কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শ্রেষ্ঠা সিনহা

 

কবিতা সিংহ: পঞ্চাশের কলকাতায় একটি অনড় নারীকণ্ঠ

 

 


বাংলা কবিতার ইতিহাস পড়তে গেলে একটা প্রশ্ন প্রায়ই মনে খচখচ করে, যদিও খুব কম আলোচনাতেই সরাসরি ওঠে। পঞ্চাশের দশকের কলকাতা—কৃত্তিবাস আর শতভিষার আড্ডা, যেখানে গলার স্বর বলতে মূলত পুরুষদেরই বোঝাত। সেই জগতে একজন নারী ঠিক কীভাবে নিজের ভাষা খুঁজে পেলেন, ধরে রাখলেন, শেষমেশ প্রতিষ্ঠাও করলেন? কবিতা সিংহের নামটা মনে এলেই এই প্রশ্নটাই ফিরে ফিরে আসে। বছর পাঁচেক ধরে বাংলা আধুনিক কবিতা, বিশেষত নারী-কবিদের লেখা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, কবিতা সিংহকে নিয়ে যতটা কথা হওয়া উচিত ছিল, ততটা হয়নি। অথচ তাঁর কবিতার ভেতরে যে তীব্রতা, যে প্রতিবাদ, নারী-অস্তিত্বের যে স্বতঃস্ফূর্ত ঘোষণা, তার তুলনা বাংলা কাব্যসাহিত্যে খুব বেশি মেলে না। এই লেখায় আমি তাঁর কাব্যভাষার সুর, তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য, সমকালীন সমাজ থেকে তাঁর সরে থাকার ধরন, সমসাময়িক কবিদের সঙ্গে তাঁর তুলনা এবং আজকের দিনে তাঁকে পড়ার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করব।

জীবনের একটা রূপরেখা

কবিতা সিংহের জন্ম ১৯৩১ সালের ১৬ অক্টোবর, কলকাতার ভবানীপুরে। বাবা শৈলেন্দ্রনাথ সিংহ, মা অন্নপূর্ণা সিংহ। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে, বাবা-মায়ের সম্মতি না নিয়েই তিনি বিয়ে করেন সহপাঠী তথা গল্পকার-নাট্যকার-কবি বিমল রায়চৌধুরীকে। এটা নেহাত ব্যক্তিগত একটা ঘটনা নয়, বলা যায়, তাঁর পরবর্তী জীবন আর কবিতার সুরের একটা আগাম আভাসও এখানে লুকিয়ে ছিল। সংসারজীবন তাঁর কাছে সহজ ছিল না; জটিলতা আর কষ্ট বারবার ফিরে এসেছে। কাজের জীবন শুরু করেছিলেন অমৃতবাজার পত্রিকায় সাংবাদিকতা দিয়ে, কিছুদিন পড়িয়েছেনও, আকাশবাণীর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। মাঝবয়সে সুলতানা চৌধুরী ছদ্মনামে লিখেছেন রম্যরচনা আর গল্প। আর এই ছদ্মনামের ব্যাপারটাও নেহাত সাহিত্যিক কৌশল বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না; একজন নারী যখন নিজের পরিচয়কে দুটো সত্তায় ভাগ করে নেন, তার মধ্যে সমাজে নারীর বহুস্তরীয় অস্তিত্বেরও একটা ছায়া থেকে যায়। জীবনের শেষদিকে আমেরিকায় মেয়ে পরমেশ্বরীর কাছে ছিলেন, বোস্টনেই ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর মারা যান।

শৈশবেই তাঁর মধ্যে একটা স্বতন্ত্র মন গড়ে উঠেছিল, এটা বলা যায় নিশ্চিন্তে। মাত্র ছয়-সাত বছর বয়স থেকেই লিখতে শুরু করেন কবিতা, আর মা অন্নপূর্ণা সিংহকে কবিতা লিখতে দেখেই শেখেন ছবি আঁকা। মায়ের উৎসাহে ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত নাচও শিখেছিলেন তিনি। পরে নিজেই বলতেন, নাচ আর ছবি আঁকাই তাঁকে দিয়েছে ছন্দ, বর্ণ আর শরীরের স্বাধীন স্ফূর্তির বোধ, যা পরে তাঁর কবিতাতেও ফিরে এসেছে। বাবা-মায়ের দুই বাড়ির পরিবেশ ছিল দুই মেরুর, মামার বাড়িতে গ্রাম্য তন্ত্র-বিশ্বাসের ঘেরাটোপ, বাবার বাড়িতে আবার পশ্চিমি বিলাসিতার আড়ালে এক সংকীর্ণ মানসিকতা। ছেলেদের জন্য সেন্ট জেভিয়ার্স, মেয়েদের জন্য বেলতলা গার্লস,  এই বৈষম্যের ছবি দেখেই বড় হয়েছেন কবিতা, আর সেই ছোটবেলার অভিজ্ঞতাই হয়তো পরবর্তী জীবনের প্রতিবাদের প্রথম বীজ।

মাত্র পনেরো বছর বয়সে, ১৯৪৬ সালে, নেশন পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। এর পরের বছরই আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখেন ‘আর্ট ও নারী’ — বিজ্ঞাপনে নারীশরীরের ব্যবহার নিয়ে একটা তীক্ষ্ণ প্রবন্ধ, যা লেখার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ষোলো। অমৃতবাজার পত্রিকায় সাংবাদিকতার সময় ‘কবিতা’ ছদ্মনামে ‘অ্যাজ আই সি ইট’ নামে একটা কলাম লিখতেন প্রায় চারবছর ধরে। ষাটের দশকে আকাশবাণীতে যোগ দিয়ে পরে হয়ে ওঠেন আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের প্রথম মহিলা অধিকর্তা। রেডিওর সূত্রেই প্রথম বিদেশযাত্রা তাঁর, পূর্ব জার্মানি, আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখক-কর্মশালা, ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা ঘুরে বেড়িয়েছেন কর্মসূত্রে। এই বিচিত্র কর্মজীবনকেই কবিতা সিংহ নিজে বলতেন তাঁর “জীবনের সেরা কাল”—কারণ এই সময়টাতেই নিজেকে বারবার যাচাই করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

এই জীবনের প্রতিটা বাঁকেই একটা কথা স্পষ্ট হয়ে যায়, কবিতা সিংহ কোনো একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে বাঁধা জীবন কাটাননি। কবি-বন্ধুরা মজা করে তাঁকে ডাকতেন ‘ভার্জিনিয়া উলফ’ নামে। নিছক রসিকতা নয় এটা, বরং তাঁর মননশীলতা, স্বাধীনচেতা দৃষ্টিভঙ্গি আর নারীর ভেতরের জগৎ নিয়ে তাঁর নাছোড় খোঁজের প্রতি এক ধরনের স্বীকৃতিও বটে। লেখিকা ভাস্বতী রায়চৌধুরী তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, কবিতা সিংহ প্রায়ই ভোরবেলা একা ময়দানে হাঁটতে বেরোতেন, স্বামীর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতির সৌন্দর্য একা থাকলেই সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করা যায়। ছোট্ট এই ঘটনাটাই যেন কবিতা সিংহের গোটা জীবনদর্শনের একটা সংক্ষিপ্ত ছবি। একাকিত্বকে তিনি ভয় পাননি, বরং সেটাকেই আঁকড়ে ধরেছেন নিজের চেতনার শক্তি হিসেবে।

পঞ্চাশের দশক ও একজন ব্যতিক্রমী আবির্ভাব

বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক বাংলা কবিতায় এক উত্তাল সময়। জীবনানন্দ-পরবর্তী প্রজন্মের কবিরা তখন নতুন কাব্যভাষার খোঁজে, কৃত্তিবাস আর শতভিষা পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে একটা নতুন আন্দোলন। এই আন্দোলনের কেন্দ্রে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসুর মতো কবিরা প্রায় সবাই পুরুষ। এই পুরুষ-প্রধান সাহিত্যজগতে কবিতা সিংহ ঢোকেন স্বামী বিমল রায়চৌধুরী আর অন্যদের উৎসাহে। ১৯৪৬ সালেই তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয়। এই ঢোকাটা কিন্তু নেহাত  অংশগ্রহণ ছিল না, বরং একরকম অনুপ্রবেশ — এমন একটা জগতে ঢোকা, যেটা আসলে নারীর জন্য তৈরিই ছিল না।

অধ্যাপিকা মঞ্জুশ্রী সেন সান্যাল কবিতা সিংহকে নিয়ে লেখা এক প্রবন্ধে যে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তার মোদ্দা কথা এমন — পঞ্চাশের দশকে যখন নারীর মাধুর্য নিয়ে কবিতা লেখাটাই দস্তুর, তখন সেই মোহাচ্ছন্ন গতানুগতিকতা ভেঙে সত্যের কঠোর ভাষায় পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন কবিতা সিংহ। এখান থেকেই বোঝা যায়, তাঁর আবির্ভাব সত্যিই সেই সময়ের নিরিখে ব্যতিক্রমী ছিল। সম্ভবত তিনিই প্রথম বাংলা কবি-নারী, যিনি পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত কাব্যজগতের প্রথাগত ভাষা, বিষয়বস্তু আর দৃষ্টিভঙ্গিকে সচেতনভাবে প্রশ্ন করেছিলেন।

‘দেশ’, ‘প্রসাদ’, ‘শতভিষা’ আর ‘কৃত্তিবাস’-এর মতো প্রথিতযশা পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন, সুনামও অর্জন করেছিলেন। এখান থেকে বোঝা যায়, তিনি সেই সময়ের মূলধারার সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানের বাইরের কেউ ছিলেন ন, বরং তার ভেতরেই থেকে, তার সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করেই নিজের কণ্ঠস্বর গড়ে তুলেছিলেন। প্রতিষ্ঠানের অংশ হয়েও প্রতিষ্ঠান-বিরোধী স্বর বহন করা, এই দ্বৈততাই কবিতা সিংহের সাহিত্যিক অস্তিত্বের একটা জরুরি দিক।

কাব্যভাষা: তীব্রতা, শ্লেষ আর অস্বীকৃতি

কবিতা সিংহের কবিতায় সবচেয়ে বেশি যা কানে বাজে, তা এক ধরনের দৃঢ় প্রত্যয়ের সুর। এখানে দ্বিধা নেই, নরম আপসও নেই। ভাস্বতী রায়চৌধুরী, যিনি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন, লিখেছেন—সত্তরের দশকের শুরুতে বাংলা কবিতা লিখতে আসা তরুণদের চোখে কবিতা সিংহই ছিলেন পূর্বসূরী নারী-কবিদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল, সবচেয়ে তীব্র। এই তীব্রতা শুধু বিষয়বস্তুতে আটকে থাকেনি, ঢুকে পড়েছে ভাষার গভীরেও। তাঁর পঙক্তিতে পঙক্তিতে এক ধরনের আত্ম-অন্বেষণের প্রশ্ন জাগে, যা মিনতির মতো নয়—প্রায় ঘোষণার মতো শোনায়।

তাঁর ভাষার আরেকটা লক্ষণীয় দিক ব্যঙ্গ আর শ্লেষের ব্যবহার। প্রেম, প্রকৃতি আর সমাজ-প্রচলিত ভালোবাসার ধারণাকে তিনি অনেক সময় বিদ্রুপের ভেতর দিয়ে দেখিয়েছেন। প্রচলিত রোমান্টিক ভাষ্যকে তিনি যেভাবে ভেঙেছেন, তা প্রায় বিদ্রোহেরই নামান্তর। যখন প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা নেহাত লেনদেনে পরিণত হয়, হৃদয়ে সত্যিকারের অনুতাপ জাগে না, তখন কবিতা সিংহ সেই ফাঁকিটাকে তীক্ষ্ণ শ্লেষে জনসমক্ষে টেনে আনেন। এই ব্যঙ্গাত্মক স্বরই তাঁকে নেহাত ’অনুভূতিপ্রবণ নারী-কবি’র সীমা থেকে মুক্ত করে দেয়—তিনি হয়ে ওঠেন সমাজের একজন তীক্ষ্ণদৃষ্টি পর্যবেক্ষক ও সমালোচক।

সমালোচক প্রমিতা ভৌমিক একটা জায়গায় লিখেছেন, “কবিতা সিংহের লেখার উৎস ক্রোধ”।[১] এক কথায় এই পর্যবেক্ষণটাই যেন তাঁর গোটা কাব্যভাষার চাবিকাঠি। এই ক্রোধ কোনো অবিন্যস্ত আবেগ নয়, বরং একটা সচেতন, শাণিত শক্তি, যা তাঁর প্রতিটা পঙক্তিকে একটা দিক দেয়।

এই তীব্রতার একটা কারণ সম্ভবত তাঁর সাংবাদিক-সত্তা। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকায় বাস্তবতাকে নির্মম চোখে দেখার একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছিল, যা তাঁর কবিতাতেও ফুটে উঠেছে। কবিতা সিংহের কবিতা কখনও বিমূর্ত কল্পনায় হারিয়ে যায় না; বরং বাস্তবতার মাটিতেই দাঁড়িয়ে সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। বাস্তবতাবোধ আর কাব্যিক তীব্রতার এই মিশেলই তাঁর কণ্ঠস্বরকে আলাদা করে তোলে।

ভাষার স্তরে দেখা যায়, প্রয়োজনে চলিত আর কথ্য বাংলা ব্যবহার করতে দ্বিধা করেননি কবিতা সিংহ। কিছু কবিতায় লোকজ ছড়ার ছন্দ, কথ্য বাগ্‌ভঙ্গি, আঞ্চলিক শব্দচয়ন—এসব দেখা যায়, যা তখনকার ‘মার্জিত’ কাব্যভাষার প্রথাগত ধারণাকে প্রশ্ন করে। এই ভাষাগত সাহস তাঁর কবিতাকে এক ধরনের সজীবতা দেয়, যা অনেক সমসাময়িক কবির লেখায় দুর্লভ।

নারী-চেতনা: রূপকে না বলে মনকে হ্যাঁ বলা

কবিতা সিংহের কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর সবচেয়ে বেশি আলোচিত দিক তাঁর গভীর নারী-চেতনা। এটা শুধু বিষয়বস্তুর স্তরে আটকে নেই, বরং তাঁর গোটা জীবনদর্শনের ভিত্তি। ভাস্বতী রায়চৌধুরীর স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, নারীর রূপকে নারীর মননশীল অস্তিত্বের শত্রু বলেই মনে করতেন কবিতা সিংহ। ব্যাপারটা তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি নিজে ছিলেন অসামান্য সুন্দরী, তবু সচেতনভাবে রূপকে অস্বীকার করেছেন—কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, নারীর রূপ যে দরজার দিকে টেনে নিয়ে যায়, তা তার চেতনাদীপ্ত অস্তিত্বের বিরোধী। এই উপলব্ধি থেকেই নিজের সাজপোশাকের প্রতি একধরনের উদাসীনতা ছিল তাঁর, যা তাঁকে দেখতে আসা মানুষদের প্রায়ই অবাক করত।

এখানে একটা কথা বলার আছে—কবিতা সিংহ নিজেকে ‘মহিলা কবি’ বলে পরিচয় দিতে চাইতেন না। এই প্রত্যাখ্যানকে ওপর-ওপর দেখলে মনে হতে পারে তিনি বুঝি নিজের নারী-অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছেন। কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এটা আসলে একটা রাজনৈতিক অবস্থান—তিনি চাননি তাঁর কবিসত্তাকে ‘নারী’ বিশেষণ জুড়ে গৌণ বা আলাদা একটা খোপে ফেলে দেওয়া হোক, যেখানে ‘কবি’ শব্দটা অজান্তেই পুরুষ-কেন্দ্রিক থেকে যায় আর নারীর লেখাকে ধরা হয় ব্যতিক্রম বা উপবিভাগ হিসেবে। অথচ তাঁর কবিতার প্রতি স্তরে নারী-অস্তিত্ব এতটাই স্পষ্ট যে সমসাময়িকরা মনে করতেন, এ লেখা কোনো পুরুষ কবির পক্ষে সম্ভবই ছিল না। এখানে একটা আপাত-বিরোধাভাসই কাজ করে—পরিচয়ের রাজনীতিকে না বলেও অভিজ্ঞতার সত্যতাকে ধরে রাখা।

তাঁর কবিতায় নারীর সৃষ্টিশীলতা আর মননশীলতাকে সমাজের অস্বীকার করার প্রবণতার প্রতি একটা গভীর ক্ষোভ ধরা পড়ে। নারীর রূপ ছাড়া অন্য কোনো ক্ষমতাকে স্বীকার করতে না চাওয়া—এই মানসিকতাকে বারবার ধিক্কার জানিয়েছেন তিনি। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন আবেগ নয়, বরং তাঁর কাব্যদর্শনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। আধুনিক সমালোচকরা তাই তাঁকে বাংলা সাহিত্যে নারীবাদী রচনার অন্যতম স্রষ্টা এবং নারী মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎদের একজন হিসেবেই দেখেন।

একাকীত্ব, অন্ধকার আর সচেতন নিঃসঙ্গতা 

কবিতা সিংহের কবিতার আরেকটা স্থায়ী সুর একাকিত্ব আর অন্ধকারের প্রতি এক গভীর টান। এই দুটো বিষয় তাঁর কাছে যেন প্রিয়ই। এই একাকিত্ব কোনো নিষ্ক্রিয় বিষণ্ণতা নয়, বরং এক চেতনাদীপ্ত অনুভূতি, যা কেবল একাকিত্বকেই আশ্রয় করতে পারে। তাঁর সমগ্র কবিতার তলায় বয়ে চলে সচেতন নারীর নিঃসঙ্গতা—শিল্পীর অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একাকিত্ব, যা শিল্পী-নারীর ক্ষেত্রে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

এই একাকিত্বকে বুঝতে হলে বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে তাঁকে রাখাটা জরুরি। এমিলি ডিকিনসনের নির্জন জীবন, আনা আখমাতোভার রুশ কবিতায় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতার একসঙ্গে থাকা, স্যাফোর প্রাচীন গ্রিক কবিতায় নারী-আবেগের একান্ত প্রকাশ—এসবের সঙ্গে কবিতা সিংহের একাকিত্ববোধের একটা আত্মিক যোগ খুঁজে পাওয়া যায়। এই তুলনাটা নেহাত সাজসজ্জা নয়; বরং এটা দেখায়, সৃষ্টিশীল নারীর নিঃসঙ্গতা কোনো একটা সংস্কৃতির একার ঘটনা নয়, বরং পিতৃতান্ত্রিক সমাজে সৃষ্টিশীল নারীর একটা সাধারণ, বিশ্বজোড়া অভিজ্ঞতা।

কবিতা সিংহের ব্যক্তিগত জীবনেও এই একাকিত্বের টানের প্রমাণ মেলে। ভোরবেলা একা ময়দানে হাঁটতে যাওয়ার ঘটনাটা এখানে আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে—তিনি বিশ্বাস করতেন প্রকৃতির সৌন্দর্য একাই সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করা যায়। এটা কোনো খামখেয়াল নয়, বরং তাঁর কাব্যদর্শনেরই একটা জীবন্ত প্রতিফলন—একাকিত্বকে তিনি দুর্বলতা নয়, শক্তি বলে দেখেছেন।

প্রকৃতি, বৃক্ষ আর আত্ম-অন্বেষণ

কবিতা সিংহের কবিতায় প্রকৃতি নেহাত সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ নয়, বরং আত্ম-অন্বেষণের একটা মাধ্যম। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর বৃক্ষ-কেন্দ্রিক কবিতাগুলো, যেখানে গাছের মধ্যে তিনি একধরনের সত্তা খুঁজে বেড়িয়েছেন। বৃক্ষ তাঁর কাছে বারবার ফিরে আসা এক প্রত্যয়ের প্রতীক—গাছের স্থিরতা, শিকড়ের গভীরতা, নিরন্তর বেড়ে ওঠা—এসবের মধ্যে যেন নিজের অস্তিত্বের একটা রূপক খুঁজে পান তিনি। বৃক্ষ থেকে শেখা যায় ভেতরে-বাইরে বাঁচার এক সামগ্রিক পাঠ—মনোময়, অঙ্গময়, প্রাণময়। এই প্রতীকী নির্মাণ কবিতা সিংহকে নেহাত সামাজিক প্রতিবাদী কবির গণ্ডিতে আটকে রাখে না, বরং একটা গভীর দার্শনিক মাত্রাও যোগ করে দেয়।

প্রেম আর প্রকৃতিকে একসূত্রে গাঁথার কাজেও কবিতা সিংহের দক্ষতা চোখে পড়ার মতো। সাংবাদিক-নারী হিসেবে নারীর রহস্যকে কবিতার আকারে তুলে ধরার একটা অনন্য উদাহরণ পাওয়া যায় তাঁর প্রেম-বিষয়ক কবিতায়। সেখানে প্রকৃতির চিত্রকল্প নারীর ভেতরের আবেগের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে প্রকৃতি আর নারী-অস্তিত্ব প্রায় একাকার হয়ে ওঠে।

যৌনতা, সৃষ্টি আর উত্তরাধিকারের কথা

স্ত্রী-পুরুষ সম্পর্কের গভীর জৈবিক ও আধ্যাত্মিক দ্বন্দ্বও কবিতা সিংহের কবিতায় উঠে এসেছে বেশ সাহসী ভঙ্গিতে। জীবনের ওঠাপড়াকে তিনি একই মুদ্রার দুই পিঠ হিসেবে দেখেছেন, আলো আর অন্ধকারকে একই সৃজনের অংশ বলে ধরেছেন। এই ধরনের রচনায় তিনি নিজেকে দেখিয়েছেন সেই সৃষ্টির প্রথম সাক্ষী হিসেবে, যিনি জীবনের দ্বৈততাকে প্রথম উপলব্ধি করেছেন। এই আধ্যাত্মিক-দার্শনিক গভীরতাই তাঁর কবিতাকে নেহাত সামাজিক প্রতিবাদের স্তর থেকে তুলে নিয়ে যায় একটা বড় অস্তিত্ববাদী জিজ্ঞাসার দিকে।

মাতৃত্ব আর উত্তরাধিকারের প্রশ্নেও কবিতা সিংহের দৃষ্টিভঙ্গি প্রথাগত ধারণা থেকে আলাদা। কন্যাকে উদ্দেশ্য করে লেখা একটা কবিতায় তিনি বলেছেন, নিজের সব অর্জিত জ্ঞান, সব সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ফেলে দেওয়ার কথা—যাতে আগামী প্রজন্ম নিজের মতো করে নতুন করে সব গড়ে নিতে পারে। এখানে উত্তরাধিকার মানে জিনিসপত্র বা প্রথার হস্তান্তর নয়, বরং একধরনের মুক্তির আশীর্বাদ—মায়ের অভিজ্ঞতার বোঝা কন্যার কাঁধে না চাপিয়ে তাকে নিজের পথ নিজে তৈরি করার স্বাধীনতা দেওয়া। পঞ্চাশ-ষাটের দশকের প্রেক্ষাপটে এই দৃষ্টিভঙ্গি সত্যিই বেশ এগিয়ে থাকা এক নারীবাদী চিন্তা।

জীবনের শেষপর্বেও কবিতা সিংহের সৃষ্টিশীলতা কমেনি; মৃত্যু আর নিয়তি নিয়েও তিনি লিখে গেছেন অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে। জীবনের শেষ অন্ধকারকে ভয় না পেয়ে বরং তার গভীরে ডুব দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি, যা তাঁর কবিসত্তার একটা অসাধারণ দৃঢ়তার প্রমাণ।

সমকালীন সমাজ থেকে ভিন্ন অবস্থান

এখন প্রশ্ন হল, ঠিক কীভাবে কবিতা সিংহের অবস্থান তাঁর সমকালীন সমাজ থেকে আলাদা হয়ে উঠেছিল? এটা বুঝতে হলে আগে দেখতে হবে পঞ্চাশ-ষাটের দশকের বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজে নারীর অবস্থান ঠিক কেমন ছিল। সে সমাজে নারীর ভূমিকা মূলত গৃহকেন্দ্রিক বলেই ধরে নেওয়া হত; শিক্ষিত নারীরাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে থাকতেন সহায়ক বা প্রান্তিক ভূমিকায়। নারীর কবিতা লেখা মানেই ধরে নেওয়া হত সেটা হবে কোমল, ভাবালুতাপূর্ণ, গার্হস্থ্য জীবনকেন্দ্রিক, প্রেম-বিরহের গণ্ডিতে বাঁধা। কবিতা সিংহ এই ধারণাটাকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছিলেন।

প্রথমত, নারীর রূপ-নির্ভর মূল্যায়নকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি—সমাজ যেখানে নারীকে মূলত দেহ আর সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে বিচার করত, সেখানে তিনি সচেতনভাবে সেই মাপকাঠি অস্বীকার করে মননশীলতাকে কেন্দ্রে বসিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা—ভোরে একা হাঁটতে যাওয়া হোক বা কাজের জায়গা বেছে নেওয়া—কখনও সমাজের প্রথাগত প্রত্যাশার কাছে বিসর্জন দেননি তিনি। তৃতীয়ত, তাঁর কাব্যভাষার যে তীব্রতা আর ব্যঙ্গ, তা তখনকার ‘ভদ্র’ মহিলা-কবি ভাবমূর্তির একেবারে উল্টো। সমাজ যেখানে নারীর কণ্ঠস্বর বিনয়ী আর অনুগত হবে বলে ধরে নিত, সেখানে কবিতা সিংহের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল প্রশ্নবিদ্ধকারী, দ্রোহী, কখনো কখনো উদ্ধতও।

আরেকটা জরুরি দিক—কবিতা সিংহ নিজেকে কখনও ভুক্তভোগী বা করুণার পাত্র হিসেবে দেখাননি। সে সময়ের অনেক নারী-লেখকের রচনায় নিপীড়নের বর্ণনা এক ধরনের আত্মকরুণার সুরে ধরা দিত, কিন্তু কবিতা সিংহের কবিতায় সেই সুর নেই। বরং সেখানে একধরনের আত্মপ্রত্যয়, গভীর আত্মমর্যাদাবোধ ধরা পড়ে, যা তাঁকে ভুক্তভোগীর জায়গা থেকে সরিয়ে বসিয়ে দেয় একটা প্রতিস্পর্ধী কণ্ঠস্বরের আসনে। উইকিপিডিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী-নিবন্ধেও উল্লেখ আছে, তাঁর চিন্তা-চেতনা আর জীবনদর্শন সমকাল থেকে বহুদূর এগিয়ে ছিল, আর সমাজের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে তিনি নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।

সাহিত্য-পত্রিকা কালি ও কলমে প্রকাশিত এক স্মৃতিচারণায় বলা হয়েছে, আজকের নারীবাদীদের তুলনায় কবিতা সিংহকে অনেক বেশি পথ হাঁটতে হয়েছিল—তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে যোজন-যোজন এগিয়ে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী যখন কেবল পণ্য বা কামনার বিষয় বলে গণ্য হত, তখন কবিতা সিংহ সেই কাঠামোর বিরুদ্ধে নিজের কলমকেই অস্ত্র বানিয়েছিলেন। এটা নেহাত তত্ত্বকথা ছিল না—তাঁর পারিবারিক জীবন আর কর্মজীবন, দুই জায়গাতেই এই অবস্থানের ছাপ পড়েছিল প্রতিদিনের বাস্তবতায়।

সমকালীন কবিদের সঙ্গে তুলনা

কবিতা সিংহকে তাঁর সমসাময়িকদের পাশে রেখে দেখলে তাঁর স্বাতন্ত্র্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কৃত্তিবাস-গোষ্ঠীর প্রধান কবিরা—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু—মূলত পুরুষের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতা, প্রেম আর দ্রোহকে ঘিরে লিখেছেন। তাঁদের কবিতায় নারী প্রায়ই থেকে গেছে বিষয় হয়ে—প্রেমিকা, মিউজ, আকাঙ্ক্ষার বস্তু। এই কাঠামোয় নারীর নিজের কণ্ঠস্বর, নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে জগৎ দেখার চেষ্টা তুলনামূলকভাবে বিরল। কবিতা সিংহ এই কাঠামোটাই উল্টে দিয়েছিলেন—তাঁর কবিতায় নারী আর বিষয় থাকেনি, হয়ে উঠেছে কর্তা; দেখা হওয়ার বস্তু নয়, দেখার সক্রিয় দৃষ্টিকোণ।

সমসাময়িক নারী-কবিদের সঙ্গে তুলনা করলেও কবিতা সিংহের একটা আলাদা জায়গা স্পষ্ট হয়। নবনীতা দেবসেন, যিনি নিজেও পরে একজন উজ্জ্বল কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন, কবিতা সিংহকে বর্ণনা করেছিলেন ‘দীপশিখার মতো উজ্জ্বল’ নারী বলে—এই উপমা থেকেই বোঝা যায়, সমসাময়িক নারী-কবিদের কাছেও তিনি ছিলেন একরকম অগ্রণী দৃষ্টান্ত, প্রায় পথপ্রদর্শকের মতো। দেবারতি মিত্র বা রাজলক্ষ্মী দেবীর মতো কবিদের সঙ্গেও একটা আত্মিক নৈকট্য খুঁজে পাওয়া যায় কবিতা সিংহের, বিশেষত নিঃসঙ্গতাবোধের প্রশ্নে—যা সৃষ্টিশীল নারীর জীবনের একটা সাধারণ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। তবু পার্থক্য আছে—রাজলক্ষ্মী দেবীর কবিতায় যেখানে অন্তর্মুখী, আত্মকেন্দ্রিক একটা ধ্যানের সুর প্রধান, কবিতা সিংহের কবিতায় সেই আত্মমগ্নতার পাশাপাশি একটা বহির্মুখী, সমাজের দিকে তাকানো প্রতিবাদী স্বরও সমান জোরালো।

এই তুলনার আলোচনায় বিশ্বসাহিত্যের প্রসঙ্গও এড়ানো যায় না। কবিতা সিংহের সমসাময়িকরা তাঁকে তুলনা করেছেন স্যাফো, এমিলি ডিকিনসন আর আনা আখমাতোভার সঙ্গে—এই তুলনা নেহাত প্রশংসাসূচক কথার কথা নয়, বরং একটা গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য-তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণকেই নির্দেশ করে। মেয়েদের লেখা কবিতা পড়লেই বোঝা যায় সেটা মেয়েদের কবিতা—এই কথাটাই তাঁর সমসাময়িকরা তুলে ধরেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন যে নারীর অভিজ্ঞতা থেকে জন্মানো কবিতার একটা নিজস্ব সংবেদনশীলতা আছে, যা পুরুষ-কবির পক্ষে নকল করা সম্ভব নয়। বাংলা কাব্যভাষায় এই স্বাতন্ত্র্যকে প্রথম সার্থকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কবিতা সিংহ, এমনটাই মনে করেন অনেক সমালোচক।

তবে এই তুলনার মধ্যেও কবিতা সিংহের একটা নিজস্বতা থেকে যায়, যা তাঁকে নেহাত পাশ্চাত্য নারী-কবিদের বাংলা প্রতিরূপ হয়ে থাকতে দেয় না। এমিলি ডিকিনসনের একাকিত্ব ছিল প্রায় সন্ন্যাসিনীর মতো—বাইরের জগৎ থেকে স্বেচ্ছায় দূরে সরে থাকার ফল। কবিতা সিংহের একাকিত্ব কিন্তু সক্রিয় জীবনযাপনের ভেতর থেকেই অর্জিত—তিনি সাংবাদিকতা করেছেন, সংসার করেছেন, সন্তান মানুষ করেছেন, সমাজের ভেতরে থেকেই কাজ করেছেন, তবু ভেতরে ভেতরে ধরে রেখেছেন একটা গভীর নিঃসঙ্গতাবোধ। সামাজিক সক্রিয়তা আর আত্মিক নিঃসঙ্গতার এই সহাবস্থানই কবিতা সিংহকে দেয় একটা আলাদা বাঙালি-নারীবাদী মাত্রা, যা শুধু পাশ্চাত্য মডেল দিয়ে বোঝানো যায় না।

উপেক্ষা আর স্বীকৃতির প্রশ্ন

কবিতা সিংহের সাহিত্যিক জীবনের একটা বেদনার দিক হল, জীবদ্দশায় তিনি প্রাপ্য মর্যাদা পাননি। আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি ছিলেন একজন পথিকৃৎ কবি-নারী, তা সত্ত্বেও সমকালীন সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান তাঁকে ঠিকমতো মূল্যায়ন করেনি। এই উপেক্ষার সবচেয়ে করুণ উদাহরণ পাওয়া যায় তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশের ঘটনায়—কোনো প্রধান সংবাদপত্রে তাঁর মৃত্যুর খবর ছাপা হয়নি, অনেক পরে কিছু ছোট পত্রিকায় সেটা প্রকাশ পায়। এই ঘটনা যেন প্রতীকীভাবেই সেই গোটা সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানের মনোভাবকে তুলে ধরে, যেখানে একজন যুগান্তকারী নারী-কবির অবদানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

তবে এই উপেক্ষার মধ্যেও কিছু স্বীকৃতি তিনি পেয়েছিলেন—লীলা পুরস্কার, মতিলাল পুরস্কার আর ভুবালকা পুরস্কারের মতো সম্মাননা এসেছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদানের জন্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আছে ‘সহজ সুন্দরী’, ‘কবিতা পরমেশ্বরী’, ‘হরিণাবৈরী’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘সোনারূপার কাঠি’, ‘মোমের তাজমহল’, ‘বিমল হাওয়ার হাত ধরে’। এ ছাড়া ‘ইদানিং’, ‘সপ্তদশ অশ্বারোহী’ আর ‘সত্তরের কবিতা সংকলন’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংকলনও তিনি সম্পাদনা করেছেন, যা দেখায় সমকালীন কাব্য-আন্দোলন গড়ে তোলার কাজেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

আংশিক স্বীকৃতি আর ব্যাপক উপেক্ষার এই মিশ্র ছবিটা একটা জরুরি প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেয় আমাদের—সাহিত্যের ইতিহাস কীভাবে লেখা হয়, আর কাদের কণ্ঠস্বর সেই ইতিহাসে জায়গা পায়? কবিতা সিংহের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিভা আর অবদান থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে লিঙ্গ-বৈষম্য কীভাবে কাজ করে। এটা শুধু কবিতা সিংহের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার একটা কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিতও বহন করে এটা।

আজকের সময়ে কবিতা সিংহ

একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে কবিতা সিংহকে আমরা কীভাবে পড়ব, তাঁর প্রাসঙ্গিকতা ঠিক কোথায়? প্রথম কথা, গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী আর ভারতীয় প্রেক্ষাপটেও নারী অধিকার, লিঙ্গ-সমতা আর যৌন হয়রানি-বিরোধী আন্দোলন যেভাবে সামনে এসেছে, তার আলোয় কবিতা সিংহের কবিতা নতুন একটা তাৎপর্য পায়। সত্তর বছর আগে তিনি যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন—নারীর শরীর ঘিরে সমাজের আবেশ, নারীর মননশীলতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার অধিকার—সেগুলো আজও সমান প্রাসঙ্গিক, বরং কোনো কোনো জায়গায় আগের চেয়েও জরুরি হয়ে উঠেছে।

দ্বিতীয়ত, সাহিত্যজগতে সাম্প্রতিক সময়ে বিস্মৃত বা উপেক্ষিত নারী-লেখকদের নতুন করে খোঁজার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। রোববার, জ্বলদর্চি, কালি ও কলমের মতো সাহিত্য-পত্রিকা আর ওয়েবজিন নিয়মিত কবিতা সিংহকে নিয়ে স্মৃতিচারণা আর পুনর্মূল্যায়নমূলক লেখা প্রকাশ করছে, যা বলে দেয় নতুন প্রজন্মের পাঠক-গবেষকরা তাঁকে নতুন চোখে দেখতে আগ্রহী। এই পুনরাবিষ্কারের প্রক্রিয়া কবিতা সিংহকে সেই পথিকৃতের মর্যাদা দিতে শুরু করেছে, যা জীবদ্দশায় তিনি পাননি। প্রসাদ পত্রিকা-পরিবারের উদ্যোগে চালু হওয়া ‘কবি কবিতা সিংহ স্মারক সম্মান’-ও এই পুনর্মূল্যায়নের একটা বাস্তব উদাহরণ, যেখানে তাঁর নামেই বর্তমান প্রজন্মের কবিদের সম্মান জানানো হচ্ছে।

তৃতীয়ত, শিক্ষা আর গবেষণার জগতেও কবিতা সিংহ ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে নারীবাদী সাহিত্য-তত্ত্বের আলোয় তাঁর লেখা পাঠ্যক্রমের অংশ হচ্ছে, বিভিন্ন গবেষণাপত্র আর পিয়ার-রিভিউড জার্নালেও তাঁকে নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা প্রকাশিত হচ্ছে। এই মনোযোগ থেকেই বোঝা যায়, কবিতা সিংহের কাব্যকৃতি শুধু ঐতিহাসিক গুরুত্বের নয়, সমসাময়িক সাহিত্য-তাত্ত্বিক আলোচনারও একটা জীবন্ত উৎস।

চতুর্থত, আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে নারীরা সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরছেন, নিজেদের শরীর আর মন নিয়ে সমাজের প্রথাগত প্রত্যাশাকে প্রশ্ন করছেন—সেখানে কবিতা সিংহের সেই মৌলিক অবস্থান, রূপের চেয়ে মনকে প্রাধান্য দেওয়া, একাকিত্বকে শক্তি হিসেবে নেওয়া, সমাজের প্রথাগত প্রত্যাশাকে অস্বীকার করা—একটা নতুন অনুরণন তৈরি করে। যেন সাত দশক আগে থেকেই তিনি সেই কথোপকথনের শুরুটা করে রেখেছিলেন, যা আজকের নারীবাদী বিমর্শের একেবারে কেন্দ্রে।

কিছু কবিতার নাম ধরে দেখা

কথাগুলো আরেকটু নির্দিষ্ট করে বলা যাক কয়েকটা কবিতার নাম ধরে। ‘অপমানের জন্য ফিরে আসি’ কবিতায় কবিতা সিংহ একটা সম্পর্কের ভেতরের নিষ্ঠুর প্যাটার্নটাকে তুলে ধরেছেন—যেখানে বার বার অপমানিত হয়েও ফিরে যাওয়ার একটা বাধ্যতা কাজ করে, আর সেই বাধ্যতাকেই তিনি নিজের ভাষায় প্রায় আত্ম-বিশ্লেষণের মতো করে খুলে দেখান। কোমল অভিযোগের বদলে এখানে একটা রুক্ষ, প্রায় নিজের প্রতি নির্মম সততা কাজ করে।

‘আছেন ঈশ্বরী’ কবিতায় তিনি কাব্য-দেবতাকে পুরুষ নয়, নারী রূপে কল্পনা করেছেন—নিষ্ঠুর, একলা, ভয়ংকর ক্ষমতাধর এক সত্তা, যাঁর হাতেই সৃষ্টি আর ধ্বংস দুটোই। কবিতাকে ঘিরে যে ঐশ্বরিক, প্রায়-পৌরাণিক একটা কল্পনা তিনি গড়ে তোলেন, তাতে নারীকেই বসিয়ে দেন সৃষ্টির কেন্দ্রে।

‘ভাঙ্গী রমণীর ক্রোধে’ কবিতাটা জাত-ব্যবস্থা আর নারীর ওপর চাপানো অপবিত্রতার ধারণার বিরুদ্ধে এক তীব্র ক্রোধের কবিতা—এক নিম্নবর্ণের নারীর ভেতরে জমে থাকা ভয় কীভাবে ক্রোধে বদলে যায়, তারই একটা তীক্ষ্ণ চিত্র এখানে আঁকা হয়েছে। ‘আজীবন পাথর-প্রতিমা’ কবিতায় আবার মায়ের কাছে বলা একটা মেয়ের স্বগতোক্তির ভেতর দিয়ে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সুর ধরা পড়ে—এখানে মেয়েটি নিজেকে সাধারণ, নরম, পশ্চাদপসরণকারী নারীর ছাঁচে ফেলতে অস্বীকার করে।

আর ‘কবিতা এবং আমি’ কবিতায় কবি নিজের সঙ্গে কবিতার সম্পর্ককেই দেখিয়েছেন এক লড়াই হিসেবে—দুই যোদ্ধার মধ্যে চলা এক সংঘাত, যেখানে হার-জিত নয়, বরং সেই লড়াইটাই আসল, লক্ষ্যভেদের মুহূর্তটাই আনন্দের।

আরও তিনটে কবিতার কথা এখানে বলা দরকার। ‘না’ কবিতায় কবিতা সিংহ মেয়েদের মোম বা নরম তুলার মতো, পুরুষের ইচ্ছেমতো গলে যাওয়া কোনো বস্তু হিসেবে দেখানোর প্রথাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন—নিজেকে তিনি কারও সৃষ্টির প্রেরণা বা আশ্রয়দাত্রী মূর্তি হিসেবে থাকতে দিতে রাজি নন। ‘ঈশ্বরকে ইভ’ কবিতায় ইভের কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন প্রথম বিদ্রোহের কথা—স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েও যে নারী প্রথম জেনেছিল মানবজীবনের আসল স্বাদ। আর ‘ভ্রূণা’ কাব্যনাটকে অজাত কন্যাশিশুর কণ্ঠস্বর দিয়ে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন কন্যাভ্রূণ হত্যার নিষ্ঠুরতা নিয়ে—অনাগত মেয়েটি নিজেই যেন মাকে অনুরোধ করছে তাকে এই “বৃথা জন্ম” না দিতে, যতক্ষণ না সমাজ তাকে প্রকৃত মর্যাদা দিতে প্রস্তুত।

এই কবিতাগুলো একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, কবিতা সিংহের কাব্যজগতে ক্রোধ, ক্ষমতা, শরীর আর সৃষ্টি—এই বিষয়গুলো কীভাবে বারবার নতুন নতুন রূপকে ফিরে ফিরে আসে।

উপসংহার

কবিতা সিংহের কবিতা পড়লে বোঝা যায়, তিনি ছিলেন এমন একজন কবি, যিনি নিজের সময়ের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে ছিলেন। তাঁর কাব্যভাষায় ফুটে ওঠে এক তীব্র, তীক্ষ্ণ, প্রশ্নবিদ্ধকারী সুর—যা রূপের প্রথাগত প্রশংসায় কখনও আটকে থাকে না, বরং মনের মুক্তি খোঁজে; যা একাকিত্ব আর অন্ধকারকে ভয় না পেয়ে তাকে সৃষ্টির উৎস বানিয়ে নেয়; যা প্রকৃতির মধ্যে খুঁজে নেয় আত্ম-অন্বেষণের পথ; আর যা সমাজের প্রথাগত প্রত্যাশাকে বারবার প্রশ্ন করে চলে। এই সমস্ত মিলিয়েই কবিতা সিংহ হয়ে ওঠেন সমকালীন সমাজ থেকে একেবারে আলাদা এক কণ্ঠস্বরের অধিকারিণী।

সমসাময়িক পুরুষ কবিদের তুলনায় তিনি নারীকে বিষয় থেকে কর্তায় বদলে দিয়েছেন; সমসাময়িক নারী কবিদের মধ্যেও তিনি ছিলেন সবচেয়ে তীব্র আর এগিয়ে থাকা কণ্ঠস্বর; আর বিশ্বসাহিত্যের নারী-কবিদের সঙ্গে তুলনায় তিনি একটা আলাদা বাঙালি সংবেদনশীলতা তৈরি করেছেন, যেখানে সামাজিক সক্রিয়তা আর আত্মিক নিঃসঙ্গতা এক জটিল ভারসাম্যে থাকে। জীবদ্দশায় প্রাপ্য স্বীকৃতি না পেলেও, আজ নতুন প্রজন্মের পাঠক, গবেষক আর সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান তাঁকে যে পথিকৃতের জায়গা দিতে শুরু করেছে, তাতে একটা কথাই প্রমাণিত হয়—সত্যিকারের সাহিত্যিক সাহস কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা নতুন করে খুঁজে পাওয়া যায়। কবিতা সিংহ তাই আজও আমাদের কাছে শুধু ইতিহাসের একটা অধ্যায় নন, বরং এক জীবন্ত কণ্ঠস্বর, যিনি বারবার মনে করিয়ে দেন—নারীর মননশীলতা, নারীর একাকিত্ব আর নারীর প্রতিবাদী চেতনা কোনো সাময়িক ব্যাপার নয়, বরং মানবিক অস্তিত্বেরই একটা চিরকালীন অন্বেষণ।

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন