কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

শান্তিরঞ্জন চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

স্বর্গ এসেছে নেমে


 

(২৩)

এ রাজ্য বা দেশ নয়, ছাত্র সংসদ, কিন্তু তার নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন ছাত্রদের মধ্যে যে উত্তেজনা তা উল্লেখ করার মতই বটে! রুদ্রাক্ষ আজ অনুপস্থিত স্বাভাবিক কারণেই। নিজের সাম্রাজ্যের পতন দেখা কারই বা মনে সয়! ওদিকে কলেজের অধিকাংশ ছাত্রের মধ্যে উৎসবের আনন্দ। যথা সময়ে ঘোষিত হল ফলাফল। ফুলের মালা, পুষ্পস্তবক দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ষের ছাত্র প্রতিনিধি স্বাগত জানালো মৃদুলাকে। মনস্বিনী বক্তব্য রাখল সকলের হয়ে। সে বলল, ‘এতদিনে স্বেচ্ছাচারের অবসান ঘটল। এখন থেকে সংসদ সভানেত্রীর সকল কাজের মধ্যেই আমরা দেখতে পাবো ছাত্রমঙ্গলের ভাবনা। আমাদের কর্তব্য হবে সর্বতোভাবে তাঁকে সহযোগিতা করা। মৃদুলা তার প্রথম ভাষণেই জানিয়ে রাখল এখন থেকে সংসদের কাজই হবে ছাত্রদের স্বার্থ দেখা। কোন রকম অসদুপায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না কোনমতে। সংসদের সর্বোচ্চপদে আসীন থাকলেও সে নির্ভর করবে সমবেত আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্তের উপর। হাততালি যেন আর থামতে চায় না। কতদিন পর যেন শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল ছাত্রকুল।

এতবড় একটা সংবাদ থেকে বঞ্চিত রাখা যায় বৈশ্বানরকে! মেসেজ করে জানিয়ে দিল মনস্বিনী মৃদুলার বিরাট জয়ের কথা। প্রত্যুত্তরে মনস্বিনী মারফৎ অভিনন্দন জানিয়ে দিল বৈশ্বানর সদ্য সংসদ সভানেত্রীর আসনে উপবিষ্টা মৃদুলাকে এবং আশা ব্যক্ত করল মৃদুলার নেতৃত্বে সংসদের কার্যপ্রনালী সুষ্ঠুরূপেই চলবে।

এই আনন্দোচ্ছাসের মধ্যে হঠাৎ মৃদুলার খেয়াল হল তার খুব নিকট বন্ধু শঙ্খমালা নেই কেন? এতক্ষণ আনন্দোল্লাসের মধ্যে কেউ খেয়াল করেনি শঙ্খমালার অনুপস্থিতি। মৃদুলা জানতো কোন কারণ বশতঃ একটু দেরীতে এসে পৌঁছোবে শঙ্খমালা, তা বলে এত দেরী! একটা সন্দেহ মোচড় দিয়ে উঠলো মৃদুলার মনে। তবে কি পথে কোন বিপত্তি ঘটলো? মনস্বিনীর সাথে এনিয়ে কথা বলবে বলে এগিয়ে যেতেই নজরে পড়লো রুদ্রাক্ষর দুই সাগরেদ। খুব গোপন কথা চলছে কারোও সঙ্গে এমনই মনে হল মৃদুলার। ওদের কথা আর কার সঙ্গে হতে পারে রুদ্রাক্ষ ছাড়া! তবে কি রুদ্রাক্ষই আছে এর পেছনে? এতটা সাহস কি এখনও অবশিষ্ট আছে ওর মধ্যে। ফোন করেও তো সাড়া পাওয়া যায়নি শঙ্খমালার কাছ থেকে। জয়লাভের দিনেই একটা বিশাল বাধা! একটা কঠিন পরীক্ষাও বলা যেতে পারে। শঙ্খমালা তো কেবলমাত্র বন্ধুই নয় মৃদুলার, বন্ধুত্বের সূত্রে কট্টর সমর্থকও বটে। ওকে বিপদে ফেলে প্রতিশোধের ইচ্ছেটা কিছুটা হলেও পূরণ করে নিতে চাইছে না তো রুদ্রাক্ষ? সাথে বুঝিয়ে দেওয়া, রুদ্রাক্ষর সঙ্গে পাঙ্গা লড়তে গেলে কি হয় দ্যাখ।

না আর সময় নষ্ট নয়। মনস্বিনীর সাথে পরামর্শ করে কয়েকজন বন্ধু সমর্থক নিয়ে ওই দুই সাগ্‌রেদকে ইউনিয়ন রুমে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে ঢুকিয়ে নিল মৃদুলা। সোজাসুজি প্রশ্ন করল, ‘শঙ্খমালাকে কেন আটকে রেখেছিস তোরা? রুদ্রাক্ষকে এক্ষুণি বল ওকে ছেড়ে দিতে নয়তো থানায় খবর দিয়ে এক্ষুণি অ্যারেষ্ট করিয়ে দেবো, দেখবি, ফিউচারে আর চাকরী করে খেতে হবে না, এখন বল কি করবি’। ভয় পেয়ে গেল ওরা। ভাবল বুঝি, মৃদুলা যদি সত্যি সত্যি থানায় জানিয়ে দেয় তবে তো ভবিষ্যৎ অন্ধকার। পুলিশের খাতায় একবার নাম চড়ে গেলে সরকারী চাকরী আর জুটবে কোনদিন? ওদের মধ্যে একজন ফোনে বলল রুদ্রাক্ষকে, ‘ছেড়ে দাও রুদ্রাক্ষদা নয়তো আমাদের পুলিশে দেবে’। মৃদুলা বলল, ‘ভেবেছিস কি তোরা?হেরে গিয়েও শিক্ষা হয়নি? দুজন ছেলে বন্ধুকে নির্দেশ দিল মৃদুলা, ‘বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড় তোরা, ওদের একজনকে পেছনে বসিয়ে নে, রুদ্রাক্ষ তেড়িবেড়ি করলে ফোন করে দিবি, তারপর যা করার করবো’। ছেলে দুজন তৈরী হয়ে বাইক রেডি করে স্টার্ট দিতে যাবে তখনই দেখা গেল অচেনা কোন একজনের স্কুটি থেকে নেমে গেট দিয়ে ঢুকছে শঙ্খমালা। বাইক রেখে ছুটে গেল ওরা শঙ্খমালার দিকে। শঙ্খমালা হাতের ইশারায় ওদের জানালো, ইউনিয়ন রুমে গিয়ে সব কথা বলবে খুলে। মৃদুলা আর মনস্বিনী জড়িয়ে ধরল ওকে। শঙ্খমালা জানালো, একটা ফোন পাওয়ার পরেই রুদ্রাক্ষ ওর ক্লাবের একটা ছেলেকে দিয়ে ওকে পৌঁছে দিল কলেজ গেটে। কেন ওকে আটকে রেখেছিল রুদ্রাক্ষ জানতে উৎসুক সকলে। শঙ্খমালার কথায়, হারটা হজম করতে পারেনি রুদ্রাক্ষ, তাই ভেবেছিল ওকে আটকে রেখে মৃদুলাকে বুঝিয়ে দেওয়া, রুদ্রাক্ষ চাইলে এখনও অনেক কিছু ঘটিয়ে দিতে পারে। মৃদুলা তাকে ঘিরে থাকা সকলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘পারলো কি’? হাসির লহর বয়ে গেল একটা। সাগরেদ দুজনকে দেখা গেল, তারা মৃদুলাকে কিছু বলবার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। মৃদুলা বলল, ‘এখন যেতে পার তোমরা’। ওরা মৃদুলার দিকে বিনীতভাবে তাকিয়ে বলল, ‘আমাদের তোমার সঙ্গে নিয়ে নাও মৃদুলাদি, বিশ্বাস করো রুদ্রাক্ষদা এতদিন আমাদের ভয় দেখিয়ে যা ইচ্ছে করিয়ে নিয়েছে। আমরা ভুল করেছি, এখন থেকে আমরা তোমার নির্দেশেই সব কাজ করব’। মৃদুলা মিত্রতার হাত বাড়িয়ে দিল ওদের দিকে। প্রথম দিনেই বাজী মাৎ করে দিল মৃদুলা।

 

(২৪)

 

এদিকে কুন্তলা দেখল, বৈশ্বানরের অনুপস্থিতিতে যদি মনস্বিনীর বিয়েটা দিয়ে দেওয়া যায় তবে আর কোন ল্যাঠা থাকে না। সকাল সন্ধ্যে মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে বলে বলে উত্যক্ত করে তুলল অনঙ্গবাবুকে। অনঙ্গ সান্যাল রা কাড়েন না। তিনি জানেন, মনস্বিনীর জীবনে একটা ধ্রুব লক্ষ্য আছে। যে মেয়ে নিজের জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে সচেতন তাকে কি করে বলেন তার লক্ষ্য থেকে সরে আসতে! কলেজে মনস্বিনীর শেষ বছর এটি। ভাল রেজাল্ট করার ব্যাপারে অতি মাত্রায় সচেতন সে। পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করছে ল কলেজে ভর্তির সুযোগ। ওদিক থেকে বৈশ্বানর মাঝে মধ্যেই খবর নিচ্ছে, পরীক্ষার প্রস্তুতি কতদূর এগোলো। বৈশ্বানর ফিরে আসতে আসতে ল পড়াও শেষ হয়ে যাবে মনস্বিনীর। তারপর? মনস্বিনীর মনে পড়ে যায় কবি সুকান্তর ছাড়পত্র কবিতার বিখ্যাত সেই লাইনটি, ‘প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল’। জানে না সে,অধঃপতিত সমাজকে ঊর্ধমুখী করে তুলতে কতদূর সমর্থ হবে বৈশ্বানর ও তার মিলিত প্রচেষ্টা, তা বলে নৈরাশ্যের শূন্যদৃষ্টি মেলে বসে থাকার পাত্রীও নয় সে। রামায়ণের ছোট্ট কাঠবিড়ালিটির মত সমাজ পুণর্গঠনে তার বা তাদের যে প্রয়াস তা নগন্য হলেও তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে সবার কাছে, শামিল করতে হবে সমমনষ্ক মানুষদের তাদের কর্মকান্ডে।

মেয়েরা প্রমাণ করে দিচ্ছে তারা অপরিহার্য সমাজ বা রাষ্ট্রের যে কোন গঠনমূলক কর্মে কিন্তু তারা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী মর্যাদা বা প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি এখনো। মেয়েদের কোন কালেই যোগ্য মর্যাদা দেয়নি পুরুষশাসিত সমাজ। সর্বকালেই মেয়েরা সফট্ টার্গেট। ইতিহাসে ভুড়ি ভুড়ি প্রমাণ আছে তার। কোন বিজিত রাজ্য বা রাষ্ট্রের নারীকুল জয়ীপক্ষের সৈন্যদের ভোগ্যবস্তু চাকুরীস্থলে বসের যৌনাকাঙ্ক্ষার শিকার, ঘরে বাইরে নানাভাবে ধর্ষিতা তারা। কোন ধর্ষিত মেয়েকে আজও দায়ী করা হয় তার পোশাক বা চাল চলনের ওজর দেখিয়ে। মনস্বিনী অবশ্য এই দুটি ব্যাপারেই শালীনতার পক্ষপাতি। স্বাধীনতার অর্থ কখনোই যথেচ্ছাচার হতে পারে না। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে শালীন ও  সংযমী হতে শেখায়, তার মধ্যে রুচিবোধ জাগায়। শিক্ষা যদি কেবল ডিগ্রিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে তবে ওই শালীনতা, সংযম, রুচি শব্দগুলি তাদের মর্যাদা হারায়। মনস্বিনীর চোখে বর্তমান সমাজ পঙ্গুত্বের শিকার। ন্যায়নীতিবিহীন সমাজে ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। এত কিছু নেতীবাচক ভাবনার মধ্যেও আশা হারায় না সে। সে বিশ্বাস করে, অবক্ষয়িত সমাজ একদিন নিজের ভুল বুঝতে পারবে, ঘুরে দাঁড়াবে সেদিন হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধারের মানসে। মৃদুলাকে বলে রেখেছে মনস্বিনী, কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে দেখাতে হবে, মেয়েদের অসাধ্য কিছু নেই। তারা যেমন পারে একটি ভাঙা সংসারকে জোড়া লাগাতে তেমনি পারে তছনছ হয়ে যাওয়া একটি সংসদকে তার পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে।  ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে কোন উমেদারি, কোন উৎকোচ বরদাস্ত করা হবে না। সামগ্রিক ভাবে ছাত্রকল্যাণের  কথা মাথায় রেখে কাজ করে যেতে হবে যাতে সংসদের প্রতি ছাত্রদের হারানো আস্থা ফিরে আসে। রুদ্রাক্ষ বাধা সৃষ্টি করতেই পারে কিন্তু অনমনীয় দৃঢ়তায় তাকে নস্যাৎ করে দিতে হবে। মনস্বিনী হয়তো সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে না তা বলে প্রয়োজনে হাত গুটিয়ে বসেও থাকবে না সে। যেহেতু সাংসদদেরমধ্যে মেয়েরাই বেশী সংখ্যায় তাই তাদের সজাগ থাকতে হবে যে কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবার জন্য। মৃদুলা যে তৎপরতায় ও উপস্থিত বুদ্ধির প্রয়োগে শঙ্খমালাকে মুক্ত করে এনেছিল রুদ্রাক্ষর হাত থেকে তাতে অবিশ্বাসের কোন অবকাশ নেই যে সে পারবে সংসদকে মসৃণভাবে পরিচালনা করতে। মনস্বিনীর আপাততঃ আর কোন ব্যস্ততা নেই নিজের পরীক্ষার প্রস্তুতি ছাড়া।

 

(ক্রমশ)

 

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন