এক রাজকুমারী ও তার বারো জোড়া সোনার জুতো
লেখিকাঃ ড.মারী লুই ফন ফ্রানৎস মূলগ্রন্থঃ Archetypal Patterns in Fairy Tales (রূপকথায় পুরাবিন্যাসের ধাঁচেরা)
এখন আমাদের কাহিনি রাজার সমস্যা দিয়ে শুরু হচ্ছে না; বরং শুরু হচ্ছে এক নায়ককে দিয়ে যে অবচেতন ভেঙে বেরিয়ে এসেছে আর অভিযানে যাওয়ার কথা ভাবছে। এবং তাই এটিকে খুব আকর্ষণীয়ভাবে অন্যরকম বলে মনে হয়েছে। সাধারণত কাহিনি শুরু হয় একটি দুর্দশাগ্রস্ত রাজত্ব দিয়ে। কিন্তু কখনো কখনো তা শুরু হয় একজন যুবককে দিয়ে যে শুধুমাত্র অভিযাত্রার জন্য বেরিয়ে সেই রাজত্বে যেন হুমড়ি খেয়ে গিয়ে পড়ে। এর জন্যই বারবার এক প্রশ্ন আমার মনে জাগেঃ অবচেতন কি শুধুই প্রতিক্রিয়াশীল? প্রতিটি স্বপ্নই কি চেতনের কোনও সমস্যার ক্ষতিপূরণ বা সান্ত্বনামূলক কার্যই করে থাকে? অথবা অবচেতন কী একটি সৃজনশীল স্বতঃস্ফূর্ততাময় নিহিত-পদার্থ নয় যা ব্যক্তিচেতনের বিভিন্ন পুর্বানুমানগুলিকে সংশোধন করে?
রূপকথা ও পুরাকথাগুলির দিকে দেখলে বলতে হয় যে এরা উভয় কার্যই করে। কখনো কখনো এটি ক্ষতিপূরক হিসাবে কখনো কখনো সৃজনশীলরূপে ক্রিয়া করে। চেতনের কোনকিছুর প্রতিক্রিয়া হিসাবেই যে সবসময় অচেতন ক্রিয়া করবে এমন নয়। অচেতনও নিজে থেকেই কোনও ক্রিয়া করার সমান শক্তি রাখে, জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততার মতোই। এবং এটি আমাদের গল্পের মধ্যে খুবই স্পষ্ট। অচেতন মানস থেকে যুবকটি যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেড়িয়ে এলঃ যেন পৌরুষের শক্তিশালী উদ্যম হিসাবে। এরপর ভাগ্যক্রমে ও কিছু ঘটনার মাধ্যমে চালিত হয়ে ও কৌশল অবলম্বন করে মানসের চেতনের কিছু অসুখের নিরাময়কারী হয়ে উঠল। আমাদের এই গল্পে এই সত্যটির উপর জোর দেওয়া হয়েছে যে, এই শক্তির ক্রিয়া অচেতন ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু করেছে।
আর্নল্ড টয়েনবি পড়লে দেখা যায় যে তিনি একটি প্রত্যয়ী ও চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন যে একটি সভ্যতা যখন উন্নতির দিকে যায় আর যখন তা ধ্বংস হতে বসে তখন পরিস্থিতি কেমন হয়। সভ্যতার গড়ে ওঠার বৈশিষ্ট হল যে তখন জীবনের সকল অংশগুলি যেমন আইন, ধর্ম, রাজনীতি, সামজিক অবস্থা, শিল্প ইত্যাদি সবই একই সুরে বাজে। তারা একইরকম আচরণ করে। যেমন ধরা যাক একেবারে প্রথমদিকের খ্রিষ্টধর্ম ও তার দর্শন। তাকে ভালো লাগুক বা না লাগুক, সে ভালো বা খারাপ যাই মনে হোক না কেন, এটা মানতেই হবে যে এটি তৎকালীন যুগের সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় মূলগত ধর্মীয় ও মানসিক চাহিদা পূরণ করেছিল। তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা একইরকম ছিল। সেই প্রথমদিকের খ্রিষ্টীয় গোষ্ঠীগুলিতে কেউ যেমন চিকিৎসা ও ওষুধ নিয়ে চিন্তিত ছিল না। সেসব বিষয় তারা প্রাচীন রোমীয় ও খ্রিষ্টপূর্ব প্যাগান জনজাতির চিকিৎসকদের হাতেই ছেড়ে দিত। তারা বলত ওষুধ পুরোপুরিভাবেই বিজ্ঞানের বিষয় ও খ্রিষ্টের আবির্ভাবের সঙ্গে তার কোনোই সম্পর্ক নেই।
এভাবে তারা প্রাচীন ঔষধের জ্ঞান ও তার বিরাট সাফল্যকে একবারে যেন জানলা দিয়ে উবে যেতে দিল। সুপ্রাচীন জ্ঞানকে প্রয়োগ করার বদলে তারা মৃতের সমাধিতে শুয়েই তাদের রোগ সারাতে চাইল। নেতিবাচক দিক থেকে দেখলে তাদের এই আচরণ ধ্বংসাত্মক। কিন্তু সদর্থকভাবে দেখলে খ্রিষ্টধর্মের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে আবার মানবজাতির সংস্কৃতি একীভূত হল। যেন একটিই উৎস থেকে সমগ্র মানবজাতির উপর আলো এসে পড়ল আর তাদের সমগ্রতা প্রদান করল। এই একীকরণ এতই ব্যপ্তিশীল যে ব্যক্তিক চেতনাও নিজেকে অপরের সঙ্গে একীভূত করে।
আবার যখন সভ্যতা অবক্ষয়ের দিকে যায় তখন স্বতন্ত্রভাবে বিভক্ত হওয়া পরিলক্ষিত হয়। ব্যবসায়ী সারা সপ্তাহ হাঙরের মতো ব্যবহার করে আর রবিবার গীর্জায় প্রার্থনা করে। সে মনে করে বেঁচে থাকার জন্য তা বাধ্যত করতে হয়। আবার শল্যচিকিৎসক বলে যে অ্যাপেন্ডিক্স কাটা একটি পুরোপুরিভাবে বৈজ্ঞানিক ক্রিয়া যার সঙ্গে ব্যক্তি হিসাবে আমি কি ভাবি বা করি তার কোনও সম্পর্কই নেই। এমনকি আমেরিকা ও ইউরোপে বড় বড় শল্যচিকিৎসকরা এমনকি তার রোগীর নামও জানে না। তাদের সহকারীরা ও সেবিকারা সব তৈরি করে রাখে, তিনি শুধু জীবাণুমুক্ত হয়ে শল্যচিকিৎসার টেবিলে যান আর চিকিৎসা করে চলে আসেন।
আমার পরিচিত একজন চিকিৎসক এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান ও তিনি প্রতিটি শল্যচিকিৎসার আগের সন্ধ্যেবেলা রোগীর সঙ্গে মানবিক আলাপচারিতা করতে শুরু করেন। এবং পরে সংখ্যাতাত্ত্বিক নিরীক্ষা করে দেখা যায় যে সেইসব রোগীদের চিকিৎসায় মৃত্যুর হার অনেকটাই কম। তাই বিভক্ত মনের মানুষেরা যখন বলেন যে এগুলির মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই তখন তা সোজাকথায় সত্যি নয়।
অবক্ষয়িত সমাজে আমরা এমন সব বিভক্তিকরণ দেখতে পাই, প্রতিটি ক্ষেত্রে যার একটি নিয়ন্তা আছে, যার কিছু নিয়ামক চরিত্র আছে, নিজস্ব দলগত ক্রিয়া আছে, ক্রমোচ্চ শ্রেণীবিভাগের মাধ্যমে চরমতম নীতিবোধের নিজস্বতা আছে। যেমন কীনা সামরিক সৈন্যরা যারা অস্ত্র নিয়ে খেলে আর তার ক্রিয়া-কর্ম জানতেই প্রবল ইচ্ছা রেখে থাকে। এমনকি রাশিয়া যেখানে তারা এমন ভাব করে যে মনে হয় তারা এক সাম্যবাদী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা, যেখানে এক জীবনদর্শন, মার্কসবাদী-লেনিনিয় ও ইত্যাদি, সেখানেও আসলে দুটি শক্তির শাসন, সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক শক্তির। অন্যভাবে বললে, এই সামাজিক ব্যবস্থায় বহুবিধ রাজা আছেন। মানুষেরা কুঠুরির মতো বিভক্ত। এটা সেই অবস্থা যখন ব্যক্তির আত্মনের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ নেই, এটা সেই সাধারণ অবস্থা যা স্নায়ুরোগের দিকে নিয়ে যায়।
অচেতন ও আত্মনের সঙ্গে কোন সম্পর্ক না রেখে সবকিছুই যখন যুক্তি ও বাস্তবিকতা দিয়ে নির্ধারিত হয়, যেন এমনই হওয়ার কথা; তখন আমার মতো ত্রিশ বছর ইয়ুঙিয়ান মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করা মানুষেরও কিছু কিছু কুঠুরি থাকে যা এখনও সেই বাণী শোনেনি। এটা ভাবতেই কেমন যেন অবাক লাগে। অনেক ছোট ছোট “রাজত্ব” মানসের মধ্যেই আছে যারা নিজেদের সংঘবদ্ধ করেছে এবং তাদের ছোট ছোট সব নিয়মনীতি আছে; আর তা এতটাই স্বাভাবিকভাবে বিরাজ করছে যে এমনকি তাদের অস্তিত্বই টের পাওয়া যাচ্ছে না।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, ব্যক্তি-রূপায়ন প্রক্রিয়া বা উচ্চতর চেতনের জন্য যত গভীর বা বৃহৎ প্রণোদনা, তত বেশি রাজত্বকে সে একীভূত করে। আমাদের গল্পের নায়ককেই যদি ধরি তো দেখব যে সে এখানে অচেতন থেকে এক উচ্চতর চেতনে যাওয়ার প্রণোদনাকে প্রতীকায়িত করছে। সেই শক্তি শুধুমাত্র একটি রাজত্বকে শাপমুক্ত করে পুনরুদ্ধার করে আর তাকে নতুন জীবনদান করে এই মাত্র না, সে সঙ্গে সঙ্গে আরো কিছু রাজত্বকেও যেন টেনে তোলে যারা কীনা তাদের নিজেদের দোষেই এতদিন বর্জিত অবস্থায় পরে ছিল।
অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিরা তাদের সমস্যা নিয়ে সমীক্ষকের কাছে আসে এবং আন্তরিক সহযোগিতা করে, অন্তত করে বলে নিজেরা মনে করে যখন কীনা তাদের মধ্যের গূঢ়ৈষা বা অ্যানিমা অ্যানিমাসরা সমীক্ষকের কথার কোন পাত্তাই দেয় না। সেইসব সময়ে যদি ঈশ্বরের কৃপায় অচেতন থেকে খুব শক্তিশালী কোন ধাক্কা আসে ধরা যাক কোনো গভীর অর্থবিশিষ্ট ও বিচলিত করে দেয় এমন স্বপ্ন এবং ঈশ্বরের কৃপায় তা যদি এমনভাবে নিজেকে প্রকাশ করে যা আবেগকে নাড়িয়ে দেয় তবেই সেইসব রাজত্বের দেওয়ালগুলো বা প্রতিবন্ধকতাগুলো ভেঙে পড়ে। তখন হয় একটি একীভবন ও ব্যক্তিটি নতুন এক জীবনদর্শনে জেগে ওঠে। কখনও কখনও এসব সম্ভব হয় যখন আত্মন সক্রিয় হয়ে ওঠে, যখন ব্যক্তিত্বের গভীরতম স্তরগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সবসময় আমাদের সেই শক্তি থাকে না যাতে এই অন্তর্দৃষ্টিগুলিকে আমরা ধরে রাখতে ও তাদের ক্রিয়া করে যেতে দিতে পারি।
এটি যেন ধর্মতত্ত্বের সেই প্রাচীন বিবাদের মতো সমস্যা যার বিষয়টি হল কর্ম বনাম কৃপাঃ মানুষ নিজের ভালো কর্ম দ্বারা উদ্ধার পায় না পায় ঈশ্বরের কৃপার দ্বারা? এই বিষয় নিয়ে অনন্তকাল ধরে তর্ক চলছে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় বললে, সমীক্ষকের সঙ্গে সহযোগিতা করে ও সৎ ইচ্ছা নিয়ে চেষ্টা করলেই কি একজন সুস্থ হয়ে উঠতে পারে নাকি আত্মন ও অচেতন যখন নিজে চায় তখনই সে সুস্থ হয়ে ওঠে? মনস্তাত্ত্বিকরাও এর সমাধান পাননি। আমরা শুধু সেই প্রাচীন ধাঁধাকে নতুনভাবে উপস্থাপিত করেছি। যতটা আমি দেখেছি, এদের মধ্যে একটি পারস্পরিক ক্রিয়া আছে, প্রচেষ্টা আর আশীর্বাদঃ এক কে ছেড়ে আরেকজন হয় না, দুজনকেই দরকার পরে। কারণ সমীক্ষক বা সমীক্ষণ করাতে আসা ব্যক্তি কারোর হাতেই সবটা থাকে না। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কোনো উল্লেখযোগ্য ফল না পেয়েও নিরলস ও আন্তরিক অধ্যাবসায়ের সঙ্গে প্রচেষ্টা করে চলা কারোর সব পরিশ্রম কখনও বিফলে যায় না। আবার কিছু কিছু লোকের ক্ষেত্রে অল্প চেষ্টাতেই অচেতন তাকে সব কিছু প্রদান করে। কিছুই তাই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
আমাদের রূপকথায় জোর দেওয়া হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ততার উপর। প্রাথমিক সত্য হল যে যুবকটি অভিযানে বেরিয়ে পরেছিল এবং এটা দ্বিতীয় পর্যায়ের সত্য যে শেষপর্যন্ত সে একটি অসম্পূর্ণতার পরিস্থিতিতে এসে পড়ে। তাকে মনে হয় যেন খুবই অচেতন কারণ সে এটাও জানত না যে সে কী চায়; কাহিনি অনুসারে সে শুধু তার ভাগ্যানুসন্ধানে বেরিয়ে পরেছিল। সে একটি সাধারণ যুবকের মতোই সে ঘরের বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে বিশ্ব ভ্রমণে আর জীবনের অভিজ্ঞতা লাভের জন্য বেরিয়ে পরেছিল। কিন্তু সে ততটা স্বয়ংসম্পূর্ণও ছিল না কারণ তার দরকার পরেছিল সেই বৃদ্ধের যে তার সঙ্গে দেখা করে তার কাছ থেকে খাবার ভিক্ষা চেয়েছিল। তারপর তাকে দিয়েছিল জাদু উপহার, একটি বল ও একটি ছড়ি।
আমি আপনাদের ইয়ুঙের প্রবন্ধ “প্রপঞ্চবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে রূপকথায় আত্মশক্তির উপস্থিতি” পড়তে অনুরোধ করব। সেখানে আপনারা দেখবেন যে যাকে ইয়ুং “আত্মার শক্তি” বলছেন তা পুরাকথার মধ্যে বৃদ্ধের রূপে আবির্ভূত হয়। সে জ্ঞানবৃদ্ধ হতে পারে আবার শয়তানি বৃদ্ধও হতে পারে, কারণ আত্মশক্তির মধ্যে একটি দ্বৈততা রয়েছে। আবার সে কখনো কখনো দুটোই! উদাহরণস্বরূপ বলা যায় অপরসায়নের ধড়িবাজ মারকিউরিয়াসের কথা, যে একইসঙ্গে ভালো ও খারাপ; সামনের ব্যক্তিটির উপর তার চরিত্র নির্ভর করে। ইয়ুং এস্কিমোদের অনেকগুলি কাহিনির উল্লেখ করেছেন যেখানে এক বৃদ্ধ নায়ককে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে এবং তারপর আরেকজন বৃদ্ধ এসে তার সঙ্গে ক্ষতিকারক ব্যবহার করে। কিন্তু আসলে এই গল্পগুলোর চিহ্নগুলোকে ভালোভাবে দেখলে স্পষ্ট বোঝা যাবে যে এই দুই বৃদ্ধ সত্তা বাস্তবে এক ও অভিন্ন। যেন মনে হয় সে বাম হাতে নায়ককে চড় মারছে আর ডান হাত দিয়ে তাকে সাহায্য করছে। সুতরাং আত্মার শক্তি হল একটি শুদ্ধ প্রাকৃতিক ব্যাপার যে বৃদ্ধের রূপ ধরে একইসঙ্গে ভালো ও খারাপ করে চলেছে।
ইয়ুং এই আত্মশক্তি বা বৃদ্ধকে অচেতনের সক্রিয় শক্তিরূপে সংজ্ঞায়িত করেছেন যে প্রতিমাগুলি আবিষ্কার এবং সজ্জায়িত করে। সুতরাং অচেতনে অবস্থিত ইয়ুং বর্ণিত এই আত্মার শক্তি স্বপ্ন বানায়, কারণ স্বপ্ন হল সুনির্দিষ্ট পর্যায়ক্রমে সজ্জিত কিছু প্রতীকী প্রতিমার সারি। এবং আমরা জানি যে ওটা আমরা বানাই না। কেউই স্বপ্ন বানাতে পারে না। দেখার পর যখন আমরা ওটি ব্যাখ্যা করতে বসি তখন বুঝি যে এটি প্রতীকী চিত্রসমূহের অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত সজ্জা যা কেউ বানায়নি। এভাবেই ইয়ুং আত্মশক্তিকে সংজ্ঞায়িত বা বর্ণিত করেছেন।
সুতরাং এটিকে অবচেতনের সক্রিয় বুদ্ধিমত্তাও বলা যায়, অবচেতনের সেই রূপ যার অভিজ্ঞতা আমাদের হতবাক করে দেয় তার বুদ্ধিমান ক্রিয়াকলাপ দিয়ে। এটা শুধুমাত্র স্বপ্নেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা নিজের উপস্থিতি জানায় ভাগ্যের আশ্চর্য সব পরিহাসে, সমাপতনে, এবং সেইসব অভিজ্ঞতায় যেখানে উচ্চতর কোনও বুদ্ধিমত্তা দ্বারা চালিত হয়ে চলেছি এমন অস্বস্তিকর অনুভবে। কখনো কখনো এটি শয়তানি ধড়িবাজ হিসাবে আসে যার প্রভাবে লোকে ধ্বস্ত হয়ে যায়, আবার কখনো কখনো হয়ত সাহায্যকারী শক্তিরূপে, তবে যেভাবেই আসুক আসে হঠাৎ করে। যখন শয়তানি শক্তি হিসাবে আসে, কারণ তখন ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্তই থাকে, আর সেই শয়তান তাকে বেসামাল করে দেয়, মনে হতে থাকে ক্ষতিকর এক বুদ্ধিমত্তা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কাজ করে চলেছে। অন্য সব ব্যাপারে একে সাহায্যকারী বুদ্ধিরূপেও অনুভব করা যায়। সেই জিনিষ যা স্বপ্ন নির্মাণ করে। ঈশ্বরের পুরাবিন্যাস হিসাবে এই সক্রিয় পৌরুষোচিত শক্তি কাজ করে। রূপকথাগুলিতে এটি জ্ঞানবৃদ্ধ বা বামন বুড়ো আকারে ঠিক তখনই আসে যখন প্রবলভাবে সাহায্যের দরকার আর নায়কের কাছে তা থাকে না।
ইয়ুং একটি রূপকথা বলেন যেখানে একটি অনাথ বাচ্চার উপর চরম অত্যাচার হতে থাকে। সে বাড়ি থেকে পাগলের মতো পালিয়ে বেরিয়ে আসে। কিছু পরেই তার বনের মধ্যে খাদ্যহীন অসহায় অবস্থা হয়। হঠাৎ এক বৃদ্ধ তার সামনে উপস্থিত হয় এবং তাকে শুভ উপদেশ দেয় যাতে সে তার মার্গদর্শন পায়। ইয়ুঙের মতানুযায়ী সেই সাহায্যকারী বুড়ো তখনই সক্রিয় হয় যখন চেতনের প্রবলভাবে উপদেশের দরকার কিন্তু নিজে থেকে সে সেই দিশা কিছুতেই পাচ্ছে না। তখনই সেই আধ্যাত্মিক সাহায্য পাওয়া যায় যখন আমরা আমাদের শেষবিন্দু পর্যন্ত সাহসী চেষ্টা করি কিন্তু তাও সমাধান পাই না। শুধু অবচেতনের সাহায্যের আশায় অলসভাবে কাটাতে থাকলে সে তোমাকে নিয়ে শুধু খেলিয়েই যাবে। শেষপর্যন্ত চেষ্টা করেও যখন সামনের সমস্যার প্রাচীর ভেদ করা যায় না, যা হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতার বাইরের কিছু, তখনই এইজাতীয় সাহায্য অবচেতন থেকে বেরিয়ে আসে।
আমাদের গল্পের যুবকটির জীবনের কোনও উদ্দেশ্য বা অন্তর্দৃষ্টি ছিল না। তার ছিল প্রবল কর্মোদ্যোগ কিন্তু যথেষ্ট মননশীলতা ছিল না। তাই নায়ক হিসাবে ‘নির্বাচিত’ তার কাছে মনন এগিয়ে এল। তার যে বিরাট কিছু করার ছিল। তার জন্য যা অভিপ্রেত ছিল তা সেই বুড়োর রূপ ধরে এল, অবচেতনের একটি স্বাধীন প্রতীকরূপে যে যুবকটির কাছে খাবার চেয়েছিল। এরকম অনেক রূপকথায় দেখা যাবে যে সেই ছোট্ট বৃদ্ধ কাঠুরে, অথবা সেই জ্ঞানবৃদ্ধ বা বনবাসী কোনও বৃদ্ধা বা বামন, যারা নায়কের কাছে (সাধারণত গল্পের শুরুতেই) আসে আর খাদ্য প্রার্থনা করে।
অনেকসময় দেখা যায় তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় দুজন খাবার দিতে অস্বীকার করে, তারা নিজের চর্ব-চোষ্য নিজেরাই খেয়ে নেয় ও তারপর শাপগ্রস্ত হয়। সেই বুড়ো বা বামন বা বুড়ি বলে “তোমাদের সর্বনাশ হবে” এবং তাদের তাই হয়। কনিষ্ঠতম ভ্রাতাই বলে যে “ঠিক আছে, আমি আমার খাবার ভাগ করে খেতে প্রস্তুত”। তারপর সে জাদু উপহারগুলি পায়।
আমাদের নায়কেরও সেইরকম বুড়োর ছদ্মবেশী অবচেতনের শক্তিগুলির সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা ছিল। এ সেই ধর্মের মতো যা কিমিয়াবিদ্যার মারকিউরিয়াস দারুণভাবে একটি পুরোনো লেখায় বলেছিল, “আমাকে সাহায্য কর, আমিও তোমাকে সাহায্য করব”। এ যেন অবচেতন বলছে যে, “আমাকে আমার অধিকার, আমার ভাগ দাও, আমিও তোমাকে তোমার ভাগ দেব”; অবচেতনকে তার প্রাপ্য না দিলে, অবচেতনের দিকে যথেষ্ট নজর না দিলে তারও কিছু করার থাকে না”।
জীবনে হয়ত এমন মানুষ দেখে থাকবেন যারা কুড়ি বছর ধরে বাজেরকম স্নায়ুরোগে ভুগছেন, তারা আপনার কাছে এসে তাদের লক্ষণ ও সমস্যাগুলো নিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে যাবে কিন্তু আপনিও জানেন যে তাদের সাহায্য করতে পারে একমাত্র তারাই, যদি তারা তাদের নিজেদের অবচেতনের দিকে গুরুত্বসহকারে তাকায়। কিন্তু তা না করলে একজন সমীক্ষকের কিছুই করার থাকে না। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে তাদের উদার মনোভাবসম্পন্ন হতে হবে, কিছু ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছা থাকতে হবে, কিছু কিছু ত্যাগ করারও। তাদের এমনকি অভিযানে যাওয়ার মতোই কিছুটা মানসিকতা থাকতে হবে যে, না হয় এটাও করে দেখা যাক, কী আর হবে- শুধু তো একটা চেষ্টা ব্যর্থ যাবে, তাহলে নয়ই বা কেন? এইজাতীয় উদারতা দরকার যাতে করে অবচেতন থেকে এই শক্তিরা সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারে।
দেখছেন তো কেমন নোংরা খেলা আমি খেললাম! সেই যুবককে সচেতন মানব সত্তা ধরে নিয়ে আর সে আত্ম-শক্তির সঙ্গে তার যা আছে ভাগ করে নিচ্ছে ভেবে আমিও ফাঁদে পা দিলাম। কিন্তু তা সত্যি নয় কারণ যুবকটিও একটি পুরাবিন্যাসের প্রতিমা আর আত্মন হিসাবে ভাবা সেই বুড়োও পুরাবিন্যাসের প্রতিমাই। সাধারণত রূপকথার মনঃসমীক্ষণ করতে যাওয়া ছাত্ররাই এইধরনের ভুল করে। এবং আমি সচেতনভাবেই এই ভুল করেছি এটা দেখানোর জন্য যে এইধরনের ভুল কীভাবে হয়ে যায়।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন