কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

প্রশান্ত গুহমজুমদার

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫০

 

শব্দ

সমস্যাটা শব্দের।

অতনু আর তার বিরাশি বছরের মা যে আবাসনে থাকেন, তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন। সময়ের চিহ্ন তার সারা শরীরে। এমন কি ভিতরের কলকব্জাও ঠিক নেই। প্রায় প্রতি মাসেই কিছু না কিছু কোমড় ভেঙে বসে পড়ছে। আজ জেনারেটার, কাল লিফট, তারপর সিসি ক্যামেরা, ওয়ারিং। সাইনবোর্ড বহুদিন হল নিভে গ্যাছে। প্ল্যাস্টিকের ফেস্টুনে কোনক্রমে পরিচয় রক্ষা করা হয়েছে। দেয়ালের রঙ কী ছিল, বোঝার উপায় নেই। পলেস্তারার আয়ু ফুরিয়েছে বহুদিন প্রায়ই এখান-ওখানে খুলে পড়ছে। দু চারবার মানুষের গায়েও পড়েছে। বট অশ্বত্থ পছন্দমতো জায়গা পেয়ে দিব্যি বংশবৃদ্ধি করে চলেছে। জলের ট্যাঙ্ক সবুজ শ্যাওলায় ক্রমে ভারী দৃষ্টিনন্দন। জলের মেশিনও মাঝেমধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। বোধহয় তার ক্লান্তি আসে। কতো দিন আর তুলবে জল! পৌরসভা জলের লাইন দিতে চাইছে। কিন্তু আবাসন নিতে পারছে না। কী করে নেবে! পুরনো ভৃত্যের উপরেই তার যতো ভরসা। তাছাড়া নতুন জলের লাইন করা, মেশিন কেনা, সেও এক ঝকমারি ব্যাপার। কমিটি একটা আছে। দু বছর অন্তর সে কমিটির পদাধিকারী বদলে যায়। যেহেতু আবাসনের নব্বই শতাংশ মানুষ 'সিনিয়র সিটিজেন', তারা- কমিটিতে তাদের পক্ষে কোনক্রমে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়তো সম্ভব, কিন্তু নতুন কোন ভার নেওয়া তাদের পক্ষে বড়োই কষ্টকর।

তবু এই আবাসনের একটাই প্লাস পয়েন্ট শহরের মধ্যে অসাধারণ লোকেশন দু’কামরা আর তিন কামরা মিলিয়ে ২৪টি ফ্ল্যাট। চারটি ফাঁকা। এ’রকম এক ফ্ল্যাট কিনেছেন এক ব্যাঙ্ক এমপ্লয়ী দম্পতি। কিনেছেন, বেশ করেছেন। আবাসনে লোক বাড়লোবৎসারান্তে আবাসনে যে ছোট্ট দুর্গাপুজো হয়, সেখানে অনুদান বাড়লো। কিন্তু সমস্যাটা হল তারপরে।

কিন্তু ফ্ল্যাটটি দীর্ঘদিন যেহেতু ফাঁকা পড়েছিল এবং পূর্বতন মালিকের বিশেষ শখসাধ ছিল না, ফ্ল্যাটটিতে যথেষ্ট মরচে পড়েছিল। এই নবদম্পতি এলেন। এবং শুরু করলেন অত্যাধুনিক রি-মডেলিং এবং ইন্টিরিয়র ডেকোরেশনের যাবতীয় কর্মকান্ড। বিরতিহীন। সে শব্দের যে কতো প্রকার আর কী অসহনীয় প্রহার! মাঝেমধ্যেই কেঁপে কেঁপে উঠছে বৃদ্ধ আবাসন। বাসিন্দারা অস্থির। প্রথমে কথা চালাচালি হল। তারপর সিদ্ধান্ত হল, সম্পাদককে একটা চিঠি লিখতে হবে। সম্পাদক আবার কিছু পুরনোপন্থী। ভার্চুয়াল যোগাযোগে তার যাতায়াতও নেই, পছন্দও করেন না। ষাট পেরিয়ে আসা অতনু যেহেতু ওই ফ্ল্যাটের ঠিক উপরেই থাকেন, তার উপরেই দায়িত্ব পড়লো আবেদনপত্রটি লেখার শব্দের  এই ভয়ঙ্কর নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে অনধিক চারশো শব্দের মধ্যে লিখতে হবে। বিষয়কে যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে তীক্ষ্ণ, রসোত্তীর্ণ ভাষায় সবাই সই করবেন। বিরলকেশ সম্পাদক স্বপনবাবু বিচক্ষণ, রসিক। এমন ভাষায় তিনি বেশ উদ্যোগী হয়ে উঠবেন, শব্দের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবে বয়স্ক আবাসিকেরা, এমন আশাই করেন সবাই।

অগত্যা কাঁপাকাঁপা হাতে অতনু প্রিয় পার্কারটি নিয়ে ঐ প্রবল শব্দের নির্যাতনের মধ্যেই লিখতে বসলেন।

তার মা তখন পাশের ঘর থেকে সন্ধ্যাবেলার ওষুধটার জন্য কাজের মেয়ে মল্লিকাকে ডাকছেন। কিন্তু শুনবে কে! অতনু-ও অগত্যা মায়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে ডাকলেন ‘মল্লিকা’ ‘ম-ও-ল্লি-ই-কা’।   

 

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন