কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫১

 

 

ছবি

-এটা কী কাজ করেছিস হারামজাদা! ছবিটা মুছতে বললাম। মুছিসনি কেন?

-আঁইজ্ঞে, মুছেছি তো!

-কোথায়?

বৃদ্ধ হরিরামের দিকে চোখ কটমট করে তাকায় পবন। এই এলাকায় যতো দেয়াল আছে, সব সাদা করে দেবার নির্দেশ এসেছে ওপর থেকে। দেয়ালে অনেক শ্লোগান লেখা ছিল। আর ছিল এই ছবিটা। একটা কঙ্কালসার মানুষ বিছানার উপর মুমুর্ষু শুয়ে আছে। দু'চোখ কোটরে ঢোকা। কালচে লাল রঙের ছবি। সব লেখা মুছে গেলেও এই ছবিটা মোছা যাচ্ছে না কিছুতেই।

পাশেই কলেজ। সেখানে দুদিন অন্তর অন্তর পোস্টারবাজি, মিটিং মিছিল চলতেই থাকে। এই ছেলেমেয়েগুলো লেখাপড়া করে কখন কে জানে! মেয়েগুলো তো ছেলেদের থেকে বেশি সিগারেট খায়। এটা নাকি ওদের বিপ্লব।

পবন এসব বোঝে না। ক্লাস ইলেভেন থেকেই বাবার গদিতে বসছে বড়বাজারে। সে একটা জিনিস বোঝে। জগত চলে দুটো জিনিসের উপর। মুনাফা আর নুকশান। উপর থেকে আসা নির্দেশ মানলে একটা বড় টেণ্ডার পাবে পবন। রাস্তা বানাবার টেণ্ডার। এইসব ক্ষেত্রে উপরমহলের গুডবুকে টিকে থাকাটা খুব জরুরি। কারণ সেখানেও কম্পিটিশন প্রচুর। টেণ্ডার পেলে একটা বিএমডব্লু গাড়ি কিনবে পবন।

-ক’কোট লাগিয়েছিস?

-রোজ চুনা মেরে যাই। গাঢ় করে মারি। মনে হয় মুছে গেছে। পরের দিন এসে দেখি ছবিটা আবার ফুটে উঠেছে!

-আবার মার পোচটা। গাঢ় করে মার...

দূর থেকে দেখছিল এক পাগলা বুড়ো। পবনের কাজকর্ম দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। পবন ওর দিকে চেয়ে চোখ কটমট করে বলল, "কী রে পাগলা। হাসছিস কেন?"

-ও ছবি মুছতে পারবা না বাবু।

-কেন?

পাগলা হাসে। তার ছ্যাতলাপড়া দাঁতের ফাঁক দিয়ে ফেনা বেরিয়ে আসে।

-ও ছবি রঙ দিয়ে আঁকা নয় গো। রক্ত দিয়ে আঁকা।

-কার রক্ত?

-মানুষের রক্ত। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানার শ্রমিকের রক্ত, না খেতে পাওয়া পথের শিশু আর তার মায়ের রক্ত, চাকরি হারানো অবসাদে ভোগা যুবকটার রক্ত। ওরা সবাই মিলে এঁকেছে ওটা। এখন মোছো। আবার ফুটে উঠবে। বারবার ফুটে উঠবে। রক্তের দাগ অতো সহজে মোছা যায়?

হতভম্ব পবনের দিকে তাকিয়ে পাগলটা হাসতে থাকে। হাসতেই থাকে।

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন