![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫১ |
প্রত্যক্ষ প্রমাণ
দৃশ্যটা অভাবনীয় এবং আতঙ্কজনক। মোটামুটি বছর পঞ্চাশের এক প্রৌঢ় সদর রাস্তায় দ্রুতগতিতে হেঁটে যাচ্ছে। দু’হাতে আগলে রেখেছে একটা বস্তা, আর সেই বস্তার খোলামুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা কঙ্কালের দুটি পা। দৃশ্যটা যার নজরে আসছে, সেই ভয়ে আর্তনাদ করে উঠছে। কাউকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে প্রৌঢ় হাঁটতে হাঁটতে সটান ঢুকে পড়ল ওড়িশার কেউনঝরের পাটনা ব্লকের মালিপোসি এলাকায় ওড়িশা গ্রাম্য ব্যাংকের একটি শাখায়। তারপর বস্তা থেকে প্রমাণ সাইজের কঙ্কাল বের করে ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের টেবিলে রাখল। উপস্থিত সবাই শিউরে উঠল, একী সর্বনাশ!
ব্যাঙ্কের ম্যানেজার এবং কর্মীরা এই প্রৌঢ়কে চেনে। এর আগেও ব্যাঙ্কে এসেছে। প্রৌঢ়ের নাম জিতু মুন্ডা। কেওনঝরের দিয়ানালি গ্রামের বাসিন্দা। জনজাতি সম্প্রদায়ের নিরক্ষর মানুষ। তার দিদি কালরা মুন্ডা অবশ্য সামান্য পড়াশোনা করেছিল। দিন-মজুরি করে ব্যাঙ্কে একাউন্ট খুলে কিছু সঞ্চয়ও করেছিল। প্রচন্ড অনটনের সংসারে তার পোষা গরুটাকে বিক্রি করে হাজার বিশেক টাকাও ব্যাঙ্কে জমা দিয়েছিল। কালরার একমাত্র ভাই জিতু সেকথা জানত। কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য, ছাপান্ন বছর বয়সী কালরা আচমকাই কোন এক অসুখে প্রয়াত হলো। জিতু চোখে অন্ধকার দেখল। তার একমাত্র আশ্রয় দিদিকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ল।
দিন এভাবেই বয়ে যাচ্ছিল। দিদির মৃত্যুর পর দুমাস কেটে গেল। জিতুর মনে হলো, দিদি তো আর নেই, তাই দিদির ব্যাঙ্কে টাকাটা ফেলে রেখে কী লাভ! তাছাড়া তার টাকারও খুব প্রয়োজন। ব্যাঙ্ক থেকে কুড়ি হাজার টাকা তুলে নিলে কাজে লাগবে। এটুকুই তো তার খড়কুটো! জিতু টাকা তুলতে গেল ব্যাঙ্কে। সরাসরি জানালো, তার দিদির নামে একটা একাউন্ট আছে এই ব্যাঙ্কে। কুড়ি হাজার টাকার কিছু বেশি টাকা দিদির একাউন্টে আছে। সে টাকা তুলতে এসেছে। তবে সে টাকা তুলতে জানে না। ব্যাঙ্কের কর্মীরা বলল, তোমার দিদিকে ব্যাঙ্কে এসে টাকা তুলে নিয়ে যেতে বল।
জিতু একটু থমকে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল, তা কী করে হবে! দিদি তো আসতে পারবে না!
-কেন? আসতে পারবে না কেন?
-কী করে আসবে! দিদি তো মারা গেছে দু’মাস আগে!
-তাহলে তো মুশকিল! কিন্তু তোমার দিদি যে মারা গেছে, তার প্রমাণ কোথায়? দিদির মারা যাবার সার্টিফিকেট দেখাও। আর দিদি যদি মারাও গিয়ে থাকে, তাহলেও তুমি টাকা তুলতে পারবে না। এজন্য তোমার নমিনি সার্টিফিকেট জমা করতে হবে।
ব্যাঙ্কের কর্মীদের কথা শুনে জিতু ঘাবড়ে গেল। সে নিরক্ষর মানুষ, এসব সার্টিফিকেটের কথা আগে কখনও শোনেনি।
হাতজোড় করে বলল, এসব কিছু তো আমি জানি না!
ব্যাঙ্কের ম্যানেজার বলল, এটা ব্যাঙ্কের নিয়ম। নিয়মের বাইরে তো কিছু করা যাবে না। তুমি যে মিথ্যেকথা বলছ না, তারই বা কী প্রমাণ? হয় তোমার দিদিকে নিয়ে এসো, অথবা দিদির ডেথ সার্টিফিকেট!
জিতুর মাথায় ঢুকছিল না, দিদি মারা গেছে, তা কীভাবে প্রমাণ করবে! অবশেষে নিরুপায় হয়ে দিদির কবর খুঁড়ে দিদির কঙ্কাল বের করে ব্যাঙ্কে হাজির হলো।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন