কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মধুবন চক্রবর্তী

 

প্রবন্ধসংগীত থেকে কীর্তনের উৎপত্তি: কীর্তন শাস্ত্রীয় সংগীত

 


সংগীত অর্থে গীত, বাদ্য, নৃত্য। শিল্পকলার শ্রেষ্ঠ আঙ্গিক বলে মনে করা হয় সংগীতকে। সেই সঙ্গে সংগীতই হল শ্রেষ্ঠ শব্দ, শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য। গানের অন্তরে সেই শব্দ বিরাজ করে যা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। কবিগুরু তাই বলেছেন, 'গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি, আমি তখন তারে চিনি তখন তারে জানি...'

গান হৃদয়কে আনন্দ দান করে, শান্তি বিরাজ করে অন্তরে। বাদ্যর অন্তরেও সেই শব্দের ভাণ্ডার, যেখানে শুধুই মণিমাণিক্য, হিরে জহরত। যা জীবনচর্যাকে ছান্দিক করে, গতিময়তা দেয়। সঙ্গীত জীবনযাপনের আধারকে অনেক বেশি ছান্দিক করে তুলতে পারে। কবির ভাষায় আবার বলতে পারি,

'ওগো নদী আপন বেগে পাগলপারা...'

এর পর আসি নৃত্যর কথায়,

প্রাচীনকালে সংগীতের উপাদান বলতে সুর, স্বর, বর্ণনীয় বিষয়বস্তু, ছন্দতাল ও গায়ন ভঙ্গি, নর্তনভঙ্গি ইত্যাদি বোঝাত।

ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসের সঠিক ধারাবাহিকতা না জানা থাকলে সংগীতের বিবর্তন সম্পর্কে সত্য ধারণা করা সম্ভব নয়। প্রথমেই জানতে হবে, আদিবাসিদের সংস্কৃতি গ্রাম্য সংস্কৃতি, এবং নাগরিক সংস্কৃতির সম্পর্কে। নাগরিক সংস্কৃতির আবার উপবিভাগ রয়েছে যে রকম আদি, মধ্য, অন্ত অবস্থা, গ্রাম্য ও নাগরিকেরও তিনটি অবস্থা রয়েছে। নাগরিক সংস্কৃতি বিবর্তনের গতি অন্যান্য সংস্কৃতির তুলনায় অনেক বেশি। তুলনামূলকভাবে আদিবাসী ও গ্রামীণ সংস্কৃতির বিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটেছে।

সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে যা ধরা পড়ে। আদিবাসী গ্রামীণ সংস্কৃতিতে রূপান্তরের পূর্বে যেমন মধ্যবর্তী অবস্থা আছে। তেমন গ্রামীন থেকে নাগরিক সংস্কৃতিতে পৌঁছবার আগে সেরকম একটি অবস্থার মধ্যে দিয়ে পথ পরিক্রম করতে হয়। নাগরিক সংস্কৃতির আবার তিনটি ভেদ। প্রথমত ধর্মীয়, দ্বিতীয়তঃ রাজকীয়, তৃতীয়ত বিনোদনীয়। ধর্মীয় সংগীত ছিল মন্দিরাশ্রিত। আজও সেই একই ধারা বহমান ঈশ্বর দেবদেবীর উদ্দেশ্যের বিভিন্ন নাট্যক পদ বা নাট্য বর্ভূত পদ রচনা করে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলিতে নৃত্যসহ গাওয়া হত। রাজকীয় সংগীতগুলো তো এক পদেই হয়। যার কোন নাট্যরূপ হয় না। মধ্যযুগীয় এই জাতীয় দরবারী রাগাছৃত গানগুলিকে সাধারণত গীত বলা হয়। তবে মন্দিরে যে ধর্মীয় গানগুলি গাওয়া হত সেগুলি পদ নামে আখ্যায়িত হতো। কিন্তু মধ্যযুগের আগে এদের বলা হতো প্রবন্ধ। অর্থাৎ প্রবন্ধ গান এবং পদ গান অভিন্ন বস্তু। প্রবন্ধের প্রাচীন অবস্থাকে বলা হয় প্রকীর্ণ। বহু প্রাচীন এই গান। ইউরোপীয় ভাবধারায় সঙ্গীতজ্ঞরা এই গানকে বলতেন ক্লাসিকফোক। এই জাতীয় গানে যে সমস্ত দেশজ স্বর বা রাগ ব্যবহৃত হতো, গান্ধর্ব বা  মার্গসঙ্গীতের যুগে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্বাব্দ কালে এই শ্রেণীর রাগকে উপরাগ বলা হত। পরবর্তীকালে দেশি বা আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক সংগীতের যুগে এই রাগকে উপাঙ্গ বলা হত। প্রাচীন সংগীতশাস্ত্র অনুযায়ী, আঞ্চলিক শাস্ত্রীয় সংগীতকে বোঝায় লোকগীতি। যদিও শাস্ত্রীয় সংগীতের সিংহভাগই লোকগীতি বা নৃত্য। সূত্র (রাঢ় বাংলা এবং মুর্শিদাবাদের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সাহিত্য গ্রন্থ থেকে সূত্র নেওয়া হয়েছে)। পনের শতকের আগেই বঙ্গদেশে এবং বাংলা ভাষায় শুদ্ধসঙ্গীত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলা ভাষায় ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেও তাঁর উদাহরণ আমরা পাই। তার সাথে লোকসংগীত যথেষ্ট বিকাশ লাভ করেছিল। ভাটিয়ালি রাগে চর্যাপদেই আছে। এখন অবশ্য ভাটিয়ালি বলতে বিশেষ ধরনের লোকসংগীত বোঝায়। এই লোকসংগীত আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। সূত্র (হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি)

লোকসংগীতের থেকে উপাদান নিয়ে 'দেশি শাস্ত্রীয় সংগীত' উন্নত চিন্তা ভাবনায় বিপুল ব্যাপ্তি ঘটিয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকে পনেরো শতাব্দী পর্যন্ত গীত, আঞ্চলিক শাস্ত্রীয় সংগীত বা দেশীয় সংগীতকে 'প্রবন্ধ' বলা হত। প্রবন্ধ অর্থাৎ প্রবন্ধ সঙ্গীত। শাস্ত্রীয় রাগের আধারে এবং তালের আধারে গানগুলোকে বলা হতো গীতপ্রবন্ধ। বীণাদি তন্ত্র, বাদ্য এবং অনব্ধাদির বৈচিত্র্যময় প্রকাশকে 'বাদ্যপ্রবন্ধ' বলা হয়। শাস্ত্রীয় তালের নানান সমন্বয়কে 'তালপ্রবন্ধ' এবং এর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাহায্যে অভিনয়কে 'নৃত্যপ্রবন্ধ' বলা হয়। এখন যাকে উচ্চসংগীত বা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বলি তার পূর্বপুরুষ হল প্রবন্ধ। প্রাচীনকালে বহু প্রবন্ধের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাচীন যে গীত প্রবন্ধগুলো আছে, নিয়মের কঠোরতা শৈথিল্যের অনুসারে সেগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। সেগুলো হল---

১) বিপ্রকির্ণ, প্রাচীন বিপ্রকির্নের উত্তরসূরি প্রকীর্ণ।

২) সুর

৩) আলক্রম বা আলী সংশয়।

প্রকৃত নাম ছিল লোকগীতি। যেমন রাজস্থানের প্রাচীন লোকগীতি, বাংলার কীর্তন, রামপ্রসাদী গানের ভাল নমুনা বলা যেতে পারে। প্রকীর্ণ সংগীতের ধারায়, প্রবন্ধ দ্বারা আশ্রিত হয়ে দেশি শাস্ত্রীয় সংগীতের আধারে গঠিত হয়ে নানান পরিবর্তন আসতে থাকে সংগীতের মধ্যে। এখনও পর্যন্ত প্রবহমান এই ধারায় বিবর্তিত হয়েছে কীর্তন। ‘সংকীর্তন' শব্দের আবির্ভাব কিন্তু বৈষ্ণব আন্দোলনের ফলশ্রুতি নয়। ভারতীয় সংগীতে 'সংকীর্তন’ আগে থেকেই ছিল। শ্রীচৈতন্য সংস্কৃতির ফলশ্রুতিতে তার পুনরাবির্ভাব ঘটে। শ্রী শ্রী চৈতন্যদেব ধর্মপ্রচার করেছিলেন বাংলা ভাষায়। তাঁর ধর্মে শাস্ত্রের কথা শোনা গিয়েছিল সামান্যই। ঈশ্বরের নাম জপ করে নাম কীর্তনের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। এই নাম কীর্তন যাতে সবাই মিলে একসাথে আবেগের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে গাইতে পারেন, বা জপ করতে পারেন, সেই প্রচেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এই প্রেমের আদর্শ গোস্বামীদের হাতে শাস্ত্রের রূপ নিয়েছিল। নাম কীর্তনের মধ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল জটিল রাগ রাগিনী। আর এভাবেই ধীরে ধীরে কীর্তন একটি  বিদগ্ধ ও সুবদ্ধ সঙ্গীতের চেহারা নেয়।‌ বিশেষ করে পদাবলী কীর্তন সুবদ্ধ সংগীতের প্রবেশ ঘটলো ধীরে ধীরে। নাম সংকীর্তন থেকে তা রীতিমতো সম্পদ স্বতন্ত্র ধরার কীর্তন এ পরিণত হল যারা পদ রচনা করলেন তারাই সুর দিলেন এরকমটা ভাবার কোন কারণ নেই অথবা তারা যে সুর দিতে থাকলেন, সেটাই অবিকৃত থাকলো এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। কীর্তন উত্তর ভারতীয় বিশুদ্ধ সংগীতের রাগ রাগিনীর প্রভাবে স্বতন্ত্র হিসেবে ধীরে ধীরে পরিচিত হতে লাগল। তবে এটা ঠিক উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের যে আঙ্গিক বা লক্ষণগুলি বর্তমান, কীর্তন গানে তা ভীষণ ভাবে প্রভাবিত‌ নয়। এর সাথে মিশে গিয়েছিল রাঢ় ও মধ্যবঙ্গের লোকগীতি। শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্তরের সৌন্দর্য সেটিও প্রতিভাত হয়। একটা বিশেষ ভঙ্গিমা আছে যা বঙ্গীয়। এই ভঙ্গিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছিলেন নরোত্তম ঠাকুর। তিনি উত্তরভারত থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতে দীক্ষা নিয়েছিলেন। সুতরাং চৈতন্যদেবের প্রচারিত বাণীকে তিনি যেরকম শাস্ত্রীয় রূপ দিয়েছিলেন তেমনই প্রচলিত কীর্তনকে শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত্তির উপর স্থাপন করেছিলেন। আপনাদের আগেই বলেছিলাম কীর্তন শাস্ত্রীয় সংগীত। এর ভেতরে আভিজাত্যের সৌন্দর্য আগে থেকেই রচিত হতে থাকে। এই সংগীত রচিত হলো উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতের রাগ রাগিনী এবং তালের ওপর ভিত্তি করে। নরোত্তম ঠাকুর শাস্ত্রীয় সংগীতের আদলে যে ভঙ্গী প্রবর্তন করেছিলেন তা পরিচিত হয় গরানহাটি ঘরানা নামে। এছাড়াও যে ঘরানা গুলি রয়েছে সেগুলি হল, মনোহরশাহী, রানিহাটি মন্দারনী ও ঝাড়খন্ডি।

এবার আসি সুর বিভাগের কথায়। 'গীতিপ্রবন্ধ' পরে কঠিন সাংগীতিক নিয়ম থেকে খানিকটা শিথিল হয়ে ‘সলোগ’ সুর নামে গীতি প্রবন্ধ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সলোগ থেকে বিবর্তিত হয়ে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে ধ্রুপদের উদ্ভব হয়। কীর্তন সংস্কৃত শব্দ। বাংলা কীর্তন শব্দটির প্রচলিত রূপ হল কীর্তন+অন (ল্যুট)--- কীর্তনের আভিধানিক অর্থ যাতে কীর্তি অন করা হয়।  প্রচলিত অর্থ হল গুণকথন, স্তবন, দেবতার গুনগান, নামগানের মধ্যে দিয়ে ভক্তিপ্রকাশ। যাকে কৃষ্ণলীলা বিষয়ক সংগীতও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ কৃষ্ণের বর্ণনা করা, আবৃত্তি করা। বিশেষ করে ভারতীয় ধর্মে মূলত কীর্তন গান কোনও দেবদেবী সম্পর্কিত গুণগান করা বা গুণাবলি কাহিনী সম্বন্ধিত গান। সংস্কৃত পণ্ডিত কবি জয়দেব রচিত 'গীতগোবিন্দম' কীর্তন গানের প্রকৃত উৎস। কীর্তনের সমার্থক রূপে সংকীর্তন শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কখনও আবৃত্তি করে বলা হয় যোগ্য ক্ষেত্রে কখনও বা সংকীর্তনের মধ্যে দিয়ে। আক্ষরিক অর্থে সমষ্টিগত অবদান। অনেক সময় দেখা যায়, যাঁরা কীর্তন করছেন, তাঁদের মধ্যে প্রধান গায়ক একজন থাকেন। যিনি সূত্র ধরেন। এবং তাঁর সঙ্গে থাকেন সহশিল্পীরা। ভক্তিমূলক গানের মধ্যে দিয়ে বর্ণনা, রূপক, রসবোধ, বিদ্যা ও বিনোদনকে নান্দনিকভাবে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে এই কীর্তন গানে। আক্ষরিক অর্থে আরেকটি বিষয় বলা যায়, সেটি হল পুনরাবৃত্তি বা পুনরায় কথন। সংহিতা, ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য বৈদিক সাহিত্যের পাশাপাশি বেদাঙ্গ ও সূত্র সাহিত্যে পাওয়া যায় কীর্তনের কথা।

মনিয়ার উইলিয়ামস অনুসারে কীর্তন আসলে প্রাসঙ্গিক অর্থ উল্লেখ করে বলা', 'আবৃত্তি', 'পুনরাবৃত্তি', 'সম্পর্কিত ঘোষণা', 'যোগাযোগ উদযাপন', 'প্রশংসা গৌরবকথা'। মধ্যযুগীয় হিন্দুধর্মের ভক্তি আন্দোলন দ্বারা কীর্তন একসময়ের জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ষষ্ঠ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতীয় '' ও 'নয়না'র থেকে শুরু করে যা বিশেষ করে মধ্য উত্তর-পশ্চিম পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে পড়ে দ্বাদশ শতাব্দীর পরে। অন্যান্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থ যেমন ভগবদ্গীতাতেও পাওয়া যায় কীর্তনের কথা। যেখানে কৃষ্ণভক্তি মার্গকে মোক্ষের মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করা হয়। ভাগবত পুরাণেও কীর্তনের উল্লেখ পাওয়া যায়। তথাকথিত 'নারদীয় কীর্তন', কীর্তনকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে। যথা--- ১) নয়ন প্রার্থনা ২.পূর্বরঙ্গ পুরাতন মহাকাব্যের ওপর ভিত্তি করে আধ্যাত্মিক পাঠ ৩) জপ ৪) কথা বা আখ্যান ব্যাখ্যা। ৫) সর্বজনীন কল্যাণের জন্য 'চূড়ান্ত প্রার্থনা'।

এবার আসি বিভিন্ন ধর্মে কীর্তন কীভাবে প্রবেশ করেছে সে প্রসঙ্গে। প্রথমেই বৈষ্ণব ধর্ম। ধর্মীয় সংগীতের ধারা হিসেবে কীর্তন বৈষ্ণব ঐতিহ্যের প্রধান অংশ হয়েছে। তেরো শতাব্দীর পরে বৈষ্ণব ধর্মের কীর্তনের উপকার আবির্ভূত হয়, যে রকম নামকীর্তন দেবতাদের বিভিন্ন নাম্বার দিক প্রশংসিত হয়, এখানে দ্বিতীয়ত লীলাকীর্তন, কৃষ্ণের জীবন ও কিংবদন্তি শ্রীরাধিকা শ্রীকৃষ্ণের জীবন নিয়ে কথোপকথন।

মারাঠি ভাবকবি সাধক নামদেব আনুমানিক ১২১৭ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে বিষ্ণুর অবতার দেবতা বিঠোবার গৌরবের প্রশংসা করার জন্য গানের কীর্তন রূপ ব্যবহার করেছিলেন। এই কীর্তনগুলোকে আমরা বেশ কয়েক প্রকার ভাগ করতে পারি।

যেমন মারাঠি কীর্তন, বাংলার কীর্তন, অসমের কীর্তন, কর্নাটকের ঐতিহ্য।

মারাঠি কীর্তন--- মারাঠি কীর্তন সাধারণত এক-দু'জন প্রধান শিল্পী দ্বারা সংঘঠিত হয়। একজন কীর্তনকার থাকেন যাঁর সঙ্গে হারমোনিয়াম ও তবলা থাকে। গান, অভিনয়, মৃত্যু,গল্প বলার সঙ্গে সঙ্গে এই গানটি গীত হয়।

মহারাষ্ট্রের প্রচলিত কীর্তন কীর্তনকার দ্বারা সঞ্চালিত হয়। এতে জ্ঞানেশ্বর একনাথ

নামদেব তুকারামের মতো মহারাষ্ট্র সাধকদের কবিতাও গীত হয়। ১৭ ও ১৮ শতকের কবিরা যেমন শ্রীধর, মহিপতি, মেরোপন্ত এই ধরনের বিকাশে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। বলা যেতে পারে কীর্তনের ইতিহাসে যাঁদের নাম উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি যুগলবন্দি কীর্তনেরও যথেষ্ট প্রচলন ছিল সেই সময় থেকে।

বাংলা কীর্তন--- শতাব্দীর শুরুর দিকে চৈতন্য মহাপ্রভুর বাংলায় কিশোর কৃষ্ণভিত্তিক কীর্তনকে জনপ্রিয় করেছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হরে কৃষ্ণ মন্ত্র এবং অন্যান্য গানের মাধ্যমে যেখানে রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমকে একজনের আত্মা হিসেবে দেখা হচ্ছে বা ঈশ্বরের মধ্যে প্রেম বিলীন হয়ে যাচ্ছে, সেই গান কীর্তন রূপে প্রকাশ করা হয়। ষোড়শ শতকে বাঙালির ইতিহাসে স্বর্ণযুগ বলা হয়। সেই যুগকে চৈতন্য সংস্কৃতির যুগ বলা হয়। আসলে সেই সময়ের চেয়ে গতানুগতিকতা সেই পরম্পরা থেকে বেরিয়ে মানুষের চিন্তা মুক্তি ঘটিয়েছিলেন চৈতন্যদেব। চৈতন্য সংস্কৃতি প্লাবনে ভেসে গিয়েছিল সমাজ। ষোড়শ শতাব্দীর পর অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যের সংস্কৃতির উত্তর বাংলায় চলমান কীর্তনের রূপ হল শ্রীচৈতন্যের প্রত্যক্ষ প্রেরণা। সেই কীর্তন আর্যদের ভাষার দ্যুতিতে এবং প্রতিভার বিকাশ এবং ক্রমশ বিকশিত হয়ে ওঠে এবং পরে তা অন্যতম মার্গসংগীতে রূপান্তরিত হয়। বাংলা কীর্তনের তিনটি শ্রেণি--- প্রথমত,

নামকীর্তন

সংকীর্তন

লীলাকীর্তন

পালাকীর্তন।

নামকীর্তনের মধ্যে দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীরাধিকার অপার্থিব চরিত্র, প্রেম বাংলা এবং বাঙালির চিত্রকলা এবং বাংলাদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মনকে শ্রীচৈতন্যের নামকীর্তন রসাস্বাদনে নির্দিষ্ট করেছিল। শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার ও প্রেমলীলা খ্রিস্টীয় শতকের শুরু থেকেই প্রকৃত ও মৌলিক সাহিত্যের সংগীতের বিষয় হয়ে ওঠে।

লীলাকীর্তনেই সেই লীলা কথাই পাওয়া যায়। অর্থাৎ কৃষ্ণলীলা বা কৃষ্ণ রাধার প্রেম। ভারতবর্ষে কীর্তনের ঐতিহ্য দীর্ঘকালের শ্রীমদভাগবতে ভগবানের কথা বা মহিমা সূচক গানকে "কৃষ্ণ পূর্ণ শ্রবণ কীর্তন" বলা হয়েছে। আবার দাক্ষিণাত্যের দিকে যদি তাকান, দেখবেন সেখানে বৈষ্ণব সম্প্রদায় আলোয়ার বা আড়বার দের গুরুত্বপূর্ন অঙ্গ "কীর্তন"। মহারাষ্ট্রে ছিল বারকারি সম্প্রদায়, অসমের শংকরদেবের ধর্ম সম্প্রদায়ের সাধনমার্গের তাৎপর্যপূর্ণ অঙ্গ হল "কীর্তন"। সম্মেলক কীর্তন গানের পরম্পরা বাংলায় দীর্ঘদিনের। বৌদ্ধধর্মদ্ভুত বজ্রযান, সহজযান ধর্ম সম্প্রদায়গুলির অধ্যাত্ম সঙ্গীত 'চর্যাপদ' একক বা সম্মলিত ভাবে গাওয়া হত। বিভিন্ন ধরনের মানুষজন আধ্যাত্ম সংগীতের মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরকে ডাকতেন আসা ধাতু সঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারার নাম ছিল কীর্তন কখনো কখনো সেটা সংকীর্তন হয়ে উঠত ধর্মীয় এবং সামাজিক গান সংকীর্তন এর ভূমিকা হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।                           কৃষ্ণদাস কবিরাজ তার 'শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে' জানা যাচ্ছে সংকীর্তন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য.. চৈতন্যপূর্ব কাল থেকে বাংলায় কীর্তন এর ঐতিহ্য ছিল। যদিও শ্রীচৈতন্যকেই চরিতকাররা কীর্তন এর স্রষ্টা এবং প্রবর্তক বলেছেন। উপাসনা পদ্ধতি হিসেবে কীর্তন, সংকীর্তন এর বিশেষ রূপ, ধারা, ও গুরুত্ব চৈতন্যদেবের প্রভাবেই প্রসার লাভ করেছিল।

পূর্বেই বলেছি কীর্তনের সঙ্গে অনেকেই লোকসঙ্গীতের রস মিশেছিল ঠিকই। কিন্তু তা কীর্তনকে প্রভাবিত করেনি। কীর্তন মূলত শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশেষ অঙ্গ। নরোত্তম ঠাকুরের আগে কীর্তন এর আঙ্গিক প্রবন্ধ গান থাকলেও, পরবর্তীকালে পদাবলীতে নতুন শৈলী প্রবন্ধ গান সৃষ্টি হয়। যা আগের প্রবন্ধ গান থেকে প্রভাবিত হয় সম্পূর্ণ পৃথক রূপে। অনেকে ভাবেন কীর্তন তৈরি হয়েছে ধ্রুপদ ভেঙ্গে। কিন্তু সঙ্গীত শাস্ত্রের গবেষণা অনুযায়ী, সে ধারণা ঠিক নয় ষোড়শ শতকে উত্তর-পূর্ব ভারতে সংগীতের নতুনধারার আন্দোলনের ফলে প্রবন্ধ গান থেকে ধ্রুপদের জন্ম হয়। তেমনই বাংলায় প্রবন্ধ গান থেকে পদাবলী কীর্তন এর সৃষ্টি করেছিলেন নরোত্তম ঠাকুর। প্রবন্ধ গানে দুটি অপরিহার্য অঙ্গ একটি নিবন্ধ একটি অনিবব্ধ। অনিবব্ধ প্রবন্ধ সংগীতে বাণী ছাড়া স্বরসমুহ দিয়ে আলাপচারিতা করা হয়। প্রবন্ধ গানের অপর ভাগ নিবন্ধ গানে ব্যাবহার করা হয় সুর তাল বাণী। তার আধারে নির্মিত গীতিরূপ। পদাবলী কীর্তনের গায়নশৈলীও অনুরূপ। ঐতিহ্যবাহী কীর্তনে দেখা যায় মূল পালা গাইবার আগে আলাপ করা হচ্ছে। কীর্তন এর পরিভাষায় যাকে বলা হয় মেল জমাট। স্মরণীয় মূল পালা গাইবার আগে যে আলাপচারিতা করা হয় অথবা অপরিহার্য যে গীতিরুপ তাকে গৌরচন্দ্রিকা বলা হয়। এই গৌরচন্দ্রিকার অন্য ব্যাখ্যা বা তাৎপর্য শ্রী রাধাকৃষ্ণের অভেদ রূপ, গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদাবলী।

আপনাদের আগেই জানিয়েছি কীর্তন শাস্ত্রীয় সংগীত। এই সঙ্গীতে প্রাচীন রাগ রাগিনীর ব্যবহার লক্ষণীয়। রাগের বিবর্তনের ধারায় দেখা যায় তার জন্মলগ্ন থেকে বর্তমান পর্যন্ত রাগ নানাভাবে বিভাজিত হয়েছে। অনেকে ভুলক্রমে জাতিকেই জাতি রাগ হলে থাকেন জাতি জাতি রাখে কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা প্রাচীনকালে রাগ রাগিনীর যে লক্ষণ ছিল, সেই সমস্ত লক্ষণসমূহ তার অংশ, মন্ত্র, সন্যাস, বিন্যাস, অল্পত্ব, বহুত্ব, অপন্যাস, এসব লক্ষ্মণ ছাড়াও ষরব, ঔরব অন্তরমার্গ সহ তেরটি লক্ষণকে স্বীকার করে তালবদ্ধ গানকে জাতি গান বলা হত। নাট্যশাস্ত্রে বলা হয়েছে, আঠারোটি জাতি ছাড়া দু-চারটি রাগ বা যেগুলো গাওয়া হয়ে থাকে, সেগুলি সবই জাতি থেকে জন্মেছে। জাতি থেকে উৎপন্ন জাতির সংখ্যা কুড়িটি ছিল। শারঙ্গ দেব তাদের নামগুলি সম্পর্কে জানিয়েছিলেন শ্রীরাগ, বঙ্গাল (প্রথম) বঙ্গাল (দ্বিতীয়) ভাস, মধ্যম, ষাড়ম, রক্ত হংস প্রসব ভৈরব,‌ মেঘরাগ, সোমরাগ কামোদ প্রমুখ। প্রভৃতি রাগগুলিকে ভরতের সময়ে  জাতি রাগ বলা হলেও, পরবর্তীকালে এদের শুধুমাত্র রাগ নামে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আর এই সমস্ত রাগের বিন্যাস আমরা দেখতে পাই কীর্তনের বিন্যাস।

মূলত কীর্তন ভাব সমৃদ্ধ সঙ্গীতও বটে। বর্তমানে কীর্তন এর প্রসার ও প্রচার ততোধিক না হলেও, এখনও কীর্তনের রূপ ও আঙ্গিককে অনেকেই ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। যদিও প্রাচীনকালে যেভাবে কীর্তন কে তুলে ধরা হতো বিভিন্ন আঙ্গিকে কঠোর নিয়মের মধ্যে দিয়ে সেই নিয়ম কতটা পরিপূর্ণ আকারে অনেকে মানছেন সে বিষয়ে সন্দেহ থাকতে পারে।

প্রচলিত ধারায় অন্যমতে শ্রী রাধাকৃষ্ণের অষ্টকালীয় নিত্যলীলাই পালার আসরে গাওয়া হয়। কীর্তন শিল্পীরা বিভিন্ন কবির একই ভাবের পদ একসঙ্গে গেঁথে এক একটা পালার পর্যায় সাজিয়ে থাকে এবং অভিনয় করে থাকেন। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি শ্রীচৈতন্য নামকীর্তন ছাড়াও লীলাকীর্তন, উদ্দন্ড কীর্তন, এবং রাধা কৃষ্ণ লিলায় অভিনয় নিজে করেছিলেন। যেরকম জন্মলীলা, বাল্য লীলা, গোষ্ঠ লীলা, রাধাকুণ্ডে মিলন, সূর্যপূজা, জলক্রীড়া, পাশাখেলা, দান লীলা, বাসন্তীরাস, রাসলীলা, ঝুলন, কুঞ্জভঙ্গ, নৌকাবিলাস ইত্যাদি অভিনয় করে লীলা কীর্তন পালায় দেখানো হয়।

লীলা কীর্তন বা রস স্থানে রয়েছে চৌষট্টি কলার প্রদর্শনী একে ৬৪ রসের গান বলা হয় উজ্জ্বলনীলমণি রসশাস্ত্র গোস্বামী উজ্জ্বল রস কিভাবে ভাগ করেছেন সমূহ নায়ক-নায়িকার দর্শন আলিঙ্গন এবং স্পর্শজনিত সুখ আরম্ভ হচ্ছে নায়ক-নায়িকার মিলিত বিচ্ছেদ অবস্থায় আলিঙ্গনে না পাওয়ায় যে বিরহ বা ভাব প্রকাশ পায় তাকে বিপ্লব বলে যেমন পূর্বরাগ মান, প্রবাস, প্রেমবৈচিত্র। এগুলির আবার আটটি করে প্রকার আছে।

অনুরাগ রুপানুরাগ।

কীর্তন শুধুমাত্র শাস্ত্রীয় সংগীতের আধারে রচিত নয়। অনেক বিভাজন, অনেক বিভাজিকা, রস ও ভাবের অপার্থিব সৌন্দর্য।  আছে অভিনয়। তাই কীর্তন হল বাংলার ঐকান্তিক সম্পদ বা ঐশ্বর্য। যা  আমাদের হৃদয়ে ধারণ করা উচিত। সংগ্রহ করে রাখা উচিত সংগীতের ইতিহাসে।  যত্ন করে তাকে লালন করা উচিত। একটি বিশেষ ধারা বলে তাকে কখনোই সরিয়ে রাখা উচিত নয়।

কীর্তন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন... "কীর্তনে জীবনের রসলীলার সঙ্গে সংগীতের রসলীলা ঘনিষ্ঠভাবে সম্মিলিত। জীবনের লীলা, নদীর স্রোতের মতো নতুন নতুন বাঁকে বাঁকে বিচিত্র। ডোবা বা পুকুরের মতো ঘের দেওয়া পাড় দিয়ে বাঁধা নয়। কীর্তনে এই বিচিত্র ধারার পরিবর্তমান ক্রমিকতাকে কথায় এবং সুরে মিলিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছিল"... । রবীন্দ্রনাথের কাছে এই 'কীর্তন 'ছিল উচ্চাঙ্গের একটা জিনিস... আর সে কথা তিনি বারবার স্মরণ করেছেন। হিন্দুস্তানি গান থাকা সত্ত্বেও, বাঙালির মন প্রাণ কীর্তন জুড়ে ছিল বা বলা যেতে পারে কীর্তন গান রচনার জন্য ব্যাকুল ছিল। আর সে কথা প্রসঙ্গেও তিনি লিখছেন, "আত্মপ্রকাশের জন্য বাঙালি স্বভাবতই গানকে অত্যন্ত করে চেয়েছে। সেইজন্য সর্বসাধারণে হিন্দুস্থানী সঙ্গীত রীতির একান্ত অনুগত হতে পারেনি। কানাড়া, আড়ানা, মালকোষ, দরবারী, তোড়ীর বহুমূল্য উপকরণ থাকা সত্ত্বেও, বাঙালিকে কীর্তন সৃষ্টি করতে হলো"। অর্থাৎ তিনি কীর্তনকে স্বাধীনচেতা অথচ ঐতিহ্যপূর্ণ, আভিজাত্যময় উচ্চতর আর্ট বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত হিসেবেই দেখেছেন।

বাঙালির কীর্তন গানে সাহিত্য ও সংগীতের রস মিলে এক অপূর্ব সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়েছিল। ‌এই কীর্তনকে শুধুমাত্র ফোক মিউজিক বললেই কিন্তু হবে না। উচ্চাঙ্গের গান বা উচ্চাঙ্গ সংগীত হিসেবেই দেখতে হবে। কীর্তন গানের আঙ্গিক ছিল জটিল এবং বিচিত্র। তালের বিস্তার ব্যাপক দুরূহ,‌ কিন্তু তার পরিসর হিন্দি গানের চেয়েও বড়। তার মধ্যে যে বহু শাখায়িত নাট্যরস আছে তা হিন্দুস্তানি গানে নেই।

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন