কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

অচিন্ত্য দাস

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫০

 

জায়া জননী

আমি যে ছোট্ট ট্রাকটিতে বসে আছি সেটা দেখলে কেউ বলবে না এর ভেতরে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, দূরপাল্লার রাইফেল ইত্যাদি থাকতে পারে। অপরাধ-দমন শাখার উঁচু দিকের অফিসার আমি, বহু এনকাউন্টার করেছি। সঙ্গে আছে দুটি বিশ্বস্ত অনুচর আর ড্রাইভার। হাইওয়ে ধরে প্রায় তিনঘণ্টা ধাওয়া করে এই রাত দশটায় কেশবলালের মোটর-সাইকেল দেখতে পেয়েছি। কেশবলাল বিখ্যাত চরিত্র। আজ সে এটিএম ভেঙে পনেরো লাখ লুট করেছে। বাধা দিতে আসা চৌকিদারটি খুন হয়েছে তার হাতে।

কেশবলালের হাঁড়ির খবর সব আমরা জানি। আপন বলতে তার মা আর বৌ। দুজনের একেবারে পটে না। তাই আলাদা জায়গায় থাকে। তবে প্রায় একবছর পুলিশের তাড়া খেয়ে কেশবলাল রোজগার করতে পারেনি। মা বৌ দুজনেই চরম অর্থকষ্টে আছে।

কেশবলালের সঙ্গে ইদানীং কিছু আতঙ্কবাদীর যোগাযোগের খবর আসাতে এনকাউণ্টারের আদেশ হয়েছে।

ড্রাইভারকে বললাম, “অত কাছে না গিয়ে তিন-চারশ মিটার দূরে থাকো। টের পেলে জঙ্গলে গা ঢাকা দেবে। কেশবলাল জানে আমরা পিছু নিয়েছি আর বন্দুকের আওতায় পেলে ওকে আমরা গুলি করব। শিকার আমার হাতের মুঠোয় – মনে মনে বললাম, “ওরে কেশবলাল তোর আয়ু আর মিনিট পনেরোর বেশি নয় – ‘নাম লহ দেবতার, দেরি তব নাই আর…”

হাইওয়ে মাঠের ওপর এসে পড়ল। দু-পাশে শস্য কেটে নেওয়া হেমন্তের মাঠ। হালকা চাঁদের আলো।  আড়াল-আবডালহীন এই রাস্তা কেশবলালের জন্য ভীষণ অসুবিধেজনক। সময় এসে গেছে – এবার রাইফেলের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাবে।

আরে এটা কেমন চাল চালছে কেশব! বাইক থামাচ্ছে যে! ম্যাপে দেখলাম, সামনে একটা তেমাথা আসবে, সেখান থেকে দুদিকে দুটো সরু রাস্তা। ম্যাপ বড় করে দুদিকের গ্রামগুলোর নাম চোখে পড়ল। এবারে কেশবলাল সংক্রান্ত তথ্যগুলো ফোনের পর্দায় একবার ঝালিয়ে নিতেই বুঝলাম ব্যাপারটা।

কেশবলাল এতক্ষণে টের পেয়ে গেছে। তবু সে মোটর-সাইকেল দাঁড় করিয়ে গাছের আড়াল নিল। আর তেমন অসুবিধে নেই আমার, কয়েক সেকেণ্ড লাগবে ওখানে যেতে, তারপর …

তা হলেও তীব্র এক কৌতূহল আমাকে চেপে ধরল। বললাম, “রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করাও, ভাব করো যেন কিছু একটা খারাপ হয়েছে…”

ড্রাইভার কারণ না বুঝলেও যা বললাম তাই করল।

কেশবলালকে লক্ষ্য করতে লাগলাম। ডানদিকের রাস্তা গেছে সেই গ্রামে যেখানে তার বৌ থাকে। আর বাঁদিকে তার মা। কেশবলাল জানে দুই রাস্তায় দুটো ঘরে যাবার সময় তার নেই। অনেক আগেই আমরা তাকে মারব। যদি কোনোরকমে একটাতে পৌছোতে পারে! মা আর বৌ দুজনেরই নিদারুণ দারিদ্র। আর  তার বাইকের ডিকিতে কড়কড়ে পনেরো লাখ।

আমার ইনফ্রারেড দূরবীণটা দিয়ে অন্ধকারে প্রায় সবই স্পষ্ট দেখা যায়। দেখলাম, ক্ষিপ্রগতি দুঃসাহসী কেশবলাল থমকে দাঁড়িয়ে কাঁপা হাতে সিগারেট ধরালো। সহস্রাধিক বছরের যে দ্বন্দ্বে পুরুষজাতি দ্বিধান্বিত, সেই চিরন্তন টানা-পড়েন কেশবলালের মন ফালাফালা করে দিচ্ছে।

তাড়াহুড়ো না করে দূরবীণ চোখে কেশবলালকে দেখতে লাগলাম। জীবনের শেষ দশটা মিনিটে সে কার কাছে যেতে চাইবে? জায়া না জননী…

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন