কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

দীপক সেনগুপ্ত

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

 

অন্ধকারের দিনলিপি

বিষণ্ণতা মোটেই নিরীহ ব্যাপার নয়। অনেক সময় বিষণ্ণতাই হিংস্রতার জন্ম দেয়। পত্নী করিনার মৃত্যুর পর অর্জন সিং বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন। তবে তার আত্মীয় স্বজনদের মনে হয়েছিল ব্যাপারটা সাময়িক। ওটা কিছু  দিনের মধ্যেই কেটে যাবে। আর একটা বিয়ে দিলে অতি অবশ্যই সেটা পুরোপুরিই কেটে যাবে। কিন্তু সেরকম ঘটলো না। হঠাৎই দেশে ককরোচ আন্দোলন এসে গেলো।

এর আগেই বিষণ্ণ অর্জন সিং মানসিক কারণেই থানা প্রভারির কাছে ফিল্ড ডিউটি থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলো। কতৃপক্ষের সাথে কথা বলে থানা প্রভারি তার সেই সীমাবদ্ধতাকে সহানুভূতি সহ দেখে তাকে হাল্কা কাজের দায়িত্ব দিয়েছিল। কাজটা থানায় বসে বসে। দিন কাটছিল সেভাবেই। কিন্তু হঠাৎ করে দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থান আন্দোলন শুরু করলো ককরোচ জনতা পার্টির ছেলে মেয়েরা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আবার ফিল্ড ডিউটিতে পাঠানো হলো অর্জন সিংকে। শুধু অর্জনকে নয় আরো অনেককেই। আন্দোলনটি ক্রমেই ব্যাপক হচ্ছে। তাকে দমন করতে অনেক অনেক পুলিশ লাগবে। হয়তো বা শুধু পুলিশ দিয়েও হবে না। আরো অনেক রকম ফোর্স ডেপ্লয় করতে হবে। গোয়েন্দাদের ধারণা এটা নেপাল ধাঁচের ছাত্র আন্দোলন। শুরুতেই একে তছনছ করে না দিলে, এরা সরকারের সর্বনাশ ঘটিয়ে দেবে। ওদের কাছে ওপর থেকে নির্দেশ এসেছিল-

- কুচল ডালো শালো কো! 

সেই নির্দেশ মাথায় নিয়ে অর্জনরা সদলে যন্তর মন্তর জমায়েতে হাজির হলো। দেখলো সেখানে অনেক ছেলে মেয়ে উপস্থিত। কারোরই বয়েস বেশি না। কিন্তু চোখে মুখে একধরনের বেপরোয়া ভাব। কিছু একটা অচেনা সংকল্পের দৃঢ়তা। সব মিলিয়ে তারা যেন বড্ড অচেনা। ওদের দেখে অর্জনের তার নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। বহুদিন দেখা হয়নি মেয়েটার সাথে। মায়ের মৃত্যুর পর মামা বাড়িতেই থাকতো সে। তারপর দিদিমার মৃত্যুর পর বর্তমানে থাকে হস্টেলে। পড়ে কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে। আচমকা অর্জনের মনে হয় তার মেয়ের চোখে মুখেও কি এরকম সব ভাব ফুটে ওঠে আজকাল! সেদিন রাতে ডিউটি থেকে ফিরে এসে মেয়েকে ফোন করলো-

- কৈসি হো?

- ঠিক হুঁ পাপা।

- এ ককরোচ পার্টিকা মশলা কে বারে মে জানতি হ্যায় ক্যা?

- হাঁ পাপা। হমারে হস্টেল সে ভি কই লড়কি বঁহা ভাগ লেনে গই হ্যায়।

- আরে ক্যা বোলতি হ্যায়?

- হাঁ পাপা। হস্টেল বালে বো লোগ কো হস্টেল সে নিকাল দিয়া হ্যায়।

- আচ্ছা!?

- ফিরভি ঔর কই লড়কি দিল্লিকে জানে কা মন বনা লি হ্যায়।

- তু কঁহি এ সব চঙ্গুল মে পড় তো নহি গই।

- নহি পাপা। মৈ এ সব সে দূর হি রহতি হুঁ। পর এঁহা বতায়া যা রহা হ্যায় হস্টেল বন্ধ কর দিয়া যায়গা। ঔর সব লড়কিয়ো কো আপনি আপনি ঘর ভেজ দিয়া যায়গা।

- তু চিন্তা মত কর। বৈসি স্থিতি মে মৈ তুঝে মেরে পাশ লে আয়ুঙ্গা।

একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে ফোন রেখে দেয় অর্জন। ঠিক করে কাল থানায় গিয়ে দু দিনের ছুটির জন্য বলতে হবে। কিন্তু থানায় রিপোর্ট করতেই ওদের সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হলো-

- আজ রাত কো ডিউটি দেনা হোগা।

- সর। মুঝে দো দিনকি ছুট্টি চাহিয়ে থা। বেটিকো হস্টেল সে লানে যানা হ্যায়।

- ও সব ফিলহাল ভুল যাও। আর্জেন্ট রাত ডিউটি হ্যায় আজ। যিসে সবকো করনা হি পড়ে গা। নো ছুট্টি।

অর্জন তার মেয়েকে ফোন করে-

- ইধর এক ঝমেলা হো গয়া। তুঝে লানে মৈ আ নহি সকুঙ্গা।

- কোই বাত নেহি পাপা। মৈ খুদ হি আ যাউঙ্গি।

- লেকিন রাতবালি বস নহি পকড়না। সময় ঠিক নহি হ্যায়।

- ঠিক হ্যায় পাপা।

মনে উদ্বেগ নিয়েই রাত ডিউটিতে গেল অর্জন। গিয়ে দেখলো সেখানে অনেক লোকজন। যাদের অধিকাংশই পুলিশ নয়। ওদের যিনি নির্দেশ দিচ্ছেন তাকে দেখেও মনে হলো না যে তিনি পুলিশের লোক। তার ইন্সট্রাকশনগুলো শুনে সেটাই কনফার্ম হয়ে গেলো। তিনি অর্জনদের আদেশ করলেন-

- বর্দি সে অপনা নাম হটা দো। স্টার ভি। উ বচ্চে লোগ বহত শৈতান হ্যায়। বে লোগ কিসি কো পহচান না পায়ে।

সেই রাতে অর্জনদের যা অভিজ্ঞতা হলো তা ভয়ঙ্কর। ভয়াবহ। আর সে সব দেখে শুনে অর্জনের পুরনো ডিপ্রেশনের রোগটা প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। অবস্থার উন্নতি দেখে ডাক্তারের দেওয়া ওষুধগুলো খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল ও। এখন ওর মনে হলো বাড়ি ফিরে সেগুলোকে খুঁজে পেতে বের করে খেতে হবে। ওষুধটার সাইড এফেক্ট আছে। তাই অতিরিক্ত খাওয়া চলে না। কিন্তু এখন যা অবস্থা, খেতেই হবে।

ভোরে ভোরে বাসায় ফিরে এলো অর্জন। ক্লান্তিতে ওর শরীর চলছিল না। গাড়ি থেকে নেমে টলতে টলতে ও ওর ঘরে ঢুকলো। প্রথমেই ছুটে গেল বাথরুমে। সেখানে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করলো। তবুও যেন ঠিক মতো পরিষ্কার হওয়া গেল না। মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেটা ঘরেই বিছানার উপর পড়েছিল। ফোন হাতে নিয়ে অর্জন দেখলো মেয়ের বেশকটি মিসকল। ফোন করে বাবাকে পায়নি। তারপর মেসেজ করেছে। লিখেছে, হস্টেল খালি করার অর্ডার হয়ে গেছে। সে আরো কয়েকজন মেয়ের সাথে বাসে চেপে দিল্লিতে ফিরছে। তার পরের মেসেজটি ইংরাজিতে- We have started.

তারপর- We will reach Delhi, but not before evening. There are many nakabandi on the road. Vigorously checking as well. তারপর একটুকরো ভয়েস মেসেজ।

-পাপা এ লোগ হমে মেসেজ অংরেজি মে করনে বোল রহে হ্যায়। সেন্ড করনেকা পহলে পড়কে চেক কর লেতে হ্যায়। ফির ভেজতে হ্যায়।

দেখে শুনে বিচলিত হয়ে পড়লেও মাথা ঝিমঝিম করতে থাকায় অর্জন আর মাথা ঘামাতে পারে না। ততক্ষণে তিনটে ট্যাবলেট গিলে নিয়েছে। তাই অল্প পরেই ওর ঘুম এসে গেল। ও মরার মতো ঘুমিয়ে পড়লো। ওকে ঠেলে ঠেলে ঘুম ভাঙ্গালো ওর মেয়ে-

- অন্ধেরা হো গয়া। অব তো উঠিয়ে পাপা।

ধড়মড় করে উঠে বসে অর্জন।

- আ গই তু!

- হ্যাঁ। এক ঘন্টা পহলে হি।

- আনে মে তকলিফ তো নহি হুই।

- নহি পাপা।

- ক্যা খাই।

- রাস্তে মে ধাবা মিলা থা। বঁহা রোটি সব্জী খা লি থি।

তারপর টেবিলের উপর ট্যাবলেটের স্ট্রিপগুলো হাতে তুলে নিয়ে ও বলল-

- কিস কি দবা হ্যায় এ?

- ও ডিপ্রেশন কা দবা হ্যায়।

- ডিপ্রেশন?

- হাঁ। কভি কভি হো যাতা হ্যায়। দবা লেনা পড়তা হ্যায়।

হঠাৎ দরজায় করাঘাত পড়ে। কারা চেঁচিয়ে ডাক দেয়-

- ওয়ে অর্জন সিং। রেডি হো লে। চলনা হোগা। অভি। কুইক।

তার মানে আবার আরেকটা ভয়ঙ্কর রাত ডিউটি। যেতেই হলো। আজ সেখানে জমায়েতে আগের রাতের চেয়েও অনেক বেশি ছেলেমেয়ে। তারা গান গাইছে। যার কথাগুলো ব্যাঙ্গাত্মক। সুর আকর্ষণীয়। ওদের হাতের  মোবাইল ফোনগুলোর টর্চলাইট অন করা। ওরা গানের তালে তালে সেই মোবাইলের আলো নাচাচ্ছিল। নিজেরাও নাচছিল। ওরা অবিরাম অর্জনদের দলবলের ছবিও তুলছিল। যদিও অর্জনদের জানানো হয়েছে, এলাকায় জ্যামার লাগানো হয়েছে। এখান থেকে মোবাইলে যোগাযোগ করা সম্ভব নয়। খবর বা ছবি পাঠানোও অসম্ভব।

একটু পরে ছাত্রদের ওপর অর্জনদের এ্যাটাক শুরু হলো। সেটা চললো শেষ রাত পর্যন্ত। সেই রাতে অর্জনও হিংস্র হয়ে উঠেছিল। খুব বিষণ্ণ ছিল অর্জন। আর বিষণ্ণতা কতোটা ভয়ঙ্কর হতে পারে সেটা বুঝতে পারছিল অর্জন। নাকি কিছুই বুঝতে পারছিল না? বোঝা না বোঝার বাইরে চলে গেছিল ওর চেতনা।  সত্যিই এ এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার সময়। যেখানে বোঝা না বোঝা সব একাকার হয়ে গেছে। সময়টাই যেন বোঝা হয়ে মানুষের  ওপর চেপে বসে গেছে।

খুব ভোরে পুলিশের গাড়ি অর্জন সিংকে ওর বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলো। টলতে টলতে ঘরে ঢুকলো ও। আজও ভালো করে স্নান করতে হবে। তারপর কটা ট্যাবলেট খেতে হবে। তারপর মরার মতো ঘুম দেবে।

কিন্তু ঘরে ঢুকে চমকে উঠলো। ওর বিছানায় শুয়ে আছে ওর মেয়ে। আর ওর পাশে বিছানায় পড়ে আছে ট্যাবলেটের খালি স্ট্রিপ। সঙ্গে সঙ্গে দুয়ে দুয়ে চার করে অর্জন বুঝে নিল। তার মেয়ে সবকটা ডিপ্রেশনের ট্যাবলেটই খেয়ে নিয়েছে। কিন্তু কেন? কিস লিয়ে? কিন্তু তার আগে এক্ষুনি মেয়েকে নিয়ে যেতে হবে হাসপাতালে। খতরে মে হ্যায় বেচারি।

অমানুষিক শক্তি অর্জন করে অর্জনের টলমল পা মেয়েকে নিয়ে ছুটতে থাকলো ভোরের অন্ধকারে।

কদিন পরে অর্জন সিং চাকরি থেকে ইস্তফা দেবার জন্য দরখাস্ত জমা করলো। সঙ্গে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট। রিজন সিরিয়াস মেন্টাল ডিজিজ। যে ডাক্তার অর্জনের মেয়ের চিকিৎসা করছিলেন, তিনিই অর্জনের জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেটটা লিখে দিয়েছেন। বাপ বেটিতে নিজেদের দেশের বাড়িতে ফিরে গেছিল পরদিনই।

ততক্ষণে দেশের সরকার এবং প্রশাসন একটা ব্যাপারে হতভম্ব হয়ে গেছিল। জ্যামার লাগিয়ে ইন্টারনেট বন্ধ করেও এই ধুরন্ধর নিউ জেনারেশনদের আটকানো সম্ভব হয়নি। তারা অত্যাচারের দৃশ্য দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। সেরকমই একটা ভিডিও পৌঁছে গেছিল অর্জন সিং এর মেয়ের মোবাইলে। এবং সেখানে একটা দৃশ্যে দেখা গেছিল হিংস্র অর্জন সিং পাগলের মতো লাঠি চালাচ্ছে ছেলে মেয়েদের ওপর। সেসব দেখে ডিপ্রেশনের ট্যাবলেট নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না ওর।

এখন ওরা পালাচ্ছে। কিন্তু ওদের দুজনেরই মন বলছিল, এই পরিস্থিতি নিশ্চয় পাল্টাবে। দৃশ্যটা উল্টে যাবে। তখন পালাতে হবে এই অত্যাচারী শয়তানদের!

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন