| সমকালীন ছোটগল্প |
অন্তরীণ
বিচক্ষণ? উচ্চারণে বিরক্তি ঝরে পড়ল শতরূপার। শব্দটা যেন অশ্লীল, শব্দটা যেন আপত্তিকর। আলাপচারিতার এই পর্যায়ে শব্দটার এমন আকস্মিক প্রয়োগ যেন অপমানকর। দেখে শুনে হতভম্ব নবারুণ। শুধুই যদি বিরক্তির প্রকাশ থাকত তাহলে হয়তো এমন হত না তার। আরো কী যেন ছিল। হয়তো প্রতিক্রিয়া বিস্ফোরণের মতন আকস্মিক বলেই পদক্ষেপে সাবধানী হওয়ার সুযোগ পায়নি শতরূপা। এমন ভাবে উচ্চারণ করল ‘বিচক্ষণ’ শব্দটা, যে সেই প্রবল আপত্তির প্রকাশের মধ্যে যেন দূর থেকে ভেসে আসা একটা কান্নার সুরও মিশে ছিল। তাই মুখের উপর রেখাগুলো বারবার কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছিল। অবাক হয়ে তাকিয়েছিল নবারুণ।
হঠাৎ ঘটে গেল ব্যাপারটা। তাই মনের মধ্যে অনুভবকে এত স্পষ্ট করে তখনই পায়নি নবারুণ। ঘনীভূত হতে পারেনি বলে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ব্যাপ্ত ছিল সে আয়তন। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্যমনা অবস্থায় আর একখানা সিগারেট ধরিয়ে ফেলল সে। আগেরটার অবশিষ্টাংশ থেকে তখনো সরু সরু রেখার মতন ধোঁয়া উঠছে। নবারুণের চোখের সামনে বাতাসে নানারকম বিচিত্র বিচিত্র ছবি আঁকা হয়ে যাচ্ছে সেই রেখাগুলিতে। পর মুহূর্তে তা আবার পাল্টে যাচ্ছে। দেখেও তা দেখতে পাচ্ছে না সে।
শতরূপা বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডেকে হুকুম শোনাল, "শরৎ, জানলাগুলো খুলে দাও তো"। কথাটা যেন ধমকের মতন বাজল নবারুণের কানে। তাড়াতাড়ি অ্যাশট্রের মধ্যে গুঁজে নিভিয়ে ফেলতে যাচ্ছিল সিগারেট। শতরূপা যেন আবার ধমক দিয়ে উঠল, "না, না, ক্যারি অন প্লিজ। নিভাতে হবে না। জানলা খুলে দিলে আর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়"। নবারুণ বলল, "না, তবু। আমার খেয়াল করা উচিত ছিল। আমি বরং একটু বাইরে থেকে আসছি"। শতরূপা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল, তারপর মুখের ভাব এতটুকুও পরিবর্তন না করে বলল, "কথা শেষ হোক আগে, তারপর"। নবারুণ ধপ্ করে আবার বসে পড়ল। যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল সে।
তবু মূল অস্বস্তিটা তার কাটল না। হ্যাঁ, সে বলেছে, প্রশংসা করবার জন্যই বলেছে যে শতরূপার সিদ্ধান্তগুলোই প্রমাণ করে সে বিচক্ষণ। এ কথায় যে কারো আপত্তি থাকতে পারে, তা সে ভাবতেও পারেনি। দোষ যদি কিছু হয়েই থাকে, তবে তা হল তার প্রগলভতা। কে জানতে চেয়েছিল তার মতামত যে আগ বাড়িয়ে মন্তব্য করতে গিয়েছে সে! সে এসেছে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এবং শতরূপার ফার্মের ডাক পেয়ে। তার নিজের যে প্রতিষ্ঠার 'মিরেজ', তাকেই চিঠি লিখে ডেকে পাঠিয়েছিল শতরূপার ফার্ম, 'মডার্ন টাইমস'। মিরেজ-এর মালিক হোক বা কর্মচারী হোক, সবই যেহেতু নবারুণ সেন নিজে, তাই তাকেই আসতে হয়েছে। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে শতরূপা যদি তার ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার গল্প কিছু করেই থাকে তো করেছে। ইচ্ছে হয়েছে করেছে। কিন্তু সে নিজে আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের ব্যাপারে নাক গলাতে গেল কেন! বিশেষত সে যখন এসেছে গ্রহীতা হিসেবে, অর্থাৎ নিজের ফার্ম এবং নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে তাকে নিশ্চিত করে তার কাছ থেকে কাজ আদায় করবার জন্য। অন্যজনের নানান কথার কেবল মুগ্ধ শ্রোতা হয়েই তার নিজের ভূমিকা শেষ করা উচিত ছিল। শতরূপা যদি তার চেনা কেউ না হত, তাহলে তো সে তেমনই করত। চেনা কাউকে দেখতে পাওয়ার আশা নিয়ে সে এখানে আসেনি, এখানে এসে দেখতে পেয়েছে তাকে।
একটু ভয় ভয় করছিল নবারুণের। কাজের অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাজনিত ভয় নয়, তেমন পরিস্থিতি তার চেনা বলে সে পরিণতির কথার ভেবে তেমন একটা ভয় করে না এখন। এখনকার এই ভয় অন্যরকমের। শতরূপাকে আজ সেই দেখল অনেকদিন পর। সময় গেলে চেনা মানুষ অচেনা হয়ে পড়ে। লোকমুখে খবর পেত অনেক। আজ যে এমন আকস্মিক নিজের চোখে দেখার সুযোগ এসে যাবে, তা কে জানতো! শুনেছিল অনেক পাল্টে গিয়েছে নাকি শতরূপা, এখন নাকি সে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী একজন। আজ নিজের চোখে দেখার পর বিস্মিত হয়েছে বারবার, কেবল প্রতিষ্ঠার পরিমাপ দেখে নয়, শতরূপার ব্যক্তিত্বের আমূল পরিবর্তন দেখেও। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছে না সে পরিবর্তনের গতিমুখ, তার কতটা ভিতরের আর কতখানি শুধুই বাইরের।
কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল শতরূপা। তারপর আবার বলতে শুরু করল, ওটাকে কখনই বিচক্ষণতা বলে না। ওটাকে বলে জিদ। যা নিজে ঠিক বলে মনে করেছি তা আঁকড়ে ধরে থাকার জিদ। যা মনস্থির করেছি, তাকেই অনুসরণ করবে কর্মসূচি, আর নিজের মন থাকবে নিজের ভিতরে, কখনই বিজ্ঞপ্তির মতন বাইরে টাঙানো থাকবে না। মোদ্দা কথা হল এই যে তার মন অপরের পরিদর্শনের নাগালে থাকবে না। কারো এক্তিয়ার থাকবে না তা পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা কোনো রকম সংশোধন করার। সফলতা যদি কিছু পেয়ে থাকি তবে তা এরই জোরে পেয়েছি।
নবারুণ শুধু সম্মতিবাচক ঘাড় নাড়ল। মুখে কোনো কথা বলল না। মনে মনে জেনে নিয়েছে সে, বলবার অবকাশ তার জন্য নেই। তাই সে কেবল শুনছিল, শুধুই শুনছিল, স্কুলের ক্লাসরুমে কড়া মাস্টারমশাইয়ের শাসনাধীন ছাত্রের মতো। কিন্তু স্কুল মাস্টারের শাসনকাল অতীত হয়ে যাওয়ার পর আর কখনও তাকে এতখানি অনুগত হয়ে থাকতে হয়নি কোথাও। তবে এখন কেন হচ্ছে? ভাবছিল নবারুণ। ছাত্রাবস্থায় মাস্টারমশাইয়ের সুপিরিয়রিটি নিঃশর্তে অনুমোদন করত মন। কিন্তু এখানে? তবে কি এই সুসজ্জিত এবং সুদৃশ্য অফিস ঘরের বৈভবের উজ্জ্বলতা চোখ রাঙিয়ে তার সম্ভ্রম আদায় করছে? নাকি সামনে যাকে দেখতে পাচ্ছে সে শতরূপা বলে? চেনা মুখের অচেনা মানুষ বলে? একদৃষ্টে শতরূপার দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ নবারুণ কেবল যে শুনছিল, তা সত্যি, কিন্তু সে শ্রবণ একান্তভাবেই ভাবনা উপদ্রুত। শতরূপার ব্যবহৃত শব্দ এবং বাক্যবন্ধগুলো কখনও তার ভাবনাকে পাংচুয়েট করছিল এবং কখনও উজ্জীবিত করছিল, কিন্তু তার মর্মার্থ যথাযথ মর্মে পৌঁছাচ্ছিল না। ঠিক এমন সময়ই শতরূপা উচ্চারণ করল, "পেয়েছি যেমন, নিঃস্বও হয়েছি তেমন। যদি বিচক্ষণতা থাকত তাহলে এমন হত না। জিদের জোর ছিল বেশী, তাই বিচক্ষণতা বিবেচনায় আসার পথ পায়নি"। একথা শোনার পরও প্রতিক্রিয়াহীন দৃষ্টিতে শতরূপার দিকে তাকিয়ে ছিল নবারুণ।
শতরূপা জিজ্ঞেস করল, "কী হল? কথা বলছ না যে?" গলার স্বরে অস্পষ্ট বিরক্তি। কিন্তু তা স্পষ্ট হতে বেশী সময় নিল না। কথার উত্তর না পেয়ে উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, "অ্যাম আই হিটিং আ ওয়াল? আর ইউ লস্ট? অন্য কোথাও হারিয়ে গেলে নাকি?
--- না, না, আমি শুনছি। আর্গুমেন্টগুলোর মধ্যে নতুন ভাবনা দেখতে পাচ্ছি, তাই চুপ করে ভাবছি। কথা বললে পাছে ইনটারাপশন হয়, তাই চুপ করে আছি।
--- ভুল করছ। আমি আগেই বলেছি যে আমার মন বিজ্ঞপ্তির মতন বাইরে টাঙানো থাকে না যে বাইরের কেউ কাটাকাটি করে তার ভার্সন পাল্টে দেবে।
--- না, সে দুঃসাহস আমার নেই। আমি কেবল আমার গন্ডির মধ্যে থাকতে চেয়েছি। দেখলাম আমার ভাবনার জগত আলাদা। সেখানে বোল্ডনেস, ডিটারমিনেশন সবই বিচক্ষণতার আবশ্যিক কনস্টিটিউয়েন্ট। কিন্তু এখানে তা মিলছে না দেখলাম।
--- এখানে তা মিলছে না বললে কেমন করে হবে? বলো যে রিয়েলিটির সাথে মিলছে না, কারণ আই অ্যাম স্পেলিং আউট রিয়েলিটি ওনলি।
নবারুণ সম্মতিবাচক মাথা নেড়ে বলল, ইনডিড। শতরূপা তখন পূর্ণোদ্যমে বলতে শুরু করল, "মে বি, ইউ আর রেসপেক্টফুল টু ইউর পার্টিকুলার আইডেন্টিটি, তোমার একটা বিশেষ আইডেন্টিটি হয়ত তোমাকে গৌরবান্বিত করে, হয়ত সেই আইডেন্টিটিতেই তুমি আইডেন্টিফায়েড হতে চাও, বাট ইট উইল বি অ্যা ক্রিমিনাল মিসটেক ইফ ইউ ফ্যান্সি টু পুট দা এনটায়ারটি অফ ইউরস ইন দ্যাট পার্টিকুলার আইডেন্টিটি, কারণ কেবল ঐটুকুই তুমি নও। এন্ড দা লেফট ওভার ইজ হিউজ। যদি তুমি তেমনটা করো, দেন ইউ আর নট ওয়াইজ, মানে বিচক্ষণ নও। আমি এই ভুলটাই করেছিলাম"। বলতে বলতে নরম হয়ে এসেছিল তার কণ্ঠস্বর।
শুনতে শুনতে ঘোর লেগে গিয়েছিল নবারুণের। মিরেজকে লেখা মডামডার্ন টাইমস-এর চিঠির উত্তরে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সে এসেছে। তার ফার্মে সে ছাড়া আর কেউ নেই আসবার মতন, তাই সে এসেছে। মডার্ন টাইমসকে চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠালে নিশ্চয় স্যুট-টাই পরা কোনো প্রতিনিধি যেত। এই ব্যতিক্রমের কারণে তাকে নেহাত তুচ্ছজ্ঞান করতে পেরেছে বলেই কি এমন অনায়াসে তার জীবনের ঘটনা, তার মনে হওয়া, প্রভৃতি বলে যেতে পারছে তার কাছে? নাকি পরোক্ষে পুরনো পরিচয়ের কোনো তিক্ততার প্রতিশোধ নিচ্ছে এইভাব। এই যে কখনো কখনো আর্তনাদের মতন শোনাচ্ছে তার ব্যাখ্যা, কিংবা এই যে হতাশার উচ্চারণ মুহুর্মুহু, তা কি পরোক্ষে নবারুণের বিরুদ্ধে অভিযোগ? সান্ত্বনা দেওয়ার সাহস আর নেই তার, তবু শতরূপার কথার উত্তরে প্রশ্ন করে বসল সে, "ভুল কোনটা?"
উত্তর এল, দিস মেটিওরিক রাইজ। এই দ্রুত উত্থান। পরিধানের জন্য জামা বানালাম, কিন্তু সে জামা শরীরের মাপের থেকে এতই বড় যে খসে পড়ে যায় গা থেকে। এক কলসি জলের জন্য এক সমুদ্র আয়োজন। অথচ তা দিয়ে তৃষ্ণা মেটে কই? আর, তা মেটে না বলে মনে করতে থাকি যে তার কারণ বোধহয় পরিমাণের ঘাটতি। তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ি আরেক সমুদ্র আয়োজনের। আয়োজন বাড়তে থাকে, কিন্তু তৃষ্ণার শান্তি হয় না। তাও না হয় হল, তৃষ্ণা মেটাবার আয়োজনে আছি, মিটছে না বলে প্রয়াস চলছে ক্রমশ। কিন্তু আরো যে অনেক হা-মুখ মানুষের থাকে তা কি কখনো খেয়াল করেছি? সেগুলো তো সেই কবে থেকে হাহাকার নিয়ে জেগে আছে, তাদের দিকে নজরই গেল না। যেখানে বিপুল আয়োজন দরকার সেখানে বিন্দুমাত্র নেই, যেখানে প্রয়োজন সামান্য সেখানে আয়োজন বিপুল। এইভাবে মনের শক্তি, শরীরের শক্তি, আনন্দ, স্বপ্ন সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। বিচক্ষণ হলে কখনই এমন হত না।
শতরূপা থামল। নবারুণ তখনো চেয়ে আছে তার দিকে। মুখে তার কথা যোগাল না। যেন পরবর্তী ভাষণের অপেক্ষায় আছে। শতরূপা তার দিকে চেয়ে হাসল। বলল, "বুঝতে পারলে কেন এই শব্দটায় আমার এত আপত্তি?" কিন্তু নবারুণের মুখে তখনো কথা যোগাল না। অনেকদিন পর সে দেখছে শতরূপাকে, তার জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক পরিবর্তনের পর। চেনা যায় না বলেই নিঃসংশয় হওয়ার যায় না যে উচ্চারিত কথায় যতটুকু উচ্চারিত, কেবল ততটাই তার অর্থ কিনা। হতে পারে এ সবই কথার বাহাদুরী, হতে পারে করুণাবশতঃ নবারুণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা যে চোখ ধাঁধানো এই বৈভব আসলে কিছুই নয়, শতরূপাকে তা তৃপ্তির শান্তি দিতে পারেনি। যদি তাই হয়ে থাকে তবে তাহলে নবারুণ মনে করে সে চেষ্টা তার কাছে নিরর্থক এবং নিষ্প্রয়োজন, কারণ নিজেকে সে মনে করে আর্টিস্ট। হন্যে হয়ে কোনোকিছু যদি সে খুঁজে থাকে, তবে তা হল কেবল আর্ট। অন্য সবকিছু তার চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে চলে গেছে, সে কখনো দৃষ্টিপাত করেনি। অবশ্য শতরূপা বলছিল, খানিক আগে, কোনো একটা পার্টিকুলার আইডেন্টিটির মধ্যে গোটা নিজস্বতাকে বন্দি করে রাখা একটা ক্রিমিনাল মিসটেক। হতে পারে, নবারুণ ভাবছে, তাঁর নিজের জীবনেও হয়ত এই একই মিসটেক ঘটে গেছে, কে জানে। সংসার ধর্ম সে করেনি, ভালবাসায় সে আস্থা রাখতে পারেনি, সরে এসেছে সকলের কাছ থেকে। গভীর ভিতরে কোনো হতাশা যদি ক্রিয়াশীল থেকে থাকে তো থেকেছে, নবারুণ কোনোদিন মাথা ঘামায়নি তা নিয়ে। সে জানে সে হাত বাড়াতে জানে না, সে কেড়ে নিতে জানে না, প্রতিযোগিতায় নেমে বুক বাজিয়ে কারো উপর অধিকার দাবী করতে জানে না। যা আপনা থেকে আসে কোলাহলবিহীন পথে, তার জন্য আসন বিছিয়ে দিতে ত্রুটি করে না সে। তার জন্যে সে বিশুদ্ধ একা হয়, যেমন বিশুদ্ধ একা হয়েছে আর্টের শুদ্ধাচারী সঙ্গী হবে বলে। নেহাত ক্ষুধার তাড়না অগ্রাহ্য করতে পারেনি বলে মাঝে মাঝে তাকে এমন দোরে দোরে ঘুরে বেড়াতে হয়। যদি তা সেই শতরূপা বর্ণিত মিসটেক হয়ে থাকে, তবে তার জন্য শতরূপার মতন কোনো ক্ষোভ বা আফসোস নেই তার। সে অভাবী মানুষ বটে, কিন্তু তার সে অভাব তার কাছে আছে নিতান্ত অবলা একটা পোষ্য হয়ে, মাথায় চড়ে বসার ক্ষমতা তার নেই। নবারুণের গন্ডি যে ছোট আঙিনায় বাঁধা সেখানে শতরূপা বর্ণিত বিপর্যয়ের মতন অত বড় বিপর্যয়ের সম্ভাবনা নেই। সেখানে এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না, কারণ সেখানে সুখ বা দুঃখ এমনই ছোট মাপের এবং এমনই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকে তারা যে তাদের আর আলাদা করে চেনা যায় না।
ভাবলে তাই হয়ত হাসি পায় নবারুণের। তাই প্রশ্ন করে বসে, "এ ভুল কি এড়ানোর কোনো উপায় ছিল না?" শতরূপা মুখ তুলে তাকালো। এতক্ষণ দুজনেই নিশ্চুপ ছিল বলে শতরূপা টেবিলের উপর রাখা একটা ফাইল টেনে নিয়ে দেখছিল। ফাইলটি বন্ধ করে ঠেলে ডান দিকে সরিয়ে দিল। প্রশ্নটা ভালো করে বুঝবার জন্য, অথবা প্রসঙ্গে ফিরে আসার সময় নেওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করল, "কার কথা বলছ? আমার কথা?"
--- হুঁ।
--- তখন ঐ ভুলটাই তো ছিল পরিত্রাণের একমাত্র পথ। ঐ ভুলটাই তো আমায় বাঁচিয়েছিল তখন, পরে বেশী করে মেরে ফেলবে বলে!
অবাক হয়ে তাকাল নবারুণ। "যা বাঁচবার উপায়, তা আবার মৃত্যুকারক হয় কেমন করে?" অমনি হো হো করে হেসে উঠল শতরূপা। হাসতে হাসতে বলল, "কেন হবে না? দুর্ভিক্ষের সময নাছোড় খিদের জ্বালায় অনন্যোপায় হয়ে ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে খেয়ে তখনকার মতো প্রাণ বাঁচিয়ে তারপর কত মানুষ ডাইরিয়া বা কলেরায় মারা গিয়েছিল, তা শোনোনি?”
--- তা শুনব না কেন? শুনেছি তো বটেই। কিন্তু ওটা শারীরিক মৃত্যু, ওখানে যে মরে সে মরেই, নিজের মৃত্যুর জন্যে তাকে আর আক্ষেপ করতে হয় না। তাছাড়া অন্যরাও তখন তাকে মৃত বলেই জানে। মৃত ব্যক্তিকে তখন ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হয় না যে সে জীবিত নয়, সে মৃত।
--- তা ঠিক, কিন্তু অনেক সময় অন্যরা তাকে ভুল করে জীবিত মনে করে। জানতে পারার পর আবার করে তাকে মেরে ফেলতে হয়, নইলে ভুলের ঘোর আর কাটতে চায় না। যেমন ঐ ছবিটার দিকেই একবার তাকিয়ে দেখ না!
শতরূপার চোখের নির্দেশ অনুসরণ করে মাথা ঘুরিয়ে পিছনের দেওয়ালে যে ছবিটা দেখতে পেল, সেটা তার আগেই চোখে পড়েছিল যখন ঘরে ঢোকে। ছবিটা অতীশদা'র। অতীশ দত্তকে তো সে চেনে বটেই, আর ঐ ছবিটা আর যার হোক, তার নিজের অচেনা হতে পারে না। ঘরে ঢুকেই প্রথম যখন ছবিটা চোখে পড়েছিল, তখন আঁতকে উঠেছিল নবারুণ। বলা ভালো যে ঐ ছবিটা আগে দেখে ফেলেছিল বলেই শতরূপাকে চিনতে পারা সহজ হয়েছিল। নইলে এই অবস্থায় শতরূপাকে দেখে সে হয়ত বিশ্বাসই করতে পারত না যে এইটাই শতরূপা। যাইহোক, এখন শতরূপার নির্দেশে দ্বিতীয়বার সে ছবিটা দেখার পর প্রথমবারের প্রতিক্রিয়া আর দেখা গেল না। সেদিকে তাকিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সামনের দিকে মুখ ফিরিয়ে এনে শতরূপার চোখের উপর চোখ রেখে বলল, "ড্রয়িংটা তো চেনা অবশ্য। ভুলি কেমন করে? কিন্তু ছবিটা নয়। ইমেজারি হ্যাজ সাফারড ডেস্ট্রাকশন। ছবিটা কি রেস্টোর করতে হয়েছিল? নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বুঝি?
এই প্রথম শতরূপাকে মাথা নীচু করতে দেখা গেল। যেন কোনো অপরাধবোধ তার স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর কেড়ে নিয়েছিল। তাই প্রায় ফিসফিস করে বলল, "না! নষ্ট হয়ে যাবে কেন?"
--- হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেকদিনের ব্যাপার, বয়েস তো কম হয়নি ছবিটার। তা ছাড়া তখন দামী রং জোগাড় করার সামর্থ্য ছিল না আমার, সস্তায় কাজ সারতে হয়েছিল। তাই নষ্ট হয়ে যেতেই পারে। না হলে আর রেস্টোর করার দরকার পড়বে কেন?
শতরূপার চোখ তখন ছবির দিকে। মুখাবয়বে তখনও ম্লানতার ছায়া। যে কথাগুলো উপলব্ধিতে সত্যি হলেও কোনোদিন কাউকে বলা যায় না, সেগুলোই মুখের উপর ছায়া ফেলে বেশী, বেশী ম্লান করে। উত্তর দেওয়ার জন্য কথা যখন বলতেই হল, তখন স্বীকারোক্তির মত শোনাল সে কথা। "আমিই আর্টিস্ট ডাকিয়ে রেস্টোর করিয়েছিলাম। অতীশ চলে যাওয়ার পর যখন 'মডার্ন টাইমস'র অফিসে এসে বসা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকল না, তখন অস্থির মনকে শান্ত করার জন্য অতীশের একটা ছবির বিশেষ দরকার ছিল। তখন ঐ ছবিটা নিয়ে এসে অফিসে টাঙাই। কিন্তু বড্ড উজ্জ্বল ছিল ছবিটা। দেখলে মনে হত ঐ তো অতীশ। আছে, তবু কথা বলছে না। কারো উপস্থিতি যদি ঐভাবে প্রকট হয়ে ওঠে, তাহলে কি আর মন স্বাধীন হতে পারে? পদক্ষেপ তখন দ্বিধায় জড়িয়ে যায়। তাই হল, ভিতর থেকে মনটা তখন না না করে উঠল। না, এ ছবি চলবে না। যা জীবন্ত তা ঈশ্বর জ্ঞানে পুজোর অনুপযুক্ত, কারণ, তার সাথে শরীরী বোধগুলো জড়িয়ে থাকে। ঈশ্বর হিসাবে বিবেচনা করার স্বাধীনতা পাওয়া যায় বরং মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে। তাই আর্টিস্ট ডাকিয়ে এনে কথাটা বললাম তাকে। বলল, হ্যাঁ, বদলে দেওয়া যাবে। তারপর ছবিটা এইরকম দাঁড়াল। মনে হচ্ছে ঐ হলদে টিন্জটাই ছবিটাকে অতীতে ঠেলে দিয়েছে। এখন আর ছবিটায় চন্দনের ফোটা লাগাতে বা মালা দিতে বাধো বাধো ঠেকে না। লার্জার দ্যান লাইফ কল্পনা করতে মন বাধা পায় না।
নবারুণ তার দিকে চেয়েই বলল, "তার মানে আর্টিস্টের দোষ নেই, নিজেই চেয়ে করিয়েছ"। তারপর মুখ ঘুরিয়ে আরেকবার চেয়ে দেখল ছবিটা। জিজ্ঞেস করল, "ছবির নীচে আর্টিস্টের নাম নেই যে?"
--- আমিই চাইনি। ওরিজিনাল আর্টিস্টের নাম যখন মুছেই দিতে হয়েছে, তখন আর্টিস্ট হিসাবে দ্বিতীয় জনের নামই বা থাকবে কেন? ওরিজিনাল আর্টিস্টের নাম কেন মুছে দিতে হল তা জিজ্ঞেস করবে না?
--- হা হা হা, তা কেন জিজ্ঞেস করব?
--- জিজ্ঞেস না করলেও বলব। তখন ছবিটার দিকে তাকালে বারবার চোখ চলে যেত ঐ আর্টিস্টের নামের জায়গায়। তখন ঐ নামটা আমার চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলার দরকার ছিল।
নতুন করে কোনো ম্লানতা এসে নবারুণের মুখের উপর আস্তরণ বিছিয়ে ছিল কিনা বোঝা না গেলেও শতরূপা বলল, "জানতাম তুমি কষ্ট পাবে শুনলে, কিন্তু সত্যটাকে আড়াল করে রাখাও তো মিথ্যাচার! মৃত মানুষের ছবি আর জীবিত মানুষের স্বাক্ষর দুটো এক জায়গায় থাকলে মৃত মানুষটাতে মনসংযোগ করা কি সম্ভব হত? তাই মুছে দিতে বলেছিলাম।
--- হুঁ। তা তো বটেই। আচ্ছা, আর একখানা ছবি ছিল না? তোমার ছবি একটা?
--- আছে। চিন্তা কোরো না, সেটা এতটুকুও নষ্ট হতে দিইনি। যত্ন করে তুলে রাখা আছে। অতীশ যখন ছিল তখন মাঝে মাঝেই বলত আমাদের ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে দিতে। আমি বলতাম, না থাক। সেই থেকে তুলে রাখাই আছে। মাঝে মাঝেই ভাবি একবার বের করে দেখব। কিন্তু হয়ে ওঠে না। থাক ওসব কথা, তুমি মরণের কথা বলছিলে, সেইটাই আগে শোনো, কেমন সে মরণ, কেমন করে তা এলো।
নবারুণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "মরণ? মরণ কোনটাকে বলছ?" বলেই নিজেকে সামলে নিল সে, পাছে সে প্রশ্ন অসহ্য মনে হয় শতরূপার কাছে, পাছে আবার কোনো একটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঐশ্বর্য, বৈভব, যেগুলো তার কাছে বৃহদায়তন বেঁচে থাকার প্রমাণ, শতরূপার ব্যাখ্যায় সেগুলোই মৃত্যুকারক। তাই সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে বলল, হ্যাঁ, বলো, বলো।
মুখের দিকে চেয়ে থাকল শতরূপা, সঙ্গে সঙ্গে কথা শুরু করতে পারল না। মুহূর্ত কয়েক যেতে না যেতেই ঘর জুড়ে নিস্তব্ধতা, যেন বন্ধ্-এর শহরের সদৃশ। শহরে আজ বন্ধ্ চলছে। অফিসে বিশেষ লোকজন নেই, বেশীরভাগ লোক আসেনি বা আসতে পারেনি। সে নিজেও হয়তো আজ আসত না যদি বন্ধ্ ঘোষিত হওয়ার পর ফোন করে যোগাযোগ করার চেষ্টা সফল হত। রাস্তাঘাট মোটামুটি নির্জন, নিস্তব্ধ। বাইরের নিস্তব্ধতা তবু মাঝে মাঝে ব্যহত হচ্ছে, এই যেমন এখন সাইকেলের বেলে'র আওয়াজ শোনা গেল, তার মানে রাস্তায় আর কেউ আছে যাকে সতর্ক করা হল। সামনে টেবিলের উপর শতরূপার হাত দুটো রাখা, যে হাতে এত কীর্তি, তবু ঠিক আগের মতনই, হয়ত সামান্য ভারী। এই নিস্তব্ধতাই এখন ভালো লাগছে নবারুণের। শব্দ মানেই তো এখন কঠিন কঠিন শব্দ আর কঠোর মনোভাবের প্রকাশ। এখন তবু চেয়ে চেয়ে দেখা যাচ্ছে শতরূপাকে।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার মতন শব্দে হঠাৎ আবার বলতে শুরু করল শতরূপা। "বিয়ের সময়কার ব্যাপার স্যাপার সবই তো তুমি জানো। অতীশের সাথে সংসার করতে যখন এলাম, তখন যেমন সব কিছু ছেড়ে এলাম, এমনকি আমার আপত্তিটুকুও, ঠিক তেমনি অতীশ যখন চলে গেল তখন সব কিছু ছেড়েই আবার ফিরে গেলাম। কনে বিদায়ের দিন বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন, "কাঁদছিস কেন? আমি তো রইলাম, এই বাড়িও তোর নিজের রইল"। সেই ভরসাতেই ফিরেছিলাম। ফেরার যে কারণ ছিল, তা বোধহয় বলা দরকার। মনে মনে যাকে কোনোদিন মেনে নিতে পারিনি, তার সহায় সম্পত্তি কেবলমাত্র আইনী অধিকারের জোরে ভোগ করব তা মন থেকে মেনে নিতে পারিনি বলে চলে গিয়েছিলাম। যখন ফিরে গেলাম তখন বাবা আর বেঁচে নেই, কিন্তু মা ছিলেন। মা কান্নায় ভেঙে পড়ল দেখে বলল, "তোর এই দশা চোখে দেখার আগে মরণ হল না কেন আমার!" বৈধব্য পালনের নিয়ম কানুন সব শিখিয়ে দিল মা। এ ছাড়া একটা মস্ত বড় চৈতন্যের দিশা পেলাম আমার গর্ভধারিণী জননীর কাছ থেকে। বললেন, "তুই তো বিচক্ষণ, তাই তোকে যে বলে বোঝাতে হবে না তা জানি। জানিস তো কী চাকরি করে তোর দাদা! ক'টাকা মাইনে পায়! ঘাড়ের উপর এত বড় সংসার! আমার যেন কোনো উপায় নেই, তাই পড়ে আছি"।
--- সে কী? নবারুণ যেন আঁতকে উঠল। বলল, "মানে?"
হাঃ হাঃ বলে হাসির মতন শব্দে করে শতরূপা বলল, "সে কী? মানে তো সবার আগে তোমারই বুঝতে পারার কথা! একই তো সুর, একই তো কথা, সেই আমার বিচক্ষণতার প্রশংসা! তাই তার উপদেশ বুঝতে এতটুকু কষ্ট হল না। নিভৃত বৈধব্য যাপনেই বিধবার মহিমা। মৃতকে স্মরণ করে মৃতবৎ জীবন কাটাবে সে।
--- এ তো এক রকমের নিষ্ঠুরতা!
--- পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট দেওয়ার ভার কে তোমাকে দিল নবারুণ? অন্যের ব্যপারে সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারি বলে নিজের ব্যাপারে একদম পারি না আমরা।
স্তম্ভিত হয়ে গেল নবারুণ। চোখ সরিয়ে নিল শতরূপার মুখের উপর থেকে। তারপর ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা। আবার যখন কথা শুরু করল, গলা তখন ভারী শতরূপার। বলল, "ঐটাই টার্নিং পয়েন্ট। ঠিক করলাম যথার্থই বিধবা হব, অতীশের বিধবা। ফাঁকা ঘরে মৃত'র চিহ্নগুলোর সাথে সংসার করব। এই ব্যবসাটা ওরই একটা চিহ্ন বটে। এক সময় অতীশের চাপে আসতে হত মাঝে মাঝে। সেই সুবাদে খানিকটা জানা হয়ে গিয়েছিল ব্যবসার ব্যাপারটা। তা ছাড়া অতীশ যখন অসুস্থ তখন মাঝেমধ্যে আসতে হত। কিন্তু সিরিয়াসলি দেখাশোনা না হওয়ায় ব্যবসার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমার হাতে যখন এলো, তখন প্রায় শেষ অবস্থা। আর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে তখন এই ছিল আমার একমাত্র সাধনা। নিজের মধ্যে শূন্যতার বোধ যত গভীর, তত তীব্র আমার প্রচেষ্টা, যা হোক কিছু দিয়ে সেই ফাঁক ভরাট করার। আর তারই ফলশ্রুতিতে এই রমরমা, এই উত্থান, এই বিস্তার, এন্ড নাউ ইট ইজ রিয়েলি এ ট্রিট টু আইজ। শুরু করেছিলাম কোনোমতে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখব বলে, আর এখন তা বিরাট হয়ে আমারই বুকের উপর চেপে বসেছে। এখন একে বাঁচিয়ে রাখা একটা নেশা, আমার নিজের গুরুত্ব গেছে হারিয়ে"।
--- অন্য কোনো সিদ্ধান্ত কি এর থেকে বেটার রেজাল্ট দিত?
--- অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নয়, অন্য কোনো সিচুয়েশন। আর, অন্য কোনো সিচুয়েশন মানে অন্য কারো সিদ্ধান্তের কনসিকোয়েন্স।
--- অন্য কারো সিদ্ধান্ত বলত?
নবারুণের প্রশ্নে হাসল শতরূপা। জিজ্ঞেস করল, "চা খাবে আরেকবার? অবশ্য শুধুই চা। বন্ধের দিন বলে অন্য কিছু আনানো যাবে না"।
--- আমার প্রশ্নের উত্তর বোধহয় এটা নয়।
--- তা যে নয় তা অজানা নয় কারো। কিন্তু যথার্থ উত্তরটাও কি কারো অজানা থাকার কথা?
বলেই বেল বাজিয়ে ডেকে নিল শরৎকে। বলল, "দু কাপ চা। বিস্কুট বা স্ন্যাক্স যদি কিছু থাকে তো চায়ের সঙ্গে দিও”।
শরৎ চলে যাওয়ার পর শতরূপা বলল, "সত্যিই যদি তা অজানা থাকে তো তাই থাক। কী লাভ এখন আর সেসব কথায়?"
--- লাভ বা লোকসানের কথা ভেবে বলিনি। বলতে তোমার আপত্তি থাকতেই পারে। জানলে কখনো জিজ্ঞেস করতাম না।
--- আপত্তি না থাকলে শুনতে? শুনতে কোনো আপত্তি থাকত না?
নিরুত্তর নবারুণকে মুখের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে শতরূপা যখন নিজেই বলতে শুরু করল, তখন রূঢ় শোনাল তার ভাষণ। বলল, "আপত্তি থাকলে কি মুখের উপর স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে হবে সে কথা? কিংবা যদি এমনই হয় যে আপত্তি নেই বা তা জানাতে ভুলে গেলাম, সেক্ষেত্রে বলায় আপত্তি নেই বলেই শুনতে আপত্তি থাকবে না কেন? যে শুনছে বা যে শুনবে, হি অর শি কান্ট বি লাইক অ্যারঅ্যাগ পিকার যে যা পাবে সবই কুড়িয়ে নেবে! দেয়ার শুড বি সেন্স অফ রেসপন্সিবিলিটি টু গাইড হিজ অর হার কন্ডাক্ট। কারো ঘরের দরজা খোলা পেলেই তার অন্তঃপুরে ঢুকে পড়তে হবে নাকি? সেন্স অফ ডিসেন্সি তাকে বাধা দেবে না?
মুহূর্তে ওলট পালট হয়ে গেল সবকিছু। উত্তেজনায় অস্থির যে নবারুণ জ্যা-মুক্ত তীরের মতন সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে যেন অন্য আর কেউ। ভয়ংকর তার দৃষ্টি, অনিয়ন্ত্রিত তার অঙ্গ সঞ্চালন আর শরীরের পেশীগুলো যেন আশু যুদ্ধের প্রস্তুতিতে জেগে উঠেছে। প্রবল পীড়নে পীড়িত জন্তুর রূপ পরিগ্রহ করেছে যেন তার চেহারা। কষাঘাতে কষাঘাতে জর্জরিত হতে হতে কখনো কখনো পীড়িত প্রাণীটি ডোরাকাটা বাঘের আদল পায়। চাবুক ফেলে আঘাতকারী তখন পালাবার পথ খোঁজে। শতরূপাও তেমনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু পালাবার পথ খোঁজার ভাবনা তার মাথায় এলো না। কেন, তা কে জানে! ভযংকরকে এমন সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করার দুর্লভ সুযোগ যেন সে কিছুতেই হারাতে চায় না। আতঙ্ক তার কাছে এক অচেনা অভিজ্ঞতা, এ জীবনে যা পাওয়া বাকি ছিল। অচল প্রস্তর হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠে প্রলয়ের সূচনা করেছে -- এ যেন তার নিজের ক্ষমতারই প্রমাণ। বরফ কেমন করে এতখানি আগুন জমা করে রাখে নিজের মধ্যে? বিস্ময়ের আর শেষ থাকে না শতরূপার। কই দেখা হয়নি তো কোনোদিন এমন উদ্গিরণ। ছটফট করতে করতে এলোমেলো পদক্ষেপে এমনভাবে ঘরময় পায়চারি করছিল নবারুণ, যেন চেয়ারে, টেবিলে, সোফায় বা অন্য ফার্নিচারে কিংবা পেডেস্টাল ফ্যানে ধাক্কা লেগে এখনই মুখ থুবড়ে পড়বে। ভয়ংকর কিছু একটা ঘটতে পারে মনে করে ভয় হতে লাগল শতরূপার।
শেষ পর্যন্ত ভয়ংকর কিছুই ঘটল। হঠাৎ দ্রুতবেগে শতরূপার দিকে ধেয়ে গেল সে। এগিয়ে গেল আরো কাছে। তারপর আরো কাছে। শতরূপা মৃতপ্রায় বসেছিল অনিয়ন্ত্রিত শরীর সোফায় এলিয়ে দিয়ে, আর ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে ছিল তার দিকে। তবু হয়তো মুখ দেখে করুণা হল না নবারুণের। দুইহাতে শতরূপার কাঁধের দুই দিকে দুই বাহুর উপরিভাগ চেপে ধরে এক ঝটকায় টেনে দাঁড় করিয়ে দিল তাকে। শিথিল শরীর বিনা প্রতিরোধে নবারুণের শক্তির উপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে থাকল। কেবল দুটি চোখ স্থির চেয়ে থাকল নবারুণের চোখের দিকে।
সৌজন্যের সমস্ত রীতি ভুলে নবারুণ হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, "তোমাকে এত ভয় পাই কেন বলো তো? আমার প্রতি তোমার আর কোনো মমতা বা করুণা থাকার কথা নেই বলে? শ্রদ্ধা নেই, তাই অশ্রদ্ধার প্রকাশ যেকোনো সময় তীব্র হয়ে উঠতে পারে বলে? নাকি তোমাকে ভয় পাচ্ছি দেখলে খুশি হবে বলে?" তারপর সজোরে ঝাঁকানি দিয়ে বলল, "উত্তর দাও, চুপ করে থেকো না। আমি কিন্তু এখন পিষে মেরে ফেলতে পারি"। ঘোর লাগা চোখে শতরূপা তখনো চেয়ে ছিল নবারুণের দিকে। এলিয়ে পড়া কণ্ঠস্বরে বলল, "তবে তাই করো নবারুণ। আমি যে তার চেয়ে অনেক বেশী দুর্বিষহ মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাই"।
অমনি থেমে গেল ঝড়। অত কথার মধ্যে কোনটা ঝড় থামানোর মন্ত্র, তা কেউ জানত কিনা কে জানে। অতি ধীরে, অতি যত্নে শতরূপাকে আবার সোফায় বসিয়ে দিয়ে তখনো দুইহাতে ধরে থাকল তাকে। কণ্ঠস্বরে তখন শিশির বিন্দু, জিজ্ঞেস করল, "কী হল শত? শরীর খারাপ লাগছে নাকি? চুপ করে বোসো একটু, কথা বোলো না। কাউকে ডাকব?" অমনি শিউরে উঠল শতরূপা, জীজ্ঞাসার সুরে উচ্চারণ করল, "কী বললে শত? তোমার মনে আছে এখনো?"
--- না, মানে, মুখ থেকে বেরিয়ে গেল হঠাৎ।
জিভ হোঁচট খেল নবারুণের। বলতে পারল না, "ঐ নামেই তো ডাকতাম একসময়। তুমি বলতে 'শত' আবার কী রকম নাম? নাম ছোট করে নিয়েই যদি ডাকতে হয়, তাহলে 'রূপা' নামে ডাকতে পার! আমি বলতাম, “শত মানে একশ, মানে তুমি একাই একশ"।
নবারুণ জিজ্ঞেস করল, "ডাকব কাউকে?"
--- না, ডাকতে হবে না। তুমি জায়গায় গিয়ে বোসো। চা নিয়ে এখনই এসে পড়বে।
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এলো নবারুণ তার নিজের জায়গায়। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো শতরূপা। জিজ্ঞেস করল, "সত্যিই জানতে চাও কেন ভয় পাও?" সঙ্গে সঙ্গে নিভে যাওয়া আগুন আবার ফিরে এল নবারুণের গলায়। সে হয়ত চেয়েছিল প্রসঙ্গ শেষ হোক, চায়নি আবার তা ফিরে আসুক। বলল, "হ্যাঁ, চাই"।
--- তাহলে শোনো, মনে মনে আমাকে মেরে ফেলেছ বলে, তোমার কাছে আমি মৃত বলে। অনেকেই জীবিত'র থেকে মৃতকে বেশী ভয় পায়। ভয় পাও আমাকে এড়িয়ে যেতে চাও বলে, জড়িয়ে পড়ার ভয়ে।
--- না, তা নয়। আমার মনে হয়, ভয় অশ্রদ্ধার। যার প্রতি মমতা আর অবশিষ্ট নেই তাকে অশ্রদ্ধা করতে কোনো দংশন অনুভব করে না কেউ। যেমন আজ আমার সেন্স অফ ডিসেন্সি নিয়ে প্রশ্ন উঠল। আশঙ্কা প্রকাশ পেল যে ঘরের দরজা খোলা পেলে আমি অন্তঃপুরে ও ঢুকে পড়তে পারি। হায়, কী দুর্ভাগ্য আমার! এমন অভিযোগ কিনা আমার বিরুদ্ধে! আর কেউ না জানুক, তুমি তো জানো আমি নিজের হাতে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছি অন্তঃপুর থেকে, কেবলমাত্র তোমাকে অস্বস্তি থেকে বাঁচাবার জন্য, কারণ তোমার তখন ঝুঁকি নেওয়ার শক্তি বা সাহস কোনোটাই ছিল না। তারপর আর একবার মাত্র দেখা করেছিলাম, তোমাদের বিয়ের দিনে। আমার আঁকা তোমাদের দুজনের দুটো ছবি উপহার হিসাবে তুলে দিয়ে সেই যে অদৃশ্য হলাম, তারপর আর কোনোদিন যোগাযোগ করিনি। আজও আসতাম না, যদি জানতাম এই কোম্পানিটা তোমাদের। ডেকে পাঠিয়েছিলে বলে এসেছি, জানতাম না তুমি ডেকেছ।
--- তাই?
--- হ্যাঁ, তাই।
--- ও। ভেবেই তো বলছ নিশ্চয়!
জোর করে টেনে আনা একটা হাসির রেখা তখন শতরূপার মুখে। কেবল ওষ্ঠ সংলগ্ন এলাকায় তা আটকে আছে, সারা মুখে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। এই যে সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনার অভিঘাতে অবশ হয়ে পড়েছিল তার সমস্ত অস্তিত্ব, এত তাড়াতাড়ি তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। তবু শরীরের অবসন্নতা বোধহয় একটু একটু করে কাটছিল, অথবা চেষ্টা করে কাটিয়ে উঠছিল শতরূপা। সেই হাসির রেখা অক্ষত রেখে সে সদ্য বলা কথার সাথে জুড়ে দিল আরেকটি কথা।" কিন্তু ভাবতে মুহূর্তকাল সময়ও লাগল না তোমার! ভারী চমৎকার তো! জগৎ সংসারে যা অনাদি অনন্ত কালের রহস্য, মুহূর্তে তার সমাধান বলে দেওয়া তোমার পক্ষে কত অনায়াসে সম্ভব, নবারুণ। যেন গায়ের থেকে ধুলো ঝেড়ে ফেলার মতো সহজ। সত্যিই তো, তা না হলে এত অহংকার আসে কোন জোরে? কিন্তু, তুমিও তো সেই একই কথা বললে নবারুণ! আমি বললাম জড়িয়ে পড়ার ভয় পাও তুমি। আর, তুমি বললে জানলে তুমি আসতে না। তোমার অহংকার এই যে অন্তঃপুর থেকে নিজের ইচ্ছায় তুমি বেরিয়ে এসেছিলে একদিন, অর্থাৎ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলে।
নবারুণ, তুমি তো আর্টিস্ট মানুষ, আর্ট আর হার্ট তো বড় কাছাকাছি, তবু কেন ওরা পরষ্পরের অচেনা এত? তুমি যেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিলে বলছ, সেটা যে অন্তঃপুর তা জানলে কেমন করে? বেরিয়ে যে এসেছিলে তা প্রত্যয়িত হল কেমন করে? যদি বেরিয়ে ই এসেছিলে মনে কর, তাহলে নিশ্চয় এটাও মনে কর যে একদিন সেখানে ঢুকেছিলে? কেমন করে ঢুকতে পারলে সেখানে, কেবল নিজের ইচ্ছায়? অন্তঃপুর থেকে নিজের ইচ্ছায় বেরিয়ে এসেছি, এ অহংকার কি কাউকে মানায় নবারুণ? তা কেবল জানতে পারে অন্যজন, যার হৃদয়টাই সেই অন্তঃপুরের একমাত্র মানে"।
কথা হারিয়ে ফেলেছে নবারুণ। তন্ন করে খুঁজেও পেল না কোথাও। অব্যবহৃত হৃদয়ে কবেকার ধুলোয় ঢাকা পড়ে আছে কথাগুলো, মুহূর্তের সন্ধানে তা আবিষ্কৃত হবে কেমন করে? অথচ একসময় সে নিজেই তো এই ভাষায় কথা বলত, আর অবাক শতরূপা চোখ বড় বড় করে শুনত। সেই অবাক দু চোখের কিরণ বিশ্লিষ্ট হয়ে রামধনু হয়ে থাকত তার মনে সারাদিন। তখন কখনো সেই ভাবনায় নিবিড় হয়ে ওঠেনি নিরূপণের জন্য যে সেই তৃপ্তি, সেই প্রশান্তি প্রকৃতপক্ষে প্রেমের নাকি আত্মগৌরবের। শতরূপার কথাতেও তো সেই রকমই ইঙ্গিত পেল সে। শতরূপা তার সম্পর্কে বলল এই যে সে মনে করছে সে নিজেই স্বেচ্ছায় বেরিয়ে এসেছে অন্তঃপুর থেকে, তা নাকি তার অহংকার। তা হবেও বা, সত্যিই তো, এই বাক্যে কেবল তার নিজেরই মহিমা গীত হয়েছে, অন্যের কোনো ভূমিকা এতটুকুও স্বীকৃত হয়নি।
নিশ্চুপ কেটে গেল অনেকগুলি মুহূর্ত। শরৎ চা দিতে এসে জানালো বাড়ি থেকে টিফিন পাঠিয়ে দিয়েছে। শতরূপা উৎফুল্ল হয়ে বলল, "তাই? পাঠাতে পেরেছে টিফিন? বেশ, বেশ, তাহলে চা এখন থাক, আগে তুমি প্লেট সাজিয়ে দাও। চা পরে খাব"। বলেই নবারুণের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "অসুবিধা নেই তো চা একটু পরে খেলে?" নবারুণ তখনো নিশ্চুপ। শতরূপা নিজে থেকেই বলে দিল শরৎকে, "না, না, কোনো অসুবিধা নেই, তুমি তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো খাবার যা আছে"।
দেরী হয়নি শরৎয়ের। টেবিলের উপর যত্ন করে প্লেট সাজিয়ে দিয়ে চলে গেল সে। সে চলে যেতেই নবারুণের প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিল শতরূপা। তারপর চামচে করে নিজের প্লেট থেকে খানিকটা ঝাল সুজি আর এক পিস্ টোস্ট নবারুণের প্লেটে তুলে দিয়ে আবার সেটাকে নবারুণের সামনে সাজিয়ে দিয়ে বলল, "নাও, শুরু করো, দেরী কোরো না, এখনই হয়তো চা নিয়ে আসবে। একবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে, আর আমি ফেরত পাঠাতে পারব না। নবারুণ বলল, "তুমিও শুরু কর, আমি একা খাব নাকি?" শতরূপা বলল, "করছি, আমার সময় বেশী লাগে না। তুমি আগে শুরু করো"। তারপর নবারুণ খাওয়া শুরু করলে সেই তাকিয়ে থাকল সেই দিকে। জিজ্ঞেস করল, "বাড়িতে তো আর কেউ নেই শুনেছি এখানে! রাঁধে কে?"
--- বাড়ির কাজের জন্য একটা মেয়ে আছে। সেই রেঁধে রেখে যায়।
--- দূর থেকে আসে বুঝি? নাকি কাছেই থাকে?
--- না, বেশ দূর থেকেই আসে। মাঝে মাঝে কামাই হয় সেইজন্য। তুমি বুঝলে কেমন করে?
--- না, না, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।
--- তুমি শুরু করলে না?
--- করছি। আজ এসেছিল?
--- কে?
--- মেয়েটা? যে রান্না করে দেয়?
খাওয়া ছেড়ে শতরূপার মুখের দিকে তাকাল নবারুণ। "কেন বলো তো?" সে কথার উত্তর দেওয়ার আগে তার নিজের প্লেট থেকে আরো একটা টোস্ট আর খানিকটা ঝাল সুজি চামচে করে নবারুণের প্লেটে তুলে দিল আপত্তি জানাবার সুযোগ না দিয়েই। বলল, "আজ বন্ধ্ চলছে। যানবাহন বেশীরভাগ অচল। দূর থেকে যাদের আসতে হয়, সবাই পারে না আসতে"। সে কথার উত্তর না দিয়ে আঁতকে ওঠার সুরে নবারুণ বলল, "এ কী? এ কী করলে? তুমি খাবে না? তোমার তো কিছুই থাকল না!"
--- খাও। কথা না বলে খেয়ে নাও, চা আসছে। মেয়েটা না এসে থাকলে আজ তো রান্না হয়নি।
--- হবে না কেন?
শতরূপা বলল, "কথা বোলো না, খেয়ে নাও। আমি খেয়েছি। খিদে নেই, তাই খেতে পারছি না এখন। ওহ, শোনো, একটা কাজ করতে হবে তোমায়। তুমিও আজ আমার সাথে যাবে। রাতে একসাথে খাব। তারপর তোমায় বাড়ি পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার। ভয় নেই, বেশী দেরী হবে না।
--- অকারণে ব্যস্ত হয়ো না শতরূপা। না খেয়ে তো আর এতদিন বেঁচে থাকা যায় না! সুতরাং ব্যবস্থা একটা কিছু নিশ্চয় আছে। তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো যে আমায় কোনো অসুবিধায় পড়তে হবে না।
--- হ্যাঁ, তা জানি। আমার সাথে গেলেও কোনো অসুবিধা হবে না। তুমিও নিশ্চিন্ত থাকতে পারো সে ব্যাপারে। ভয় নেই, তোমাকে আটকে রাখব না সেখানে। Ransom আদায় করার সুযোগ যখন নেই, তখন আর আটকে রেখেই বা কী করব?
--- হ্যাঁ, তাই তো! আটকে যে রাখবে না তা জানতে কি আর বাকি থাকে যখন জানা যায় যে আমার থেকে Ransom এর দাম বেশী-- হাসতে হাসতে বলল নবারুণ। সে হাসির ছোঁয়াচ শতরূপার মুখে লেগেই মিলিয়ে গেল।
--- হ্যাঁ, ব্যবসা করলে একটু হিসেবী হতেই হয় বৈকি, নবারুণ। আর, অতীশ দত্তের বিধবার জন্যে তো ঐ একটা মাত্র আইডেন্টিটিই পড়ে আছে, সে ব্যবসায়ী। তা না হয়ে তার উপায় কী, বলো। ঐ পরিচয় আশ্রয় করেই তো শেষ পর্যন্ত প্রাণ বাঁচল অতীশ দত্তের বিধবার, ঐ পরিচয়েই প্রতিষ্ঠা, ঐ পরিচয়ের সুবাদেই বিচক্ষণতার আখ্যা। তাই ব্যবসার নিয়মটাই তাকে মাথায় রাখতে হয়, লাভালাভের বিবেচনাকেই প্রাধান্য দিতে হয়। সুতরাং তোমার আর ভয় থাকল না, এখন তুমি নির্ভয়ে যেতে পারো।
নবারুণ ছটফট করতে করতে উঠে দাঁড়াল। আবার সেই অস্থিরতা। আবার সেই রকম কিছু একটা ঘটবে না তো? ভিতর থেকে প্রতিরোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে যখন সফল হল না শতরূপা, তখন অনেকটা মিনতির সুরে বলল, "বোসো, বোসো, উত্তেজিত হয়ো না"। নবারুণ দুপাশে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, "সেই এক কথা বারবার। তখন তুমিই বললে যে তুমি বলছ বলেই তা রাস্তার কাগজ কুড়ানোওয়ালার মতন সব আমার কুড়িয়ে নেওয়া উচিত নয়। এখন তাহলে আমার কী করা উচিত?" নবারুণ বসল, শতরূপার কথা মতো, কিন্তু অস্থিরতা তখনো যায়নি। স্বগতোক্তি করার মতো বলল, "উইটনেসেস টু ম্যাসাকার"। এমন ভাবে বলছ যে বারবার চোখের সামনে কেবল একটা ম্যাসাকারের ছবি ভেসে উঠছে। বুঝতে পারছি না আমার কি করা উচিত। কখনো প্রশ্ন করছ, অ্যাম আই হিটিং আ ওয়াল, কখনো বলছ কোনো কোনো কথা শুনতে আমার আপত্তি থাকা উচিত। কী করব বলতে পারো?
"আপত্তি করলে তো আমি বেঁচে যাই", হো হো করে হাসতে হাসতে বলল শতরূপা। "নাহলে বলতে গেলে যে এখনো এক বুক কান্না চলে আসে। সে সব শুনলে তুমিও হাসবে"।
--- হাসব কেন?
--- আমি নিজেই তো হাসি, যখন ভাবি। মনে মনে নিজেকে অভিসম্পাত করি, যখন সেই মরলিই, তখন মরলি না কেন? সেই জন্যেই তো বলে মরার আগে যদি মরতে পারলে তো বাঁচলে। এই শতরূপা তখন থাকলে কি তার এই দুর্দশা হতো? সে অনায়াসে রুখে দিতে পারত সব কিছু। অতীশের বিধবা না হওয়া অবধি সে শক্তি আমার আয়ত্তে এলো না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর আবার বলতে শুরু করল, "তুমি যদি একটু শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পাশে ...হয়তো তোমার পক্ষে রিস্ক হয়ে যেত ... কী আর করবে? তুমি আর্টিস্ট মানুষ, তুমি তো আর রিহ্যাবিলিটেশন স্কিম চালাবার কথা ভাবতে বসতে পার না! তাই সাড়া না পেয়ে তোমাকে বলে আর মুখ পোড়াতে যাইনি। থাক ওসব কথা, খেয়ে নাও তো তাড়াতাড়ি, খেয়ে নাও, খেয়ে নাও। চা বোধহয় এতক্ষণে জল হয়ে গেছে। আবার দিতে বলি।
কথা বলতে বলতেই বেল বাজিয়ে দিল শতরূপা। শরৎ আসতেই বলল, "চা দিয়ে যেও। তিনকাপ। ডি জি এম সাহেবকে ডাকছি, উনিও থাকবেন"। কথা শেষ করেই ইন্টারকমে ফোন করে কথা বলল জনৈক মিঃ খাসনবিশের সাথে "উড ইউ প্লিজ কাম ওভার টু হ্যাভ অ্যা কাপ অফ টি? ওহ রাইট, সো নাইস অফ ইউ"। তিনি আসতেই আলাপ করিয়ে দিলেন, "মিট আওয়ার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মিঃ খাসনবিশ। এন্ড হেয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ড এন্ড অ্যা গ্রেট আর্টিস্ট অফ মাই চয়েজ, মিঃ নবারুণ সেন। আই সিনসিয়ারলি এপ্রিসিয়েট ইউর সিলেকশন এজ আই গেট মাই ফ্রেন্ড ব্যাক।
--- অ্যামেজিং! ইজ ইট রিয়েলি সো? তাহলে আমার রিওয়ার্ড?
--- অবশ্যই পাবেন। আমার সিনসিয়ার গ্রাটিচুড।
--- সার্টেইনলি নট। দ্যাট ওন্ট ডু। ইট শুড কাম আউট ম্যাটেরিয়ালি।
--- ডান। কাল সারাদিন যা খাবেন সব আমার একাউন্টে। এখন একটা ফেভার করতে হবে আমাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার বন্ধুকে পাঠিয়ে দিচ্ছি আপনার কাছে। আমাদের খড়গপুরের অফিসের ব্যাপারটা একটু আলোচনা করে নেবেন। বিউটিফিকেশন প্ল্যানটা যদি উনি হাতে নেন তাহলে আমি বাধিত হব।
--- ইটস মাই প্লেজার।
--- থ্যাঙ্কস।
চা শেষ হতেই মিঃ খাসনবিশ চলে গেলেন। নবারুণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল শতরূপার দিকে। গলায় হতাশার সুর, বলল, "তাড়িয়ে দিচ্ছ?", যেন এখান থেকে যেতে তার আপত্তি। শতরূপার চোখে মুখে মুহূর্তে উপচে পড়ল হাসি। সে হাসি অন্যরকম, তার জাত আলাদা, ধর্ম আলাদা। তা একবার এলে কেউ আর তখন ম্যানেজিং ডিরেক্টর থাকতে পারে না। বিবশ মনের থেকে সমস্ত একোয়াইর্ড আইডেন্টিটি তখন খসে পড়ে। অন্য এক পুরাতনী মন এসে এমন ভারাক্রান্ত করে ফেলল তাকে যে ব্যাক রেস্টে শরীরটাকে এলিয়ে না দিয়ে পারল না শতরূপা। অথচ হাসি তখনও উছলাচ্ছে চোখেমুখে। শায়িত অবস্থায় দুপাশে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, "ধুস্, তা কখনো আমি পারি? কোনোদিন কি তা সম্ভব আমার পক্ষে? না হয় পাল্টেই গেছি অনেক, কিন্তু তাই বলে কি মরেই গেছি একেবারে? আমার কি ... আমার কি"। কথা শেষ হল না, কিন্তু থেমে গেল হঠাৎ, সামান্য একটু স্বর পরিবর্তনের পর পরই। কেন এমন হল, তা কেউ জানে না। নবারুণ শুধু সেইটুকুই জানতে পারল যা চোখে দেখতে পে । সোফার ডানদিকের হাতলের উপর রাখা তোয়ালেটা দ্রুত বেগে টেনে নিয়ে চোখ চাপা দিল শতরূপা।
খুব বেশী সময় লাগল না স্বাভাবিক হতে, আবার সোজা হয়ে বসল শতরূপা। বলল, "আবার এসো একথাটা হয়তো তেমন জোর দিয়ে কোনোদিন বলতে পারব না, কিন্তু এই প্রাণে কী করে পারব তাড়িয়ে দিতে? কী করে বলব, চলে যাও? কোথায় যেতে বলেছি তোমায়? কতদূরে? কতক্ষণের জন্য? এখুনি তো আবার চলে আসবে, কথা শেষ হলে! আমি তো ততক্ষণ বসে থাকব তোমার জন্য। তুমি এলে তারপর তোমাকে নিয়ে বেরোব।
--- কোথায় যাবে আমায় নিয়ে?
--- কেন? বললাম যে? তুমি আজ বাড়ি যাবে আমার সাথে। যাও কথাবার্তা সেরে এসো, দেরী কোরো না। ততক্ষণে এদিকে আমিও হাতের কাজগুলো সেরে ফেলি। অফিসে সবাই জানে ম্যাডাম গল্প করে সময় নষ্ট করে না। ম্যাডাম মিনস্ বিজনেস। তুমি নিশ্চয় চাইবে না সেই ইমপ্রেশনটা সাফার করুক। যাও, ঘুরে এসো, লক্ষী ছেলে।
বলেই আবার খিলখিল করে হাসতে লাগল শতরূপা। নবারুণ বলল, "বেশ, যাচ্ছি। তুমি অপেক্ষা করতে চাও তো কোরো, কিন্তু আজ আর তোমার বাড়িতে যাওয়ার কথা বোলো না। আরেকদিন যাব"।
--- হ্যাঁ, আরেকদিনও যাবে, একশবার যাবে। কিন্তু আজও যাবে। আমার সাথে ডিনার করবে। তারপর পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা সে আমি করব, তোমায় চিন্তা করতে হবে না।
--- আমার খাওয়া দাওয়া নিয়ে এত চিন্তায় পড়লে কেন? বেঁচে থাকলে লাঞ্চ, ডিনার সবই করতে হয়, সুতরাং কোনো একটা ব্যবস্থা থাকেই।
--- আমি তার থেকে একটু বেশী ব্যবস্থা করেছি। তার তো একটা মর্যাদা দিতে হয়, নাকি?
--- আগাম কী করে ব্যবস্থা করলে? বলতে পারো যে গিয়ে করবে। অর্থাৎ করা এখনো বাকি আছে।
--- না, না, কথা বলে সময় নষ্ট কোরো না। যখন বলছি করা আছে, তখন নিশ্চয়ই করা আছে। হ্যাঁ, আগামই করা আছে, অনেকদিন আগেই । সে তখন গেলে দেখতে পাবে ।
--- আগে এমন নাছোড় ছিলে না, এখন হয়েছ। কেমন করে সম্ভব আগাম ব্যবস্থা করে রাখা?
--- সত্যিই আছে। রুটি খাবে না ভাত খাবে বা কী কী পদ দিয়ে খেতে দেব সে ব্যবস্থা হয়তো গিয়ে করব, কিন্তু সেটা গৌণ। আসল কথাটা অন্য।
--- কী? ওসব ছাড়া আবার আসল কথা কোনটা?
--- শুনবে? শোনো তাহলে। আমার যে ছবিটা এঁকেছিলে, তোমার সেই পেইন্টিংটা আজ বার করব। সেই যে তখন যত্ন করে মুড়ে রেখে দিয়েছিলাম, কোনোদিন আর খোলা হয়নি। জানি না এতদিন পর কেমন আছে সেই ছবি, তবু একসাথে দেখব দুজনে।
--- নির্ঘাত নষ্ট হয়ে গেছে। ঐ রকম মুড়ে রেখে দিলে থাকে নাকি এতদিন? টাঙিয়ে রাখনি কেন?
--- সে কথা অতীশও বলত। কিন্তু আমার মন মানত না। ওটা অন্য আরেক অধ্যায়, এই উপসংহারের সাথে সেটা মিশিয়ে দেব কেন? ওটা নবারুণের চোখে দেখা শতরূপা, ওটা নবারুণেরই শুধু। আজ তোমার সাথে বসে দেখব কেমন ছিল নবারুণের শতরূপা। যাও, কথাবার্তা সেরে এসো, আমিও সেরে নিই ততক্ষণে।
--- বেশ, তাই হবে। কিন্তু আমার একটা কথা তোমায় রাখতে হবে। তোমাদের খড়গপুরের অফিসের কাজটা অন্য কাউকে দাও। আমি বরং কোনো একজন কমপিটেন্ট আর্টিস্টের খোঁজ তোমাকে দিতে পারি, কিংবা প্রয়োজনে আরো কিছু সাহায্যও করতে পারি, কিন্তু কাজটা নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
--- কেন? হঠাৎ এমন কথা বলছ কেন?
নবারুণ হাসল। শতরূপা বলল, "হাসছ যে! কারণটা শুনি"।
--- এ কাজ আমার নেওয়া চলে না শতরূপা। কেন যে তুমি বুঝতে পারছ না, তা আমি বুঝতে পারছি না।
--- না, সত্যিই বুঝতে পারছি না। কেন?
--- আমি কমপিট না করে কাজ নিই না।
অবাক শতরূপা তাকিয়ে থাকল শুধু। নবারুণ উঠে দাঁড়িয়েছে বলে অনেকখানি উঁচুতে উঠে গেছে মাথা, শতরূপাকে তাই উপর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করবার জন্য ঘাড় কাত করতে হল মাথা পিছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন