে আমার গোলোক রে, তুই আমারে ছেড়ে কোথায় গেলি রে! ওরে আমার গোলোক রে!

-- এই খানকি, আবার নাটক হচ্ছে? বেশি চেঁচালে গাঁড়ে ডান্ডা ঢুকিয়ে দেবো।

একজন হাফপ্যান্ট ঠোলা মাসীমার দিকে এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠতেই, মাসীমা একলাফে উঠে দাঁড়িয়ে কোনকিছু না ভেবেই সেই পুলিশটার লিঙ্গস্থানে ঝেরে এক লাথি মেরে, তাকে চিৎ কোরে ফেলে ছুটে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। ঘর থেকে আমি শুনতে পাচ্ছি মাসীমার গলা, ওরে আমার গোলোক রে, তুই কোথায় গেলি রে... ! কিন্তু এদিকে মাসীমা যাকে লাথিটা মেরেছে সে কোনক্রমে উঠে দাঁড়ালেও, দুহাতে বিচী ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যন্ত্রণায় তার বাবার নাম ভুল হয়ে গেছে। অন্য যারা, মানে টেবিলে বসে থাকা এই দুই কনস্টবলদের বস এবং অন্য হাফপ্যান্ট, ঘটনার আকস্মিকতায় কেমন হতভম্ব হয়ে খাবি খাচ্ছে। এই ফাঁকে আমিও দৌড় দিলাম যেদিকে মাঠ জঙ্গলে ঢুকে গেছে সেইদিকে।

ঘটনার ট্যুইস্টটা এর পরেই। পেছন ফিরে দেখলাম এলাকার ডোম বলে যাকে চিনি সে ট্রলি চালিয়ে ক্যাম্পের সামনে এসে দাঁড়ালো। ট্রলিতে শোয়ানো লাশ। লাশ মানে বোঝাই যাচ্ছে গোলোকবিহারী পাটোয়ারী। কালকেও বটতলায় দাঁড়িয়ে গাঁয়ের প্রচুর মেয়ে বউদের চঞ্চল হয়ে দেখে গেছে ঘাড় একবার এদিক, একবার ওদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। আজ লাশ। লাশের পেছন পেছনই দেখলাম ছাতা মাথায় এলাকার পঞ্চায়েত মেম্বার এসে ক্যাম্পের ভিতরে ঢুকে গেলো। সাহস সঞ্চয় করে আমিও আর না-পালিয়ে ফিরে এলাম ক্যাম্পের সামনে। ঘরে ঢুকে সেই বস বা টেবিলে বসে থাকা অফিসারকে বললাম, মাসীমাকে আটকাতে গেছিলাম। কি জানি উনিও আবার কিছু করে না বসেন? কিন্তু পেলাম না। পঞ্চায়েত সদস্য সামনে আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন--

-- কি হয়েছে রে বাল্টু ?

আমি সুযোগ পেয়ে যথাসাধ্য পুরো ব্যাপারটা খুলে বললাম। পঞ্চায়েত সদস্য সব শুনে বললেন--

-- তোকে তবে এসবের সঙ্গে জড়িয়ে দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে?          

আমি কিছু বলবার আগেই হাফপ্যান্ট অন্য পুলিশটা ঝাঁঝিয়ে বললো-- আরে স্যার, এই ছোঁকড়া অই মহিলার সঙ্গে ইন্টুফিন্টু করে ছেলেটাকে মেরে ফেলেছে। আমরা সেটা হাতেনেতে ধরে ফেলে এদের ধরে নিয়ে এসেছি। হঠাৎ পঞ্চায়েত সদস্য ভীষণ রেগে গিয়ে চিৎকার করে উঠলো--

-- পুলিশ হয়ে হাতির পাঁচ পা দেখেছো, শুয়োরের বাচ্চা! একটা ভালো ছেলেকে তার মায়ের বয়েসী মহিলাকে নিয়ে গল্প চোদাচ্ছো! প্যান্ট খুলে নিয়ে তোমায় ভোগে পাঠিয়ে দেবো। এটা আমার গ্রাম। এ গ্রামের সবাইকে আমি চিনি। কাল রাতেও গোলোকের মা আমার সাথে রাত কাটিয়েছে, ওর সব আমি জানি, মহিলার সব কটা লোম আমার জানা। আর আমার সামনে এই ভালো ছেলেটাকে নিয়ে গল্প ফাটাচ্ছো? এখুনই খবর দিলে আমার লোকজন এসে তোমাদের সহ এই পুলিশ ক্যাম্প আগুন লাগিয়ে ধুলো করে দেবে।

এই চেঁচামেচির মধ্যেই সেই অফিসার মতো ফুলপ্যান্ট পরা পুলিশটা, এতক্ষণ যিনি মুখবন্ধ সবকিছুই শুনে গেছেন এবং দেখে গেছেন, তড়াক কোরে উঠে দাঁড়িয়ে পঞ্চায়েত সদস্যের হাত চেপে ধরে কাকুতি-মিনতি শুরু করে দিলো-- না স্যার, ভুল হয়ে গিয়েছে স্যার, এমন আর কক্ষণো হবে না স্যার। আমি ওদের হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি স্যার। আপনি উত্তেজিত হবেন না স্যার, আমরা সব ঠিক করে নেবো। আপনি এই চেয়ারটায় বসুন স্যার।

আমার দিকে তাকিয়ে সেই ফুলপ্যান্ট পুলিশটা বললো--

-- এই ছোকড়া, তুমি যাও তো, বাড়ি যাও। এখানে একদম দাঁড়াবে না।

-- ঠিক আছে স্যার, যাচ্ছি।

-- নাম কি তোমার?

-- আজ্ঞে, বাল্টু।

-- বাল্টু?

 -- আজ্ঞে হ্যাঁ।

হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে তার দুই হাফপ্যান্ট কনস্টবলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলো--

-- তোদের লাথি মেরে এই ক্যাম্প থেকে বার করে দেবো। লাশ আনতে গেছিস, সেটা খুলে নিয়ে চলে আয়! তা নয়, কোথা থেকে এই বাল ছাল গুলোকে ধরে আনতে গিয়েছে। তোদের জন্যে আমার ক্যারিয়ারে কালি লেগে যাবে, শুয়োরের বাচ্চা। যা, বাইরে লাশটাকে ঢ্যামনাচাঁদ খুলে এনেছে, পুড়িয়ে দেবার ব্যবস্থা করগে। আমার চোখের সামনে থেকে এক্ষুনি ভাগ!

পঞ্চায়েত মেম্বারের জন্যে আমি মুক্ত হলাম তাই তাকে একটা হাতজোড় পেন্নাম ঠুকে ক্যাম্পের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই হঠাৎ আবার এক পুলিশ এসে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, আমাদের অফিসার তোমাকে ডাকছে। একবার দেখা কোরে যাও। আমিও আর কিছু না ভেবে পেছন ঘুরে আবার ক্যাম্পের ভেতর প্রবেশ করলাম।

-- স্যার, আমাকে ডেকেছেন ?

-- হ্যাঁ, শোন, এখন ছেড়ে দিচ্ছি, কিন্তু রাতে একবার তোকে নিয়ে ঘটনার পুনর্গঠন করবো। তোকে তখন আমরা ডেকে নেবো। কোথাও পালাবি না।

হঠাৎই টেবিলে থাপ্পড় মেরে পঞ্চায়েত সদস্য চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে বললো--

-- মানে? ছেলেটাকে মাঝরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গাছের ডালে গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে ঘটনার পুনর্গঠন! তার মানে আমার সামনে ছেড়ে দিতে হচ্ছে বলে, রাতের আঁধারে এনকাউন্টার! শুয়োরের বাচ্চা চালাকি মারছো! পুলিশ হয়েছো বলে নিজেকে শেয়ানা ভাবছো, আর সবাই বোকাচোদা, নির্বোধ, কিছুই বোঝে না! তোদের ব্যবস্থা আমাকেই করতে হবে।

কথাটা বলেই পকেট খামচে একটা ফোন বার কোরে টিপতে যাবে, এমন সময় সেই ক্যাম্পের ফুলপ্যান্ট পরা বস পুলিশকর্তা সোজা পঞ্চায়েত মেম্বারের দু-হাত সপাটে জড়িয়ে ধরে কাঁদোকাঁদো গলায় বলে উঠলো--

-- না স্যার, আমি এ কথা ভেবে কথাটা বলিনি স্যার, যে বাড়িতে গলায় দড়ির মড়াটা পাওয়া গেছে, সেই বাড়িটা রাতে একবার দেখতে যাবো।

-- তাই নাকি? তা তোমার যে পুলিশগুলো মড়াটাকে তুলে নিয়ে এলো, তারা সে বাড়িটা চেনে না? মাতালকে মাগীবাড়ি দেখাচ্ছো? গলায় দড়ি মড়ার পুনর্গঠন মানে কি? আর একজনকে ধরে ঝুলিয়ে দিয়ে সেটাকে দেখা?-- লোকজনকে ডেকে এসব কথা তাদের বললে, হাটের ক্যালানি বোঝো তো, তোমাদের পুলিশগিরির গাঁড় মেরে দেবে। সামলাতে পারবা তো? তখন তো আবার আমাকেই দায়িত্ব নিয়ে জেলার অফিসারদের বোঝাতে হবে তোমাদের দাঁতক্যালানে মার্কা ক্যাওড়ামো।

কথাগুলো বলে পঞ্চায়েত মেম্বার আমার উদ্দেশ্যে বললেন--

-- এই বাল্টু বাড়ি যা। গোলোকের মায়ের একটু খবর-টবর রাখিস। থানা থেকে এরা  যদি কেউ ডাকতে যায়, উত্তর দিবি না, দরজা ধাক্কালে খুলবি না আর আমাকে একটা পারলে ফোন করে দিস। 

অফিসারও আমার কাছে এসে পিঠে হাত রেখে বললো, কোনো ভয় নেই, কেউ আপনাকে আর বিরক্ত করতে যাবে না। আপনি বাড়ি চলে যান।

পায়ে হেঁটে বাড়ির পথ ধরে আসতে আসতে আমার মাথায় শুধু বার বার ফিরে আসছে একটাই প্রশ্ন, রহস্যও একটাই-- মাসীমা, পঞ্চায়েত সদস্য এবং গোলোকবিহারীর দড়িযাত্রা। রহস্যটা ঠিক কোথায়? পুলিশ কি তাহলে শুধুই কলাবাগানের কেঁচো, নিজেকে বাঁচাতেই মাটির নীচে মুখ ঢাকছে অকারণ হল্লায়!

 

    

   

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন