| সমকালীন ছোটগল্প |
দুটি পথ দেখি দুটি দিকে গেল বেঁকে
রোজই দুজনকে দেখি। লোকালে যাত্রীদের কামরা আর বসার জায়গা মোটামুটি ঠিক করাই থাকে, বরং নতুন যাত্রী এলে জায়গা খালি থাকলেও তাকে বসার খুব একটা জায়গা দেওয়া হয় না। অবশ্য বয়ষ্কদের কথা আলাদা হতে পারে। দলবেঁধে তাস খেলা, একই ভাঁড় থেকে চা শেয়ার করা, উত্তেজিত গলায় রাজনীতি চটকানো, পারিবারিক খোঁজখবর দেওয়া নেওয়া - এ সবের জন্যেই এদের সিটগুলো সংরক্ষিত থাকে, একটি পরিবারের মতই।
আমার উল্টোদিকেই দুজন বসে আসছে বরাবর। ট্রেনের ঝাঁকুনি আর শব্দের মধ্যে দিয়েও ওদের বেশীরভাগ কথা শোনা যায়, আমি যে খুব উৎসুক তা নয়, তবে সাধারণত: ওরা পারিপার্শ্বিক মানুষ জনের কোন ভ্রূক্ষেপ করে না। বয়সে ছোট বলে আর ওদের শিশুসুলভ সরল মুখের জন্যে সবাই ওদের স্নেহের চোখেই দেখে। ব্যস্ত না থাকলে, আমি কখনো সখনো ওদের পরামর্শও দিয়েছি নিজের বুদ্ধিমত, ওরা খুশিই হয় বলে মনে হয়। ওদের তো ভেতরে এক বাইরে আরেক স্বভাব নয়, আমাদের পোড়খাওয়া পাকা অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতেই পারি - এরা একেবারে স্বচ্ছ আয়না। এ ওর কাঁধে মাথা রেখে কবিতা পড়া, ঠোঙার চানাচুর নিয়ে খুনসুটি, কানে হঠাৎ করে ফুঁ দেওয়া, এসব কান্ড সবার উপস্থিতিতেই নির্বিকারভাবে করতো ওরা কোন জড়তা ছাড়াই। ওদের প্রশ্নাতীত সারল্য দেখে মজাই লাগত আমাদের। মধ্যস্থতাও করেছি কখনও ওদের মেকী ঝগড়া যখন তুঙ্গে উঠত।
“এই, কাল শনিবার সন্ধ্যেবেলায় আমরা যাচ্ছি তো রবীন্দ্র সদনে, সাড়ে ছ’টায় শুরু কিন্তু।” কিয়ার গলায় আত্মবিশ্বাস।
“সদনে! কেন?”
“বলেছিলে না সবুজ মিত্রের একক অনুষ্ঠান আছে!”
“বলেছিলাম নাকি? কাল বললে না কেন, আজ সকালেই তো সায়ন্তীর সংগে শনিবার শপিং আর মোকাম্বোতে ডিনারে যাওয়া ঠিক হল। এখনই ওকে না বলি কী করে?”
“অসম্ভব, ওটা তো হবেই না। পোষ্টার দেখে অনেক আগে থেকেই আমরা ঠিক করেছিলাম আমরা শুনতে যাব। এখন কে না কে সায়ন্তী উড়ে এসে আমাদের প্ল্যান বানচাল করবে নাকি?”
“ওরকম বোল না কিয়া, ও মাত্র কয়েকদিনের জন্যে এসেছে, আর এখানে ওর ভরসা একমাত্র আমিই। ছোটবেলা থেকেই জানাশোনা, একটা সন্ধ্যা আমরা নিশ্চয়ই ওর জন্যে স্পেয়ার করতে পারি!”
“ওহ্, নিশ্চয়ই। মানে নিশ্চয়ই বিশেষ জানাশোনা? তোমার মনে নেই বোধহয় আমি কতবার তোমার ইচ্ছে রাখতে অনেক ঝুঁকি নিয়ে, মা’র কথা অমান্য করে বেরিয়ে এসেছি!”
“সেটা তো আলাদা -
কিয়ার মোবাইলে রেজওয়ানার মধুর গলা বেজে উঠল, আমি তোমার প্রেমে হবো সবার কলঙ্কভাগী, ওটাই ওর রিংটোন। মন-কেমন করা নিবেদন। সাধারণত তোলে না কিয়া, কিন্তু আজকের কলটা ও নিলো। হয়তো একটু সময় নেবার জন্যই।
“হ্যালো!”
“ও জয়, সো সুইট্, কেমন আছো, কবে কখন পৌঁছেছো কোলকাতায়?” একরাশ খুশী ঝরে পড়ল কিয়ার শরীরে। “ফোন করোনি কেন যতই কাজ থাকুক। একসময় তো বাধা বিপত্তির মধ্যেও দিনে তিন চারবার ফোন না করলে নাকি তোমার চলতো না! কেবল আমার গলাটা শুনবে বলেই?”
“সারপ্রাইজ দেবে ভাবলে, আশ্চর্য, মনটা একটুও খুঁত খুঁত করল না? ওয়েসিসে টেবল বুক করেছ মানে - কবে, কখন? আমাকে না বলেই? ওফ্!”
“কাল? শনিবার সন্ধ্যে? না না, কাল তো হবেই না, সরি জয়, কালই ব্যস্ত আছি রবীন্দ্র সদনে যাব। রোববার করো না প্লিজ!”
“এ মা, রোববার সকাল দশটায় ফ্লাইট? তাহলে তো তোমাকে সকাল সাতটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে হবে। সোজা টেক্সাস? তাহ’লে? এতো বছর পরে দেশে এলে, দেখা হবে না জয়?”
কাতর অসহায়তার বন্যা উপছে পড়ল স্বরে, সায়নের জলজ্যান্ত উপস্থিতি গ্রাহ্যের মধ্যে একেবারেই নেই।
কিয়ার গলায় এখন হতাশা চরমে, চোখে মেঘের ছায়া, অসহায় শরীরটা একটু সামনে ঝুঁকে পড়েছে - অকৃত্রিম অনিশ্চয়তা।
“আমি তবে রোববারে এয়ারপোর্টে যাবো, একটু দেরী হলেও তুমি এনট্রেন্সেই দাঁড়িয়ে থাকবে কিন্তু!”
নিমেষে মুখের ভঙ্গি পাল্টে গেল, বুঝিয়ে দিল, ওপারে লাইন হঠাৎই কেটে দেওয়া হল। নিরাশ, নিরুপায় মসৃণ হাতদুটো মোবাইলটা আঁকড়ে ধরে ধীরে ধীরে কোলের ওপর এসে পড়ল। বিশাল পল্লবে ছাওয়া পাতা দুটি আস্তে আস্তে চোখের ওপর নেমে এলো।
তাকিয়ে দেখলাম - সায়নের ভুরু সর্পিল, কোঁচকানো চোখের বিভ্রান্ত দৃষ্টি জানলার বাইরে। স্পষ্ট রাগ আর বিরক্তির চিহ্ন।
পরের সোম মঙ্গল দুটো দিন দেখে নিয়ে বুধবার থেকেই ওদের সিট দুটি অন্য দুই যাত্রীর জন্যে বরাদ্দ হয়ে গেল।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন