ঋষি অরবিন্দ: বিপ্লবী থেকে বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের রূপকার
দ্বিতীয় পর্ব: বরোদা (১৮৯৩–১৯০৫) কীভাবে গোপনে প্রস্তুত হচ্ছিলেন এক বিপ্লবী?
১৮৯৩ সালে ইংল্যান্ড থেকে ভারতে ফিরে অরবিন্দ ঘোষ সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের চাকরিতে যোগ দেননি। বরং তিনি বরোদা রাজ্যের মহারাজা সয়াজিরাও গায়কোয়াড় তৃতীয়ের প্রশাসনে কাজ শুরু করেন। ইতিহাসের বিচারে এই সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ পরবর্তী প্রায় তেরো বছর (১৮৯৩–১৯০৬) বরোদায় কাটানো সময়ই তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ এবং বিপ্লবী চেতনার ভিত গড়ে তোলে। অনেকেই অরবিন্দের বিপ্লবী জীবনের সূচনা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে ধরেন, কিন্তু স্বীকৃত গবেষক Peter Heehs, K. R. Srinivasa Iyengar এবং A. B. Purani দেখিয়েছেন যে, প্রকৃত প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল বরোদাতেই। এখানেই পাশ্চাত্য শিক্ষায় বেড়ে ওঠা অরবিন্দ প্রথমবার গভীরভাবে ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃত সাহিত্য, উপনিষদ, ভগবদ্গীতা এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনার সঙ্গে পরিচিত হন। পরে তিনি নিজেই লিখেছিলেন, ভারতের আত্মাকে বুঝতে না পারলে ভারতের স্বাধীনতাও সম্ভব নয়।
বরোদা কলেজে অধ্যাপনা এবং পরে উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি অরবিন্দ এক অসাধারণ আত্মশিক্ষার সূচনা করেন। ইংল্যান্ডে দীর্ঘ চৌদ্দ বছর কাটানোর ফলে তাঁর বাংলা ভাষাজ্ঞান প্রায় ছিল না বললেই চলে। দেশে ফিরে তিনি নিয়মিত বাংলা শেখেন, সংস্কৃত অধ্যয়ন করেন এবং মহাভারত, রামায়ণ, উপনিষদ ও গীতা মূল ভাষায় পড়া শুরু করেন। এই সময়েই তাঁর পরিচয় হয় দীনেন্দ্রকুমার রায়ের সঙ্গে, যিনি তাঁকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে দক্ষ করে তুলতে সাহায্য করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই অধ্যয়ন অরবিন্দের রাজনৈতিক চিন্তাকে আমূল বদলে দেয়। ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল আগে থেকেই; কিন্তু বরোদায় তিনি উপলব্ধি করেন যে ভারতের জাতীয়তাবাদের ভিত্তি কেবল রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিকও। এই ধারণাই পরবর্তীকালে তাঁর সমস্ত রাজনৈতিক রচনার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এই সময়েই অরবিন্দ প্রকাশ্যে নয়, গোপনে বিপ্লবী সংগঠনের ভিত্তি নির্মাণে মন দেন। একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, তিনি ১৯০৫ সালের পর হঠাৎ বিপ্লবী হয়ে ওঠেন। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। তাঁর ছোট ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষের স্মৃতিকথা, Peter Heehs-এর গবেষণা এবং The Lives of Sri Aurobindo গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে ১৯০২ সাল থেকেই অরবিন্দ বাংলায় একটি গোপন বিপ্লবী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। তিনি কয়েকবার গোপনে বাংলায় এসে যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (নিরালম্ব স্বামী), বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং অন্যান্য যুবকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। লক্ষ্য ছিল একটিই—ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সশস্ত্র প্রস্তুতি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: ইতিহাসে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে অরবিন্দ একাই অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বরং দলিল থেকে বোঝা যায়, তিনি এই বিপ্লবী ধারার অন্যতম প্রধান মতাদর্শিক অনুপ্রেরণা এবং সংগঠকদের একজন ছিলেন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারে সতীশচন্দ্র বসু, প্রমথনাথ মিত্র, বারীন্দ্রকুমার ঘোষসহ আরও বহু ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
বরোদা পর্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অরবিন্দের রাজনৈতিক লেখনী। ১৮৯৩–৯৪ সালে ইন্দু প্রকাশ পত্রিকায় তিনি ধারাবাহিকভাবে New Lamps for Old নামে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। এই প্রবন্ধমালায় তিনি তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, আবেদন, স্মারকলিপি এবং ব্রিটিশ সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে কোনো জাতি স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না। সেই সময় এই মত ছিল অত্যন্ত সাহসী এবং বিতর্কিত। পরবর্তীকালে ইতিহাসবিদ আর. সি. মজুমদার এই প্রবন্ধগুলিকে ভারতীয় উগ্র জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রাথমিক দলিল বলে অভিহিত করেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয়, তখনও অরবিন্দ প্রকাশ্যে পূর্ণ স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতা হননি; কিন্তু তাঁর চিন্তায় স্বাধীনতার ধারণা ইতিমধ্যেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
অতএব, বরোদার তেরো বছরকে যদি কেবল একটি সরকারি চাকরির সময় বলে মনে করা হয়, তবে তা হবে ইতিহাসের বড় ভুল। এই সময়েই অরবিন্দ একজন পাশ্চাত্য শিক্ষিত মেধাবী যুবক থেকে ভারতীয় সভ্যতার গভীরে প্রবেশ করেন; একজন অধ্যাপক থেকে জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদে রূপান্তরিত হন; এবং একজন প্রশাসনিক কর্মচারী থেকে ভবিষ্যতের বিপ্লবী আন্দোলনের নীরব সংগঠকে পরিণত হন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে তিনি যে বিস্ফোরক রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেবেন, তার বীজ রোপিত হয়েছিল এই বরোদা পর্বেই। ইতিহাস তাই বলে—কলকাতা অরবিন্দকে জাতীয় নেতা বানিয়েছিল, কিন্তু বরোদাই তাঁকে গড়ে তুলেছিল।
(ক্রমশ)
এই পর্বে ব্যবহৃত প্রধান সূত্র
১. Sri Aurobindo, On Himself (Complete Works of Sri Aurobindo)
২. Peter Heehs, The Lives of Sri Aurobindo (Columbia University Press, 2008)
৩. A. B. Purani, The Life of Sri Aurobindo
৪. K. R. Srinivasa Iyengar, Sri Aurobindo: A Biography and a History
৫. Barindra Kumar Ghose, The Tale of My Exile (স্মৃতিকথা; অন্যান্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহারযোগ্য)
৬. Sri Aurobindo, New Lamps for Old (Indu Prakash, 1893–94)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন