![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫০ |
সংবাদ
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ সুধীরবাবু ঢুকলেন হাতে একটা ছোট রেডিও নিয়ে। প্রোফেসর হরেন মুস্তাফি তখন তাঁর স্টাডিরুমে একটি গবেষণাপত্রের খসড়া নিয়ে ব্যস্ত। সপ্তাহে দু-একদিন সুধীরবাবু আসেন তাঁর কাছে। নিছক আড্ডার মধ্যে প্রোফেসরের অদ্ভুত সব বৈজ্ঞানিক আলোচনা শোনেন।
কলিং বেলের শব্দে নিতাই দরজা খুলেছিল। সে প্রোফেসর মুস্তাফির সর্বক্ষণের সঙ্গী। বাজারহাট, রান্নাবান্না এবং প্রোফেসরের ব্যক্তিগত সবকিছু দেখাশোনার দায়িত্ব নিতাইয়ের। ইদানিং আবার প্রোফেসরের কাছেই সে কম্পিউটার চালানো শিখছে।
সুধীরবাবুকে বসতে বলে নিতাই চলে গেল প্রোফেসরকে ডাকতে। বলে গেল, পাঁচমিনিট বসুন, বাবু কী যেন লিখছেন! আমি ডেকে আনছি।
কিছুক্ষণ পর প্রোফেসর এলেন। তাঁকে দেখেই সুধীরবাবু টেবিলের ওপর রাখা রেডিওটার দিকে আঙুল দেখিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে হেসে বললেন, এই জিনিসটাই আজ আপনাকে দেখাতে এনেছি।
প্রোফেসর ভুরু কুঁচকে বললেন, কী ওটা? রেডিও মনে হচ্ছে…
সুধীরবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, পুরনো জিনিসের বাজার থেকে কিনেছি। ব্যাটারি লাগাতেই দিব্যি চালু হয়ে গেল। কিন্তু কয়েকদিন আগে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল…”
কী?
রাত আটটা থেকে পুরনো ছায়াছবির গান শুনছিলাম। রাত দশটায় গান শেষ হতেই বাংলা খবর শুরু হল। হঠাৎই সংবাদপাঠক বারাসতের একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার খবর পড়তে শুরু করলেন। শুনে একটু অবাকই হয়েছিলাম। কারণ তখনও এমন কোনও দুর্ঘটনার কথা কোথাও জানা যায়নি। ভেবেছিলাম, নিশ্চয়ই ভুল সংবাদ। পরদিন সকালের খবরের কাগজেও তেমন কিছু দেখলাম না। কিন্তু সেদিন দুপুরে টিভির ব্রেকিং নিউজে দেখি, বেলা আড়াইটে নাগাদ হুবহু সেই দুর্ঘটনাই ঘটেছে।
প্রোফেসর বললেন, ও ডাকবাংলো মোড়ের সেই দুর্ঘটনাটা?
বলতে বলতে তিনি রেডিওর পেছনের ঢাকনাটা খুললেন।
আরে! ব্যাটারি কোথায়?
বেরোনোর আগে ভয়ে ব্যাটারি দুটো খুলে রেখে এসেছি। আবার কী সংবাদ শুনিয়ে দেয়…
প্রোফেসর চট করে তাঁর স্টাডিরুম থেকে দুটো ব্যাটারি নিয়ে এসে রেডিওতে লাগালেন। তারপর নব ঘুরিয়ে স্টেশন ধরার চেষ্টা করতে লাগলেন। মিনিট দশেক পর স্পিকারে খসখস শব্দ ভেসে উঠল।
ঠিক তখনই সাতটা পঞ্চাশের স্থানীয় সংবাদ শুরু হওয়ার সময়। কিন্তু তার বদলে ভেসে এল এক অদ্ভুত কণ্ঠ -
আকাশবাণী। বিশেষ সংবাদ। আজ একত্রিশে জুলাই, দুই হাজার ছেষট্টি…”
ঘরে নিস্তব্ধতা।
কণ্ঠস্বর বলছে, আজ দুপুরে দীঘার উপকণ্ঠে পরীক্ষামূলক সময়-তরঙ্গ যন্ত্রের প্রথম সফল প্রয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, সীমিত সময়ের জন্য অতীতের দিকে একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে সংকেত পাঠানো সম্ভব হয়েছে। পরীক্ষার সাফল্যের জন্য নিখোঁজ বিজ্ঞানী প্রোফেসর হরেন মুস্তাফির তত্ত্বকে কৃতিত্ব দিয়েছেন গবেষকরা। ২০৩০ সালে তিনি গবেষণাটি অসমাপ্ত রেখেই নিখোঁজ হন। তাঁর আর কোনও সন্ধান মেলেনি…
হঠাৎ রেডিওটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
সুধীরবাবু কিছুক্ষণ প্রোফেসরের মুখের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললেন, আপনি… এরকম কোনও গবেষণা করছেন?
কোনও উত্তর দিলেন না প্রোফেসর হরেন মুস্তাফি।
ধীরে ধীরে তিনি স্টাডিরুমের দিকে চলে গেলেন। সেখানে তাঁর কম্পিউটারের পর্দায় ওয়ার্ড ফাইলের শিরোনাম– Time_Transmission_v1…
কার্সরটি তখনও ব্লিঙ্ক করছে।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন