| সমকালীন ছোটগল্প |
পিতলের হাড়ি
পিতলের হাড়ি ঐ একটাই ছিল বাড়িতে। কেবল একবারই পোলাও রাঁধা হয়েছিল সেই হাড়িতে, আমার অন্নপ্রাশনের সময়। সেই সময়েই কেনা, বাবার সখে, পোলাও রাঁধতে পিতলের হাড়ি লাগে বলে। বাবার সখ হয়েছিল একটু ধুমধাম করার, বড়লোকদের মতন। বড়লোকদের বাড়িতে ঠিক কী কী হয় তা সঠিক জানা না থাকলেও বাবার মনে হয়েছিল পোলাও নিশ্চয়ই হয়, কারণ ঐ নামে যে একটা দামী খাবার আছে তা শোনা থাকলেও নিজের পাতে তাঁর জোটেনি কখনো। যা তাঁর নিজের নাগাল ছাড়িয়েছে তার অধিষ্ঠান নিশ্চয় বড়লোকদের বাড়িতেই। এইটাই সহজ অনুমান, এবং তাই অমন সিদ্ধান্ত। মা বারণ করেছিল, "ওসব বড়লোকি চাল আমাদের মানায় নাকি? মাথার উপর ধারের বোঝা চেপে আছে এক কাঁড়ি, তার উপর আবার নতুন করে ধার?" বাবা মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিল। মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় কী? মাত্র তো কয়েকদিন আগের কথা, মা আর ছেলের জীবন নিয়ে যখন যমে মানুষে টানাটানি চলছিল তখন নিজের সঞ্চিত সম্বল বলতে কেবল ঐটুকুই ছিল, মাটির ভাড় ভেঙে পাওয়া সতেরো টাকা তেইশ পয়সা। ধার না করে তখন উপায় কী? ধারের বেদনার থেকেও বেশী ভারী ধার যোগাড় করার বেদনা। চিকিৎসার টাকা পরে মিটিয়ে দেওয়ার শর্তে চিকিৎসা করতে রাজী হল না ডাক্তারবাবু। মিনতি করে যখন বলা হল, "রুগীর যাই যাই অবস্থা। বড্ডো বিপদে পড়েছি। ভগবান আপনার মঙ্গল করবেন", তখন ডাক্তারবাবু উত্তর দিয়েছিল, "তা যদি বোঝেন তো আর অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? তিনি আপনারও মঙ্গল করবেন, তাঁর উপরেই নির্ভর করুন"। শেষে সুদে টাকা ধার করতে হয়েছিল। এবং তারপর আবারও, যখন জানা গেল হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বাবার বয়েস চব্বিশ, বুঝবে কেমন করে যে ডাক্তারের বলে দেওয়া দিনের আগেও অনেকসময় প্রসব হয়ে যায় যখন অপুষ্ট, অশক্ত শরীর অত সময় আর ধারন করে রাখতে পারে না গর্ভের সন্তানকে। মা ও পারেনি, তাই প্রসব হল আট মাসে। জন্মের পরেও দুর্ভোগ যায়নি। অসময়ে জন্ম নেওয়া সন্তান আর অসময়ে জন্ম দিতে বাধ্য হওয়া মা, বিপদ দুজনকে নিয়েই। বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে টাকা লাগে, আর সেই টাকা হাতে না থাকলে ধার করতে হয় । বলা বাহুল্য যে তা না করে উপায় ছিল না বাবার।
ধারের পর ধার, সেটা যেমন একটা কথা, তেমন আরেক কারণেও মা'র কথা মেনে নিতে হয়েছিল বাবাকে। অমন বড়লোকি চাল তখন সত্যিই বেমানান ছিল অমন সংসারে, যেখানে গর্ভকালে প্রসূতির বাড়তি পুষ্টির ব্যবস্থা বলতে কড়াই নামিয়ে নেওয়া অতিরিক্ত শাকসেদ্ধ করা জলটুকু ছাড়া আর কিছু ছিল না। দারিদ্রের কারণে অপুষ্ট মায়ের থেকে জন্ম নেওয়া অপুষ্ট ছেলের অন্নপ্রাশনে পোলাওয়ের ভাবনা বড়ই ছন্দহীন। তবু বাবা একবার মিন মিন করে বলেছিল, "তুমি আগে সেরে ওঠো তো, তারপর দেখা যাবে"। বলবার কথা হয়তো আরো ছিল মায়ের, কিন্তু অমন দূর্বল শরীরে কতক্ষণ আর কথা চালিয়ে যাওয়া যায়! মা তাই চুপ করে ছিল। সেই সুযোগে বাবা বলল, "প্রমোশনের খবরটা নেহাত সঙ্গে সঙ্গেই এলো বলেই তো! সবাই বলল এই ছেলে হওয়াটা নাকি আমাদের সৌভাগ্যের সূচনা। এক এক করে সব বাধা নাকি কেটে যাবে এবার। তা সত্যিই তো, তোমাকে আর ছেলেকে যে ফিরিয়ে আনতে পারব, সে কথা কি তখন ভাবতে পেরেছি। নেহাত পাশে কয়েকজন এসে দাঁড়াল, তাই। তারা ধার দিল বলেই চিকিৎসাটা চালিয়ে যেতে পারলাম। প্রমোশন হয়েছে, মাইনে তো বাড়বে কিছুটা। কিছু টাকা এরিয়ারও পাওয়া যাবে, সব মিলিয়ে ধার সব শোধ করে ফেলা যাবে আস্তে আস্তে। ছেলের জন্যে ভাগ্য ফিরল, তার অন্নপ্রাশনে একটু কিছু না করলে বা তখন যারা উপকার করল তাদের না বললে কি ভাল দেখায়?"
ব্যবস্থা সেই মতই হয়েছিল। মা সেরে উঠেছিল। সেই সাথে একটু একটু করে আমিও। বাবা বলল, "দেখো, ভিয়েন বসানোর ক্ষমতা তো নেই, ঠাকুর চাকর এনেও পোষাতে পারব না। ভরসা একমাত্র তুমি। রান্নার বই একটা কিনে আনছি, তুমি যদি একটু পড়ে পড়ে শিখে নাও তাহলে সবদিক বাঁচে"। মা বলল, "লাগবে না, মনে আছে। বেনারসে মাসীমার কাছে যখন ছিলাম তখন দেখেছি করতে। প্রায়ই তো লোকজন আসত, খাওয়া দাওয়া হত, সেসব এলাহী ব্যবস্থা। তখন পোলাও রান্নাও হত। আমি আর দিদি হাতে হাতে এগিয়ে দিতাম রান্নার সময়। তাই জানি। পারব। দিদি সাথে থাকলে আর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু পিতলের বড় একটা হাড়ি লাগবে যে!" বাবা বলল, পিতলের হাড়ি? সে তো অনেক দাম! তারপর নিজেই বলল, তা হোক। কত বড় হাড়ি? মা হাতের মাপে দেখিয়ে বলেছিল, "এই এত বড়"। বাসনপত্র ভাড়া করার চল তখনো শুরু হয়নি তেমন। তা ছাড়া সংস্কারের ব্যাপারও ছিল। বাসনে আগে কী রান্না হয়েছিল তা জানা না থাকলে সে বাসন ব্যবহারের উপযোগী নয়। সুতরাং নগদে কেনাই একমাত্র উপায়। হিসেব করে দেখা হল, নগদে হাড়ি কেনার পরেও বাড়িতে রান্নার ব্যবস্থা করাতেই সাশ্রয়। তাই এই হাড়ি।
সখ মেটাতে পেরেছিল বাবা, পাতে পাতে পোলাও পরিবেশন করা গিয়েছিল। নতুন হাড়িতে রান্না হয়েছিল পোলাও। মস্ত সে হাড়ি, নামাতে ওঠাতে লোক লেগেছিল দুজন, মা আর মাসী। গরীবগুর্বো আত্মীয় পরিজনেরা, অনেকেই যারা জীবনে প্রথম স্বাদ পেয়েছিল পোলাওয়ের, ধন্য ধন্য করেছিল তারা। যারা স্বাদ জানত পোলাওয়ের, তারাও বাহবা দিয়েছিল সকলে। কতবার শুনতে হয়েছে সেসব গল্প, মা'র কাছ থেকে, মাসীর কাছ থেকে, বাবার কাছ থেকে, যেন তা বলবার মতো একটা পারিবারিক ঐতিহ্য। কিন্তু সেসব গল্পে পোলাও এবং পোলাওয়ের স্বাদের কথাই ছিল প্রধানত, পিতলের হাড়ি ক্বচিৎ সুযোগ পেয়েছিল আসার। পোলাওয়ের স্বাদ পাওয়া সম্ভব হয়নি আমার পক্ষে, কিন্তু হাড়িটা আমি দেখেছি। দেখেছি বটে, কিন্তু সে ঐতিহ্যের সাথে বা পোলাওয়ের গল্পের সাথে সম্বন্ধ জুড়ে দেখতে পাইনি। প্রাত্যহিক ব্যবহারের হাড়ির থেকে পৃথক করে চেনার জন্য ওটাকে বলা হত 'ডেগ'।
অমন একটা দামী পাত্রের পক্ষে তা যেন একটা হীন পরিচয়। কাপড়চোপর যেগুলো ময়লা হতো বেশী, সেগুলো কাচার জন্য ঐ ডেগে সাবান-জলে সেদ্ধ করে নেওয়া হত। লেপের ওয়াড়, বিছানার চাদর, মাথার বালিশের তেলচিটে ওয়াড় কেচে পরিষ্কার করার জন্য এছাড়া কোনো উপায় ছিল না। রাতে রান্না হয়ে যাওয়ার পর উনুনের অবশিষ্ট আগুনে হাড়ি চাপানো হত। তার মধ্যে জল আর গোলা সাবানের কুচির মধ্যে ডোবানো কাপড়চোপর। ধোঁয়া উঠত, আর হাতপাখার ডাঁটি দিয়ে হাড়ির ভেতর কাপডগুলো ঠাসতো মা। আগুন যতক্ষণ থাকত ততক্ষণ সেদ্ধ হতো, আর আমি বড় হতে হতে ভাই বোন আরো এসেছে, ডেগের ব্যবহার ক্রমশ আরো বেশী নিয়মিত হয়ে পড়েছে। ক্রমশ তার রং গেছে পাল্টে, আর জমা হওয়া সাবানের আস্তরণের নীচে চিরতরে ঢাকা পড়ে গেছে তার উজ্জ্বল ইতিহাস। গল্পের পিতলের হাড়ির ছবি মনের মধ্যে একভাবে ছিল, আর চোখে দেখা কাপড় সেদ্ধ করার ডেগ আরেক ভাবে। কোনোদিন অবশ্য শোক হয়নি সেই অবমূল্যায়নের জন্য। বলা বাহুল্য যে পোলাও রেঁধে লোককে খাওয়ানোর সখ আর কখনো হয়নি বাবার। একের পর এক সন্তান আসার কারণে মায়ের মনে বা শরীরে সে শক্তি আর নেই যে পোলাও রান্না করার কথা ভাবতে পারবে। তাই অত দামের পিতলের হাড়িটাকে পড়ে পড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে তার রূপান্তর ঘটানো হয়েছিল ডেগে।
আরো একটু বড় হলাম যখন সবাই, তখন কাপড় কাচার ঐ পদ্ধতি অচল হয়ে পড়ল। সংসার একটু সচ্ছল হয়েছে বলে সেই গোল গোল বল সাবানগুলো বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিল। সার্ফ জাতীয় গুঁড়ো সাবানের চমৎকারিত্বে বাড়ির সবাই তখন মুগ্ধ। পরবর্তীতে যার যার পরিধেয় নিজে নিজে কেচে নেওয়ার দায়িত্ব স্থির হল। বড় রকমের কাচাকুচির জন্য মাসকাবারি ধোপার ব্যবস্থা। সেই ফাঁকে কখন যে কোথায় গিয়ে মুখ লুকালো সেই পিতলের হাড়ি থেকে রূপান্তরিত হওয়া ডেগ, তা কেউ টের পেল না। টের পেলে হয়তো চাল রাখার জন্য ব্যবহার করা যেত কিছুদিন। সে সুযোগ ফসকে যাওয়ার জন্য অবশ্য শোক করতে হয়নি কাউকে। ব্যপারটা অনেকটা রাঙা পিসিমা'র মৃত্যুর মতন। সম্পর্ক একটু দূরের বটে, কিন্তু একসময় বড় কাছের ছিলেন। বুকের মধ্যে জাপটে ধরে ভালবাসতেন, যখন এখানে ছিলেন। তারপর কী হতে কী হলো তা আর জানি না, খোঁজ খবরও বিশেষ একটা পাওয়া যেত না। তারপর একসময় একদমই না। শেষে খবর একদিন এলো, অন্য কোনো সূত্র থেকে। বলা বাহুল্য, তা তার মৃত্যুসংবাদ। শোকে ভেঙে পড়ার কথা ছিল, কিন্তু কিচ্ছু হল না। যেদিন খবর পেলাম, তার তিনবছর আগে গত হয়েছেন তিনি। সংবাদ না পাওয়ার কারণে শোকহীন তিনটে বছর কাটিয়ে দিতে পারলে, তারপর সংবাদ পেলেও শোক আর ফিরে পাওয়া যায় না। যে যায় সে যেমন চিরদিনের মতন চলে যায়, তার সাথেই চিরদিনের মতন চলে যায় তাকে হারাবার শোক। সেই পিতলের হাড়ি ব্যাপারেও তেমনটাই হয়েছিল।
তারপর দিন কেটে গেছে অনেক। সবাই বড় হয়েছে। যাদের বিয়ে হয়ে চলে যাওয়ার কথা, তারা চলে গেছে। যার বিয়ে করে ঘরে থাকার কথা সে তাই করেছে। সংসারের চেহারা এখন অন্যরকম। যারা ছিল তারা সকলে নেই, যারা ছিল না তারা এসেছে। ইতোমধ্যে বাড়ি পাল্টেছে কয়েকবার, সুতরাং শিফটিংয়ের টানাটানিতে অনেক জিনিস হারিয়েছে, অনেক জিনিস ভেঙে চুড়ে নষ্ট হয়েছে এবং আরো অনেক কিছু বাতিল করতে হয়েছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও। নইলে খাটের পায়ার তলায় ঠেকনা দেওয়ার থান ইটটাও ফেলতে তো মন চায় না। তবু বহু কিছু থেকেও গেছে, কুবের রাজার মতন যার খবর জানি না। পিতলের হাড়িটা মনের মধ্য থেকেও হারিয়ে গিয়েছিল সেইভাবে।
হঠাৎ একদিন তা হাতে এসে পড়ল, লফটের উপরে ডাঁই হয়ে থাকা পুরনো জিনিস ঘাটতে ঘাটতে। ধুলি ধুসরিত একটা হাড়ি, তার ভেতরে তোবড়ানো কয়েকটা এলুমিনিয়ামের বাটি, ভাঙা সাঁড়াশির ডাঁটি, পুরনো ঘি'য়ের শিশি, চশমার খাপ, এমনি আরো কত কিছু। দেখে কিছু মনে করতে পারছিলাম না এমন ধুলোটে রঙের এত বড় একটা হাড়ি কোথা থেকে এলো। এর ব্যবহারের ইতিহাস কিছু মনে পড়ল না, বাতিল হওয়ার কারণ বোধগম্য হল না। নামিয়ে এনে মা'র কাছে নিয়ে গেলাম। মা এখন চোখে দেখে কম, হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে বলল, "এতো সেই ডেগটা"। জিজ্ঞেস করলাম, "কোনটা? কী হত এটাতে?"। মা বলল, "কেন মনে নেই সেদ্ধ কাচা হতো? ময়লা কাপড় সাবান-জলে সেদ্ধ করা হতো। তোর অন্নপ্রাশনে পোলাও হয়েছিল এই হাড়িতে"।
--- পিতলের হাড়ি? ধুস, এটা পিতলের নাকি? হাত দিয়ে দেখেই বুঝে নিলে কেমন করে যে এটা পিতল?
--- হাড়ির কাঁধায় হাত দিয়ে বুঝাতে পারলাম। এলুমিনিয়ামের হাড়ির বাঁক এমন হয় না। এমনটা পিতলের হাড়িতেই হয়, অনেকখানি বেশী গোল ভাব থাকে।
হাতে নাতে প্রমাণ পাওয়ার জন্য ছুরি দিয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় অনেকক্ষণ ধরে গায়ের জোরে ঘষতে লাগলাম। কী আশ্চর্য! আবছা পিতলের রং বেরিয়ে এলো। 'ইউরেকা' বলে চিৎকার করে উঠলাম। তারপর কয়েকদিন লাগল হাড়ির গা থেকে আস্তরণ তুলে ফেলতে। কখনো অ্যাসিডের ব্যবহার, কখনো অন্য কোনো কেমিক্যাল, কখনো সিরিশ কাগজ আর সব চেয়ে বেশী করে জিদ আর সেন্টিমেন্ট, সব মিলিয়ে কার্যোদ্ধার হল ঠিকই, কিন্তু তা আশানুরূপ নয়। কখনই তাকে নতুন বলে মনে হল না দেখে, কিছুতেই সে চেহারা ফেরানো গেল না। কোনো কোনো জায়গায় কেমিক্যাল বা অ্যাসিডের বেহিসাবী প্রয়োগ বা অন্য আর কোনো কারণে চামাটি ওঠার মতন উপরতল থেকে উঠে গেছে। কোনো কোনো জায়গায় অমোচনীয় দাগ রয়ে গেছে। তবু ঠিক করলাম এই হাড়িতেই হবে আবার পোলাও রান্না, অন্তত আর একবার। সেবার মায়ের হাতের পোলাও সবাই খেয়েছে কিন্তু আমার খাওয়া হয়নি। মা'কে গিয়ে বললাম, "মা, আমার সৌভাগ্যটা একবার দেখেছ? তুমি এখনো আছ, এখনো 'মা' বলে ডাকতে পারি। তারপর দেখো, তুমি যে হাড়িতে পোলাও রেঁধেছিলে, সে হাড়ি হারিয়ে যাওয়ার পরও আবার ফিরে এলো। ইঙ্গিতটা বুঝতে পারছ তো? তখন আমিই মুখ্য ছিলাম, অথচ এই হাড়িতে রাঁধা সেই পোলাও আমার খাওয়া হয়নি। এবার খাব, খেতেই হবে, সেই জন্যই হাড়িটা ফিরে এসেছে"। বার্ধক্য পীড়িত গলায় মা বলল, "না, খেয়েছিস তুই। তোর মুখে আগে ছুঁইয়ে নিয়েছিল তোর বাবা, তারপর পরিবেশন করা হয়েছিল অন্যদের"। আমি বললাম, "ওটা কোনো কথার মত কথা নয়। এবার ব্যবস্থা করতে হবে সচেতন অবস্থায় খাওয়ার। তোমায় রান্না করতে হবে। আমি যে তোমার কুপুত্তুর, তা তো জানই। আমি নিজে তোমায় ধরে ধরে নিয়ে যাব রান্নাঘরে, সারাক্ষণ ধরে থাকব, তুমি বলে বলে যাবে কখন কী করতে হবে। সেই ভাবে রাঁধা হবে পোলাও এই হাড়িতে"। মা হাসল, বলল, ঐ হাড়িতে রান্না হয় নাকি আর, ওতে কাপড় কাচা হতো। বললাম, না, তবু হবে।
সে জবরদস্তি সইল না। হাড়ির ভিতর ফুটো আবিষ্কৃত হল। বাতিল হয়ে গেল পোলাও রান্নার কর্মসূচ। ব্রাসো দিয়ে পালিশ করে এবং কয়েকটা জায়গায় রং দিয়ে নকশা করে তার মধ্যেশ মাটি ঢেলে গাছ লাগানো হল গৃহসজ্জার উপযুক্ত করে। তারপর তাও আর রাখা হল না। একদিন হাড়ির আকারের একটা বড় টব কিনে বাড়ি ঢুকলাম বিষণ্ণ মুখ। মা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে তোর? মুখ অমন শুকনো কেন?" মা'র ঘরে তখন সবাই এসে জুটেছে এক এক করে। সকলের একই প্রশ্ন, "আবার টব কেন?" বললাম, "ঐ পিতলের হাড়ির গাছ এই টবে থাকবে। পিতলের হাড়িটা কাউকে দিয়ে দেব"।
--- কেন? কী হয়েছে?
--- একটা খারাপ খবর পেলাম আজকে, মা। তাই ঠিক করলাম ঐ পিতলের হাড়িটা আর রাখব না। তাই টব কিনে আনলাম। কী হয়েছে, জানো মা, একজন প্রবেশনার ডি এস পি র সাথে দেখা হল। কথা হচ্ছিল পুলিশ ট্রেনিং কলেজের নানা ব্যাপার নিয়ে। কথায় কথায় একসময় সে বলল আমাদের চেনা একটা ঘোড়ার কথা। বেশ মনে আছে, ধপধপে সাদা, কতখানি উঁচু, রেকাব-এ পা দিয়েও উঠতে অসুবিধা হত। নাম ছিল চৈতক। একবার উঠে বসতে পারলে আর নামতে ইচ্ছে করত না। এইড দিতে যদি ভুল হয় তো হোক, শুধু মুখে বলতে হবে, "চৈতক, ক্যান্টার কিংবা গ্যালপ"। ব্যাস্, পাগলের মতন দৌড়াতে থাকবে তখন। কী তার স্পিড, কী তার ছন্দ, ভাবলে এখনো যেন কেমন একটা তরঙ্গ ছুটতে থাকে সারা শরীরে। একবার কী হল, পাগলের মত ছুটছে চৈতক, হঠাৎ বাম দিকের স্টিরাপের ফিতে গেল ছিঁড়ে। ভারসাম্য হারিয়ে বাম দিকে ঝুলে গেছে শরীর, ওদিকে ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটছে চৈতক। ভয়ংকর একটা বিপদ হতে যাচ্ছে বুঝে ডান পা কোনোমতে রেকাব থেকে ছাড়িয়ে ঐ ঝুলন্ত অবস্থাতেই চৈতকের গায়ে ধাক্কা মেরে বাম দিকে আছড়ে পড়লাম। ছুটন্ত ঘোড়ার পিছনের পায়ের আঘাত থেকে বাঁচলাম। চৈতক ছুটতে ছুটতে স্টেবলে গিয়ে থামল।
--- তা হলটা কী?
--- ছেলেটা বলল, চৈতক আর নেই। মারা গেছে। মারা গেছে মানে মেরে ফেলা হয়েছে, কপালে রিভলভার ঠেকিয়ে গুলি করে।
--- কেন?
--- অমনই হয়। জানতাম, কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম। যে ঘোড়াগুলোর ইতিহাস এত ভালো, সেগুলোকে এইরকম মেরে ফেলা হয় যখন তারা আর আগের মতন দৌড়তে পারে না।
--- কেন?
--- ঐ ঘোড়াগুলো যে ওদের বড় আদরের জিনিস, বড় ভালবাসার জিনিস। ওরা সইতে পারবে না ওদের মর্যাদা হারিয়ে বেঁচে থাকা, ওদের অথর্ব হয়ে কষ্ট পাওয়া, কষ্ট পেতে পেতে মরা। তাই সেই খারাপ দিনটা ওরা আসতে দেয় না ওদের জীবনে। যখন ওরা বুঝল চৈতক আর চৈতক হয়ে থাকতে পারবে না, তখন তাকে অমর্যাদা থেকে বাঁচাবার জন্য মেরে ফেলল।
--- সেই জন্যে মন খারাপ তোর?
---হ্যাঁ। মন খারাপ হল পিতলের হাড়িটার কথা ভেবে। আমার অন্নপ্রাশনে পোলাও রাঁধা হয়েছিল ঐ হাড়িতে, আমার অন্নপ্রাশনের কথা ভেবেই ওটা কেনা। ঐটাই ওর যথার্থ মর্যাদার জায়গা। আর যখন সেই মর্যাদায় ওর স্থান হবার নয়, তখন চোখের সামনে ওর এই অমর্যাদা আর হতে দেওয়া যায় না। ওটা পোলাও রাঁধার হাড়ি। তা যখন আর ওটা হতে পারল না, তখন ওটা দূর হয়ে যাক চোখের সামনে থেকে। তাই মাটির টব কিনে আনলাম গাছটাকে হাড়ি থেকে তুলে এনে এই টবে বসাব বলে। পিতলের হাড়িটা ফেলে দেব বা কেউ চাইলে দিয়ে দেব, চোখের সামনে আর রাখব না।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন