কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

রিমি দে

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

 

আবিদা বিবি

(১)  

আকাশ দুপুর থেকেই কালো। বিশেষ করে ঈশান কোণে জমাট বাঁধা মন খারাপের মত বেশ কয়েক দলা ইতঃস্তত ছড়িয়ে থাকা মেঘ একটু একটু করে ঘন হছিল। থম মেরে আছে জগৎ যেন। অথচ সকালের দিকেই ছিল দখিনা বাতাস। চৈত্র মাসে এইরকম পরিবেশ মনকে যেমন একটু শান্ত করে, তেমন উতলাও। এইরকম পরিবেশ নন্দিতাকে অস্থির করে অনেক সময় আজকাল। বসন্তের দামালপনা যেন তাকে ছাড়তে চায় না! চারদিকে বালি, হাওয়া, শুকনো পাতার মুচমুচে কানাকানি, পুরনো দিনের কত কথা মনে করিয়ে দেয়! দিনে গরম, রাতে নরম শীতল নন্দিতাকে একদিকে যেমন মুগ্ধ করে, অন্যদিকে ডেকে আনে বিস্ময়। মন তার কিছুতেই ভালো হচ্ছে না। চায়, কিন্তু পারে না। ছোট থেকে সে একটু অন্যরকম। বোন চুপচাপ। ঘরের কোণে চুপটি বসে থাকা মিচকে। মা বাবার সে প্রিয় সন্তান। ভালো মেয়ে। ঘরে থাকে। বনি, বন্দিতা। অন্যদিকে ননি অর্থাৎ নন্দিতা বহির্মুখী। বিকেলে খেলে। মণিমেলা যায়। নাচ গান করে, "মণিমেলার ভাই বোনেরা মিলেছি একসাথে, মানুষ সবার স্বপ্ন নিয়ে জীবন প্রভাতে"। আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় নাম দেয়। আশির দশকে মফস্বলের প্রান্তিক অঞ্চলে ভালো মন্দের সংজ্ঞা এভাবেই বিচারক মনোভাবের মধ্য দিয়ে নিধারিত হতো।

মফঃস্বল খালিপুর। ডুয়ার্সের এই অঞ্চল। এই অঞ্চলটির খালিপুর নামকরণের পেছনে একটি গল্প প্রচলিত। শোনা যায় একবার বহিরাগতদের আগমনে অঞ্চলে অরাজগতার সৃষ্টি হয়েছিল। গলাকাটা থেকে নাকি রাজবংশী রাজার একভাই হীরু তীর ধনুক নিয়ে চলে এসেছিল। সে নাকি বহিরাগতদের শক্ত হাতে দমন করে তাদের সাফ করে দিয়েছিল। বহিরাগতরারা সেই অঞ্চল খালি করে চলে যায়। সেই থেকে নাম হয় খালিপুর। পাশেই ডাঙ্গিবাড়ি গ্রাম। কী যে অপূর্ব তার শোভা ছিল একসময়! সরু শক্ত মাটির রাস্তা বহুদূর গ্রামটির বুক চিরে গেছে বহুদূর। দুইদিকে ধানক্ষেত। আলে বসে থাকা পাখিরা আজও তাকে স্বপ্নে ডাকে। তবে এখন সেটা আর গ্রামাঞ্চল নেই। সময় সব বদলে দেয়।

নন্দিতা বিকেলের দিকে একটা টোটো নিয়ে বের হয় আজকাল। এরকম সে মাঝে মাঝেই করে থাকে। একা মানুষ। অরবিন্দ চলে যাবার পর থেকে সে বুঝে গেছে জীবন আসলে কী! কিছুই থাকে না জীবনে। সমন্বয় একমাত্র ছেলে হায়দ্রাবাদে থাকে চাকরি সূত্রে। পড়তে গেল ব্যাঙ্গালোরে। চাকরি পেয়ে থেকে গেল সেই দক্ষিণের অঞ্চলেই, আর ফেরেনি। এছাড়া উপায় বা কী? বাংলায় মনমতো চাকরি পেত না জানা কথাই। দক্ষিণ ভারতেই চাকরিসূত্রে ঘোরাফেরা। মানে উড়িষ্যাতেও বদলি হয়নি। কর্ণাটক থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ অব্দি ওর কর্মক্ষেত্রের জোন। অরবিন্দর মৃত্যুর পর মাসখানেক এসে থেকেছিল করোনাকাল বাদ দিয়ে। তারপর থেকে চারমাস চলে গেছে। সমু আসেনি। ওর বাবাও এইরকম ছিল। বাবার ধারাটাই ছেলে পেয়েছে। পাড়ার বাবাই আইটি ছেড়ে দিয়ে ফুলগ্রামে জমি কিনে ব্যবসা করছে। মাছের চাষ করছে। যদিও ওই পঞ্চায়েত এলাকার নেতা কুখ্যাত কৃষ্ণ দাস ও তার সম্প্রদায়কে কয়েক লাখ ঘুষ হিসেবে দিতে হয়েছিল। সমন্বয় ওরফে সমু এসব পারত না কিছুতেই।

(২)

নন্দিতাকে আবিদা বিবির ছোট্ট আস্তানার সামনে  টোটো ছেড়ে দেয়। টোটোর মালিক ও চালক  রবি। সকালে  মাছ বিক্রি করে সাইকেলে চেপে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে। বিকেল থেকে টোটো চালায়। একদম খারাপ না উপার্জন। বেশিরভাগ বিকেলের দিকেই নন্দিতা টোটো নিয়ে বের হয়ে যায় বাইরে। অরবিন্দর মৃত্যুর পর থেকে বিকেলে ঘরে থাকতেই পারে না। শোক আছে, তবে বাস্তবে নিজের বেঁচে থাকার দায়িত্বও আছে। বেশ কয়েক বছর আগে আবিদা বিবিকে নন্দিতা একটি স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিল। সেটাই সে ব্যবহার করে। আবিদা বিবি প্রাচীন নদীয়ার। বছর কুড়ি আগে আবিদা বিবির সাথে নন্দিতার পরিচয়। মাধ্যম হাঁসের ডিম।

২০০৪/২০০৫ নাগাদ নদীয়ার ইলামঘাট গ্রাম থেকে দশ বারোটি পরিবারের কিছু মানুষ উত্তরের অঞ্চলে কাজ করতে চলে আসে। ওদিকে ওরা নাকি ঠিক কাজ পেত না! বেশিরভাগই  মুসলিম পরিবারের শাশুড়ি ও বৌ, মা ও ছেলে, দাদু ও নাতি, এইরকম আরকি! কেউ কেউ নাম বদলে কাজ নিয়েছিল। বাংলার উত্তর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলার দোকানে বা কারুর বাড়িতে তারা কাজ পায় এবং থাকতে শুরু করে দেয়। ওরা কাজকর্মের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সৎ। কাজেই কারুর কারুর পরিচয়ে মিথ্যে থাকলেও সততার প্রলেপে সেটা ঢাকা পড়ে যায়।

করোনার সময় অরবিন্দ আর নন্দিতা ভোরের দিকে ছোট মাঠটায় হাঁটতো। সমু তখন মাসকয়েক হল  চাকরি পেয়েছে। ছেলে সাতদিনের জন্য এসে দু বছর থেকে যায়। সারা পৃথিবীতে তখন ওয়ার্ক ফ্রম হোম। সমুরও তাই হল। করোনা বেশ কিছু নতুন পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে। কোয়ারেনটাইন, লকডাউন, রংবেরঙের মাস্ক, স্যানিটাইজার ব্যবহার, অনলাইনে নানারকম কাজ, জুম মিটিং ইত্যাদি। সেই সময় সকলে কাজের লোক ছাড়িয়ে দিচ্ছিল। আবিদা বিবিকে নন্দিতা এক দিনের জন্যেও আসতে না করেনি। সে তো পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছিল এত বছরে।

শুক্ত থেকে সেমাই, মোগলাই পরোটা থেকে ডাকবাংলো মটন সবরকম রান্নাই সে জানতো। বহু রান্না নন্দিতার কাছ থেকেও শিখেছে। বানিয়ে রান্না করার প্রবণতাও ওর ছিল। বেশ ইনোভেটিভ। নন্দিতার বেশ লাগত। অরবিন্দর পেটপুজোর বহর আবিদা বিবি আসার পর থেকে আরও জমে উঠেছিল। করোনাকালে যেদিন বাজার হত সেদিন প্রচুর বাজার করে আনত সমু। সমুর অফিস থেকে গ্রসারি কেনার একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা সোডেক্সো কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া হতো। রিলায়েন্স মেগামার্ট থেকে কেনা হত। দু একদিন সমু বাইকের পেছনে করে আবিদা বিবিকে নিয়ে যেত।

বাড়ির সকলের কাছেই প্রথম থেকে সে ছিল আবিদা বিবি। সমু তখন স্কুলে। বিশ্বস্ত যে সেটা নন্দিতা কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে গেছিল। অরবিন্দ ছিল ছেলের চেয়েও বেশি খাদ্যরসিক। আবিদা বিবি অরবিন্দকে দাদা বলে ডাকত। খোয়া আর ক্রিম দিয়ে তৈরি কেশর পিস্তা ছড়ানো সেমাই মুখে লেগে থাকার মতো বানাতে জানত। খিচুড়ি রান্না হত লকডাউনের সময়। বাড়ির সামনে বড় বড় দুই হাঁড়ি। নন্দিতা আর আবিদা বিবি  দুজনে দুটো মোড়া নিয়ে বসে পরিবেশন করত। কত গরীব, না খেতে পাওয়া মানুষ খেতে আসত নিজেদের বাসন নিয়ে। বাড়ি পাড়ার অনেকটা ভেতরের দিকে। তবু খিচুড়ি বিতরণ করে কুল পেত না।  মানুষের মুখে মুখে খবর পৌঁছে গিয়েছিল আশেপাশে। খাইয়ে খুব ভালো লাগত ওদের। সেই সময়ে সত্যিই যাদের উপার্জন ছিল না, তাদের দুরবস্থার শেষ ছিল না। পাড়ায় পাড়ায় মাছ, মাংস, ডিম, সব্জি, ফল ফেরি করে বিক্রি করত। জগৎ তখন অদ্ভুত বলে মনে হতো। গোটা ভারতবর্ষর দরোজা বন্ধ। ভাবা যায়! শুধু ভারত কেন, পৃথিবীর প্রচুর দেশ এই অসুখে ভুগেছিল। সমু মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড় জঙ্গলের দিকে। বাইক নয়, সাইকেল হতো সফরসঙ্গী।

স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে দিনগুলো খুব মিস করে ননি। নন্দিতা। অরবিন্দর কাছে সে ছিল শুধুই ননি। কী ভালো গাড়ি চালাতে পারত। সমুর ড্রাইভিংএ বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। অথচ ওর বন্ধুরা গাড়ি চালায়। অরবিন্দ তরুণ বয়সে ছিল ফুটবল প্লেয়ার। ইন ফ্যাক্ট সরকারি চাকরিটাও খেলার কোটায়। পরের দিকে অফিসের কাজে এতটাই মগ্ন হয়ে যায় যে খেলাটা চলে যায়। অথচ সেই ব্যথাটা থেকে যায়। একটু বয়সের পর মাঝে মাঝেই সেই ব্যথাটা জেগে ওঠে। ইউনিভার্সিটি ম্যাচে একবার কাদায় এমনভাবে স্লিপ খেয়েছিল যে একঘণ্টার মতো সে উঠতে পারেনি। তারপর প্রায় বছরখানেক খেলতে পারেনি। সে সময় একমাত্র সেলিম ছিল তার সঙ্গী। ইউনিভার্সিটির পাশেই ছিল ওদের বাড়ি। অনেকদিন ওদের বাড়িতে  গিয়েছিল। নিম্নবিত্ত মুসলিম পরিবার। আন্তরিক। মায়াভরা। পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে অরবিন্দ বাড়ি ফেরে। ওর একটা সুন্দরী বোন খুব যত্ন করেছিল। নাম জাহানারা। অযত্নের মালিন্য চোখে মুখে।চঅল্প কদিনেই সেবা পেতে পেতে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। এসব কথা নন্দিতা বিয়ের পর পর সামান্যই শুনেছে। সেই ব্যথা অরবিন্দকে জ্বালিয়েছে গোটা জীবন।

(তিন)

অবিদা বিবি ভোর ছয়টার মধ্যে ঢুকে যেত করোনার সময়ে। ওর কোন দল ছিল না বলে কাজে আসতে বাধা দিতে পারত না ইউনিয়ন। কাজে আসবে না, মাইনে নেবে এতে আবিদা বিবির বিশ্বাস ছিল না। তাই নো কামাই। কিন্তু সন্ধ্যের পর সে বাড়ি যাবেই। মন্দির পাড়ায় খাস জমির উপর ছোট্ট একটা ঘর। পাশে ছোট্ট একটা দিঘি মতো। ওর হাঁসেরা সেখানে আগে সাঁতার কাটত। যখন এসেছিল নদীয়া থেকে তখনই কিছু জমানো টাকা দিয়ে জমি নিয়েছিল সুজা মণ্ডলের কাছ থেকে। তখন তার ছেলে আফিফ সঙ্গে ছিল। পরে আফিফ অন্য কাজ নিয়ে গলাকাটা অঞ্চলে মাশরুমের ব্যবসা শুরু করে। বিবি বাচ্চা নিয়ে আসে পরে। ব্যাস এর বেশি নন্দিতা আবিদা বিবি সম্পর্কে জানত না। এই শ্রেণীর মহিলা এত কন্টিনেন্টাল খাবার বানানো শিখল কীভাবে, এই প্রশ্নটা মনে বহুবার জাগলেও সেটা কখনোই জানতে চায়নি নন্দিতা আবিদা বিবির কাছে! শুরুর দিকে আবিদা বিবি শুধু বলত, "আমরা গ্রামে মেয়েরা মসজিদে যেতে পারতাম না!" অনেক অনুযোগ ছিল তার। গ্রামে সে আর ফিরে যায়নি। আফিফ মাস কয়েক ছিল আম্মির সাথে। অন্য ব্যবসায় চলে যাবার পর আবিদা বিবি দেশি মুরগীর ডিমের পাশাপাশি পোল্ট্রির ডিম বিক্রি শুরু করে। তারপর হাঁস কেনে। ওই হাঁসের ডিমই আবিদা বিবিকে নন্দিতার কাছে এনেছিল। মোড়ে বাজারের এক কোণে বসত ডিম নিয়ে। ডিম নিতে নিতে আর গল্প করতে করতে অসম বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে দুজনের।

বাড়িতে এসে ডিম দিয়ে যেত। তারপর একদিন বাড়ির রান্নার কাজে নিয়ে নিল নন্দিতা। অরবিন্দ বলেছিল, "ননি, ঠিকঠাক চেন না, রান্না করাতে চলছ, ভেবেছো তো?

-তুমি এত ভেব না। তুমি এখনও দ্যাখোইনি। আমার উপর ছেড়ে দাও তো!

-ঠিকাছে, তোমার উপর আমার ভরসা আছে গো! তবু জাস্ট বললাম।

হালিম! হ্যাঁ, প্রথম দিনেই এই রান্নাটা খেয়ে ফিদা হয়ে গেছিল অরবিন্দ। তারপর তো গোটাটাই ইতিহাস। ১৪/১৫ বছর একজন রান্নার মুসলিম বৌ হিন্দু বাড়িতে টিকে যাওয়া! নট অ্যা ম্যাটার অফ জোক!

ঘুমের মধ্যে পড়ে যাওয়াটাই কাল হল! সেই যে পড়ল অরবিন্দ আর উঠল না। ব্যথাটা আবার বাড়ল। বছর দুয়েক ওভাবেই! ট্রিটমেটএর অন্ত ছিল না! পার্কেন্সন ধরে গেল মাস কয়েকের মধ্যে! ব্যস সব শেষ খুব কম সময়ের মধ্যে! আবিদা বিবি অরবিন্দর জন্য যা করেছিল, তার জন্য নন্দিতা ঋণী আবিদা বিবির কাছে চিরজীবন।

আবিদা বিবি আরও কাছের হয়ে উঠেছিল। সমু চলে গেল হায়দ্রাবাদ। কী আর কাজ! মানুষ কমে গেলে কাজ কমে যায়। একদিন বাদে বাদে আবিদা বিবি আসে। তাতেই হয়ে যায় নন্দিতার। আবিদা বিবি সকালের দিকে আসে দুপুরে চলে যায়। এসবের ঊর্ধ্বে ওদের দুজনের মধ্যে কী যেন থেকে যায়! কী সেটা? ভালোবাসার চাইতেও অধিক কিছু?

তবে আবিদা বিবিকে নিয়ে নন্দিতার প্রশ্ন ছিলই! প্রচুর। বেশি মাটি সে খুঁড়তে চায়নি কাজের লোক নিয়ে! তবে কিছু সংশয় অধিক মাত্রায় ঘুরতে শুরু করে সেদিন থেকে যেদিন সে অসুস্থ অরবিন্দকে রোগান জোশ করে খাওয়াল! মুসলিম মহিলা ফিরনি, কুবুস, হালিম তৈরি করা জানতে পারে! কিন্তু রোগান জোশ! এই খাবার কীভাবে সে জানবে? একেবারে প্রায় নিম্নশ্রেণীর মানুষ। অভিজাত কাশ্মীরিরান্না রোগান জোশ। পারিবারিক সংস্কৃতি উচ্চমানের না হলে জানার কথা নয়! অনেক অসঙ্গতি ছিল আবিদা বিবির পরিচয় ও কাজের ধরনে। আগে প্রশ্নগুলো এত চাগিয়ে বসত না মাথায়। অরবিন্দ না থাকায় তার প্রচুর সময়। ভাবনা এসে চেপে বসল। কত কত পুরনো চিন্তা মাথা ঘুরিয়ে দিতে থাকল নন্দিতার। রাতের আঁধার শরীর মনে লুটিয়ে পড়তে লাগল। আসলে কে সে? সারারাত ঘুম এল না। জল আর বাথরুম করে রাত ভোর হল। আবিদা বিবিকে ফোন করে। ফোন বন্ধ!

সকাল নটা অব্দি অপেক্ষা করল। অবিদা বিবির আসার কথা ছিল না, তবু তার মনে হয়, সে আসবে! সমুর ফোন আসে। অফিস যাবার আগে। দিনে দুবার মায়ের খোঁজ নেয় ছেলে। সকালে আর রাতে। রাতে দশটা বেজে গেলে নন্দিতাই কথা বলে নেয়। রিসিভ না করলে জানে মিটিংয়ে আছে সমু। ফিরে এসে ফোন ঠিক করবে। এইরকম বোঝাবুঝি দুইজনের।

একটু চা খেয়ে বেরিয়ে পড়ে। রবিকে ফোন করে। পায় না। মনে পড়ে যায় যে রবি মাছ বিক্রি করতে বেরিয়েছে পাড়ায় পাড়ায়। আবিদা বিবি নন্দিতার সারারাত মাথা খেয়েছে। আর সবুর সইছে না! আগের গাড়ি সমু হায়দ্রাবাদ নিয়ে গেছে অরবিন্দ চলে যাবার পর। র‍্যাপিডো বুক করে একটি টোটো নিয়ে সোজা আবিদা বিবির ঘরে! নন্দিতাকে দেখে আবিদা বিবি অবাক!

- কী হয়েছে দিদি তোমার? এত সকালে?

- তোমার ফোন বন্ধ কেন?

- কাল থেকে খুব জ্বর দিদি, ফোনে চার্জ দিতে ভুলেই গেছি গো!

কিছুক্ষণ চুপ থেকে চোখে চোখ রেখে নন্দিতা জিজ্ঞেস করে, তোমার দাদার নাম কি সেলিম? তোমাদের বাড়িতে অরবিন্দ বহু আগে একবার কিছুদিন ছিল? তুমি সেবা করেছিলে? তুমি জাহানারা?

আবিদা বিবি থতমত খেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। চোখে চোখ রাখতে পারে না। মুখ সরিয়ে নেয়। ঠান্ডা নিস্তব্ধ হাওয়া কী যেন বলে দেয় দুজনকে পৃথকভাবে! নন্দিতার বুকের ভেতর রোগান জোশ উথাল পাথাল ঘুরতে থাকে, ঘুরতেই থাকে। নন্দিতার প্রাণের ভেতর একটি জায়গা করে নিয়েছিল আবিদা বিবি।

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন