কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাজেশ গঙ্গোপাধ্যায়

 

                                                                সমকালীন ছোটগল্প

 

রাধামাধব! রাধামাধব!

এক আকাশ তারার নীচে এক নিস্তব্ধ চা বাগানের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে একটি শীতল রাত। সম্পর্কের অবতলেও কবোষ্ণতা নেই যতটা থাকার। আশিকবাড়ি টি এস্টেটের এই বিরাট প্রপার্টির মালিক পিটার দত্ত ও তাঁর স্ত্রী পামেলার মনে বিন্দুমাত্র সুখ নেই। কারণ তাঁদের একমাত্র ছেলে, বাইশ বছরের জড়বুদ্ধিসম্পন্ন নীল। একমাত্র ছেলের এমন না মরে বেঁচে থাকাকে চোখের সামনে রোজ দেখতে দেখতে দিনযাপন করতে হয় যে বাবা-মাকে, তাঁদের কি আর সুখ বলে কিছু থাকতে পারে? থাকা সম্ভব? এ তো কোন রোগ নয়, এ এক সাংঘাতিক দৈহিক অভাব, যা জন্মগত। গর্ভবতী অবস্থায় পামেলা একদিন অসাবধানতাবশত পা ফসকে পড়ে গিয়েছিল। ভয়ে কাউকে বলেনি। ঈশ্বরের কাছে রোজ প্রার্থনা করেছে। অথচ ঈশ্বরও…

নীলকে এক ঝলক দেখলে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় নেই যে ওর বুদ্ধি, প্রবৃত্তি, অনুভূতি নিথর, নিস্পন্দ হয়ে গেছে কোন এক প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারে। চেতনার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে গিয়ে হারিয়ে গেছে উদ্দেশ্য বিধেয় সব। উজ্জ্বল গাত্রবর্ণে একমাথা কালো চুল, অপূর্ব টানা দুটি চোখের সুঠাম যুবকটিকে দেখলে মনে হয়, যেন এক দেবদূত এই পৃথিবীতে পৌঁছতে গিয়ে স্বর্গের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে…আর এগোতে পারেনি। পিছিয়েও যায়নি। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঠায় লক্ষ্য করলে বুঝতে পারা যায় টুকটুকে লাল নীচের ঠোঁটটা ঝুলে গিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে, যার ওপর ওর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। মাথাটাও আস্তে আস্তে বেঁকে যাচ্ছে। হেলে পড়ছে গোটা শরীরটাই। ঘোর একটা অস্বাভাবিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিমেষে। কিন্তু মালতী চোখের নিমেষে রুমাল দিয়ে পরিষ্কার করে দেয় নীলের লালামাখানো ঠোঁট। মাথাটা সোজা করে বসিয়ে দেয় সুস্থ মানুষের মত। প্রায় স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টায় কোন খামতি রাখেনা নীলের আয়া, বছর পঁচিশের যুবতী, বৈষ্ণবী মালতী।

বাগানের কর্মচারীদের প্রায় সবাইকেই পিটার মনে রাখতে পারে। সকালের কর্মমুখর বাগানে এক চক্কর দিয়েই ও চট করে বুঝে যায় আজ কে কে আসেনি। সেদিন হঠাৎ দেখা গেল সামা নেই। দুএকজনকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল ওর ছেলের শরীর খারাপ। তাই আসতে পারেনি। এটা এক স্বাভাবিক ঘটনা হতেই পারত। কিন্তু একজন অক্ষম সন্তানের পিতা পিটারের কাছে এই সংবাদ কোথায় যেন বাজল। নিজের জীপ বের করে খুঁজে খুঁজে সামা যে বস্তিতে থাকে, ঠিক সেখানে গিয়ে হাজির হল। খুপরি ঘরটায় একমাত্র অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে সামার নিজেরই থাকার জায়গা নেই, সেখানে মালিককে কোথায় বসতে দেবে ভেবে যখন অস্থির হয়ে উঠেছে, পিটার বললেন, “চিন্তা করিস না। তোর ছেলে ভালো হয়ে যাবে।“ এই বলে পিটার বেশ কিছু টাকা দিলেন সামার হাতে। কৃতজ্ঞতা জানাতেও ভুলে গেল বিস্মিত সামা। ফেরার পথে পিটার ডাক্তারকে বলে দিয়ে এল ছেলেটার চিকিৎসার জন্য যা করার দ্রুত ব্যবস্থা করতে।

জীপটা যখন পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে ফিরে আসছে, তখন হঠাৎ মেঘ করে এল আকাশে। অদূরে কুয়াশায় ঢাকা পাইন বনের আরোহে তাকিয়ে পিটারের মনের ভেতরটা কেন যে হু হু করে উঠল। পরশু নীলের তেইশতম জন্মদিন। হে ঈশ্বর, সামার ছেলেটাকে সারিয়ে দিয়ো, আর এই পুণ্যের ছোঁয়া যেন আমার ছেলেটাকে ছুঁয়ে দেয়। পরক্ষণেই তাঁর মনে হল, ছি ছি, আমি দানের বিনিময়ে পুণ্য চাইছি! পিটারের দু চোখ ঝাপসা হয়ে উঠল, “তুমি তো জানোই প্রভু, আমার মনের অবস্থা। কি ভাবতে কি ভেবেছি। সামার ছেলে ও নীল দুজনেই যেন ভালো থাকে।“ এইসময় মেঘ পরিষ্কার হয়ে আবার ম্রিয়মাণ রোদ্দুরের রশ্মিপাতে আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ। পিটারের জীপ যখন বাংলোর সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে, ব্যালকনি থেকে পামেলা দেখতে পেয়ে ভেতরে গেল।

“একটা কথা বলব, সাহেব?” রামশরণ সামনে এসে দাঁড়ালো।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রামশরণের দিকে তাকিয়ে পিটার খবরের কাগজটা রেখে দিল টেবিলে।

“বলছিলাম, সাহেব, নীলের জন্য একজন ছেলে আয়া রাখা যায়না?”

যেন এইরকম আশ্চর্য কথা কোনদিন শোনেন নি, এভাবে চোখ বড় বড় করে পিটার বলে উঠল, “হঠাৎ একথা বলছিস?”

“না…মানে…কেমন যেন মনে হয় একেকসময়। মালতি একটু বেশীবেশীই যত্নআত্তি করে না ওকে?“

“এতে দোষের কি আছে? আমরাও তো এটাই চাই।“

“আমি ঠিক কি বলতে চাইছি, হয়ত বুঝতে পারছেন না, সাহেব।“

“না, পারছি না। আর তোর এত চিন্তা করার আছেটাই বা কি?”

রামশরণ বুঝে গেল, ওর উদ্দেশ্য সফল হলনা। ও আর কিছু না বলে ঘাঁড় গুজে চলে গেল আস্তে আস্তে। কিন্তু পিটারের মনের ভেতর একটা দোলাচল রেখে দিয়ে গেল।

“আচ্ছা, মালতী নীলকে ঠিকঠাক দেখাশোনা করে তো?” পামেলাকে জিজ্ঞেস করা প্রশ্নের ভেতর অবাক করে দেওয়ার গুঁড়োগুলো উড়তে উড়তে ছেয়ে ফেলল চতুর্দিক।

“কেন তুমি জানোনা? আমরা বাবা-মা হয়েও কি এত যত্ন করতে পারতাম আমাদের সন্তানের?” উত্তরের আদলে পামেলার প্রশ্নটা যেন ঠকাস করে এসে পড়ল ওদের দুজনের মাঝখানে। পিটার ইচ্ছে করেই রামশরণের কথাটা তুলল না, কারণ পামেলা এই লোকটাকে মোটে পছন্দ করে না।

পিটারের মাথা থেকে কিন্তু রামশরণের কথাটা মুছল না। নিজের মধ্যেই একে গোপন রেখে হাঁটতে হাঁটতে নীলের ঘরের দিকে যখন এগিয়ে যাচ্ছে, পেছনদিকে দাঁড়ানো পামেলার ভ্রূদুটো কুঁচকে গেছে, ও দেখতে পেলনা। কিন্তু কি মনে করে পিটার ওই ঘরের দিকে তাকালোও না। সোজা স্টোররুমের দিকে চলে গেল গাড়ি মেরামতির কিছু যন্ত্রপাতির খোঁজে। পামেলাও ড্রয়িং রুমের দিকে চলে গেল। ফেরার সময় পিটারের কৌতূহলী চোখ ঘরের দিকে ঘুরে গেলই। দেখল নীল আলুথালু হয়ে শুয়ে আছে। আর মালতী ওর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছে চেয়ারে। ওর হাতে জপমালার একটা একটা করে তুলসী-দানাগুলো আঙুলের টানে সরতে সরতে যাচ্ছে। মালতী আরাধনার একান্তেও নেইলের দিক থেকে দৃষ্টি সরায়নি একবারের জন্যও। আর রামশরণ কিনা এই মেয়েটারই নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন তুলল! কিন্তু কেন?

এগিয়ে আসা মালতীর দিকে গভীর তাকিয়ে থাকা রামশরণের কুটিল দৃষ্টিতে কি ছিল? মালতী ঝাঁঝিয়ে উঠল, “কিছু বলবি?”

“নাঃ কি আর বলব?”

মালতী চলেই যাচ্ছিল, রামশরণ ভেতর থেকে গুবগুবিয়ে ওঠা একটা হাসি চেপে বলে উঠল, “তা তোর রাধামাধব কেমন আছে?”

মালতীর বুঝতে অসুবিধে হলনা, এই জিজ্ঞাসার ধরণে একটা নোংরা তামাশা লুকিয়ে আছে। ও বলতে চাইল, “তোর জানার কি দরকার?” কিন্তু বলল, “ভালো।“

“হুঃ! আধমরার আবার ভালো আর খারাপ!”

“একদম বাজে কথা বলবি না রামু।“

“বাব্বা! ওই মাংসের ডেলাটার জন্য যে দরদ উথলে উঠছে তোর! আর কত রঙ্গ দেখব দুনিয়ায়!”

“কে দেখতে বলেছে তোকে? চোখ বুজে থাকনা, আপদ।“ মালতী রেগে দ্রুত চলে যেতে পা বাড়ালো। শুনতে পেল রামশরণ খ্যা খ্যা করে একটা গা জ্বালানো হাসি হেসে উঠল। ওর একেকসময় ইচ্ছে হয় সাহেবকে বা মেমসাহেবকে বলেই দেয় রামুর এইসব অসভ্যতামির কথা। কিন্তু কিছুই বলতে পারেনা। ও জানে ওর দিকে রামুর বাঁকা নজর বহুদিনের।

পিটার যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। মালতী গান গাইছে না! এ গানের কথা সবটা বুঝতে না পারলেও ভাবের চলন থেকে পিটারের বুঝতে একটুও অসুবিধে হলনা যে এই গীত ঈশ্বরকে নিবেদনকারী। ব্যালাডের মত সুরটা একটা কান্নারেখা ধরে চলেছে যেন। পিটার তন্ময় হয়ে খেয়ালই করেনি কখন পামেলাও এসে চুপ করে দাঁড়িয়েছে ওর পাশে।

“কী অপূর্ব গায় না মেয়েটা?“

পিটার মাথা নেড়ে সমর্থন জানালো এবং ওরা অবাক হয়ে দেখল পেছনে এবং দুপাশে বালিশে হেলান দিয়ে বিছানায় নীলকে সোজা করে বসিয়েছে মালতী। নীলের মুখ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে না। আপাতভাবে দেখে মনে হচ্ছে দু চোখে এক সম্মোহিত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকা নীল যেন সেই গানের সুরে ভেসে চলেছে…আর তার মাঝিটি যেন সওয়ারীকে ভাসিয়ে নিয়ে চলার অনির্ব্বচনীয় আনন্দে বিভোর। মগ্নতার এ দৃশ্যের কোন তুলনা হয়না। পামেলা পিটারকে আলতো করে স্পর্শ করল। দুজনে দুজনের ভিজে ওঠা দু চোখের দিকে তাকিয়ে কোন কথা বলতে পারল না।

দিনের কাজ শেষ করে সবাই মিলে জড়ো হয়েছে অফিসঘরের সামনে আজ বেতন পাওয়ার দিনএদিন কিছুটা আগেই কাজ শেষ করে ফেলে সবাই, বেশ খুশীর একটা আবহে মজে থাকেআজ দোকানে ধার মেটানো হবে কেনাকাটা হবে হাত খুলে মদের দোকানেও ভিড় হবে রামশরণকে দেখা গেল ভিড়ের মধ্যেও এই চা বাগানের কর্মী নয় কিন্তু এলাকায় মোটামুটি প্রভাব আছে বলে, জোর করে সবার থেকে খাতির আদায় করে নেয় কেউই পছন্দ করেনা ওকে কারণ নানাধরণের ঘোঁট পাকাবার ওস্তাদ লোক ও পিটার বোঝে সবই, কিন্তু ইনফর্মার হিসেবে রামশরণদের মত লোকদের হাতে না রাখলেও চলেনা যে

এটা কেমন হল, মাঞ্জারবাবু?” মংলুর কর্কশ জিজ্ঞাসায় ম্যানেজার বাবু হিসেব থামিয়ে বিরক্তিতে মুখ তুলে তাকালেন

কি হল আবার?”

সামা কেন পুরো মাসের বেতন পাবে? ওর তো দুদিন ছুটি ছিল

এর কৈফিয়ত কি তোকে দিতে হবে? তোকে যে নাচাচ্ছে, তাকে বলে দিস, একদিন তোরও এইরকম ছুটি হতে পারে, সেদিন ছুটির পয়সা পেলে কি ফেরত দিয়ে যাবি?

মংলুর বেলুন চুপসে গেল রামশরণ চকিতে সরে যেতে গিয়েও ম্যানেজারবাবুর শ্যেনদৃষ্টিতে ঠিক ধরা পড়ে গেল তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “বিষের চেয়েও বিষাক্ত শয়তান একটা!

সেদিন বিকেলবেলা ম্যানেজারবাবু পিটারকে বললেন, “সাহেব, এবার রামুকে যদি হাল্কা করে টাইট না দেওয়া যায়, তাহলে আমাদের বিপদ কিন্তু আরো বাড়বে

পিটার শুনলেন সব কিছু বললেন না মনে পড়ল পামেলাও কোন এক অজ্ঞাত কারণে রামশরণের নাম শুনলেই বিরক্ত হয়।

“আজ বাড়ি যাওয়ার পথে একবার ধানুয়া তামাংকে দেখা করতে বলে যাবেন তো।“ সাহেবের আদেশে এবং চোখের ইশারায় ম্যানেজারবাবু ক্রূর হেসে ঘাড় হেলিয়ে দিলেন।

“আপ নে বুলায়া সাহেব?“ ধানুয়ার চোখ দুটো লাল। পিটারের হয়ে এর আগেও অনেক কাজই করেছে ও।

নতুন কাজের বরাত পেয়ে যখন খুশী মনে ফিরে যাচ্ছে, ধানুয়ার পকেটে এক তাড়া নোট।

রামশরণ চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল, “তুই? এখানে?”

ধানুয়া কোন উত্তর দিলনা, ঝোলা থেকে ওর হেঁসোটা বেরিয়ে সোজা রামশরণের গলা লক্ষ্য করে...ছটফট করতে করতে যখন রামশরণের দেহটা নিথর হয়ে আসছে, ঠিক তখন একটা গুলির মোক্ষম শব্দ শুনতে পাওয়া গেল। ধানুয়া মাথার পেছনে বুলেটটা নিয়ে উল্টে পড়ল রামশরণের কাছাকাছিই। আগ্নেয়াস্ত্রটা মৃত রামশরণের হাতে গুঁজে দিল সেই কালো চাদর ঢাকা মূর্তি। তারপর আস্তে আস্তে ঘটনাস্থল থেকে চলে গেল। তখন সন্ধ্যে ঘন হয়ে আসছে। তার হাঁটার ধরণটা...

মালতী এই দুর্ঘটনার কথা শুনে যে আলতো খুশীই হল, সূক্ষ্ম হলেও এটা পিটারের অভিজ্ঞ চোখ এড়ালো না।

ডাক্তার সেনগুপ্ত চুপ করে বসে আছেন। কি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। নেইলের মধ্যে যে একটা মৃদু পরিবর্তন আসছে, তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন। এতদিনের অভিজ্ঞতায় এর কোন ব্যাখ্যা নেই তাঁর কাছে। পিটারকে একথা বললেও তো বিশ্বাস করবেন না মনে হয়। তবে এর পেছনে যে মালতীর গভীর ভূমিকা রয়েছে, ডাক্তার সেনগুপ্ত বিলক্ষণ জানেন। মেয়েটা বড় আন্তরিকভাবে সেবা করে নীলের। পড়াশোনা জানেনা, কিন্তু এভাবে ডাক্তারের নির্দেশ নিখুঁতভাবে মেনে চলতে পিটার পামেলাও পারতেন কিনা সন্দেহ। তবুও এটা নীলের বাবা মাকে বলা যাবেনা। তিনি মালতীকে একটু আড়ালে ডাকলেন।

“তোর জন্যই নীল একটু একটু করে সেরে উঠছে, তুই বুঝিস সেটা?”

মালতী হাত জোড় করে নমস্কারের ভঙ্গীতে কপালে ঠেকিয়ে বলে উঠল, “রাধামাধব! রাধামাধব!”

ডাক্তার সেনগুপ্ত হেসে বললেন, “তোর ঈশ্বর সাধনার রূপেই হয়ত অরূপের সন্ধান মিলছে রে।“

“এতসব জানি না গো ডাক্তারবাবু। তবে এটা বুঝি ছোট সাহেবের মধ্যে আমি যেন তাঁকেই খুঁজে পাই। তাঁরই সেবা করি। কথা বলতে পারেনা, কিছু বোঝাতেও পারে না, তবুও আমার ওকে বুঝতে এতটুকু অসুবিধে হয়না গো। আমাকেও ও দিব্য বোঝে”।

ডাক্তার সেনগুপ্ত আর কিছু বলতে পারলেন না। এক গভীর অনুভবের রেখার ওপর দিয়ে সন্তর্পণে চলতে থাকা এই মোহিত চলন যেন শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে পারে, এই শুভকামনা রাখলেন মনে মনে।

পামেলা সেদিন কি ডাক্তার সেনগুপ্ত ও মালতীর কথোপকথন শুনতে পেয়েছিল? কে জানে! ও তো আগে মহিলা, তারপর মা। একটা সন্দেহ যে ওরও কোনদিন ছিলনা, তা নয়। যদিও পিটার জিজ্ঞেস করলে ও সেই সন্দেহ উড়িয়ে দিত। কিন্তু কড়া নজর রাখত মালতীর ওপরে। ডাক্তার সেনগুপ্তর গভীর পর্যবেক্ষণ পামেলার চোখে ধরা পড়েছিল আগেই। এতে তো ওর আনন্দ হওয়ারই কথা। অথচ হল ঠিক তার বিপরীত। আর পামেলার এই মনে হওয়া, মনে হওয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়া আশ্চর্যভাবে মালতীর কাছেও গোপন রইল না।

সদ্য কেনা হুইল চেয়ারটায় নীলকে বসিয়ে মালতী বাংলোর উঠোনে রোজ সকালে ও বিকেলে ওকে অল্প ঘুরিয়ে আনে। কেমন যেন মনে হয় নীলের আনন্দ হচ্ছে। অথচ সেই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হতে পারছে না দেখে, এক তুমুল স্ফুরণ আসন্ন বিস্ফোরণের আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছে। মালতীর মনে হত নীল ওর সাথে কথা বলতে চায়, বলেও। দুজনের মানসতরঙ্গে যে স্তিমিত হিল্লোল ওঠে, তার সংক্রমণ কাউকে বোঝাতে পারার নয়। নাহলে গভীর রাত্রে নীলকে বিশেষভাবে স্পর্শ করে মালতী কোন অতীন্দ্রিয় ভাবের আদানপ্রদান করে। নিজের যৌবনের আঁচ কত লুব্ধ হায়নার নাগাল  থেকে কষ্ট করে দূরে রেখেও স্থবির এই দেহকে সেই ওম স্বেচ্ছায় পোহাতে দিতে চায় কেন? ডাক্তারবাবুকে ও বলতে পারেনি, কোন উপশমে ও নীলকে জাগিয়ে তুলতে চায়। ধীরে, অত্যন্ত ধীরে এই জেগে ওঠার প্রহর পালনে টিঁকিয়ে রাখতে চায় আকাঙ্ক্ষার সলতেটাকে। শুধু মেমসাহেবকে ওর ভয় করে। এমনভাবে তাকায়, তাকিয়েই থাকে মাঝেমাঝে, যেন সব গোপন কৌশল বুঝে ফেলবে। মালতী জিজ্ঞেস করে, “কিছু বলবেন মেমসাহেব?”

পামেলা কিছু বলেনা। নেইলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, দুচোখ দিয়ে টপটপ করে ঝরে পড়ে হতাশার ধারা। তারপর মালতীকে বলে, “নীল কি কোনদিনও ভালো হয়ে উঠবে?”

“চেষ্টা করতে ক্ষতি কি মেমসাহেব? ঈশ্বর আছেন। তিনিই তো এই যন্ত্রণা দিয়েছেন, মনে করলে তিনিই আবার ফিরিয়ে নেবেন। আমরা হাল ছাড়ব কেন?“

“মালতীকে ছাড়িয়ে দাও। অন্য কোন আয়ার খোঁজ কর।“ পামেলার কথায় চমকে উঠে পিটার হুইস্কির অবশিষ্টাংশটুকু গলায় ঢেলে স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন। মনে পড়ে গেল রামশরণের কথা। জিজ্ঞেস করলেন, “হঠাৎ!”

“এক কাজ বেশীদিন ধরে করলে তার ওপর মায়া জন্মে যায় না? এরপর ওর কি হবে?”

পিটারের কাছে এ জিজ্ঞাসার কোন উত্তর নেই। নিয়তির কী আশ্চর্য খেলা, জল আনতে যাওয়ার সময় মালতীর কানে পামেলার কথার এই অংশটুকু ঠিক প্রবেশ করল। বাঁধভাঙা কান্নায় কেঁপে উঠতে উঠতে মালতী দেখল নীল ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। যেন জানতে চাইছে সেই অকপট কান্নার কারণ। মালতী ওর বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। পামেলা পিটারের ঘরে অনেকক্ষণ আগেই আলো নিভে গেছে। রাতের স্বাভাবিক শৈত্য জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দিতে চাইছে সব অবসন্ন, ক্লান্তির চোখগুলোকে। অথচ মালতী ও নীলের গায়ে এক টুকরো কাপড় নেই। মিলনের পূর্ণতা নয়, মিলনের অঙ্গাঙ্গী ইচ্ছের কাছে হার মেনে গেল বাস্তব...দুটি দেহ একাকার হতে আর কি প্রয়োজন?

পরদিন সকালে চতুর্দিকে একটু বেশীই কুয়াশা। এ সময় নীলকে বাইরে আনার কথা না। অথচ...হুইল চেয়ারটার হাতল মালতী আলগা হতে দিল...চাতালটা থেকে অভিকর্ষের টানে গড়িয়ে যাচ্ছে খাদের দিকে...মালতীও স্বেচ্ছায় নিজেকে সেদিকে ভাসিয়ে দিল বিড়বিড় করতে করতে – “রাধামাধব! রাধামাধব!”

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন