কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

 

কবিতার কালিমাটি ১৬০

 

গ্রুভের ভেতর রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ সত্যিসত্যি পৃথিবী ছেড়ে যাননি। মৃত্যু তাঁর শরীরকে ভস্মধূসরতায় অদৃশ্য করে তুলেছে, কিন্তু তাঁর স্বরময় অস্তিত্ব জেগে আছে — একটি কণ্ঠস্বর কিংবা বিশেষ পঙ্‌ক্তিমালার দীপ্তি তাঁর মূর্ততা নিশ্চিত করে।

কমপ্যাক্ট ডিস্কের বৃত্তাকার গ্রুভে ছড়িয়ে পড়ে লেজার রশ্মি। আলোর আবর্তনে জেগে ওঠে নিদ্রিত ধ্বনি। যন্ত্রটির প্রায় নিঃশব্দ ঘূর্ণনের সাথে ঘরে প্রবেশ করেন রবীন্দ্রনাথ।

তিনি আমাদের পাশে স্থির হয়ে বসেন। ঋতু গুহ তাঁর প্রথম অ্যালবাম থেকে গান গেয়ে চলেছেন। তাঁর তরুণ কণ্ঠ রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে কোনো সায়াহ্ন-স্মৃতি যা পরজ-বসন্তের স্বরবিন্যাসে বিকম্পিত।

আমি একবার রবীন্দ্রনাথের দিকে তাকাই। পরমুহূর্তে পাশে বসে থাকা বন্ধুটির শিহরন উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। স্রষ্টা ও শ্রোতার ভেতর দিয়ে একই সঙ্গীত সমান দীপ্তি ছড়িয়ে প্রবাহিত হচ্ছে দেখে আমি বিমুগ্ধ হয়ে পড়ি।

কয়েকটি গানের পরে ধ্বনিত হল 'গভীর রজনী নামিল হৃদয়ে'। প্রথম পঙ্ক্তি ঘরটির ভেতর নিঃশব্দ অন্ধকার ছড়িয়ে দিল। ক্রমে অন্ধকার করোনারি ধমনির প্রবাহের সাথে মিশে যেতে লাগল।

রবীন্দ্রনাথের মুখ একটি ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। অনন্তনিদ্রার পর প্রিয় রমণী মেঘের ছায়ায় রূপান্তরিত হয়। এ কি তবে মৃণালিনী? এত কাল পেরিয়েও কি তাঁর প্রস্থান কবির হৃদয়কে বিমর্ষ করে তোলে?

অসীম দূরত্বের কালান্তক প্রভাব নেই। অদৃশ্য গৃহে প্রিয় মানুষ বারবার ফিরে আসেন। তাঁর স্পর্শ কিংবা সংলাপের স্নিগ্ধতা কবিতা-গানে মূর্ত হয়ে ওঠে।

সুরস্রষ্টার মুখে শুধু বিষাদ নয়, নীরব তৃপ্তিরেখাও স্থির হয়ে আছে। শতাব্দী পেরিয়ে তাঁর গান শিল্পীকণ্ঠে সংবেদ্য হয়ে উঠেছে। তিনি জেনেছিলেন সুরবহ্নির নির্বাণ নেই—তাঁর বোধ হয়েছে উত্তীর্ণ।

ঋতু গুহ গেয়ে চলেন অপরিসীম মমতায়। প্রতিটি সুরের শরীরে রবীন্দ্রনাথ যে সূক্ষ্ম চেতনা মুদ্রিত রেখেছিলেন, সেগুলো নিমফুলের কোমল আলো বিকিরণ করতে থাকে।

গভীরতম নৈঃশব্দ্যের নীলত্ব উন্মোচনে একটি গানের কয়েকটি শব্দই যথেষ্ট। ঋতু গুহের কণ্ঠ থেকে একটির পর একটি স্বর ঝরে পড়ে, আর আমাদের ভেতরের সূক্ষ্ম স্রোতে তা স্পন্দিত হতে থাকে।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের স্রোতের প্রতিধ্বনি শোনেন। মানুষের বেঁচে থাকার অস্থির যাত্রা থেকে তিনি নিজেকে মুক্ত করেন।

পৃথিবীর কোলাহল ক্রমে দূরে সরে যায়। রবীন্দ্রনাথ বাসনাদীপ্ত প্রহর অতিক্রম করে নিজের গন্তব্য স্থির করেন।

তিনি তাঁর সত্তার গভীরে প্রবেশ করেন; আশ্চর্য একটি কক্ষের দরজা খুলে স্তব্ধতার মুখোমুখি হন — একটি প্রদীপ তাঁকে স্বাগত জানায়।

তিনি প্রদীপের দিকে এগিয়ে যান — শিখার শুভ্রতায় দ্রবীভূত হতে থাকে প্রেম ও বিচ্ছেদের চেতনা। একাত্ম হয়ে ওঠেন প্রেমিক ও যোগসাধক।

রবীন্দ্রনাথ অরূপ সৌন্দর্যের ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে শান্তি অন্বেষণ করেন। কমপ্যাক্ট ডিস্ক ঘুরে ঘুরে আকাশ সৃষ্টি করে; ঋতু গুহর কণ্ঠ আকাশের বিস্তৃত পথরেখায় ভেসে যায়।

 

অরণ্যপথে কণ্ঠসত্তা

কোলাহলের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠস্বর আমাকে ডেকে নিয়ে যায় এমন এক অরণ্যের দিকে, যেখানে নৈঃশব্দ্য আড়মোড়া ভেঙে উঠেছে। পৃথিবীর বিপুল ঔদাস্য কখনো যাত্রার জন্য অনুকূল হয়ে ওঠে। প্রায় নিশ্চিহ্ন একটি পথের দিকে আমরা উড়ে চলি।

আকাশের নিচে জনাকীর্ণ পথ, ট্রাফিক ও অপরিকল্পিত ভবন। তবে কণ্ঠস্বরের গতির সাথেই আমার দৃষ্টি গ্রন্থিত।

অসুস্থতার তুষারশৃঙ্গ পেরিয়ে কণ্ঠসত্তা আবার জেগে উঠেছে। মৃত্যু তার শয্যার পাশে নিঃশব্দে শ্বাস ফেলেছে। অথচ আশ্চর্য দীপ্তি নিয়ে সে ফিরে এসেছে নির্মল আকাশে।

পৃথিবীর সকল শরীরে সময় পরিকল্পিত ক্ষতচিহ্ন রেখে যেতে পারে না। বিশ বছর আগের সজীবতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে কণ্ঠসত্তা।

ঝোপঝাড়ে আচ্ছন্ন একটি অরণ্যপথের দিকে সে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ পথের নির্জনতার ভেতর আমরা একটি বিকেলের গভীরতম ধ্বনি খুঁজেছিলাম। কণ্ঠসত্তা জিজ্ঞেস করে, "পথটি চিনতে পেরেছ?”

সে জিজ্ঞেস করার আগে পথটিকে চিনতে পারিনি। তার প্রশ্নের পরেই পথটি অতীত সৌরভ নিয়ে জেগে ওঠে। পথে দৃশ্যমান হয় আমাদের কম্পিত পদছাপ।

এ পথ দিয়েই আমরা হেঁটেছিলাম। আমাদের শরীরে ছিল বেতপাতার শিহরন—দুজনের ভেতরের সামান্য দূরত্ব ডেকে এনেছিল ভেজা পাতার গন্ধ।

পথের শেষে একটি দীঘি। আমরা দীঘি-কিনারে বসে জলে একখণ্ড আকাশের গভীরতা পরিমাপের চেষ্টা করেছিলাম। আমরা কথা বলেছি — উপসংহারের দিকে যেতে পারিনি।

সে এসেছিল আমার সঙ্গে হাঁটবে বলে। খাবার প্রস্তুত করে না খেয়েই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। ক্ষুধার শক্তি আকাশের দৃশ্যের কাছে হয়তো নতি স্বীকার করেছিল।

হয়তো এক ধরনের অস্থিরতাই তাকে অভুক্ত রেখেছিল। এমন কিছু দিন আসে যখন অব্যাখ্যেয় ব্যাকুলতা অন্নকে অস্বীকার করে।

আমি তার সাথে হেঁটেও ক্ষুধা-তৃষ্ণার কিছুই বুঝিনি। দীর্ঘদিন পরে বুঝেছি—আকাশে তখন সন্তাপী জলের সঞ্চরণ।

দীঘিচিত্রিত বিকেল অনেক দূরে সরে গেছে। অরণ্যপথের ওপর ঋতুরা ছড়িয়েছে বিচিত্র রং। প্রকৃত অর্থের খোঁজে ক্ষুধার খবর আজ ঢুকে পড়ে বিগত বিকেলে।

তার সঙ্গে ছিল শুধু কয়েকটি ফক্সেস ক্রিস্টাল ক্যান্ডি। সেগুলো এখন বাস্তবের চেয়েও সমুজ্জ্বল।

দীঘির পাশে বসে এখনও সে একটি ক্যান্ডির মোড়ক খোলে; অরণ্যের নৈঃশব্দ্যের ভেতর মিশে যায় মোড়কের মৃদু শব্দ।

বিশ বছরের ওপার থেকে কণ্ঠসত্তা আবার ডেকে ওঠে। আমি অরণ্যপথ কিংবা দীঘিটিকে চিনতে পারি—আমি তাদের দিকে উড়ে যাই। সেই বিকেলের কাছে আর পৌঁছতে পারি না।

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন