কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শাহনাজ নাসরীন

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫১

 

জীবন বড় রহস্যময়

দেয়ালে লটকে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকাই। আটটা বেজে গিয়েছে। একইসাথে লটপটে ঘড়িটা আর আটটা বেজে যাওয়া আমাকে বিরক্ত করে। সাথে সাথেই মনে পড়ে আজ নির্ঘাত মোমেনা আসবে না। থইথই বৃষ্টির জল তার বাড়িতে ঢুকবেই। কথাটা মনে পড়তেই যুক্তি-বুদ্ধির সীমা ছাড়িয়ে মন বিরক্তিতে ভরে যায়। ঘরে বাইরে কোথাও কি আরাম পাবো না একটু?

কাল গিয়েছিলাম শিল্পকলায় নাটক দেখতে। অনেক অনেকদিন পর খুব আশা নিয়ে গিয়েছিলাম। মাঝে দু’বছর গেলো করোনায়, পরের দু’বছর পোস্ট করোনা ইফেক্ট। কিছুতেই স্বাভাবিকতায় ফিরতে পারছিলাম না। তাই বেশ ভালোই লাগছিল ভাবতে যে, অনেকদিন পর পুরনো মানুষদের সাথে দেখা হবে। তাদের আপনত্ব কিছুটা শুশ্রুষা দেবে নিশ্চয়ই। শিল্পকলার চেনা বাতাস আমার বিকট অবসাদ ধুয়ে দিচ্ছিল যেন।  অথচ নাটক শুরু হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ছন্দপতন। বন্ধ হয়ে গেল নাটক। পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হয়ে গেল চেনা মানুষের মধ্যেই। আমি কোন পক্ষ? কার পক্ষ? দুপক্ষেরই অনেক যুক্তি, কোনোটাই ফেলনা নয়। পক্ষ তো আমারও আছে, কিন্তু আমার বিচারে আমি যে পক্ষ সেই পক্ষের মানুষেরাও তো আমার মতো করে ভাবে না। এমনকি নিজের পক্ষের একটি দোষ বা ভুল আমি উচ্চারণ করলেই আমাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে  যাবে জেনে চুপ হয়ে যাই, মরবো নাকি কথা বলতে গিয়ে? জাস্টিস এতোটাই সোজা! সুতরাং পালিয়েই এসেছিলাম একরকম।

আকাশ কী ভয়ংকর কালো হয়ে আছে। ঘরের ভেতরে মনে হচ্ছে রাত। লাফ দিয়ে উঠে পর্দা সরাই। আলসেমি করার বিলাসিতা আমার জীবনে নেই।

সারাদিন ঝমঝম-ঝিরঝির-টিপটিপ নানারকম বৃষ্টি চললো! বিকেলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি, দেখি রংধনু উঠেছে। কোন ফাঁকে ডুবতে থাকা কমলাসুর্যের সামনে থেকে মেঘ সরে গিয়ে সামনের মাঠে কমলাআলো ছড়িয়ে পড়েছে। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি, দেখি বৃষ্টির মিহিগুঁড়ো উপেক্ষা করে দুটিমেয়ে ছোটাছুটি করে বিভিন্নরকম পোজ দিয়ে ছবি তুলছে। শাড়ি পড়েছে তারা, নিশ্চয় সাজগোজও করেছে অনেক। কেমন নায়িকা নায়িকা পোজ দিচ্ছে। হাসি পেলো, এদের বয়সে সব মেয়েই নিজেকে নায়িকা ভাবে। সুর্যের শেষ রশ্মিকে ধরে রাখার তাড়ায় তারা অনেক ছবি তুলছে ছোটাছুটি করে, কখনও নারকেল গাছের নিচে, কখনও ঝরে পড়া কাঠবাদামের পাতা কুড়িয়ে। বেশ মজা লাগছে দেখতে, তন্ময় হয়ে তাকিয়ে দেখছি  সুর্য ডুবে গেছে তবু পশ্চিমাকাশে যে লাল তার আলোয় আরও কিছুক্ষণ ছবি তোলা চলতে পারে। এমন সময় একটি মোটরবাইক থামলো, তিনটি ছেলে নামলো লাফিয়ে আর মোবাইল তাক করলো। মেয়েদুটি কিছু বললো, প্রতিবাদ করলো বোধহয়। ছেলেগুলিও কিছু বলছে। কিছু মানুষ দেখলাম গুটিগুটি জমছে। হয়তো সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথের মানুষ, হয়তো মাগরিবের নামাজে যাওয়ার জন্য কিছু মানুষ বের হয়েছে। মেয়ে দুটিকে ঘিরে এখন আর মানুষের মাথা বা পাছা ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না।

আমি সরে এলাম জানালা থেকে। জানি শেষ বিচারে একটি প্রশ্নই বিচার্য হবে যে, দুটিমেয়ে একা একা কেন বৃষ্টিবাদলার দিনে নির্জন মাঠে এসেছিল?

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন