কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

জয়িতা ভট্টাচার্য

 

বর্ণমালার সাতকাহন

 


(পর্ব ৪১)

ওইরকম হতো তখন। ঘন শ্রাবণমাসে। গ্রামঘর ঘিরে উড়ত হাজার পোকামাকড়। নারকেলগাছের গা ভিজে। ঝোপ ঝাড় চুপচুপে। তাই বড় বড় পাটকিলে রঙের গাছের পোকা ঘরে ঢুকে পড়ত। মথ ঘর ভর্তি। বড় বড় বিশ্রী ডানার। খাটের তলায় সোনা ব্যাং আর কুনো ব্যাং। কী যে মজা ওদের লাফ দেখে হতো। বড় ব্যাংগুলো থপথপ করে চলত। সাপ অনায়াসে ওদের গিলে নিত। ওদের খোঁজে ঘরে চলে আসতো। আশ্রয় নিতে আসতো। বিষধরেরও আশ্রয় প্রয়োজন হয়। বর্ষার রাতে ঘরের থেকে বাহির বেশি ধ্বনিময় হয়ে যেতো। জোরে জোরে ব্যাং ডাকছে, তক্ষক ডাকছে, ঝিঁঝিঁ পোকার তারস্বর ঝিঞ্ঝিট আর সামনের পুকুরে বড় রুই মাছেদের ঘাই মারার শব্দ। সব মিলিয়ে একটি বালিকার কাছে শ্রাবণ রোমান্টিক তত নয় যতটা বিভীষিকাময়। আমাদের মাটির ঘর পাতা উনুন খড়ের চাল ছিলো না। ওই ঘরগুলোর মাঝে তখন সবে আমার বাবার মত শহরের মানুষ সেখানে জমি কিনে পাকা ঘর তুলেছেন। অল্পবয়সী স্বামী স্ত্রী মিলে কপি টমেটো বেগুন ধনেপাতা কত কিছু লাগিয়েছেন যত্নে। ছাদে লাউএর ঝুলে থাকা। বাড়ির সামনে একটি করবী গাছ। লাইন করে সারিবদ্ধ রজনীগন্ধা আর ঝাউগাছ পরিপাটি করে ছাঁটা। বর্ষায় গোখরো আর দাঁড়াশ, কেউটে আর চন্দ্রবোড়া ঘরে আসত। লাউডগা সাপ ঝুলে থাকত নতুন ইমারতের মার্জিন ধরে ধরে।

আসলে জাত সাপ জলে থাকে না। প্রায় নির্বিষ সাপেরাই জলে থাকে। আমাদের পুকুরধারে কলমির বন, ওখানে জলঢোড়া আসত ভিড় করে আর ঘাটের সিঁড়ির কাছে তেপিয়ার বাচ্চারা দল বেঁধে এসে খলবল করতো। সাপের প্রতি একটা ভালোবাসার আকর্ষণ থেকেই গেছে। পড়ে সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফেরার পথে কতবার দেখেছি সাপের খোলস পড়ে আছে পথের পাশে। রূপকথার মতো সেই সব দিন যাপন শেষ হবার ছিল। তবু নন ডিজিটাল সেই বিশ্বে আমরা প্রচুর কাগজের নৌকো ভাসিয়েছিলাম। আমরা অনেক রাত অবধি উত্তোরণের কথা আলোচনা করতাম। অনেক বেশি সুস্থ চিন্তার কথা বলেছিলাম ওই বর্ষাতেও পরে পরে।

রঙিন মাছের মতো এখন বর্ষার জলের ভেতর দিয়ে এই শহরের একোয়ারিয়ামের ভেতর দিয়ে আমরা যাই ছপছপ করে। পায়ের চাপে কাদা ছিটকে ওঠে। আমাদের মাঝবয়েসের ছাঁট ভিজিয়ে দেয় শরীর। জ্বর হয়। ক্লান্ত হই। এখন গ্রাম কেটে শহর। সব কিছুই পাকাপোক্ত। সেই সব পোকারা আর সরীসৃপেরা কোথায় আশ্রয় পেয়েছে কে জানে। হয়ত অন্য রূপে জন্মেছে ফের। সাপ নেই তাই সাপুড়ে নেই। পেট ফোলা বাঁশিটিও নেই।

রাষ্ট্রময় একটা আনহ্যাপিনেস থৈ থৈ করছে মেঘলা গুমোট সময়কালে। রাত হলে অন্ধকারে মাতামহ রকাছ ঘেঁষে শুয়ে গল্প শুনতাম। জঙ্গলের পশুপাখি সব লাইন করে "যাচ্ছে তো যাচ্ছে" এক বন থেকে অন্য বনে। আর শুনতাম শিকার করার গল্প। মাচার ওপর বসে বিনিদ্র শিকারি। নিচে মরি বাঁধা। বাঘ আসবে। চড়ায় সুন্দরি গাছের শেকড় মাথা তুলে। জানলা দিয়ে ক্ষীণ চাঁদের আলো আসত। সেই সময়ও খাটে করে খালি পায়ে মরা নিয়ে যেতো। বলহরি হরিবোল। নিশুত রাতে সেই আওয়াজ অনেক দূর অবধি চলে যাবার পরেও মিলিয়ে যেতো না। রাস্তাময় সাদা খই ছড়ানো। একবার এরকম রাতে বালিগঞ্জ বাড়ির গলিতে চোর এসেছিল। আমি একা জেগে ছিলাম। জানলা থেকে সরে যাওয়া মুখ পাশের বাড়ির পাইপ বেয়ে ওঠা সবই দেখেছিলাম। বলিনি কাউকে। ছোটোরা খুব ছোটো নয় মনস্তত্বে। সেই সময় যা মনে হতো অনেক বয়সের পরেও সেই ধারণা বদলায়নি। চুরি ডাকাতি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার পরিণাম অন্তত   একাংশে দায়ী এটা মনে হতো। স্বভাবে কম লোকেই ক্রিমিনাল হয় এই ধারণা রয়ে গেছে।

সূর্য তেজ হারালে ছায়া দীর্ঘ। দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টে যায়। মনে হয়। অসহায় মরি। বাঁধা জীবনে পালাবার পথ নেই। কখন বাঘ এসে খাবে। শিকারি ক্রেডিট পাবে। শুধু  ছাগলের মত গরুর মতো দড়িতে বাঁধা আছি জন্মেছি পরের কাজে ব্যবহৃত হতে। মরি। এই তো স্কুলের মাঠ এই তো পেয়ারা গাছে চড়া এই তো কলেজের পথে সিগারেটের ধোঁয়া দোল পূর্ণিমার সুখস্মৃতি এই তো সেদিন, এর মধ্যে অপরাহ্ন এসে গেলো? মন, সে তো একই আছে প্রায়। শুধু ক্ষত বিক্ষত হয়েছে কতবার, হতে হতে জীবনের আলো ম্লান হয়ে গেছে। জীবন মানে কি শুধু এই? হারিয়ে ফেলা? স্মৃতি ওভারল্যাপ করে না বর্তমান এখনও তবু হঠাত সেই পাড়াগেঁয়ে ভুতটা ঘাড়ে বসে পা দোলায় আচমকা। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। তারা হয়ে গেছে চেনা লোকগুলো। এখন অচেনা একটা গ্রহে এসে পড়েছি। আবার রিস্টার্ট করি ল্যাপটপ। গ্যালারি মুছে রাখি। তবু সব জমা থাকে ক্লাউড স্পেসে। শরীরে হরমোন খেলা করে মস্তিষ্কে এলগরিদম।

একেকটা অনুভূতি মানুষকে কিভাবে তাড়া করে বেড়ায়! আমার শাশুড়ি শেষ সময় অবধি সেই গল্প করতেন। সবে বিয়ে হয়েছে। প্রায় বালিকা। নবদ্বীপের মেয়ে কলকাতায় সবে। পার্ক সার্কাসে মেলায় হারিয়ে গেছিলেন। একটি মেয়ে ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে অসহায়। নতুন শহর নতুন বর, ঠিকানা জানা হয়নি। সেই হারিয়ে যাওয়ার আতংক চল্লিশ বছর তাঁর মনে অবিকৃত থেকে গেলো। আমারও কি নয়? ছয় বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়া ইন্দ্রনীল, ফর্সা মুখ ভাসা ভাসা চোখ কোঁকড়া চুল ইন্দ্রনীল। এখনও তাকে ভুলিনি।

ইমোশন মনের ভেতরে অনেক ইল্যুশন সৃষ্টি করে। আজকের তথ্য প্রযুক্তির প্রজন্ম অনেকটাই আবেগ শূন্য। প্র্যাকটিক্যাল। তবু বেড়ে যাচ্ছে আত্মহত্যার প্রবণতা মদ্যপানে  রিলিফ খোঁজার বহর। তবু ওরা ক্রমশ একা। ঝগড়াঝাঁটি নেই, ভালোবাসাও নেই। কেবল বেঁচে থাকা আর সিঁড়ি বেয়ে ওঠা। "জড় নই মৃত নই, নই অন্ধকারের খনিজ আমি তো জীবন্ত প্রাণ আমি এক অঙ্কুরিত বীজ, মাটিতে লালিত ভীরু, শুধু আকাশের ডাকে মেলেছি সন্দিগ্ধ চোখ, স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে আমাকে।" (সুকান্ত ভট্টাচার্য)

(চলবে)

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন