![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫০ |
পোড়া বইমেলা
তখন কলকাতা বইমেলা হতো গড়ের মাঠে, মানে ময়দানে। মেলাভর্তি মানুষের শ্রীচরণের ছোঁয়ায় সন্ধ্যে নাগাদ উজিয়ে উঠত ধুলোর কুয়াশা। সন্ধ্যারানীর ছিল আবার ধুলোর অ্যালার্জি। নাকের ফুটোয় ধুলোর অনুপ্রবেশ মানেই হাঁচির ছররা। খুব বেগতিক অবস্থা তখন হত তার। তবু নিজেকে যতটা আড়াল করা যায়! কলকাতার মানুষ তখনও মুখে মাস্ক পরা দেখেনি, সন্ধ্যরানী হ্যন্ডমেড মাস্ক পরে আসত। এবং রীতিমতো আফশোস হত, তার এত সুন্দর লাবণ্যে টলটল মিষ্টিমুখ জনগণের চোখের আড়ালেই থেকে গেল! সন্ধ্যারানী মেলার মাঠ চষে বেড়ালেও তার সন্ধানী চোখ খুঁজে বেড়াত কবিতার বই। যখন সে বাংলা অনার্সের ছাত্রী ছিল, তখন থেকেই তার আকর্ষণ বাংলা কবিতার প্রতি। প্রাচীন থেকে অর্বাচীন সব কবিদের কবিতা গুলে খাবার অদ্ভুত তেষ্টা ছিল তার। বিশেষত অনামী কবিদের অনবদ্য কবিতা খুঁজে খুঁজে পড়া ছিল তার প্যাশন।
সেবছর বইমেলায় লেগেছিল আগুন। লেগেছিল সন্ধ্যারানীর চোখের সামনেই। হতবাক অসহায় সন্ধ্যারানী দেখেছিল সেই সর্বনাশী আগুনের মাতন। উন্মাদের মতো আগুন গ্রাস করছিল একটার পর একটা বইয়ের স্টল। দাউদাউ জ্বলে যাচ্ছিল সাজানো র্যাকের বই। আর ঠিক এই সময়েই একজন দীর্ঘদেহী যুবক তার হাত ধরে টান দিয়ে বলেছিল, একী করছেন! সরে আসুন! আপনার শরীরে যে আগুন লেগে যাবে!
কথাটা ভুল নয়। সন্ধ্যারানী আনমনে আগুনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছিল। যুবকের মুখে দৃষ্টি রেখে বলেছিল, দেখছেন, কীভাবে বইগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে!
যুবকটির দুচোখে তখন জল টলটল করছে। প্রশ্ন করেছিল, আপনি লেখেন? আপনার বইও কি এই স্টলে আছে?
সন্ধ্যারানী বলেছিল, না না, আমি লিখি না। আমি পড়ি। কেন, আপনি লেখেন নাকি?
যুবক হাতের পাতার উল্টোদিকে দুচোখের জল মুছে বলেছিল, হ্যাঁ লিখি। কবিতা লিখি। আর জানেন, পুড়ে যাওয়া সামনের ঐ স্টলে আমার লেখা বেশ কয়েকটি কবিতার বই আছে। এবছর সদ্য প্রকাশিত বইটাও আছে। সব পুড়ে গেল। সব শেষ হয়ে গেল। এতবড় ক্ষতি আমার জীবনে!
আগুনের আওতা থেকে দূরে সরে এসে পুকুরপাড়ে দুজনে বসেছিল। আর সেই পরিবেশে কাঁধের ব্যাগ থেকে সদ্য প্রকাশিত কবিতার বইয়ের একটা কপি বের করে যুবকটি কবিতা পড়ে শুনিয়েছিল সন্ধ্যারানীকে। কবিতা শোনায় মন ছিল না সন্ধ্যারানীর। সে গভীর বিষাদে আনমনে তাকিয়েছিল পোড়া বইমেলার দিকে, ভেতর থেকে একটা তীব্র কষ্ট উঠে আসছিল। এতটা অসহায় অবস্থা এর আগে সে কখনো অনুভব করেনি।
আরও অনেকটা সময় পাশাপাশি নিশ্চুপ হয়ে বসেছিল তারা। যুবক উঠে যাবার আগে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনার নাম কী?
সন্ধ্যারানী নাম বলায় নিজের কবিতার বইয়ে সন্ধ্যারানীর নাম লিখে তাকে উপহার দিয়েছিল বইটি।
সন্ধ্যারানী এখনও প্রতিবছর বইমেলায় যায়। ইতিমধ্যে বইমেলার জায়গা পরিবর্তিত হয়েছে। ময়দান থেকে যুবভারতী, মিলনমেলা ঘুরে এখন সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কে এসে থিতু হয়েছে। সন্ধ্যারানী সব বইমেলাতেই খোঁজে একদা সেই যুবক কবির সদ্য প্রকাশিত কবিতার বই। খোঁজে সেই কবিকেও। দেখা হয়নি আর। তবে কোনো এক বইমেলায় দেখা হবে ঠিকই!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন