ক্ষুধার্ত চাঁদ, সংগঠিত স্বপ্ন: সুকান্ত
ভট্টাচার্যের কাব্যভাবনা

বাংলা
কাব্যসাহিত্যে সুকান্ত ভট্টাচার্য এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত। মাত্র একুশ বছরের
সংক্ষিপ্ত জীবনে এবং মেরেকেটে ছয়-সাত বছরের রচনাকালে তিনি এমন একটি কাব্যভাষা
নির্মাণ করে গেছেন, যা রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতার ব্যক্তিসত্তা-কেন্দ্রিক
আধুনিকতাবাদী ধারাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। এত অল্প সময়ে, এত অল্প বয়সে
একটি স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণ করা বাংলা সাহিত্যে বিরল ঘটনা---সাধারণত একজন
কবির স্বকীয় স্বর গড়ে উঠতে দশক পেরিয়ে যায়, অথচ সুকান্তের ক্ষেত্রে এই
প্রক্রিয়া ঘটেছে প্রায় সংকুচিত সময়ে, ইতিহাসের চাপে ত্বরান্বিত এক অভিজ্ঞতায়।
তাঁকে নিয়ে বাংলা সাহিত্য-আলোচনায় একটি পুরনো প্রশ্ন আজও ঘুরপাক খায়---তিনি কি
প্রকৃত অর্থে একজন কবি, নাকি এক প্রতিভাবান রাজনৈতিক প্রচারক, যাঁর অকালমৃত্যু
তাঁকে বাড়তি মহিমা দিয়েছে? এই প্রশ্নের সরল উত্তর খোঁজার বদলে বরং প্রশ্নটির
নিজস্ব কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা দরকার। সুকান্তের কবিতা কখনও নিজেকে "বিশুদ্ধ" নান্দনিক
সৃষ্টি হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং তা সচেতনভাবে রাজনৈতিক প্রয়োগমূল্যকেই তার
কেন্দ্রীয় মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তাই আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত---এই
আত্মপ্রতিজ্ঞার ভেতরে দাঁড়িয়ে সুকান্তের কবিতা কতটা সফল, কতটা জটিল, কতটা
মানবিক।
তিরিশের
দশকের কবিরা---জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অমিয়
চক্রবর্তী---যে আধুনিকতাবাদী, প্রধানত ব্যক্তিসত্তা-কেন্দ্রিক ও নাগরিক
নিঃসঙ্গতাচারী কাব্যধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সুকান্ত তার প্রায় বিপরীত মেরুতে
দাঁড়িয়ে কবিতাকে সরাসরি রাজনৈতিক সংগ্রামের হাতিয়ার করে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর
কবিতা নিভৃত অনুভূতির বিলাস নয়; তা ক্ষুধার্ত মানুষের মিছিলে, শ্রমিকের ঘর্মাক্ত
শরীরে, কৃষকের ফসল-বঞ্চনার ক্রোধে সঞ্চারিত এক জাগ্রত স্বর। সুকান্তের কাব্যকে
বিচ্ছিন্ন নান্দনিক বস্তু হিসেবে না দেখে তার ঐতিহাসিক
উৎপাদন-প্রেক্ষাপট---দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, তেভাগা আন্দোলন,
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক আন্দোলন---এর সঙ্গে
অবিচ্ছেদ্যভাবে পাঠ করলেই তাঁর কবিতার প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়ে। এই পাঠপদ্ধতি নিছক
পাঠ্য-অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণের চেয়ে ভিন্ন এক অনুশীলন দাবি করে---এখানে কবিতাকে
বুঝতে হলে তার রচনাকালীন সংবাদপত্রের শিরোনাম, দলীয় ইশতেহার, রাজনৈতিক সভার
আলোচ্যসূচি, এমনকি তৎকালীন মিছিলের স্লোগানও পাশাপাশি রাখতে হয়। এই পদ্ধতিগত
অবস্থানের একটি সরাসরি ফল হলো, সুকান্তের কবিতাকে যদি বিচ্ছিন্ন করে, নিছক একটি "কবিতা" হিসেবে পড়া
হয়, তাহলে তার অনেকখানি রাজনৈতিক তীব্রতা হারিয়ে যায়; কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে
জুড়ে পড়লে তা এক জীবন্ত দলিলে পরিণত হয়, যেখানে সাহিত্য ও রাজনীতি পরস্পরকে
ব্যাখ্যা করে।
সুকান্ত
ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট, কলকাতার কালীঘাটে মাতুলালয়ে। পিতা
নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য ও মাতা সুনীতি দেবীর সন্তান সুকান্তের শৈশব-কৈশোর কেটেছে
উত্তর কলকাতার বেলেঘাটা অঞ্চলে, এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পারিবারিক পরিবেশে, যেখানে
দারিদ্র্য ও শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম প্রত্যক্ষভাবে দৃশ্যমান ছিল। এই
বসবাসের পরিবেশই সম্ভবত তাঁর কবিতার সেই অকৃত্রিম বাস্তবতাবোধের প্রথম উৎস, যেখানে
দারিদ্র্য কোনো দূরবর্তী পর্যবেক্ষণের বিষয় নয়, বরং নিত্যদিনের প্রত্যক্ষ
অভিজ্ঞতা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তিনি সম্পূর্ণ করতে পারেননি---রাজনৈতিক তৎপরতা ও
সাংগঠনিক কাজের চাপে তাঁর প্রথাগত পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। কিশোর বয়সেই তিনি অখিল
ভারত ছাত্র ফেডারেশন ও পরবর্তীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে
যুক্ত হন, এবং দলীয় মুখপত্র দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকার কিশোরসভা বিভাগের সম্পাদনার
দায়িত্ব পালন করেন। এই প্রথাগত শিক্ষা-বহির্ভূত রাজনৈতিক শিক্ষাই পরবর্তীকালে
তাঁর কাব্যরচনার তাত্ত্বিক ভিত্তি গঠন করে। প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষার অভাব
তাঁর কবিতাকে এক বিশেষ চরিত্র দিয়েছে---এখানে পাণ্ডিত্যের ভার নেই, তত্ত্বের জটিল
প্রদর্শনী নেই, বরং আছে সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক প্রত্যয়। তাঁর
সাহিত্যিক জীবন বিস্তৃত ছিল মূলত ১৯৪০-৪৭ সাল পর্যন্ত---ঠিক সেই সময়টিতে, যখন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বাংলার মন্বন্তর, ভারত ছাড়ো আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন এবং
শেষপর্যন্ত দেশভাগের রক্তক্ষয়ী প্রেক্ষাপট বাংলার সমাজজীবনকে বিপর্যস্ত করে
তুলেছিল। ক্ষয়িষ্ণু স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য ও যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের
১৩ মে, মাত্র একুশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়---দেশের স্বাধীনতা লাভের মাত্র কয়েক
মাস আগে। এই মৃত্যুর সময়নির্দিষ্টতা এক করুণ ঐতিহাসিক পরিহাসের জন্ম দেয়---যে
স্বাধীনতার জন্য তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনের প্রায় সবটুকু উৎসর্গ করেছিলেন, সেই
স্বাধীনতা আসার মাত্র কয়েক মাস আগে তিনি চলে যান, দেখে যেতে পারেননি তাঁর
স্বপ্নের বাস্তবায়ন, আবার দেখতে হয়নি দেশভাগের সেই রক্তাক্ত বিভীষিকাও, যা তাঁর
আজীবন লালিত হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের স্বপ্নকে চূর্ণ করে দিয়েছিল। জীবদ্দশায়
প্রকাশিত তাঁর একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র (১৯৪৭); মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় ঘুম
নেই, পূর্বাভাস, মিঠেকড়া, অভিযান, হরতাল ও গীতিগুচ্ছ। কবিতার পাশাপাশি তাঁর
ব্যক্তিগত পত্রাবলিও এক গুরুত্বপূর্ণ আত্মভাষ্য বহন করে---যেখানে সংগঠন, সাহিত্য ও
ব্যক্তিগত সংগ্রামের টানাপোড়েন প্রায় দিনলিপির মতো ধরা পড়ে, এবং যা তাঁর কবিতার
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধতাকে নিছক কাব্যিক ভঙ্গি নয়, একটি বাস্তব জীবনচর্যা
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই পত্রাবলিতে দেখা যায় এক তরুণ, যিনি অসুস্থতা ও অভাবের
মধ্যেও সংগঠনের কাজ, সাহিত্যিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের মধ্যে একটি
সামঞ্জস্য খুঁজে চলেছেন---এই আত্মভাষ্য তাঁর কবিতাকে বুঝতে এক অমূল্য সহায়ক দলিল।
সুকান্তের
রচনাসম্ভার পরিমাণে স্বল্প হলেও তার মধ্যে একটি স্পষ্ট বিকাশরেখা লক্ষ করা যায়,
যা তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলির ক্রমপরিচয়ে ধরা পড়ে। ছাড়পত্র সুকান্তের কাব্যপরিচয়ের
কেন্দ্রীয় দলিল। এই সংকলনের কবিতাগুলিতে ক্ষুধা, মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদবিরোধী
সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে একটি সুসংহত কাব্যদর্শন
গড়ে তোলে। গ্রন্থনামেই একটি প্রতীকী তাৎপর্য নিহিত---"ছাড়পত্র"
শব্দটি একদিকে যুদ্ধকালীন প্রশাসনিক
অনুমতিপত্রের ইঙ্গিতবাহী, অন্যদিকে রূপকার্থে তা এক শোষণমুক্ত ভবিষ্যতে প্রবেশের
অনুমতিপত্র হিসেবেও পাঠযোগ্য। এই দ্বৈত অর্থবহতাই সুকান্তের কাব্যকৌশলের একটি
প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ---তিনি প্রায়ই এমন শব্দ বা প্রতীক বেছে নেন, যার একটি
আক্ষরিক, তাৎক্ষণিক অর্থ আছে এবং একইসঙ্গে একটি গভীরতর রাজনৈতিক-রূপকার্থক
ব্যঞ্জনা। ঘুম নেই তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, যেখানে যুদ্ধ
ও মন্বন্তরের যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা আরও ঘনীভূত রূপে উপস্থিত---গ্রন্থনামটি নিজেই
একটি রাজনৈতিক ভাষ্য বহন করে, শোষিত মানুষের নিদ্রাহীনতাকে জাগ্রত প্রতিরোধ-চেতনার
রূপক করে তুলে। পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থে সুকান্তের ভবিষ্যৎমুখী আশাবাদ সর্বাধিক
স্পষ্ট রূপে প্রকাশিত; এখানে তিনি আসন্ন সামাজিক বিপ্লবের পূর্বাভাস হিসেবে
সমকালীন সংগ্রামকে ব্যাখ্যা করেছেন, যা তাঁর ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিকতাবাদী
দৃষ্টিভঙ্গির সরাসরি কাব্যিক অভিব্যক্তি। মিঠেকড়া ও হরতাল মূলত ব্যঙ্গাত্মক ও রাজনৈতিক
ছড়া-জাতীয় রচনার সংকলন, যেখানে সুকান্ত হাস্যরস ও শ্লেষের মাধ্যমে শাসকশ্রেণি,
মজুতদার ও সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছেন---এই রচনাগুলি
সুকান্তের এমন একটি দিক উন্মোচন করে, যা প্রায়ই তাঁর গম্ভীর রাজনৈতিক কবিতার
আড়ালে অবহেলিত থেকে যায়: তাঁর তীক্ষ্ণ, চটুল, লোকজ ভাষাব্যবহারের ক্ষমতা।
গীতিগুচ্ছ ও অভিযান তাঁর সৃজনশীলতার ভিন্নধর্মী দিক তুলে ধরে---গীতিগুচ্ছে
গীতিময়তার প্রতি আগ্রহ, অভিযান নাটিকায় নাট্যরূপে রাজনৈতিক বার্তা পরিবেশনের
প্রয়াস। এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে সুকান্ত একরৈখিক প্রচারধর্মী কবি ছিলেন না, বরং
বিভিন্ন সাহিত্যরূপে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আকাঙ্ক্ষী এক বহুমুখী প্রতিভা ছিলেন, যাঁর
সম্পূর্ণ বিকাশ অকালমৃত্যুতে ব্যাহত হয়েছিল। এই বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে
যাত্রা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে---সুকান্ত কখনও একটিমাত্র কাব্যভঙ্গিতে
স্থির থাকেননি; গম্ভীর রাজনৈতিক আবেগ থেকে তীক্ষ্ণ শ্লেষ, গীতিময় কোমলতা থেকে
নাটকীয় সংলাপ---এই বিস্তৃত পরিসরই প্রমাণ করে তাঁর সাহিত্যিক সম্ভাবনা আরও অনেক
দূর বিস্তৃত হতে পারত, যদি সময় তাঁকে আরও কিছুকাল দিত।
সুকান্তের
কাব্যকে বুঝতে হলে ১৯৪০-এর দশকের বাংলাকে বুঝতে হবে---ইতিহাসবিদরা যাকে প্রায়ই "সংকটের দশক" বলে চিহ্নিত
করেন। এই প্রেক্ষাপটের পাঁচটি স্তম্ভ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৩৯ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার ভারতকে তার সম্মতি
ছাড়াই যুদ্ধে সম্পৃক্ত করে। সোভিয়েত-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির সময়কালে ভারতীয়
কমিউনিস্ট পার্টি এই যুদ্ধকে "সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ"
বলে চিহ্নিত করেছিল, কিন্তু ১৯৪১ সালে জার্মানি
সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করার পর পার্টির অবস্থান বদলে যায়---যুদ্ধ তখন হয়ে ওঠে "জনযুদ্ধ", ফ্যাসিবাদের
বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রগতিশীল শক্তির সম্মিলিত সংগ্রাম। সুকান্তের কবিতায় এই
ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়---স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধ তরুণ
প্রগতিশীল বাঙালি কবি-লেখকদের কাছে যে প্রতীকী মহিমা অর্জন করেছিল, সুকান্তও তার
ব্যতিক্রম ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর---বাংলার ইতিহাসের অন্যতম
ভয়াবহ মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। যুদ্ধকালীন
খাদ্যনীতি, মজুতদারি, কালোবাজারি এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসনের অবহেলা এই দুর্ভিক্ষের
মূল কারণ। কলকাতার রাজপথে অনাহারক্লিষ্ট মানুষের মিছিল, গ্রাম থেকে শহরে খাদ্যের
সন্ধানে আসা উদ্বাস্তু পরিবার---এই দৃশ্যগুলি সুকান্তের কবিতায় গভীর ছাপ ফেলেছিল।
মন্বন্তর কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, শ্রেণিবৈষম্যের নগ্নতম প্রকাশ হিসেবেই তাঁর
কাছে ধরা দিয়েছিল। পরবর্তীকালে অমর্ত্য সেনের
"এনটাইটেলমেন্ট" তত্ত্ব
দেখিয়েছে যে এই দুর্ভিক্ষ খাদ্যশস্যের প্রকৃত অভাবজনিত নয়, বরং বণ্টন-বৈষম্য ও
ক্রয়ক্ষমতার ধসের ফল---সুকান্তের কাব্যিক প্রত্যক্ষদর্শন, যদিও প্রাতিষ্ঠানিক
অর্থশাস্ত্রের ভাষায় প্রকাশিত নয়, একই সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করে। এই মিল
লক্ষণীয়---একজন তরুণ কবি, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থশাস্ত্রের কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই,
নিছক প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও রাজনৈতিক সচেতনতা দিয়ে সেই সত্যে পৌঁছেছিলেন, যা
দশকের পর দশক পরে একজন অর্থনীতিবিদ কঠোর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা
করেন।
তৃতীয়ত,
ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২) ও ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী চেতনা; চতুর্থত, ১৯৪৬-৪৭
সালের তেভাগা আন্দোলন---ভাগচাষি কৃষকদের ফসলের ন্যায্য অংশ (উৎপাদনের তিন ভাগের
দুই ভাগ) দাবি করে গড়ে ওঠা প্রত্যক্ষ শ্রেণিসংগ্রাম, যার প্রতিধ্বনি সুকান্তের
বহু কবিতায় শোনা যায়; পঞ্চমত, ১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা, যা দেশভাগের রক্তাক্ত
পটভূমি তৈরি করে। সুকান্তের কবিতায় সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে
হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের আহ্বান বারবার উচ্চারিত হয়েছে---তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে
শ্রেণিসংগ্রামের পথে এক বিভ্রান্তিকর প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখতেন, শাসকশ্রেণির
স্বার্থে সাধারণ মানুষকে বিভক্ত রাখার কৌশল। তাঁর এই অবস্থান কেবল একটি রাজনৈতিক
প্রত্যয়ন নয়, বরং একটি বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো---তাঁর কাছে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব
শ্রেণিদ্বন্দ্বের একটি বিকৃত, ভ্রান্ত রূপ, যা প্রকৃত শোষণ-সম্পর্ককে আড়াল করে
ফেলে এবং সাধারণ মানুষকে নিজেদের প্রকৃত শত্রু চিনতে বাধা দেয়।
এই
প্রেক্ষাপটে সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রগতি লেখক আন্দোলন ও গণনাট্য
সংঘের (ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন, ১৯৪৩) ভূমিকা। এই সংগঠনগুলি কেবল
সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর ছিল না, তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিকদের একটি
বিকল্প রাজনৈতিক-বৌদ্ধিক শিক্ষাব্যবস্থাও প্রদান করেছিল, যেখানে মার্কসবাদী
রাজনৈতিক অর্থনীতি ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দর্শন নিয়ে নিয়মিত পাঠচক্র অনুষ্ঠিত
হতো। প্রথাগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত সুকান্তের কাছে এই বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থাই ছিল
তাঁর তাত্ত্বিক গঠনের প্রধান উৎস। তিরিশের কবিরা মূলত ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতার
আদর্শে কবিতা রচনা করতেন, যেখানে কবি এক নিভৃত স্রষ্টা---সুকান্তের কাছে কবিতা
রচনা ছিল সমষ্টিগত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ, দলীয় সভা, ছাত্র মিছিল, শ্রমিক
সমাবেশে পরিবেশনের জন্য রচিত। এই প্রেক্ষাপটে কবিতার
"সাফল্য"
মাপা হতো শৈল্পিক জটিলতা দিয়ে নয়,
শ্রোতা-পাঠকের মধ্যে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির ক্ষমতা দিয়ে। এই
মানদণ্ডের পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্ন তোলে---সাহিত্য সমালোচনার
প্রথাগত হাতিয়ার, যা মূলত ব্যক্তিগত পাঠ-অভিজ্ঞতা ও নিভৃত অভ্যন্তরীণ জটিলতার ওপর
ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, তা কি সুকান্তের মতো একটি সমষ্টিগত,
পারফরম্যান্স-কেন্দ্রিক কাব্যধারা বিচারের জন্য পর্যাপ্ত? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা
যায়, সুকান্তের কবিতা বিচারের জন্য আমাদের একটি দ্বৈত মানদণ্ড দরকার---একদিকে তার
ভাষিক-নান্দনিক গুণমান, অন্যদিকে তার সামষ্টিক কার্যকারিতা, তার আবৃত্তিযোগ্যতা,
তার সংগঠিত শক্তি হিসেবে সক্ষমতা।
তিরিশের
কবিদের জটিল, বহুস্তরীয়, প্রায়ই দুরূহ চিত্রকল্প ও প্রতীকনির্ভর ভাষার বিপরীতে
সুকান্ত বেছে নিয়েছিলেন এক আশ্চর্য প্রত্যক্ষ, সরল অথচ তীক্ষ্ণ ভাষাশৈলী। তাঁর
কবিতা পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য নয়---তা সরাসরি পাঠকের চেতনায় আঘাত করতে চায়। এই
সারল্য কোনো দুর্বলতা নয়, একটি সচেতন নান্দনিক-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যেহেতু তাঁর
কবিতার লক্ষ্য ছিল শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছানো, তিনি এমন একটি ভাষা তৈরি
করেছিলেন যা আবৃত্তিযোগ্য, স্লোগানধর্মী ছন্দে বাঁধা, অথচ কাব্যিক সৌন্দর্য থেকে
সম্পূর্ণ বঞ্চিত নয়। এই সারল্য অর্জন করা মোটেও সহজ কাজ নয়---বরং তা একধরনের
কঠোর সংযমের ফসল, কারণ একজন তরুণ কবির পক্ষে জটিলতা প্রদর্শনের প্রলোভন এড়িয়ে
সচেতনভাবে সারল্যকে বেছে নেওয়া, এবং সেই সারল্যের মধ্যেও কাব্যিক তীক্ষ্ণতা বজায়
রাখা, একটি উচ্চস্তরের কারিগরি দক্ষতার প্রমাণ।
সুকান্তের
কবিতায় প্রকৃতি, জ্যোৎস্না, চাঁদ, ফুল---এই চিরাচরিত রোমান্টিক কাব্য-উপাদানগুলিও
রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্জন করে। প্রথাগত কাব্য-প্রতীকগুলিকে তিনি বস্তুগত বাস্তবতার
নিরিখে পুনর্নির্মাণ করেন, যেখানে সৌন্দর্যবোধ ক্ষুধার নিরিখে পুনর্বিন্যস্ত হয়।
এভাবে তিনি রোমান্টিক ও আধুনিকতাবাদী কাব্যঐতিহ্য উভয়ের থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে এক
নতুন বাস্তববাদী কাব্যভাষা নির্মাণ করেন, যাকে সাহিত্য সমালোচকেরা প্রায়ই "সমাজতান্ত্রিক
বাস্তববাদ"-এর বাংলা কাব্যরূপ বলে চিহ্নিত করে থাকেন। এই পুনর্নির্মাণ
প্রক্রিয়াটি লক্ষ করার মতো---সুকান্ত রোমান্টিক প্রতীককে সরাসরি বর্জন করেননি,
বরং তাকে ভেতর থেকে উল্টে দিয়েছেন, তার প্রথাগত অর্থবহতাকে নতুন রাজনৈতিক
তাৎপর্যে রূপান্তরিত করেছেন---এই কৌশলটিই তাঁর কাব্যভাষার সবচেয়ে মৌলিক
অবদানগুলির একটি।
সুকান্তের
ছন্দ-প্রয়োগে দেখা যায় তিনি প্রায়শই দ্রুত, খাটো পঙক্তি ব্যবহার করেছেন, যেখানে
পর্বের পুনরাবৃত্তি একধরনের ঘাত-প্রতিঘাতমূলক গতি সৃষ্টি করে---অনেকটা মিছিলের
পদক্ষেপ বা স্লোগানের তালের অনুরূপ। অন্তমিলেও তিনি প্রায়ই সরল, প্রত্যাশিত
মিল-বিন্যাস বেছে নিয়েছেন, যা কবিতাকে সহজে স্মরণযোগ্য ও মুখে মুখে প্রচারযোগ্য
করে তোলে---তিরিশের কবিদের জটিল, অনিয়মিত পর্ববিন্যাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে,
যেখানে জটিলতা নিজেই একটি নান্দনিক লক্ষ্য, সুকান্তের কাছে সারল্য নিজেই এক
রাজনৈতিক কৌশল। তবে এই সারল্য একরৈখিক নয়; কবিতার মধ্যপর্বে প্রায়ই ছন্দের
আকস্মিক পরিবর্তন লক্ষণীয়, শান্ত বর্ণনা থেকে ক্রমশ উত্তেজিত, আহ্বানসূচক স্বরে
উত্তরণ তাঁর অনেক কবিতার কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য। তাঁর অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও
স্বরবৃত্ত---তিন ছন্দেরই ব্যবহার আছে, কিন্তু বিশেষ পছন্দ ছিল এমন ছন্দোবিন্যাস যা
সমবেত কণ্ঠে উচ্চারণের উপযোগী, যা কবিতাকে কেবল পাঠ্য বস্তু না রেখে সম্মিলিত
সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পারফরম্যান্সের অংশে পরিণত করে। এই ছন্দোগত কৌশল আসলে একটি
গভীরতর কাব্যতাত্ত্বিক অবস্থানের বাহক---কবিতা যখন সমবেত কণ্ঠে উচ্চারণের জন্য
রচিত হয়, তখন তার ছন্দ-কাঠামো নিভৃত পাঠের কবিতার চেয়ে ভিন্ন দাবি করে;
শ্বাস-বিরতি, পুনরাবৃত্তি ও প্রত্যাশিত মিল-বিন্যাস তখন নিছক আলংকারিক উপাদান নয়,
বরং কবিতার সামষ্টিক কার্যকারিতার অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে।
সুকান্তের
কাব্যকৌশলের একটি প্রায়ই উপেক্ষিত দিক তাঁর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-শ্লেষাত্মক ক্ষমতা।
মিঠেকড়া ও হরতাল-এর অনেক রচনায় তিনি শাসকশ্রেণি, আমলাতন্ত্র ও সুবিধাবাদী
রাজনীতিকদের প্রতি তীব্র বিদ্রূপাত্মক ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন, যেখানে হাস্যরস
রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর কবিতায় প্রত্যক্ষ সম্বোধনরীতি (apostrophe)---পাঠক
বা কাল্পনিক প্রতিপক্ষকে সরাসরি "তুমি" বা "তোমরা"
সম্বোধন---কবিতাকে একমুখী বর্ণনা থেকে সরিয়ে
এক সংলাপমূলক, প্রায় বক্তৃতাধর্মী রূপ দেয়। তিরিশের অনেক কবির সংস্কৃতঘেঁষা,
আভিজাত্যপূর্ণ শব্দচয়নের বিপরীতে সুকান্ত সচেতনভাবে দৈনন্দিন কথ্য বাংলার
শব্দভাণ্ডার, স্থানীয় প্রবাদ-প্রবচন ও সহজবোধ্য বাক্যগঠন ব্যবহার করেছেন---এই
ভাষাতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তও একটি শ্রেণিরাজনৈতিক অবস্থান, কবিতাকে অভিজাত সাহিত্যিক
বৃত্তের সম্পত্তি না রেখে সাধারণ মানুষের ভাষায় ফিরিয়ে আনার প্রয়াস। এই
ভাষাতাত্ত্বিক নির্বাচন একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশ---উনিশ শতকের
সংস্কৃতায়িত বাংলা সাহিত্যিক ভাষা, যা মূলত শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণির সম্পত্তি
ছিল, তার বিপরীতে সুকান্তের ভাষা এক গণতান্ত্রিকীকরণের প্রকল্প---কবিতাকে সেই
শ্রেণির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া, যাদের অভিজ্ঞতা থেকে কবিতার বিষয়বস্তু উঠে আসছে।
সুকান্তের
কাব্যে ক্ষুধা একক, সরলরৈখিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; বরং তা বহুস্তরীয় ব্যঞ্জনা বহন
করে। প্রথম স্তরে ক্ষুধা এক শারীরবৃত্তীয়, তাৎক্ষণিক বাস্তবতা---মন্বন্তরকালীন
কলকাতার রাজপথে অনাহারক্লিষ্ট মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণ। দ্বিতীয় স্তরে
ক্ষুধা রূপান্তরিত হয়ে ওঠে ন্যায়ের ক্ষুধা, স্বাধীনতার ক্ষুধা, পরিবর্তনের
ক্ষুধায়---দৈহিক অভাব বৃহত্তর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার রূপক হয়ে ওঠে। তৃতীয় স্তরে
ক্ষুধা হয়ে ওঠে একটি বিচারমূলক মানদণ্ড, যার নিরিখে সমকালীন সমাজব্যবস্থার নৈতিক
ব্যর্থতা যাচাই করা হয়। এই বহুস্তরীয় ব্যবহার সুকান্তের কবিতাকে নিছক
করুণা-উদ্রেককারী দুর্ভিক্ষ-বর্ণনা থেকে আলাদা করে একটি বিশ্লেষণাত্মক-রাজনৈতিক
ভাষ্যে উন্নীত করে। তুলনীয়ভাবে, সমকালীন ফটোসাংবাদিকতায় ক্ষুধা যেখানে মূলত
করুণা-উদ্রেককারী দৃশ্যরূপে ধরা দেয়, সুকান্তের কাব্যিক ক্ষুধা-চিত্রায়ণ পাঠককে
করুণা থেকে বিশ্লেষণে, এবং বিশ্লেষণ থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার দিকে
চালিত করতে চায়---এই রূপান্তর-প্রক্রিয়াই সম্ভবত তাঁকে নিছক একজন "সংবেদনশীল কবি" থেকে একজন "রাজনৈতিক
বিশ্লেষক-কবি"-তে রূপান্তরিত করে।
কপিরাইট
আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এখানে মূল পঙক্তি উদ্ধৃত না করেই বলা যায়---চাঁদকে
কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তাঁর একটি সুপরিচিত কবিতায় প্রথাগত রোমান্টিক
জ্যোৎস্না-বন্দনার বদলে ক্ষুধার্ত মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চাঁদকে দেখার আমূল
ভিন্ন প্রস্তাবনা লক্ষণীয়, যেখানে সৌন্দর্যবোধের প্রচলিত মানদণ্ডকেই বস্তুগত
প্রয়োজনের নিরিখে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এই কবিতাটি সুকান্তের সমগ্র কাব্যদর্শনের
একটি ক্ষুদ্র, কিন্তু অত্যন্ত ঘনীভূত প্রতিরূপ হিসেবে পড়া যায়---এখানে একটি
প্রথাগত রোমান্টিক প্রতীককে এমনভাবে উল্টে দেওয়া হয়েছে যে, পাঠকের নিজের
সৌন্দর্যবোধকেই আত্মসমীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। মহাজীবনের কাছে লেখা তাঁর
একটি বহুপঠিত প্রার্থনা-কবিতায় কাব্যিক সৌন্দর্যচর্চা ও রাজনৈতিক তাৎক্ষণিকতার
টানাপোড়েন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, এবং এই কারণেই তা সমালোচক-পাঠক উভয়ের
কাছে তাঁর কাব্যদর্শনের একটি ইশতেহার-সদৃশ রচনা হিসেবে গণ্য। রানার-কেন্দ্রিক
কবিতায় ঔপনিবেশিক ডাক-ব্যবস্থার এক প্রান্তিক শ্রমজীবী চরিত্রকে কেন্দ্র করে তিনি
শ্রমজীবী মানুষের ক্লান্তি, শোষণ ও নীরব সহ্যক্ষমতার মর্মস্পর্শী চিত্র নির্মাণ
করেছেন, যেখানে শেষপর্যন্ত নতুন যুগের বার্তাবহনের প্রতীকী আশাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই কবিতায় একটি প্রান্তিক পেশাকে কেন্দ্রীয় কাব্যবিষয়ে পরিণত করার সিদ্ধান্তই
লক্ষণীয়---সাহিত্যে যে চরিত্র সাধারণত অদৃশ্য, প্রান্তিক, নামহীন থেকে যায়,
সুকান্ত তাকে কবিতার কেন্দ্রে স্থাপন করে এক ধরনের সাহিত্যিক ন্যায়বিচার সম্পাদন
করেন। চিল-কেন্দ্রিক রচনায় প্রকৃতির সাধারণ উপাদানকেও তিনি ক্ষুধা ও
জীবনসংগ্রামের রূপকে রূপান্তরিত করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই কৌশল
লক্ষণীয়---প্রথাগত বা নিরপেক্ষ কাব্য-উপাদানকে বেছে নিয়ে শ্রেণিসচেতন রাজনৈতিক
ভাষ্যে রূপান্তরিত করার সচেতন প্রয়াস।
সুকান্তের
কাব্যদর্শনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ শ্রেণিচেতনা---কিন্তু তা কোনো বিমূর্ত মতাদর্শগত
প্রতিশব্দ নয়, বরং একটি জীবন্ত, বহুস্তরীয় কাব্যিক অভিজ্ঞতা, যা অন্তত সাতটি
পৃথক মাত্রায় বিশ্লেষণযোগ্য। প্রথমত, প্রত্যক্ষ শ্রেণিবিভাজনের চিত্রায়ণ।
সুকান্তের কবিতায় সমাজ কখনোই অখণ্ড সত্তা নয়; বরং তা বারবার শোষক ও শোষিতের
দ্বিধাবিভক্ত জগৎ হিসেবে চিত্রিত---মজুতদার, মুনাফাখোর, জোতদার, সাম্রাজ্যবাদী
শাসক একদিকে; কৃষক, শ্রমিক, ভাগচাষি, ক্ষুধার্ত শিশু অন্যদিকে। এই দ্বিমেরু কাঠামো
নিছক সহানুভূতিশীল মানবতাবাদ নয়---এর মধ্যে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অভিসন্ধি কাজ
করে, যা পাঠককে করুণা নয়, ক্রোধ ও প্রতিরোধের দিকে চালিত করতে চায়।
দ্বিতীয়ত,
ক্ষুধাকে রাজনৈতিক বিষয়ে রূপান্তর---সুকান্তের অন্যতম মৌলিক অবদান। তাঁর কাছে
ক্ষুধা কোনো ভাগ্যলিখন নয়, বরং একটি সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ ফসল,
যার পেছনে দায়ী মজুতদারি, ঔপনিবেশিক শোষণ ও শ্রেণিবৈষম্য। তৃতীয়ত, কবিসত্তার
আত্মসমালোচনা ও শ্রেণি-অবস্থান---কবি নিজেই নিজের অবস্থান নিয়ে সচেতন এবং
প্রায়শই আত্মসমালোচনামূলক, নিজেকে নিছক সহানুভূতিশীল বহিরাগত নয়, সংগ্রামের
অংশীদার হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। কবিতাকে বিলাসী শব্দচর্চা থেকে সরিয়ে সংগ্রামের
সরাসরি হাতিয়ারে পরিণত করার আকাঙ্ক্ষা---এমনকি কবিতা ছেড়ে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মে
মনোনিবেশের আহ্বান---তাঁর রচনায় স্পষ্ট। এই আত্মদ্বন্দ্ব, শিল্পী ও রাজনৈতিক
কর্মীর মধ্যেকার টানাপোড়েন, সুকান্তের কাব্যে এক গভীর মানবিক মাত্রা যোগ করে।
চতুর্থত,
আন্তর্জাতিকতাবাদী শ্রেণিসংহতি---সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ,
স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধ, বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি গভীর সংহতিবোধ তাঁর
শ্রেণিচেতনাকে একটি বৈশ্বিক মাত্রা দেয়। পঞ্চমত, শিশু-কিশোর ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি
আহ্বান---তিনি বিপ্লবকে কেবল বর্তমানের সংগ্রাম নয়, একটি আন্তঃপ্রজন্মীয়
ঐতিহাসিক প্রকল্প হিসেবে দেখতেন, যেখানে আজকের কিশোর আগামী দিনের সংগ্রামী নাগরিক।
ষষ্ঠত,
ঔপনিবেশিকতাবিরোধিতা ও শ্রেণিবিশ্লেষণের সংযোগ। প্রথাগত জাতীয়তাবাদী কাব্যধারায়
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম প্রায়ই একটি অখণ্ড
"জাতি"-র নামে পরিচালিত হয়, যেখানে অভ্যন্তরীণ
শ্রেণিবৈষম্যের প্রশ্ন গৌণ হয়ে পড়ে। সুকান্তের কবিতা এই জাতীয়তাবাদী একত্ববোধকে
প্রশ্নবিদ্ধ করে---তাঁর কাছে ঔপনিবেশিক শাসন ও অভ্যন্তরীণ শ্রেণিশোষণ একে অপরের
পরিপূরক, বিচ্ছিন্ন নয়। মজুতদার-জোতদার শ্রেণি ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত
করে কৃষককে শোষণ করে, তেমনি ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক নীতিও দেশীয় শোষক শ্রেণির
স্বার্থ রক্ষা করে। সপ্তমত, সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ ও দ্বান্দ্বিক
ঐতিহাসিকতা---তাঁর কবিতায় বর্তমানের দুর্দশা কখনোই চূড়ান্ত সত্য নয়, বরং একটি
ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার অন্তর্বর্তী মুহূর্ত, যা অনিবার্যভাবে
রূপান্তরিত ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই দ্বান্দ্বিক ঐতিহাসিকতাবোধই তাঁর
কবিতার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছন্দ-গতি ব্যাখ্যা করে, যেখানে যন্ত্রণার বর্ণনা থেকে কবিতা
প্রায় অনিবার্যভাবে আহ্বান ও আশাবাদের দিকে মোড় নেয়।
সুকান্তের
কবিতায় অতীত সাধারণত এক দীর্ঘস্থায়ী শোষণের ইতিহাস---জমিদারি-ঔপনিবেশিক শোষণের
পুঞ্জীভূত কাঠামো, যার ফলশ্রুতি বর্তমানের দুর্দশা। বর্তমান কখনোই স্থিতিশীল নয়;
তা এক তীব্র সংকটকাল। কিন্তু এই সংকটকালীন বর্তমানের মধ্যেই সুকান্ত ভবিষ্যতের বীজ
বপন করেন---বর্তমানের যন্ত্রণা কখনোই চূড়ান্ত পরিণতি নয়, বরং
রূপান্তরপ্রক্রিয়ার প্রসববেদনাসদৃশ পর্যায়। এই ত্রিস্তরীয় কালকাঠামোয় একটি
গুরুত্বপূর্ণ উপাদান "প্রতীক্ষা"---আসন্ন পরিবর্তনের জন্য সক্রিয়, সংগ্রামী
প্রতীক্ষা, নিষ্ক্রিয় ভাগ্যবাদী অপেক্ষা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুকান্তের কবিতায়
প্রতীক্ষা মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়, সংগঠিত সংগ্রামের মাধ্যমে ভবিষ্যৎকে
সক্রিয়ভাবে নির্মাণ করা। এই কালচেতনা তাঁর কবিতাকে একধরনের নাটকীয় গতিময়তা
দেয়---প্রতিটি কবিতা যেন একটি ক্ষুদ্র ঐতিহাসিক বৃত্তান্ত, যেখানে অতীতের শোষণ,
বর্তমানের যন্ত্রণা ও ভবিষ্যতের আশা একটি একক কাব্যিক মুহূর্তে সংহত হয়ে ওঠে।
সুকান্তের
কাব্যে ব্যক্তিগত প্রেম, দাম্পত্য বা নারী-পুরুষ সম্পর্কের রোমান্টিক আখ্যান
প্রায় অনুপস্থিত---তিরিশের অনেক কবির তুলনায় একটি লক্ষণীয় পার্থক্য। জীবনানন্দ
দাশ, বুদ্ধদেব বসু বা অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় ব্যক্তিগত প্রণয়ানুভূতি,
নারীসৌন্দর্যের বর্ণনা ও আন্তর সম্পর্কের জটিলতা বারবার ফিরে আসে। সুকান্তের
কবিতায় এই ব্যক্তিক পরিসর প্রায় সম্পূর্ণভাবে সামষ্টিক রাজনৈতিক বিষয়ের কাছে জায়গা
ছেড়ে দিয়েছে। এর একটি ব্যাখ্যা তাঁর অল্প বয়স ও সংক্ষিপ্ত জীবনকালে হতে পারে,
কিন্তু গভীরতর ব্যাখ্যা তাঁর সচেতন কাব্যদর্শনেই নিহিত---তিনি মনে করতেন সংকটকালীন
মুহূর্তে ব্যক্তিগত প্রণয়ানুভূতির কাব্যচর্চা এক ধরনের বিলাসিতা, যা সামষ্টিক
সংগ্রামের জরুরি প্রয়োজনের সামনে গৌণ হয়ে যায়। এই প্রবণতা তাঁর কবিতায়
নারীচরিত্রের প্রতিনিধিত্বেও প্রতিফলিত---নারী প্রধানত মা, ক্ষুধার্ত সন্তানের
জননী বা সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক হিসেবে উপস্থিত, ব্যক্তিক স্বতন্ত্র সত্তা
হিসেবে নয়। নারীবাদী সাহিত্য সমালোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ
সীমাবদ্ধতা---যদিও এ কথাও স্মরণীয় যে চল্লিশের দশকের সামগ্রিক প্রগতিশীল
আন্দোলনেই লিঙ্গ-সচেতন বিশ্লেষণ তুলনামূলকভাবে অনুন্নত ছিল, এই সীমাবদ্ধতা
সুকান্তের একার নয়, তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রজন্মেরই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
আজকের পাঠকের দৃষ্টিতে এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নেওয়া জরুরি, কিন্তু একইসঙ্গে
এটিও মনে রাখা দরকার যে সাহিত্য-ইতিহাসের বিচারে একজন কবিকে তাঁর নিজের ঐতিহাসিক
মুহূর্তের সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড় করিয়েই মূল্যায়ন করতে হয়, নইলে সব ঐতিহাসিক
সাহিত্যকর্মই সমকালীন মানদণ্ডে অসম্পূর্ণ প্রতিভাত হবে।
সুকান্তের
কাব্যিক স্বাতন্ত্র্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তুলনামূলক বিশ্লেষণে।
জীবনানন্দের কবিতায়ও যুদ্ধ, নগরায়ণ ও আধুনিক জীবনের সংকট গভীরভাবে উপস্থিত,
বিশেষত মহাপৃথিবী ও সাতটি তারার তিমির পর্বে। কিন্তু তাঁর প্রতিক্রিয়া মূলত
অন্তর্মুখী, অস্তিত্বসংকটকেন্দ্রিক ও দার্শনিক নৈরাশ্যে আচ্ছন্ন---সমাধানের কোনো
সম্মিলিত রাজনৈতিক পথ সেখানে প্রায় অনুপস্থিত। সুকান্তের কবিতা ঠিক বিপরীত মেরুতে
দাঁড়িয়ে---সংকটের একমাত্র জবাব সংগঠিত সামষ্টিক সংগ্রাম, ব্যক্তিগত নৈরাশ্য নয়।
জীবনানন্দ ইতিহাসের ভার বহন করেন এক ক্লান্ত, প্রায় পরাজিত চেতনায়; সুকান্ত সেই
একই ইতিহাসকে দেখেন পরিবর্তনযোগ্য, সংগ্রামের মাধ্যমে জয়যোগ্য বাস্তবতা হিসেবে।
বিষ্ণু
দে ও সমর সেনও মার্কসবাদী চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের
কাব্যভাষা তুলনামূলকভাবে অধিক জটিল, বৌদ্ধিক, ব্যঙ্গাত্মক ও বিমূর্ততাপ্রবণ,
প্রায়শই ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদী কাব্যরীতির প্রভাবে গঠিত। সমর সেনের কবিতায়
একধরনের তিক্ত আত্মবিদ্রূপাত্মক স্বর লক্ষণীয়, যেখানে বুদ্ধিজীবী কবি নিজের
শ্রেণি-অবস্থান নিয়ে সংশয়ী ও কৌতুকপ্রবণ। সুকান্তের কবিতায় এই বৌদ্ধিক দূরত্ব
প্রায় অনুপস্থিত; তাঁর কবিতা সরাসরি আবেগঘন, স্লোগানধর্মী ও গণসম্বোধনমুখী। এই
পার্থক্য আসলে দুটি ভিন্ন মার্কসীয় নন্দনতত্ত্বের প্রতিনিধিত্ব করে---একদিকে
বুদ্ধিজীবী, আত্মসচেতন, দ্বান্দ্বিকতায় আচ্ছন্ন এক কাব্যধারা, যা প্রায়ই নিজের
রাজনৈতিক অবস্থানের জটিলতা নিয়ে সংশয়ী; অন্যদিকে সুকান্তের সরাসরি, প্রায়
দ্বিধাহীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা, যেখানে সংশয়ের চেয়ে কর্মের তাগিদ প্রবল।
রবীন্দ্রনাথের
শেষ জীবনের কবিতায়ও সামাজিক অসাম্যের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা লক্ষ করা যায়,
কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি মূলত বিশ্বজনীন মানবতাবাদের কাঠামোয় গঠিত, যেখানে সমাধান
খোঁজা হয় নৈতিক উত্তরণে। সুকান্তের কবিতা এই বিমূর্ত মানবতাবাদকে প্রত্যাখ্যান
করে একটি স্পষ্ট শ্রেণিভিত্তিক পক্ষপাতে দাঁড়ায়---সমাধান নৈতিক উত্তরণে নয়,
শ্রেণিসংগ্রামে নিহিত। নজরুলের সঙ্গে সুকান্তের আপাত সাদৃশ্য---উভয়েই বিদ্রোহ ও
নিপীড়িত মানুষের পক্ষে জোরালো কণ্ঠস্বর---কিন্তু নজরুলের বিদ্রোহ অনেক বেশি
ব্যক্তিক, রোমান্টিক-বীরত্বব্যঞ্জক, প্রায়ই ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক প্রতীকে গঠিত।
নজরুলের কবিতায় বিদ্রোহী "আমি"-র উচ্চারণ কেন্দ্রীয়; সুকান্তের কবিতায় সেই
স্থান নেয় সমষ্টিগত "আমরা"। এই সর্বনাম-পরিবর্তন সামান্য ব্যাকরণগত বিষয়
নয়---এটি দুটি ভিন্ন কাব্যতাত্ত্বিক অবস্থানের প্রতীক। নজরুলের বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর
একজন ব্যতিক্রমী, প্রায় অতিমানবিক ব্যক্তির উচ্চারণ, যেখানে সুকান্তের কণ্ঠস্বর
সংগঠিত সমষ্টির একটি অংশ, যার শক্তি ব্যক্তিগত ব্যতিক্রমীতায় নয়, সামষ্টিক ঐক্যে
নিহিত।
সুকান্তের
ঘনিষ্ঠতম কাব্যিক উত্তরসূরি হিসেবে গণ্য সুভাষ মুখোপাধ্যায় পরবর্তীকালে দীর্ঘ
কাব্যজীবনে একটি অধিকতর পরিণত, আত্মসমালোচনামূলক প্রগতিশীল কাব্যভাষা নির্মাণ
করেছিলেন, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও ব্যক্তিগত মোহভঙ্গের দ্বন্দ্ব ক্রমশ জটিল
রূপ নেয়। সুকান্তের কাব্য এই তুলনায় অনেক বেশি তাৎক্ষণিক, অপরিণত বয়সের তীব্র
আবেগে চালিত---এই তাৎক্ষণিকতা যেমন তাঁর কবিতার একটি সীমাবদ্ধতা, তেমনি এটিই তার
অনন্য শক্তির উৎসও বটে: কিশোর বয়সের নিরঙ্কুশ, দ্বিধাহীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা, যা
পরবর্তী পরিণত কবিদের রচনায় প্রায়ই অনুপস্থিত। এই তুলনামূলক প্রতিচিত্র থেকে
একটি সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়---চল্লিশের দশকের বাংলা কবিতায় "রাজনৈতিক
প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা" নিজেই কোনো একরৈখিক ধারণা ছিল না; কারও কাছে তা বৌদ্ধিক
দূরত্ব বজায় রেখে সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ, কারও কাছে দার্শনিক নৈরাশ্যের মধ্যে
ডুবে থাকা নীরব প্রতিবাদ, আবার সুকান্তের কাছে তা ছিল সরাসরি, নিরঙ্কুশ ও সাংগঠনিক
আনুগত্যপূর্ণ সক্রিয় অংশগ্রহণ।
সুকান্তের
কাব্যমূল্য নিয়ে সাহিত্য সমালোচনায় দ্বিধাবিভক্ত মূল্যায়ন লক্ষণীয়। একদল
সমালোচক তাঁকে আধুনিক বাংলা রাজনৈতিক কবিতার প্রতিষ্ঠাতা-পুরুষ হিসেবে অভিনন্দিত
করেছেন; অন্যদল তাঁর কবিতার প্রচারধর্মিতা, স্লোগানসর্বস্বতা ও শৈল্পিক
পরিমিতিবোধের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই সমালোচনার ন্যায্য ভিত্তি আছে---তাঁর
কিছু রচনায় রাজনৈতিক বার্তা এতটাই প্রত্যক্ষ যে তা কাব্যিক জটিলতা ও বহুস্তরীয়
অর্থবাহিতাকে ক্ষুণ্ন করে; কখনো কখনো কবিতা দলীয় লাইনের প্রায় যান্ত্রিক অনুবাদে
পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে "সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ"
থেকে "জনযুদ্ধ"-এ রূপান্তরের যে দলীয় লাইন পরিবর্তন হয়েছিল,
তার কাব্যিক প্রতিফলনে প্রশ্ন তোলা যায়---একজন স্বাধীনচেতা কবি হিসেবে সুকান্ত
কতটা এই পরিবর্তনের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা করেছিলেন, নাকি তিনি মূলত দলীয়
নির্দেশনার কাব্যিক অনুবাদক হিসেবেই কাজ করেছিলেন। এই প্রশ্নটি কেবল সুকান্তের
ক্ষেত্রেই নয়, সমগ্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সাহিত্যধারার (committed
literature) ক্ষেত্রেই একটি
চিরস্থায়ী তাত্ত্বিক দ্বিধা তৈরি করে---সাহিত্যের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা কি
সবসময় তার স্বাধীন সমালোচনামূলক ক্ষমতাকে খর্ব করে, নাকি একটি সুনির্দিষ্ট
রাজনৈতিক অবস্থান থেকেও সাহিত্য তার সমালোচনামূলক তীক্ষ্ণতা বজায় রাখতে পারে?
তবে
এই সমালোচনা মূল্যায়নের সময় দুটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। প্রথমত, সুকান্তের বয়স
ও সাহিত্যিক পরিণতির সময়সীমা---মাত্র একুশ বছর বয়সে মৃত্যু এবং সাকুল্যে ছয়-সাত
বছরের রচনাকাল বিচার করলে তাঁর কাব্যভাষার আরও পরিণত রূপে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা
অস্বীকার করা যায় না, যদিও এটি একটি অনুমানভিত্তিক প্রতর্ক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
নয়। দ্বিতীয়ত, তাঁর কাব্যকে যদি নিছক ব্যক্তিগত নান্দনিক সৃষ্টি না ভেবে একটি
সাংগঠিত সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের কার্যকরী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়,
তাহলে তার মূল্যায়নের মানদণ্ডও বদলে যায়---তখন প্রশ্ন হয়ে ওঠে তার আবেদনক্ষমতা,
আবৃত্তিযোগ্যতা ও সংগঠিত শক্তি হিসেবে কার্যকারিতা, নিছক নিভৃত পাঠ-অভিজ্ঞতার
গভীরতা নয়।
বিশ্বসাহিত্যের
ইতিহাসে অল্পবয়সে প্রয়াত হয়েও স্থায়ী খ্যাতি অর্জনকারী কবিদের একটি দীর্ঘ
পরম্পরা আছে---জন কিটস ও পার্সি বিশি শেলির সঙ্গে সুকান্তের তুলনা বাংলা
সাহিত্য-আলোচনায় প্রায়ই ওঠে। কিন্তু এই তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
লক্ষণীয়---কিটস বা শেলির কাব্যপ্রতিভা মূলত ব্যক্তিক সৌন্দর্যচেতনা ও রোমান্টিক
কল্পনাশক্তির বিকাশে নিবদ্ধ ছিল, যেখানে সুকান্তের স্বল্প সৃষ্টিকাল সম্পূর্ণভাবে
একটি সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তাঁর কাব্যের গভীর
স্থান-কালনির্দিষ্টতাও তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে সীমিত রেখেছে---১৯৪০-এর দশকের
বাংলার নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাঠ করলে তাঁর কবিতার
রাজনৈতিক তীব্রতা অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হয়ে যায়---যে নির্দিষ্টতা তাঁর কবিতাকে
সমকালীন বাঙালি পাঠকের কাছে তীব্রভাবে আবেদনময় করে তোলে, সেই একই নির্দিষ্টতা
তাঁর কবিতাকে সর্বজনীন, কালোত্তীর্ণ পাঠের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রতিবন্ধকও করে তোলে।
এই দ্বন্দ্ব---স্থানিক-কালিক নির্দিষ্টতা একইসঙ্গে শক্তি ও সীমাবদ্ধতা হয়ে
ওঠা---প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সাহিত্যের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যা কেবল সুকান্তের নয়,
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক কবিতার একটি চিরায়ত সমস্যা।
মৃত্যুর
প্রায় আট দশক পরেও সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে এক জীবন্ত উপস্থিতি।
ষাট ও সত্তরের দশকের নকশালবাড়ি আন্দোলন-প্রভাবিত কবিতায়, বিশেষত বীরেন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়ের রচনায়, সুকান্তের প্রত্যক্ষ, আপসহীন রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের
ধারাবাহিকতা লক্ষণীয়---যদিও সেখানে অধিকতর তিক্ত, ক্ষুব্ধ, কখনো আত্মবিদ্রূপাত্মক
স্বর যুক্ত হয়েছে, তবু সুকান্তের প্রত্যক্ষতা, সারল্য ও সমষ্টিগত সম্বোধনরীতির
প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। তাঁর কবিতা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উভয় স্থানেই
পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ছাত্র আন্দোলন থেকে বিভিন্ন প্রগতিশীল সামাজিক
আন্দোলনে তাঁর পঙক্তি উদ্ধৃত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কালেও
প্রতিরোধ-সাহিত্যের ধারায় সুকান্তের কাব্যিক উত্তরাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ
প্রেরণাসূত্র হিসেবে কাজ করেছিল বলে সাহিত্য-ইতিহাসবিদরা প্রায়ই উল্লেখ
করেন---ক্ষুধা, শোষণ ও প্রতিরোধের যে কাব্যভাষা সুকান্ত নির্মাণ করেছিলেন, তা
পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একটি প্রস্তুত মডেল হিসেবে হাজির ছিল, যাকে নতুন ঐতিহাসিক
প্রেক্ষাপটে পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছিল।
"কিশোর কবি" হিসেবে তাঁর
পরিচিতি তাঁকে বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে---নিজেই
কৈশোর-তারুণ্যে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া একজন কবি, প্রতিটি
প্রজন্মের তরুণ পাঠকের কাছে যাঁর কণ্ঠস্বর এক বিশেষ আন্তরিকতায় পৌঁছায়।
পশ্চিমবঙ্গে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে "কিশোর দিবস"
পালনের রীতি এই সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতারই
প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
সুকান্তের
কবিতার এই দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ
নয়---তা মৌখিক সংস্কৃতিতেও গভীরভাবে প্রোথিত। ছাত্র মিছিল, শ্রমিক সমাবেশ ও
রাজনৈতিক আন্দোলনের স্লোগান-সংস্কৃতিতে তাঁর পঙক্তির পুনরাবৃত্তি এই কথাই প্রমাণ
করে যে, তাঁর কবিতা মূলত এক পারফরম্যান্স-নির্ভর মাধ্যম হিসেবেই বেঁচে আছে, নিছক
মুদ্রিত পাঠ্য হিসেবে নয়। এই মৌখিক অবিরাম-জীবিততা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য-সামাজিক
ঘটনা---এটি প্রমাণ করে যে সুকান্তের কাব্যকৌশলগত সিদ্ধান্ত, বিশেষত তাঁর সারল্য ও
আবৃত্তিযোগ্যতার প্রতি অগ্রাধিকার, প্রকৃতপক্ষে সফল হয়েছিল---তাঁর কবিতা ঠিক সেই
কার্যকারিতা অর্জন করেছে, যা তিনি নিজে তার জন্য কামনা করেছিলেন।
তাঁর
কাব্যের প্রাসঙ্গিকতা কেবল ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত
রাজনৈতিক-নান্দনিক প্রশ্ন হিসেবেও অব্যাহত---শিল্প কি রাজনৈতিক অঙ্গীকার থেকে
মুক্ত থাকতে পারে, নাকি প্রতিটি শিল্পকর্মই কোনো না কোনো রাজনৈতিক অবস্থান বহন
করে? সুকান্তের কাব্য এই প্রশ্নের একটি দ্ব্যর্থহীন, আপসহীন উত্তর প্রস্তাব
করে---শিল্প নিরপেক্ষ নয়, এবং শিল্পীর দায়িত্ব শোষিত মানুষের পক্ষে স্পষ্ট
অবস্থান গ্রহণ করা। এই প্রশ্নের মীমাংসা যতই বিতর্কিত হোক না কেন, সুকান্তের কাব্য
তার সময়ের এক অকৃত্রিম, তীব্র ও আন্তরিক দলিল হিসেবে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী
গুরুত্ব বহন করবে। বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে দেখলে, পাবলো নেরুদা বা
মায়াকোভস্কির রাজনৈতিক কবিতার মূল্যায়ন নিয়েও অনুরূপ বিতর্ক বারবার ফিরে
এসেছে---এই বৈশ্বিক তুলনামূলক প্রেক্ষাপটে সুকান্তকে স্থাপন করলে বোঝা যায় তাঁর
কাব্যদর্শন কোনো বিচ্ছিন্ন বাঙালি ঘটনা নয়, বরং বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে
বিশ্বজুড়ে সক্রিয় এক বৃহত্তর রাজনৈতিক-সাহিত্যিক প্রবণতার বাংলা প্রকাশ। নেরুদার
চিলির খনি-শ্রমিকদের প্রতি সংহতি, মায়াকোভস্কির বিপ্লব-উত্তর সোভিয়েত রাষ্ট্রের
প্রতি কাব্যিক অঙ্গীকার---এই সমান্তরাল উদাহরণগুলি দেখলে বোঝা যায়, বিংশ শতাব্দীর
মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বজুড়ে তরুণ কবিদের একটি প্রজন্ম একই ঐতিহাসিক তাগিদ অনুভব
করেছিল---সাহিত্যকে সরাসরি রাজনৈতিক রূপান্তরের হাতিয়ার করে তোলার তাগিদ, এবং সুকান্ত
সেই বৈশ্বিক প্রজন্মেরই একজন বাঙালি প্রতিনিধি।
সুকান্তের
রচনার প্রকাশনা-ইতিহাসও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। জীবদ্দশায় তিনি নিজের
হাতে কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে যেতে পেরেছিলেন---বাকি সবকটি সংকলন
প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পর, বন্ধু-সহকর্মী ও সমসাময়িক সাহিত্যিকদের
উদ্যোগে, যাঁরা তাঁর বিক্ষিপ্ত পাণ্ডুলিপি, সাময়িকপত্রে প্রকাশিত রচনা ও
অসম্পূর্ণ খসড়া একত্র করে সংকলিত করেছিলেন। এই প্রকাশনা-প্রক্রিয়ার একটি
গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো, সুকান্তের "সম্পূর্ণ"
রচনাসম্ভার বলে যা আমরা আজ পাঠ করি, তার মধ্যে
সম্পাদনাগত সিদ্ধান্তের একটি স্তর মিশে আছে---কোন কবিতা অন্তর্ভুক্ত হবে, কোনটি
বাদ যাবে, কোন পাঠান্তর গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে, এসব সিদ্ধান্ত সুকান্তের
নিজের নয়, বরং তাঁর মরণোত্তর সম্পাদকদের। এই তথ্য সুকান্ত-পাঠকে আরও সতর্ক করে
তোলে---আমরা যে সুকান্তকে পাঠ করি, তিনি আংশিকভাবে তাঁর সমসাময়িক
রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বৃত্তের দ্বারা নির্মিত এক সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর
কাব্য-ভাবমূর্তি গঠনে তাঁর মৃত্যুর পরবর্তী রাজনৈতিক প্রয়োজনও একটি ভূমিকা পালন
করেছে। এই পর্যবেক্ষণ সুকান্তের কাব্যমূল্য খর্ব করে না, বরং তাঁকে পাঠের একটি
বাড়তি ঐতিহাসিক স্তর যোগ করে---কীভাবে একজন তরুণ, অকালপ্রয়াত কবি একটি রাজনৈতিক
আন্দোলনের প্রতীকী মুখ হয়ে ওঠেন, সেই প্রক্রিয়াটিও সাহিত্য-সমাজতত্ত্বের একটি
গুরুত্বপূর্ণ অধ্যয়ন-বিষয়।
সুকান্তকে
নিয়ে বাংলা মার্কসীয় সমালোচনা-ঐতিহ্যের অবস্থানও লক্ষণীয়। প্রগতি লেখক আন্দোলন
ও তৎপরবর্তী মার্কসবাদী সাহিত্য-সমালোচকদের কাছে সুকান্ত দীর্ঘদিন ধরে একটি আদর্শ
দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন---এমন একজন কবি, যাঁর রচনায় রাজনৈতিক
প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা ও কাব্যিক গুণমান একসঙ্গে উপস্থিত বলে দাবি করা সহজ। কিন্তু এই আদর্শায়নের
একটি সমালোচনামূলক পুনর্মূল্যায়নও জরুরি---সাহিত্য-ইতিহাসে যখন কোনো কবিকে একটি
রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীক করে তোলা হয়, তখন তাঁর রচনার জটিলতা, দ্বিধা ও
অসম্পূর্ণতা প্রায়ই আড়ালে চলে যায়, এবং তাঁর কবিতাকে একটি মসৃণ, সরলীকৃত
রাজনৈতিক বার্তায় পরিণত করার প্রবণতা তৈরি হয়। এই প্রবণতা প্রতিরোধ করা
জরুরি---সুকান্তের কবিতায় যে আত্মদ্বন্দ্ব, যে অনিশ্চয়তা, যে তরুণ বয়সের
অস্থিরতা লক্ষণীয়, তা মুছে ফেলে তাঁকে একটি নিখুঁত রাজনৈতিক-সাহিত্যিক দৃষ্টান্তে
পরিণত করা তাঁর কবিতার প্রকৃত মানবিক জটিলতাকেই অস্বীকার করা। বরং একজন নির্মোহ
পাঠকের কাজ হলো সুকান্তের কবিতার মধ্যে সেই দ্বিধা, সেই টানাপোড়েন, সেই
অসম্পূর্ণতাকেও স্বীকৃতি দেওয়া, যা তাঁকে একটি প্রচারমূলক প্রতিমূর্তির বদলে একজন
জীবন্ত, সংগ্রামরত তরুণ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সুকান্তের
কবিতার অনুবাদ ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির প্রশ্নটিও এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। যদিও
তাঁর রচনার কিছু অংশ ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে, তবু তুলনামূলকভাবে
তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি সীমিত থেকে গেছে---এর একটি কারণ পূর্বেই আলোচিত হয়েছে,
তাঁর কাব্যের গভীর স্থান-কালনির্দিষ্টতা। কিন্তু আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো
অনুবাদের অন্তর্নিহিত সমস্যা---সুকান্তের কবিতার শক্তি অনেকাংশে তার ছন্দ-গতি, তার
সহজবোধ্য অথচ তীক্ষ্ণ শব্দচয়ন, তার আবৃত্তিযোগ্যতার মধ্যে নিহিত, এবং এই গুণাবলি
অনুবাদে সহজে ধরে রাখা কঠিন। একটি কবিতা যখন মূলত তার ধ্বনিগত ও ছন্দোগত শক্তির
ওপর নির্ভরশীল, তখন তার অনুবাদ প্রায়ই মূল রচনার তীব্রতা হারিয়ে ফেলে, নিছক একটি
রাজনৈতিক বার্তার গদ্যানুবাদে পরিণত হয়। এই সমস্যা সুকান্তকে বিশ্বসাহিত্যের
মূলধারায় প্রবেশের ক্ষেত্রে একটি বাস্তব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে, যদিও তাঁর
কাব্যদর্শনের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সমকালীন রাজনৈতিক কবিতার একটি গভীর আত্মীয়তা
রয়েছে, যেমনটি ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে।
শেষ
পর্যন্ত সুকান্ত ভট্টাচার্যের কাব্য বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য ঐতিহাসিক-নান্দনিক
দলিল, যেখানে ব্যক্তিগত কাব্যপ্রতিভা ও সামষ্টিক রাজনৈতিক আন্দোলন এক অবিচ্ছেদ্য
সত্তায় মিশে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও
ঔপনিবেশিক নিপীড়নের ঘনঘোর প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তিনি এমন একটি কাব্যভাষা নির্মাণ
করেছিলেন যা প্রত্যক্ষ, তীক্ষ্ণ, আবেগঘন এবং সুস্পষ্টভাবে শ্রেণিপক্ষপাতী। তিরিশের
আধুনিকতাবাদী কবিদের অন্তর্মুখী নৈরাশ্যবাদ থেকে, রবীন্দ্রনাথের বিমূর্ত মানবতাবাদ
থেকে এবং নজরুলের ব্যক্তিক-রোমান্টিক বিদ্রোহ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কাব্যধারা
তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিপীড়ন কেবল করুণার বিষয়
নয়, সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের আহ্বান। তাঁর কাব্যের
সীমাবদ্ধতা---প্রচারধর্মিতা, শৈল্পিক পরিমিতিবোধের কখনো কখনো অভাব, অকালমৃত্যুজনিত
পরিণতির অসম্পূর্ণতা, নারী-প্রশ্নে তাঁর সীমিত পরিসর---এসব সত্ত্বেও তাঁর কাব্য
বাংলার এক সংকটকালীন মুহূর্তের এমন এক আন্তরিক, তীব্র সাক্ষ্য বহন করে, যা আজও
পাঠকের চেতনায় সমান তীব্রতায় আঘাত করে।
একজন
পাঠক হিসেবে সুকান্তের কবিতার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাও উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতা
পাঠককে কখনও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থাকতে দেয় না---প্রতিটি পঙক্তি যেন
সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, পাঠককে একটি অবস্থান নিতে বাধ্য করে। এই দাবিদার,
প্রায় আগ্রাসী পাঠ-অভিজ্ঞতা আধুনিক সাহিত্য-তত্ত্বে যাকে
"পাঠকের সক্রিয় সংযুক্তি" বলা হয়, তার
একটি চরম উদাহরণ। সুকান্তের কবিতা পড়ার পর নিরুত্তাপ থাকা কঠিন---হয় তা পাঠকের মধ্যে
সহানুভূতি ও ক্রোধ জাগায়, নয়তো তার আপাত সারল্য ও রাজনৈতিক প্রত্যক্ষতার প্রতি
সমালোচনামূলক প্রতিরোধ তৈরি করে। এই দুই প্রতিক্রিয়াই আসলে সুকান্তের কাব্যকৌশলের
সাফল্যের প্রমাণ---তাঁর লক্ষ্য কখনও পাঠকের নিরপেক্ষ নন্দনতাত্ত্বিক উপভোগ ছিল না,
বরং পাঠকের মধ্যে একটি সক্রিয় প্রতিক্রিয়া উদ্রেক করা, তা সহানুভূতির হোক বা
বিতর্কের।
সবশেষে
বলা যায়, সুকান্তকে পাঠ করার সবচেয়ে ফলপ্রসূ পদ্ধতি হলো তাঁকে একইসঙ্গে ঐতিহাসিক
দলিল ও জীবন্ত কাব্যিক অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করা। ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে তিনি
চল্লিশের দশকের বাংলার এক অমূল্য সাক্ষ্য বহন করেন---সেই সময়ের ক্ষুধা, সংগ্রাম ও
আশার এক প্রামাণ্য কাব্যিক নথি। আর জীবন্ত কাব্যিক অভিজ্ঞতা হিসেবে তাঁর কবিতা আজও
প্রাসঙ্গিক থাকে, কারণ ক্ষুধা, শোষণ ও অসাম্যের প্রশ্ন আজও বিশ্বজুড়ে মানুষের
জীবনযাপনের কেন্দ্রীয় বাস্তবতা---সুকান্তের কবিতা তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক
মুহূর্তের সাক্ষ্য নয়, বরং একটি অব্যাহত রাজনৈতিক-নৈতিক প্রশ্নের কাব্যিক
রূপায়ণ, যা প্রতিটি নতুন প্রজন্মের পাঠকের সামনে নতুন করে তার প্রাসঙ্গিকতা
প্রমাণ করে চলে।
সুকান্তকে
মূল্যায়নের সবচেয়ে উপযুক্ত পথ তাঁকে কোনো একরৈখিক মানদণ্ডে---হয় বিশুদ্ধ
নন্দনতাত্ত্বিক প্রতিভা, নয়তো নিছক রাজনৈতিক প্রচারক---আটকে না রেখে, তাঁর
কাব্যকে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ মানুষের
আন্তরিক, জরুরি ও সাহসী উচ্চারণ হিসেবে গ্রহণ করা। তাঁর কবিতায় শিল্প ও রাজনীতির
যে সম্পর্ক নির্মিত হয়েছে, তা কোনো বিমূর্ত তাত্ত্বিক প্রস্তাবনা নয়, বরং এক
জীবিত, রক্তমাংসের অভিজ্ঞতার ফসল---একজন কিশোর যিনি নিজের চোখে ক্ষুধা, মৃত্যু ও
যুদ্ধ দেখেছেন, এবং সেই দেখা থেকে জন্ম নিয়েছে এক আপসহীন কাব্যিক প্রতিজ্ঞা। এই
প্রতিজ্ঞার সততা ও তীব্রতাই সুকান্ত ভট্টাচার্যকে বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে
এমন এক স্থান দিয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে ম্লান হওয়ার বদলে ক্রমশ নতুন নতুন
প্রজন্মের কাছে নতুন তাৎপর্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। একুশ বছরের একটি সংক্ষিপ্ত জীবন,
ছয়-সাত বছরের একটি সীমিত রচনাকাল---তবু এই স্বল্প পরিসরের মধ্যেই সুকান্ত এমন একটি
কাব্যিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা প্রমাণ করে সাহিত্যের গুরুত্ব পরিমাপের
একমাত্র মানদণ্ড পরিমাণ বা সময়ের দৈর্ঘ্য নয়, বরং তার আন্তরিকতা, তীব্রতা ও
ঐতিহাসিক সত্যনিষ্ঠা।